কাজী নজরুলের ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে…’
২০ মার্চ ২০২৫ ১৫:০৬
॥ এম ওবায়দুল্লাহ আনসারী ॥
আমাদের পবিত্র রমজান বরকতময় মাস। বছর ঘুরে আবারও আমাদের এসেছে সিয়াম সাধনার এ মাস। পবিত্র রমজান মাস শেষে শাওয়ালের চাঁদ দেখে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। আমাদের অন্যতম ধর্মীয় ও আনন্দের উৎসব ঈদুল ফিতর নিয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন একটি কালজয়ী গান- ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ’।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী এ গানে ঈদুল ফিতরের আনন্দ, সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিক দিক তুলে ধরা হয়েছে। গানটি বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম সমাজে ঈদের আবহ গান হিসেবে পরিচিত এবং ঈদুল ফিতরের আনন্দের এক আবশ্যকীয় অংশ হয়ে উঠেছে। নিজের বন্ধু শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদের অনুরোধে ১৯৩১ সালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ গান রচনা ও সুরারোপ করেন। গানটি প্রথম আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠেই রেকর্ড করা হয়। গ্রামোফোন কোম্পানি এর রেকর্ড প্রকাশ করে। গানটি ১৯৩২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ করা হয়। গানের রেকর্ড প্রকাশের পরপরই গানটি বাঙালি মুসলিম সমাজে তুমুল জনপ্রিয় এবং ঈদুল ফিতরের আগমনী গান হিসেবে কালজয়ী হয়ে ওঠে।
কাজীদার ভক্ত শিল্পী আব্বাসউদ্দীন ততদিনে দু-একখানা গান রেকর্ড করে নাম করে ফেলেছেন। গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের শুরু। কোচবিহার কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হন তিনি। বৃহত্তর জীবনের অনাগত দিনগুলো যেন হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকছিল। আর সেই ডাক তিনি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। তাই অভিভাবকের অনুমতি না নিয়েই কলকাতা চলে যান। কিছু অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার সুযোগ হয় তার। ততদিনে গ্রামোফোন কোম্পানিতে দুটি গান রেকর্ডও হয়ে যায়। একটি ছিল শৈলেন রায়ের লেখা ‘আজি শরতের রূপ দীপালি’, আরেকটি জীতেন মৈত্রের লেখা, ‘ওলো প্রিয়া নিতি আসি তব দ্বারে মন-ফুল-মালা নিয়া।’
কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এরই মধ্যে আব্বাসউদ্দীনের পরিচয় হয়েছে, কোচবিহারে দুটি অনুষ্ঠানে। কাজী নজরুলের চেয়ে বয়সে আব্বাসউদ্দীন ২ বছরের ছোট (নজরুলের জন্ম ১৮৯৯ সালে, আব্বাসউদ্দীনের ১৯০১ সালে)। অনেকটা বড় ভাই-ছোট ভাই সম্পর্ক। নজরুলকে কাজীদা বলে ডাকতেন আব্বাসউদ্দীন। এর মধ্যে নজরুলের ‘বেনুকার বনে কাঁদে বাতাস বিধর’, ‘গাঙে জোয়ার এলো, ফিরে তুমি এলে কই’, ‘বন্ধু আজও মনে পড়ে আম কুড়ানো খেলা’ এগুলোসহ আরো কয়েকটি গান রেকর্ড করলেন। বেশ নাম হলো আব্বাসউদ্দীনের। তবু কেন যেন মনে প্রশান্তি লাভ করতে পারছিলেন না তিনি।
ওইসময় বাংলার মুসলমান সমাজে কাওয়ালি খুব জনপ্রিয়। পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়ালের কাওয়ালির রেকর্ড বিক্রি হয় হাজারে হাজারে। একদিন আব্বাসউদ্দীনের মাথায় ভাবনা এলো, বাংলায় যদি এরকম ইসলামী গান দেওয়া যেত, কেমন হতো? কথাটা তিনি তার কাজীদার কাছে পাড়লেন, এ-ও বললেন, ‘আপনি যদি ইসলামী গান লেখেন, তাহলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান।’ কথাটা নজরুলের মনে ধরল। তিনি বললেন, ‘আব্বাস, তুমি ভগবতীবাবুকে বলে তার মত নাও। আমি ঠিক বলতে পারব না।’ ভগবতীবাবু তখন গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল ইনচার্জ। আব্বাসউদ্দীন তাকে কথাটা বলতেই তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, ‘না-না-না, ওসব গান চলবে না। ও হতে পারে না।’
