শাহবাগেই ‘মব’ কালচারের উৎপত্তি


২০ মার্চ ২০২৫ ১৪:১৮

॥ সরদার আবদুর রহমান ॥
‘শাহবাগ’ মার্কা বয়ানের মধ্যেই দেশে ‘মব কালচার’ নামক উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার তথা গণউৎপীড়নের বীজ লুকিয়ে ছিলÑ এ কথা প্রমাণিত সত্য। দেশে আইন হাতে তুলে নেয়া, আইনশৃঙ্খলাকে পাত্তা না দেয়া, গণঅরাজকতা সৃষ্টি করাÑ এসবই এ বয়ানের মাহাত্ম্য। সাম্প্রতিককালে এটি ‘মব কালচার’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। সেই যে একাত্তর-পরবর্তী রাজপথে বিনা বিচারে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করার ধারা শুরু হলো, অতঃপর সেই ধারাই পরবর্তীকালে নানা প্রকার বেআইনি কর্মকাণ্ডের সংঘবদ্ধ রূপ পেল। গণআদালত বলি, জনতার মঞ্চ বলি আর গণজাগরণ মঞ্চ বলি- এসবই সেই বেআইনি মবকে উসকে দেয়ার প্রক্রিয়ামাত্র। এভাবে বিশেষ প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার হাতিয়ার হিসেবে রাজপথে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা, প্রতিষ্ঠানে হামলা-অগ্নিসংযোগ, বাড়িঘরে আক্রমণ, বিচারবিভাগকে ‘মবের ইচ্ছা’ অনুযায়ী রায় দিতে উদ্বুদ্ধ করাÑ এসব একই ধারাবাহিকতার একেকটি এপিসোড। এসব বেআইনি ও আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে একটি পরিচয়ে চিহ্নিত করা যেতে পারেÑ সেটি হলো ‘শাহবাগী বয়ান’।

মব জাস্টিস
অভিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার, মব জাস্টিস বা মব রুল বা মবোক্রেসি একটি অবজ্ঞাসূচক শব্দ, যা সাধারণ জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের চেতনাকে অবশ করে দেয়ার প্রচেষ্টা থাকে। বলা হয়ে থাকে, এটি হলো গণতন্ত্রের একটি অবক্ষয়িত রূপ। শব্দগতভাবে, গণতন্ত্র হলো ‘জনগণের শাসন’, যা সাধারণ ইচ্ছার মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধতা দেয়। অন্যদিকে মব জাস্টিস হলো ‘উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার’। এটি গণতন্ত্রের বিপরীত, যারা নিজেদের বৈধ জনসাধারণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শর্তাবলি পূরণ করতে পারে না।
এ উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার বা মব জাস্টিস দেশে প্রথম হানা দেয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরই। সে সময় যুদ্ধবিহীন সময়কালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকদের ‘মুক্তিযুদ্ধের শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকাশ্যে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়। কাউকে প্রকাশ্য রাজপথে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়, কাউকে পিটিয়ে মারা হয় বা গুলি করে হত্যা করা হয়। আর এভাবেই ‘উচ্ছৃঙ্খল গণবিচার’-এর ধারা সূচিত হয়। পরবর্তীকালে এটি ‘বিচারবিভাগীয় হত্যা’ হিসেবে প্রকাশিত হয়।

‘গণআদালত’ মানে মব জাস্টিস
মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে সিকি শতাব্দী পর ১৯৯২ সালে সৃষ্টি করা হয় ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’। এখানে সরাসরি ‘নির্মূল’ শব্দ ব্যবহার করে সরাসরি হত্যা ও নিশ্চিহ্ন করার মতো হুমকিমূলক আবহ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন জাহানারা ইমাম।
এ কমিটির মাধ্যমে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ১৯৯২ সালে ২৬ মার্চ ’গণআদালত’-এর মাধ্যমে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অধ্যাপক গোলাম আযমের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। বেআইনি ও অবৈধ এ আয়োজন করে তার তথাকথিত বিচার করা হয় এবং তাকে ‘প্রতীকী মৃত্যুদণ্ড’ প্রদান করা হয়। এখানেই শেষ নয়, তথাকথিত এ গণআদালতের রায় কার্যকর করার জন্য সরকারের কাছে দাবিও করা হয়। ‘একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র এ কার্যকলাপ ছিল ‘মব কালচার’-এরই অংশ। এ বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য মামলা দায়ের হলেও এর সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তি পেতে হয়নি।

