স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের দোলাচল
২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:৫৫
॥ রফিক মুহাম্মদ ॥
কানামাছি ভোঁ ভোঁ/যারে পাবি তারে… এই যে… এই যে… জরি বু’রে ছুঁইছি। দু’চোখের বাঁধন নিজ হাতে খুলে বেশ দৃঢ়তার সাথে বলে পরি।
তবে বড় বোন জরি তা কিছুতেই মানতে নারাজ। সেও খুব জোরের সাথে বলে, না এইডা ঠিক না। আমারে ছুঁইতেই পারে নাই।
– না না তুমি কাণ্ডামি করতাছ। তোমার ওড়নার কোনায় আমার অঙুল লাগছে। তুমি মিছা কথা কইতাছ। এই রহম কাণ্ডামি করলে আর খেলতাম না।
– ঠিক আছে না খেল, আমি কইতাছি আমারে ছুঁইতে পারস নাই…
উঠানে পরি, জরি, জবা, পারুল, রোমানা, আমিনা এরা সবাই মিলে কানামাছি খেলছিল। খেলা নিয়ে জরি আর পরির মধ্যে প্রায়ই এমন ঝগড়া হয়। পিঠাপিঠি দুই বোন কেউ কাউকে এতটুকু ছাড় দিতে নারাজ। অন্যদিন একটু চিল্লা-চিল্লি করে আবার দুজন খেলা শুরু করে, কিন্তু আজ তাদের ঝগড়া কিছুতেই থামছে না। একজন আরেকজনকে মিথ্যাবাদী, জালিয়াত এসব বলছে। বান্ধবীরাও ওদের থামাতে পারছে না। এক পর্যায়ে দুজনের মধ্যে মারামারি বেধে যায়।
ঘরের বারান্দায় বসে বাঁশ-বেত দিয়ে হাত পাখা বানাচ্ছিল ফুলেছা। দুই মেয়ের ঝগড়া শুনে সে রাগে উঠে যায়। দুজনের পিঠে ধুপধাপ কটা দিয়ে ওদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। মায়ের হাতের মার খেয়ে ওরা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির বাইরে চলে যায়। ফুলেছা একা একা রাগে গজর গজর করতে থাকে- ফাজিল বাচ্চারা আমারে জালাইয়া খাইলো। বাড়িত বইয়া বইয়া খালি খেলা। আরে এই কানামাছির মতো আমি তো আন্ধা অইয়া ঘুরতাছি। জীবন ভইরা আমি যেদিকে যাই, সেই দিকে আন্ধাইর দেহি। কোন দিকেই আলোর দিশা পাই না। আল্লাহয় আমার কপালেই কি…। গজর গজর করতে করতে ফুলেছা ঘরের এক পাশে থাকা গরুটাকে বের করে বাড়ির সামনে জাম গাছটার নিচে খুঁটির সাথে বেঁধে রাখে।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও চৈত্রের রোদের তেজ এখনো কমেনি। বাড়ির সামনের দিকে তাকিয়ে ফুলেছা দেখে, মাঠের ধানক্ষেতে রোদ ঝিলমিল করছে। মাঠজুড়ে কাঁচা-পাকা ধানের শীষ মৃদু বাতাসে দুলছে। হলুদ-সবুজ মাঠে চৈত্রের ঝাঁ ঝাঁ রোদের ঢেউ চিকচিক করছে। খোলা মাঠের দিকে তাকিয়ে ধানের শীষে রোদের খেলা দেখে ফুলেছার দু’চোখ ঝলমল করে ওঠে।
আহ! কী সুন্দর ধানের ক্ষেত। মাঠজুড়ে কাঁচা-পাকা ধানের শীষ ঝিকমিক করছে। আর আট-দশ দিন পরই ধান পেকে হলুদ রং ধারণ করবে। গ্রামজুড়ে ধান কাটার ধুম শুরু হবে। ফুলেছার বুক ছিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
এই মাঠে ফুলেছার স্বামী আলালেরও জমি ছিল। এই তো কয়েক বছর আগেও আলাল নিজের জমিতে চাষাবাদ করেছে। নিজে খেটে ফসল ফলিয়েছে। অথচ আজ ওরা নিঃস্ব। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সব জমি বিক্রি করে আলাল এখন দিনমজুর। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে হয়। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি এসে ফুলেছা বেশ সুখেই ছিল। নিজেদের ক্ষেতে যে ফসল হতো তাতে মোটামুটিভাবে বছর চলে যেত। এ সময় আলালের জীবনে আরও বড় হওয়ার, ধনী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে হাজির হয় ফরিদ। কুয়েত থেকে ফরিদ ছুটিতে আসে। দুই মাস পর আবার চলে যাবে। কুয়েত থেকে সে চারটি ভিসা এনেছে। ফরিদের ছোটবেলার বন্ধু আলাল। তাই ফরিদ বলে, সে চাইলে অন্যদের চেয়ে কম টাকায় তাকে কুয়েতে নিয়ে যাবে। কুয়েতি দিনার কামিয়ে অল্পদিনেই অনেক বড় লোক হয়ে যাবে।