কাজী নজরুল ইসলাম দরজা বন্ধ করে আধাঘণ্টার মধ্যেই লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।’ তখনই সুর সংযোগ করে শিখিয়ে দিলেন আব্বাসউদ্দীনকে। পরদিন আবার আব্বাসকে আসতে বললেন। লিখলেন, ‘ইসলামের ঐ সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর।’ তখনকার দিনে গানের যন্ত্র বলতে ছিল হারমোনিয়াম আর তবলা। গান দুটি তখনো আব্বাসউদ্দীনের মুখস্থ হয়নি। মাইকের পাশ দিয়ে হারমোনিয়ামের ওপর নজরুল নিজেই সেই গানের কাগজখানা ধরলেন। আব্বাসউদ্দীন গেয়ে চললেন। গান লেখার ঠিক চারদিন পরই রেকর্ড হলো। তখন থেকে দুই মাস বাকি ছিল ঈদুল ফিতর। ঠিক হলো ঈদে এ রেকর্ড বাজারে আসবে।
ঈদের ছুটিতে কোচবিহারের বাড়িতে গেলেন আব্বাসউদ্দীন। একদিন কলকাতা ফিরে এসে ট্রামে চড়ে অফিসে যাচ্ছেন। তার পাশে বসে এক যুবক গুনগুন করে গাইছে, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। আব্বাসউদ্দীন একটু অবাক হলেন। ও এই গান শুনল কী করে! অফিস ছুটির পর গড়ের মাঠে বেড়াতে গেলেন আব্বাসউদ্দীন। মাঠে একদল ছেলের মাঝে একটি ছেলে গেয়ে উঠল, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’। তখন আব্বাসের মনে হলো- আরে, এ গান তো ঈদের সময় বাজারে বের হওয়ার কথা! তখন ইসলামী গানের এত বেশি চাহিদা তৈরি হলো, আব্বাসউদ্দীন একা আর গেয়ে কুলিয়ে উঠতে পারেন না। প্রতি মাসেই তার রেকর্ড বের হয়। তকরীম আহমদ, আবদুল লতিফ নামে নতুন শিল্পীরাও গেয়ে জনপ্রিয় হন।
আনন্দে-খুশিতে মন ভরে উঠল আব্বাসউদ্দীনের। গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল রুমে ঢুকে পড়লেন। গলা শুনেই একদম লাফিয়ে উঠে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন নজরুল। ‘আব্বাস, তোমার গান কী যে…’ আর বলতে না দিয়ে নজরুলকে কদমবুচি করলেন। ভগবতীবাবুকে বললেন, ‘তাহলে এক্সপেরিমেন্টের ধোপে টিকে গেছি, কেমন? তিনি বললেন, ‘এবার তাহলে আরো কখানা এ ধরনের গান…’ সবকিছুর জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলেন আব্বাসউদ্দীন। এরপর নজরুল লিখে চললেন একের পর এক ইসলামী গান। ‘আল্লাহ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়’, ‘আল্লাহ নামের বীজ বুনেছি’ ইত্যাদি। কাজী নজরুল ইসলাম দরজা বন্ধ করে আধাঘণ্টার মধ্যেই ঈদুল ফিতরের আগমনী গান হিসেবে লিখেছিলেন-
* “ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ,
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে জাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিদ,
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।
* আজ পড়বি ঈদের নামাজ রে মন সেই সে ঈদগাহে,
যে ময়দানে সব গাজী মুসলিম হয়েছে শহীদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।
* আজ ভুলে যা তোর দোস্ত-দুশমন, হাত মেলাও হাতে,
তোর প্রেম দিয়ে কর বিশ্ব নিখিল ইসলামে মুরিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।
* যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা, নিত্য উপবাসী,
সেই গরীব ইয়াতীম মিসকিনে দে যা কিছু মুফিদ,
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।
* ঢাল হৃদয়ের তোর তশতরীতে শিরনি তৌহিদের,
তোর দাওয়াত কবুল করবেন হজরত হয় মনে উম্মীদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ।
* তোরে মারল ছুড়ে জীবনজুড়ে ইটপাথর যারা,
সেই পাথর দিয়ে তোলরে গড়ে প্রেমেরই মসজিদ।
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ,
আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ।”
লেখক : সাংবাদিক।