হত্যা ও ধর্ষণের মতো অপরাধ দমনে ইসলামী দণ্ডবিধির প্রয়োগ অপরিহার্য
২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:২৬
॥ ডক্টর মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক ॥
একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠা করার জন্য এর সকল পর্যায় থেকে যাবতীয় অপরাধ বন্ধ করতে হবে। এজন্য সর্বক্ষেত্রে ইসলামী বিধিবিধান অনুশীলন ও বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। ইসলামী জীবনযাপন নীতি এবং এ সংক্রান্ত বিধানসমূহ বাস্তবায়নের পরও যখন ব্যতিক্রম হিসেবে কোনো ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে অপরাধমূলক কার্যকলাপ সংঘটিত হয়, তখন এর প্রতিকারের জন্য আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত দণ্ডবিধি প্রয়োগ করা বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে কোনোরূপ অবহেলা, অজুহাত এবং দ্বিধাসংকোচ করার অবকাশ নেই। কাউকে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে ইসলামের নীতি ও দণ্ডবিধি ঘোষিত হয়নি। নাগরিকদের অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে তাদের চরিত্র গঠন, সঠিক পথে প্রতিষ্ঠিতকরণ এবং নির্দোষ ও পরিশুদ্ধ বানানোর লক্ষ্যে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেন তারা চরিত্রহীনতায় ডুবে না গিয়ে উচ্চতর মান ও মর্যাদায় উন্নীত হয়ে পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ববোধের ভিত্তিতে একটি জবাবদিহিমূলক উন্নত সমাজ গঠনে পরস্পর সহায়ক হতে পারে।
ইসলামের নীতি হচ্ছে প্রথমত, ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সংশোধন করা, মানসিক পবিত্রতা সৃষ্টি করা, চিন্তার পরিচ্ছন্নতা তৈরি করে দেয়া এবং আচরণকে পরিশুদ্ধ করে দেয়া। ইসলাম মানুষের মনের গভীরে ঈমানের বীজ বপন করে আল্লাহ তায়ালার শাস্তির ভয় সৃষ্টি করার মাধ্যমে তার চরিত্রকে কল্যাণমুখী বানিয়ে অপরাধবিরোধী মনোভাব সৃষ্টি করে দেয়। একনিষ্ঠ ও দৃঢ়প্রত্যয়ী ঈমানই সকল পর্যায়ের অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
ইসলাম নির্দেশিত অপরাধ বিষয়ক বিধান কেবল পরকালের শাস্তির ভয় দেখিয়েই দায়িত্ব শেষ করেনি। গুরুতর কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও বিচারিক ব্যবস্থায় জাগতিক শাস্তির দণ্ডও ঘোষণা করেছে। যে সকল অপরাধের পরকালীন শাস্তি জাহান্নাম, সেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলার লক্ষ্যে জাগতিক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে কিছু মানুষ ইসলামী নীতি ও শিক্ষার প্রভাবে অপরাধ থেকে বিরত থাকবে। কিছু মানুষ বিরত থাকবে শাস্তির ভয়ে এবং কিছু মানুষ বিরত থাকবে শাস্তির দৃষ্টান্ত প্রত্যক্ষ করার কারণে। এটি স্পষ্ট যে, অপরাধ সামগ্রিকভাবে দূর করার জন্য কেবল ইসলামী নীতি, দর্শন ও বিধিবিধান প্রচার করাই যথেষ্ট নয়। কারণ ইসলামী বিধানের আলোকে সমাজের প্রতিটি স্তরে শিক্ষা বিস্তার, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি, পরকালের ভয় জাগ্রতকরণ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণের পরও অতি লোভী ও বিকৃত মস্তিষ্ক কিছু লোক নিজেকে অপরাধে সম্পৃক্ত করতে পারে এবং করেও থাকে। এক্ষেত্রে এর প্রতিকারের জন্য ইসলাম বিজ্ঞানসম্মত বিধি-ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে। প্রতিকারমূলক এ বিধিব্যবস্থাকেই ইসলামী দণ্ডবিধি বলা হয়।
অপরাধের প্রতিকারের ক্ষেত্রে বিচারক অপরাধের প্রকৃতি ও মাত্রা অনুযায়ী ইসলামের আলোকে চূড়ান্ত নির্ধারিত শাস্তি ব্যতীত যে কোনো শাস্তি প্রদান করতে পারেন। চূড়ান্ত নির্ধারিত শাস্তি হচ্ছে চুরি, ডাকাতি, ব্যভিচার, জবরদস্তিমূলক ব্যভিচার বা ধর্ষণ, ধর্ষণচেষ্টা, ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ, মাদকাসক্তি ও ধর্ম ত্যাগের শাস্তি। এছাড়া অর্থ আত্মসাৎ, দলীয়করণ, মিথ্যাচার, স্বজনপ্রীতি, সরকারি অর্থ অপচয়, প্রশাসনিক মিথ্যা সাক্ষ্য, হয়রানি করা, কাজে ফাঁকি দেয়া, ঘুষ গ্রহণ, আমানতের খিয়ানত করা, ক্রয়-বিক্রয়ে ধোঁকা দেয়া, অপরাধীদের আত্মগোপনে সাহায্য করা, চাঁদাবাজি ও মজুদদারি প্রভৃতি দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিচারক ইসলামের মূলনীতির ভিত্তিতে প্রণীত স্থানীয় ‘আইনের মাধ্যমে শাস্তি প্রয়োগ করতে পারেন। চূড়ান্ত নির্ধারিত শাস্তিকে ‘হদ্দ’ বা আল্লাহ্ তায়ালা নির্ধারিত শাস্তি এবং দ্বিতীয়টিকে ‘আইন বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত শাস্তি বা ‘তাযির’ বলা হয়। একটি আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত শাস্তি অপরটি আল্লাহ্র ‘আইনের ভিত্তিতে প্রণীত রাষ্ট্র কর্তৃক নিধার্রিত শাস্তি।
ইসলামী ‘আইনে অপরাধের শাস্তি প্রদান করা সুনির্দিষ্ট দার্শনিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সেগুলো হচ্ছে অপরাধের সকল ধরনের পথ রুদ্ধ করা এবং এর সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। অপরাধ থেকে হুমকি দিয়ে সতর্ক করে বিরত রাখা এবং অপরাধসমূহকে গোপন করে লুকিয়ে রাখা। অপরাধীর অভ্যাসকে তার শিকড় থেকে মূলোৎপাটন করা এবং বিশৃঙ্খলা থেকে সংরক্ষণ করা। অপরাধীকে সংশোধন করা ও আল্লাহ্ তায়ালার বান্দাদের প্রতি করুণা করা। সর্বোপরি মানুষের জন্য জাগতিক কল্যাণ বয়ে এনে, পরকালে ক্ষমা লাভ করে ভাগ্যবান হওয়ার পথ সুগম করাই ইসলামী আইনে শাস্তির তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভিত্তি। ইসলামী ‘আইনে শাস্তি বিধান মানুষের সামগ্রিক উপকারার্থে ও কল্যাণের প্রয়োজনে করা হয়েছে। শাস্তি প্রদান ‘আইন মানবতার কল্যাণের জন্য রচিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে অপরাধের ধরন বিবেচনায় শাস্তিকে কঠোর অথবা হালকা করা হয়েছে। এক্ষেত্রে অপরাধীর অভ্যাসসমূহ সংশোধন করা ও সমাজ থেকে অনাচার মূলোৎপাটন করাই দণ্ডবিধির প্রধান উদ্দেশ্য।
সমাজ ও রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত বিধিবদ্ধ অপরাধগুলোকে দু’শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এগুলোর প্রত্যেকটির জন্য আলাদা বিধান রয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা উপস্থাপন করা হলোÑ