ফুলেছা তখন অনেক নিষেধ করেছে, কিন্তু আলাল তা শুনেনি। চার কাঠা জমি বিক্রি করে বাকি জমি বন্ধক দিয়ে এবং এক লাখ টাকা মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে চার লাখ টাকা ফরিদের হাতে তুলে দেয় আলাল। অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে সে কুয়েত যায়। কিন্তু সেখানে গিয়ে আলাল বুঝতে পারে তার এই স্বপ্ন যে দুঃস্বপ্ন হয়ে গেছে। ছোটবেলার বন্ধু ফরিদকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে সে ভুল করেছে। ফরিদ তার সাথে প্রতারণা করেছে। প্রায় পনেরো দিন কুয়েতে জেল খেটে সেখান থেকে শূন্য হাতে দেশে ফিরে আসে আলাল। এরপর বন্ধকী জমিগুলোও আস্তে আস্তে বিক্রি করে সংসার চালিয়ে আর ব্যাংকের ঋণ শোধ করে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায়। নতুন করে শুরু হয় আলালের জীবন যুদ্ধ।
কলিজার টুকরা দুই মেয়ে জরি আর পরিকে ফুলেছার কাছে রেখে আলাল গ্রাম ছেড়ে শহরে গেছে। জরির বয়স সাত আর পরির বয়স পাঁচ বছর। ফুলেছা ওদের নিয়ে বাড়িতে আছে। আর উত্তরপাড়ার আবুলের সাথে গাজীপুর গেছে আলাল। আবুল দুই বছর আগে থেকে গাজীপুরে গার্মেন্টসে চাকরি করে। মাসে দশ থেকে বারো হাজার টাকা বেতন পায়। থাকা-খাওয়ার খরচ বাদ দিয়ে মাসে হাজার চারেক টাকা বাড়িতে বাবা-মাকে দিতে পারে। আলালের সংসারে অভাবের কথা শুনে আবুল ওকে গার্মেন্টসে চাকরির কথা বলে। অনেক ভেবেচিন্তে আলাল রাজি হয়ে যায়।
আলাল ফুলেছাকে বোঝায়, তুমি জরি আর পরিকে নিয়া কয়ডা দিন একটু কষ্ট করতে পারবা না? আমি গিয়া চাকরি কইরা একটু সুবিধা করতে পারলেই তোমরারেও নিয়া যাইয়াম। একটা ঘর ভাড়া কইরা আমরা থকবাম। জরি-পরিরে ইস্কুলে ভর্তি কইরা দিয়াম। দেখবা আল্লাহ আমরার সুদিন আবার ফিরাইবো। তুমি মন খারাপ কইরো না জরির মা। আলালের কথায় ফুলেছার দু’চোখ বেয়ে ক’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। এ অশ্রু আনন্দের না কষ্টের সে বুঝতে পারে না। জাম গাছের ছায়ায় বাঁধা গরুটার জন্য বালতিতে করে খাবার নিয়ে যায় ফুলেছা। ভাতের ফ্যানের সাথে খৈল আর কুড়া মিশিয়ে খাবার তৈরি করে। নতুন বকনা গরুটা এবারই প্রথম গাভিন হয়েছে। আর দু-তিন মাস পরেই বাছুর বিয়াবে।
গাভিটার সামনে খাবার দিয়ে ফুলেছা ওর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে। একা একাই গাভিটার সাথে কথা বলেÑ কীরে কী বাছুর অইবো? একটা লাল রঙের ডেকা (এঁড়ে) বাছুর অইলে খুব বালা অইবো। আমি খুব খুশি অইয়াম। ওই বাছুরডারে আদর যত্ন কইরা বড় হাঁড় (ষাঁড়) বানাইয়াম। তুই অহন বালা কইরা খা। খাইয়া পেটটা বালা কইরা ভর। তরে তো অহন বালা কইরা যত্ন করতে অইবো। খইল আর লালি মিশাইয়া কুড়া খাইতে দিছি। খা বালা কইরা খা। না অইলে তো দুধ বাড়বো না। দুধ বেশি অইলে বেইচ্চ্যা টেহা জমাইতে অইবো, বুঝলি? খা খা এক্কেবারে নাক ডুবাইয়া খা। গরুর গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করতে করতে কথাগুলো বলে ফুলেছা। ওর বুক ছিঁড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়। আলালের কথা মনে পড়ে। গরুটাকে যত্ন করে দেখে পাশের বাড়ির আদুরী ভাবী তাকে খোঁচা দিয়ে বলে, আহারে স্বামী বাড়িত নাই, আমরার ফুলেছার অহন গাইয়ের যত্ন-আত্তি কইরা দিন ক্যাডায়। এই সব কথা শুনতে ফুলেছার খুব খারাপ লাগলেও মুখ বুজে সে সব হজম করে।
কেমন আছে আলাাল? আজ দু’দিন হলো কোনো খবর পাচ্ছে না। গতকাল এবং আজ আলাল কোনো ফোন করেনি। অথচ প্রতিদিন একবার সে ফোন করে জরি আর পরির সাথে কথা বলে। কথা হয় তার সাথেও। দুদিন আগে তো আলাল ফোনে বলেছে, এই মাসের বেতন অহনো অয় নাই। দু-এক দিনের মধ্যে বেতন আইবো। এইবার নাকি সে ভালা ওভারটাইমও পাইবো। বেতন পাইয়া বিকাশ করবো কইছে। ফুলেছা শাড়ির আঁচলে বাঁধা মোবাইলটা বের করে দেখে, না কোনো ম্যাসেজ তো আইয়ে নাই। মনটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে। আজ ক’দিন ধরে গাঁয়ে আবুলকে নিয়ে বেশ কানা-ঘুষা শুনতাছে। তিন রাস্তার মোড়ে বটতলায় সেলিমের দোকানে গেলেই নানা কথা শোনা যায়। ফুলেছা আগে প্রায়ই সেলিমের দোকানে জিনিসপত্র কিনতে যেত। আলাল বাড়ি থেকে যাওয়ার পর তো লবণ, ডাল, তেল, মসলা এসব কিনতে মাঝে মাঝেই তাকে দোকানে যেতে হতো। একদিন দক্ষিণপাড়ার কালাম ওরে দেখে বলে, আরে ফুলেছা ভাবী যে। তা আলাল ভাই কেমন আছে। ঠিকমতো টেহা-পাইস্যা পাডাইতাছে তো।
: হ ভাই আল্লাহর রহমতে জরির বাপ বালাই আছে। টেহা-পইসাও কিছু পাডাইতাছে।
: তাইলে তো আর কোনো চিন্তা নাই। তয় ভাবী আলাল ভাইয়ের খোঁজখবর বালা কইরা নেন তো। বাতাসে তো কত কথা উইড়া বেড়াইতাছে।
: কেন ভাই কী অইছে? কী কথা ভাই…। ফুলেছার কণ্ঠে উদ্বেগ ঝরে পড়ে..।
: না তেমন কিছু না। গার্মেন্টসে যারা চাকরি করে হেরাতো হুনি কত ছেড়ির লগে পিরিত-টিরিত কইরা…। এই যে আমরার গেরামের আবুলের কথাতো হুনতাছি কুমিল্লার এক ছেড়ির লগে নাহি…। আলাল ভাইও কী…
কালামের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফুলেছা চুপচাপ উঠে চলে আসে। কোনো জবাব দেয় না। অন্য সময় হলে এর উচিত জবাব সে দিয়ে দিত। কিন্তু আলাল যে ওকে বারণ করেছে। আলাল ওকে প্রতিদিনই ফোন করে বলে, দেহ মাইনসে কত কথা কইবো, এইসব কথায় কান দিবা না। মাইনসে আমরারে ভাত দিব না। আমার উপরে বিশ্বাস রাহ। তুমি আমি মিইল্ল্যা জরি পরিরে লইয়া একটু সুহে থাহনের লাইগ্যাই তো অত কষ্ট করতাছি। আর কয়ডা দিন ধৈর্য ধর। দেখবা আল্লাহয় আমরার সুদিন ফিরাইয়া দিব।
সে দিনের পর থেকে ফুলেছা আর সেলিমের দোকানে যায় না। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে জরি-পরিকে দিয়ে দোকান থেকে আনিয়ে নেয়। তারপরও বাতাসে কত কথা ভেসে বেড়ায়। এসব তার কানেও আসে। এই তো গতকাল সন্ধ্যায় সৈয়দ বাড়ির কল থেকে পানি নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছিল, তখন আদুরী ভাবী ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলে ও জরির মা আলালের খবর কী?
আছে ভাবী, বালাই আছে?
তা আবুলের কথা কী হুনতাছি…তুমি কিছু হুনছোনি? আলাল কিছু কয় নাই?
না- তো, কিছু তো কয় নাই?
হুম এই সব কথা কি কইরা কইবো? হুনছি কুমিল্লার এক ছেড়ির লগে নাকি ভাইগ্যা গেছে?
এইডা কি কও ভাবী? ভাইগ্যা যাইবো কেরে? ওরাতো কাজী অফিসে গিয়া বিয়া করছে?
অহ! তুমিও তাইলে জান। বাপ মারে না জানাইয়া বিয়া করন তো ভাইগ্যা যাওনের মতোই।
ভাবী খামাখা এইসব কথা রডাইয়ো না। তোমারও পোলা-মাইয়া বড় অইতাছে হেইডা খেয়াল রাইখো। আর হুন, আবুল ভাই বিয়া করছে, খারাপ কিছু করে নাই। আগামী মাসে বউ লইয়া বাড়িত আইবো।
কথাগুলো বলেই ফুলেছা আদুরী ভাবীর পাশ কাটিয়ে হন হন করে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। আদুরী ভাবী তখন পিছন থেকে একা একাই বলতে থাকে, আবুলের মতো আলালও একদিন বউ নিয়া…।
মোবাইলটা বের করে ফুলেছা ভালো করে চেক করে দেখেÑ না কোনো ম্যাসেজ আসেনি, মিস কলও নেই। ফুলেছার বুকটা দুরু দুরু শুরু করে। তবে কি জরির বাপ তাকে ভুলে…। আদুরী ভাবীর কথাগুলো তার কানে বাজতে থাকে- আবুলের মতো আলালও কোন ছেড়ির লগে…। না না, এসব কী ভাবছে সে। জরির বাপ কিছুতেই তাকে, জরি-পরিকে ভুলে যেতে পারে না।
ফুলেছার হঠাৎ মনে পড়ে, জরির বাপ ফোন করবে কীভাবে। ওর তো নিজের কোনো মোবাইল নাই। এতদিন তো আবুল ভাইয়ের মোবাইল দিয়ে ফোন করতো। গত শুক্রবার থেকে আবুল ভাই তো বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা বাসায় চলে গেছে। তাই তো গত দু’দিন ধরে জরির বাপ ফোন করতে পারছে না। ফুলেছার মনটা এবার কিছুটা হালকা হয়। মনে মনে ভাবে, জরির বাপকে সে এবার বলবে বেতন পেলে একটা মোবাইল কিনে নিতে। তাহলে আর তাদের সাথে যোগাযোগের কোনো সমস্যা হবে না। প্রতিদিন যখন মন চাইবে, তখনই কথা বলতে পারবে। নিজের মোবাইল থেকে বিকাশে টাকাও পাঠাতে পারবে। ভাবতে ভাবতে ফুলেছার মনে এক অন্যরকম আনন্দ দোলা দেয়। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে হাসির ঝিলিক। মসজিদ থেকে ভেসে আসে মাগরিবের আজান। ফুলেছা গাভিটাকে খুঁটা থেকে খুলে ঘরের দিকে হাঁটা দেয়।