জনতার মঞ্চ-আরেক মব কালচার
‘জনতার মঞ্চ’ নামে আরেকটি বেআইনি কর্মতৎপরতার নমুনা পাওয়া যায়। এটি আরেকটি ‘মব কালচার’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ১৯৯৬ সালে বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে সচিবালয়ে আওয়ামীপন্থি কিছু আমলাকে নিয়ে গঠিত হয় এ ‘জনতার মঞ্চ’। ওই মঞ্চ গঠনের প্রধান কুশীলব ছিলেন তৎকালীন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মহীউদ্দীন খান (ম. খা) আলমগীর। এই আলমগীর ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে ময়মনসিংহ জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সম্ভবত তিনি একাত্তরের পাকবাহিনীর সহযোগী পরিচয় মুছে ফেলার তাড়না থেকেই জনতার মঞ্চ করে অতি আওয়ামী লীগ হওয়ার চেষ্টায় ব্রতী হন। এরপর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে শেখ হাসিনা জনতার মঞ্চ গঠনের পুরস্কার হিসেবে ম খা আলমগীরকে প্রতিমন্ত্রী বানান। এছাড়া মঞ্চে যোগদানকারী অন্যান্য কর্মকর্তাকেও বড় বড় দপ্তরে বসিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তাদের ‘পুরস্কৃত’ করার পর অন্য আমলারাও একে একে নিজেদের রাজনীতি ও দুর্নীতিতে জড়ান। আর ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এইচটি ইমাম প্রশাসনে দুর্নীতি ও রাজনীতিকে ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ রূপ দিয়ে যান। সরকারি চাকরিরত অবস্থায় এমন কার্যকলাপ বেআইনি হলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দোহাই দিয়ে এ গণউচ্ছৃঙ্খলতায় অংশ নেন একশ্রেণির আমলা। এ কর্মকাণ্ডকেও আইনের আওতায় আনা হয়নি।

গণজাগরণ মঞ্চ: অবিচারের অনুশীলন
বাংলাদেশে অবিচারের অনুশীলন চালানোর জন্য স্থাপন করা হয় ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ নামের প্রহসনমূলক কর্মকাণ্ডের ধারা।
২০১৩ সালে শাহবাগের এ বেআইনি সমাবেশ বিভিন্ন নামে আখ্যা পায়। যেমন- শাহবাগ আন্দোলন, শাহবাগ গণঅবরোধ, গণজাগরণ মঞ্চ ইত্যাদি। ঢাকার শাহবাগে ৫ ফেব্রুয়ারির তারিখ শুরু হয় এ কর্মকাণ্ড। এতে সেসময় কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচারিক প্রহসন মঞ্চস্থ হচ্ছিল। ‘জনগণের দাবি’র আড়ালে আয়োজকদের ইচ্ছেমাফিক এ বিচারের রায় প্রদানের জন্য প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে এ মঞ্চ। বলাবাহুল্য এটিও ছিল গণঅবিচারেরই আরকটি রূপ। এই মঞ্চ থেকে যে স্লোগান ও বক্তব্য উপস্থাপন করা হয় এবং এর আলোকে পরবর্তী কর্মপ্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয় তা-ই ‘শাহবাগী বয়ান’ নামে পরিচিতি পায়। এ বয়ানের ধারায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তথা ইসলামপন্থি রাজনীতি এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনতাকে লেলিয়ে দেয়া হয়। এটি ছিল মব কালচারের প্রকৃষ্ট নমুনা।