ইসলামে অপরাধ বিষয়ক শাস্তিকে মৌলিকভাবে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ‘হুদুদ’, ‘কিসাস’ ও ‘তাযির’। হুদুদ জাতীয় অপরাধগুলোর শাস্তি প্রয়োগের জন্য পন্থা ও প্রমাণের দিকে থেকে পূর্ণ শর্তাবলী পূরণ করা অপরিহার্য। এ ধরনের অপরাধ সাতটি। ধর্মত্যাগ, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ডাকাতি, চুরি, ব্যভিচার, ধর্ষণ, অপবাদ ও মদ্যপান। ইসলামী ‘আইনে এ সকল অপরাধের শাস্তি সংখ্যা, শ্রেণি ও গুণগত দিক থেকে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বিচারক বা শাসকের জন্য তা লঙ্ঘন করার স্বাধীনতা নেই। এমনকি বৃদ্ধি করা বা পরিবর্তন করারও অধিকার নেই। যে ব্যক্তি এ সকল অপরাধকর্ম ঘটাবে তার জন্য সুনির্দিষ্ট শাস্তি রয়েছে। এ ‘আইনে অপরাধির ব্যক্তিত্বের প্রতি দৃষ্টি রাখা হবে না এবং শাসকের তা ক্ষমা করার স্বাধীনতা নেই। অনুরূপভাবে শাস্তির ক্ষেত্রেও অবস্থার দিকে কোনোরূপ দৃষ্টি দেয়া যাবে না। এ সকল অপরাধের জন্য স্পষ্টভাবে শাস্তি নির্ধারিত। এক্ষেত্রে সামষ্টিকতার দিকে দৃষ্টি দেয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। এ সকল দণ্ডবিধির উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমাজ থেকে বিশৃঙ্খলা সম্পূর্ণরূপে দমন করা, সকলের কল্যাণ সাধন করা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। কোনো বিবেক বুদ্ধি অদ্যাবধি এ দণ্ডবিধির গুরুত্বকে অস্বীকার করতে পারে না। পৃথিবীর সকল মানুষ এ সকল অপরাধের ক্ষতি ও ধ্বংসাত্মক পরিণতির ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেন।
দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে কিসাস ও রক্তপণ। হত্যাকারীকে শাস্তি হিসেবে হত্যার নির্দেশ দেয়া অথবা রক্তপণ আদায় করা। হত্যা ও জখমের শাস্তি, ইচ্ছাকৃত হোক, ভুলবশত হোক বা অন্য কোনো প্রকারে হোক, এর শাস্তি হিসেবে কিসাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অভিভাবক সম্প্রদায়কে ক্ষমা, কিসাস ও দিয়াতের যেকোনো একটির স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে এর সীমা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। পক্ষান্তরে ভুলবশত হত্যার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সাবধান করে দেয়ার জন্য তাযিরি শাস্তি রয়েছে, তাতে হত্যাকারীর অবস্থাসমূহকে বিবেচনা করে সার্বিক কল্যাণ ও বাস্তবতার আঙ্গিকে শাস্তির পরিমাণ নির্ধরণ করা হয়। অপরদিকে কিসাসের মাধ্যমে হত্যাকৃত ব্যক্তি ও তার অভিভাবকের ক্ষোভের যন্ত্রণা লাঘব করা হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধের বিষয়ে চরম হুমকি প্রদান করা হয়। আর রক্তপণ দ্বারা নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীগণ যারা তার রোজগারের ওপর নির্ভরশীল ছিল, তাদের সাহায্য করা যায়। হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ইসলামের এ ন্যায়সঙ্গত বিচারব্যবস্থা পরম ভারসাম্যপূর্ণ, উদার এবং একই সাথে অত্যন্ত কঠোর।
তৃতীয় প্রকার হচ্ছে ‘তাযির’। হুদুদ ও কিসাসের বিধান ছাড়া অন্য সকল অপরাধের শাস্তি এ পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত। এক্ষেত্রে বিচারক বা শাসকের বিভিন্নতার কারণে শাস্তির ধরন, প্রকার ও বৈশিষ্ট্য বিভিন্ন হতে পারে। এক্ষেত্রে অপরাধীর ব্যক্তিগত অবস্থা, অপরাধের সময়, অপরাধে ব্যবহৃত উপকরণ, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা সকল দিক বিবেচনায় আনা হয়। এ ধরনের অপরাধের শাস্তি বাস্তবায়নে অপরাধীর একক ও সামষ্টিক দিক আলোচিত হবে। সামষ্টিক দিকটাকে বিবেচনা করে কঠোরতা বা লঘুদণ্ড ক্ষেত্রভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। সকল শাস্তিতেই জাতীয় স্বার্থকে সংরক্ষণের দিকটাকে লক্ষ রাখতে হয়। ব্যক্তির সাথে শাস্তির কষ্ট প্রদান করাটা লক্ষ রাখা হয়। যেহেতু অপরাধী সে অপরাধ ঘটায় ফলে তার ওপরই শাস্তি কার্যকর করা হয়। তার পরিবার বা অন্যদের ওপর শাস্তি আরোপ করা হয় না।
অপরাধ প্রতিরোধ এবং প্রতিকারে ইসলামী ‘আইন ও প্রচলিত ‘আইনের মধ্যে বস্তুত মৌলিক উদ্দেশ্যগত কোনো বিভেদ নেই। যেহেতু শাস্তির উদ্দেশ্য তিনটি। সার্বিক প্রতিরোধ, ন্যায়বিচার ও বিশেষ প্রতিরোধ। তবে শুধু মৌলিক পদ্ধতিতে মতপার্থক্য রয়েছে। অনুরূপভাবে বিধিবদ্ধ দণ্ড ও কিসাস, যা বাস্তবায়ন করা হয়, উভয়টিতেই ‘চিন্তাগত মতভেদ রয়েছে। উল্লিখিত তিনটি উদ্দেশ্যে শাস্তি ও তার প্রকৃতি, পদ্ধতি ও কার্যকারিতার দিক থেকে বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। সাধারণ ‘আইনবিদগণের বিশ্বাস হলো শাস্তি সম্পর্কিত শুধু ভাষ্য সাধারণ প্রতিরোধ প্রমাণ করে। অনুরূপভাবে শাস্তি ঘোষণা বিচারকদের বক্তব্য বাস্তবায়িত হয়।
পক্ষান্তরে ইসলামী ‘আইনে সাধারণ প্রতিরোধ শুধু শাস্তির ভাষ্য দ্বারাই কার্যকর হয়। তবে এতে শ্রেণি বিন্যাসের দিকে বিশেষভাবে লক্ষ রাখা হয়। শর্তপূরণ না হলে হুদুদ ও কিসাসের বিধান কার্যকর করা হয় না। অপরাধের শাস্তির উপকারিতা প্রমাণের জন্য শাস্তি কার্যকর করা হয়, যাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হয়। বিশেষ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সামষ্টিক প্রয়োজনীয়তা ‘হুদ’ কার্যকর করার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। ‘তাযিরি’ শাস্তি অপরাধ ও অপরাধীর জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে যা কার্যকর করা হয়, তা হলো প্রতিরোধমূলক উদ্দেশ্য। আর সেটি হচ্ছে সর্বসাধারণের কল্যাণের প্রয়োজনে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। ইসলাম সংশোধনের এ পদ্ধতিকে বস্তুত দাওয়াত ও সৎপথ প্রদর্শনের জন্য গুরুত্ব দিয়েছে। এভাবে পর্যায়ক্রমে অপরাধের সংশোধনের পদ্ধতি অন্য কোনো আইন বা বিধানে পাওয়া যায় না। এজন্যই ‘আইন বিশেষজ্ঞগণ সংশোধনের ইসলামী পদ্ধতিকে শাস্তির দর্শন হিসেবে গ্রহণে ঐকমত্য পোষণ করেছেন।
ইসলামী শারিয়াহ হচ্ছে বিশ্বাস, চরিত্র ও বিধানসমূহের সমন্বয়। আর ইসলামী অপরাধ দমন ‘আইন হচ্ছে বিধানসমূহের একটি শ্রেণি। মানবসমাজের মৌলিক সমস্যা সমাধানে ইসলামী অপরাধ ‘আইন মানবতার কল্যাণে ও বান্দাদের সুবিধা প্রদানের জন্য রচিত হয়েছে। অনুরূপভাবে এটি সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে তৈরি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্ম, রাষ্ট্র, বিবেক, সম্পদ, সম্মান, বংশ ও দেহকে সংরক্ষণ করা। এগুলোকে পাঁচটি মৌলিক প্রয়োজন ও বাঞ্ছনীয় বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। আর চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা।
ইসলামের অপরাধবিরোধী বিধান চিরন্তন ও অলঙ্ঘনীয়, যা কখনো পরিবর্তন করা যায় না। এর মৌলিক নীতি ও দর্শনের আলোকে স্থান, কাল, পরিবেশ ও পাত্রভেদে মুসলিম বিশেষজ্ঞ গবেষকগণের বিশ্লেষণ দ্বারা শাখা প্রশাখায় সংস্কার করা যায়। এ বিধান দ্বারা মুসলিম উম্মাহ্ অতীতের তিনটি যুগে বিশ্বব্যাপী শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেছিল। অনুরূপভাবে এটি আল্লাহ্ তায়ালার অবতীর্ণ বিধান। এ বিধান ও ‘আইন বাস্তবায়ন না করার কারণে বিশ্ববাসী ধ্বংস, অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলায় দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। এখানেও ইসলামী ‘আইন ও দণ্ডবিধি কার্যকর না থাকায় হতাশাজনক ফলাফলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সমাজ জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে। হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ঘুষ, সুদ, প্রতারণা ও অভাবনীয় পর্যায়ের দুর্নীতিসহ সব ধরনের অনিষ্ট সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছে। খণ্ডিত ও অসম্পূর্ণ হওয়ায় মানবসৃষ্ট কোনো ‘আইন দ্বারাই এসব প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
ইসলাম অপরাধ বিষয়ে অত্যন্ত ব্যাপক, গভীর এবং বাস্তব সম্মত সংজ্ঞা প্রদান করে প্রতিটি অপরাধকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে, সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ আরোপ করেছে। এক্ষেত্রে অপরাধকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা, সকল ধরনের অপরাধকে চিহ্নিত করা, সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার জন্য উদ্বুদ্ধ করা ও সতর্ক করা, নৈতিক কাজের প্রতি উৎসাহিত করা, পরকালের ভীতি প্রদর্শন করা, অপরাধ করার সুযোগ বন্ধ করা, অপরাধের উপায় উপকরণ নিষিদ্ধ করা, অপরাধের প্রাথমিক পর্যায়ে তিরস্কার ও বয়কট নীতি অবলম্বন করা এবং অপরাধী ব্যক্তির ‘আইনি ও প্রশাসনিক শাস্তির বিধান প্রণয়ন করার মাধ্যমে সর্বব্যাপী ও চিরস্থায়ী নীতি দর্শনভিত্তিক শাস্তির বিধান প্রদান করেছে। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় তা অনুসরণ করলে সমাজ থেকে অপরাধ চিরতরে দূর করা সম্ভব হবে। অতএব যথাযথভাবে অপরাধ প্রতিরোধ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে এর প্রতিকারের জন্য পরিপূর্ণভাবে আল কুরআনের অনুশীলন ও সর্বক্ষেত্রে ইসলামী দাওয়াত, প্রশিক্ষণ, সংশোধন নীতি, ‘আইন, বিধান ও দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করা একান্ত অপরিহার্য।