দেশজুড়ে গণউচ্ছৃঙ্খলা
শাহবাগী বয়ানের আলোকেই দেখা যায়, দেশজুড়ে চলতে থাকে গণউচ্ছৃঙ্খলা। সারা দেশে পুলিশের পাশাপাশি সরকারি দলের কর্মীরা জামায়াত-শিবিরের কার্যালয়, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান এমনকি বাসাবাড়িতে হামলা চালাতে থাকে। সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর লীগ কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘যেখানেই জামায়াত-শিবির ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অপতৎপরতা দেখবেন, সেখানেই তাদের প্রতিহত করবেন। তাদের ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সোপর্দ করবেন।’
এ নির্দেশার আলোকে বিরোধীদল; বিশেষত ইসলামপন্থি মহলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক-বীমা, আর্থিক ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া প্রভৃতি একের পর এক লক্ষ্যবস্তু হতে থাকে। দেশজুড়ে মব কালচারের বাস্তব অনুশীলন চলতে থাকে। পাশাপাশি এগুলো দখল করে নেয়ার প্রক্রিয়াও চলতে থাকে।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব হচ্ছে দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা। দেশে বেআইনি কোনো কিছু হলে সেটাকে প্রতিহত করা এবং ধ্বংসাত্মক কোনো কিছু ঘটলে তার প্রতিকার করা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়Ñ একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে যে ভাষায় কথা বলেন এবং তার দলীয় লোকজনকে নির্দেশ দেন, তা নিঃসন্দেহে দেশের আইন এবং সংবিধানের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। আর এ ধরনের কোনো বক্তব্য যদি সাধারণ কোনো নাগরিক দিত তাহলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হতো। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে এ ধরনের বক্তব্য দেয়ার কারণে সরকার তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করেনি।

ভুয়া অর্থনীতিবিদের ইন্ধন
বাংলাদেশের একজন ভুয়া অর্থনীতিবিদের ইন্ধনও গণউচ্ছৃখলায় উসকানির কাজ করে। অধ্যাপক আবুল বারকাত নামে পরিচিত ওই ব্যক্তি ২০০৫ সালে একটি ‘গবেষণা’ করেছিলেন। বিষয় ছিল মৌলবাদের রাজনৈতিক-অর্থনীতি। সেখানে তিনি বলেছেন, মৌলবাদীদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার সাড়ে ৭ থেকে ৯ ভাগ। তারা প্রতি বছর প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করে শুধু রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে। এর মধ্যে জঙ্গি কর্মকাণ্ড ছাড়াও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ব্যয়, রাজনৈতিক কর্মীদের বেতন, জনসভা আয়োজন ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ। তিনি উল্লেখ করেন, তাদের ১ হাজার ৫শ’ কোটি টাকা মুনাফার ২৭ শতাংশ আসে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে যার মধ্যে রয়েছে ব্যাংক, বীমা ও লিজিং কোম্পানি। ২০ দশমিক ৮ শতাংশ আসে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে, ১০ দশমিক ৮ ভাগ আসে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে। ১০ দশমিক ৪ ভাগ আসে ওষুধশিল্প ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান থেকে। ৯.২ শতাংশ আসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। ৮.৩ শতাংশ আসে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা থেকে। যোগাযোগ ব্যবসা থেকে আসে ৭.৫ শতাংশ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও সংবাদমাধ্যম থেকে আসে ৫.৮ শতাংশ। তিনি এ বলে উসকানি দেন যে, তাহলে আমাদের দায়িত্ব কী? আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে জামায়াত-শিবিরের ব্যবসায়িক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বয়কট করা, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান আরো ফুলেফেঁপে বড় হতে না পারে। এ উসকানির জেরে আওয়ামী লীগের দোসররা এসব প্রতিষ্ঠানকে টার্গেট করে এবং এগুলো লুণ্ঠন অথবা ধ্বংসের জন্য পিছনে লেগে যায়। এ প্রক্রিয়াও ছিল মব কালচারেরই অংশ।

উপসংহার
আলোচ্য মব কালচার বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। এটি বাম ও ধর্মনিরপেক্ষবাদী চেতনার মিশ্রণের ফল। এটি তাদের মনোজগতে গভীরভাবে আটকে আছে। রাজনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিপক্ষকে উৎখাত করার প্রক্রিয়া হিসেবে তারা এ মব কালচারকে বেছে নিয়ে থাকে। একদিকে মুখে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের খই ফোটাবে; অন্যদিকে যতসব অগণতান্ত্রিক পন্থার বিকাশ ঘটিয়ে চলবে। এখন বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। এজন্য চাই বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড। এ ধ্বংসাত্মক চিন্তাধারার অবসান ছাড়া সুস্থ ধারার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ধারার বিকাশ ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই।