মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর


২০ মার্চ ২০২৫ ১২:৪৯

॥ ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস॥
আরবীতে লাইলাতুল অর্থ রাত। আর কদর শব্দটি দুই ধরনের অর্থসংবলিত। প্রথমত, কদর অর্থ নির্ধারণ করা, সময় নির্দিষ্ট করা, সিদ্ধান্ত নেয়া। অর্থাৎ লাইলাতুল কদর হলো সে রাত, যে রাতে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর পরিমাণ ও সময় নির্দিষ্ট করেন, হুকুম জারি করেন এবং ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এককথায়, লাইলাতুল কদর অর্থ ভাগ্যনির্ধারণী রাত। যেমন- আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘হা-মীম, সুম্পষ্ট কিতাবের কসম। আমি এ কিতাব নাজিল করেছি এক বরকতপূর্ণ রাতে, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়, আমার নির্দেশে। নিশ্চয় আমি রাসূল প্রেরণকারী।’ (সূরা দুখান: ১-৫)। এর দ্বারা পরিষ্কার বোঝা যায়, কুরআন নাজিল হয়েছে যে বরকতময় রাতে, সেই রাতেই প্রত্যেক বিজ্ঞতাপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা আল্লাহর নির্দেশক্রমে হয়ে থাকে। তাই এ রাত ভাগ্যনির্ধারণী রাত। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘এ রাতে ফেরেশতাগণ এবং জিবরাইল (আ.) তাদের রবের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক হুকুম (ফয়সালা) নিয়ে নাজিল হন।’ (সূরা আল-কদর : ৪)। এ আয়াত থেকেও বোঝা যায়, লাইলাতুল কদর হলো সৃষ্টিজগতের জন্য ভাগ্যরজনী। এ রাতে জ্ঞানপূর্ণ বিষয়ের নির্ধারণ ও আল্লাহর হুকুম নিয়ে ফেরেশতাদের অবতরণের অর্থ সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, লাইলাতুল কদরে সৃষ্টিজগতের সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ফয়সালা স্থির করা হয়, যা পরবর্তী লাইলাতুল কদর পর্যন্ত সংঘটিত হবে।
দ্বিতীয়ত, ‘কদর’ এর দ্বিতীয় অর্থ সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব। অর্থাৎ লাইলাতুল কদর এমন এক রাত, আল্লাহর নিকট যার বিরাট সম্মান-মর্যাদা ও ফজিলত রয়েছে। আর এ মর্যাদা এ রাতে কুরআন নাজিলের কারণে। এ রাতের সম্মান-মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে আল-কুরআনের একটি সূরা অবতীর্ণ করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালার ঘোষণা, ‘নিশ্চয়ই আমি এ (কুরআন) কে নাজিল করেছি কদরের রাতে। আপনি কি জানেন, হে রাসূল (সা.)! কদরের রাত কি? কদরের রাত হলো হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
আল-কুরআন নাজিলের রজনী: সমগ্র কুরআন রাসূলে কারীম (সা.)-এর ওপর একবারে এক সাথেই নাজিল হয়নি; বরং রাসূলে কারীম (সা.)-এর নবুয়্যতের ২৩ বছর ধরে বিভিন্ন অবস্থা ও পরিস্থতির চাহিদা অনুপাতে অল্প অল্প করে তা নাজিল হয়েছে এ কথা সর্বজন স্বীকৃত। সেক্ষেত্রে আল্লাহ পাকের ঘোষণা ‘লাইলাতুল কদরে কুরআন নাজিল করেছি’Ñ এ বাণীর মর্ম সম্পর্কে মুফাস্সিরগণ দুই ধরনের অভিমত ব্যক্ত করেছেনÑ (ক) এ রাতে সমগ্র কুরআন ‘লাওহে মাহফুজ’ বা ‘উম্মুল কিতাব’ থেকে প্রথম আসমানে ওহিবাহক ফেরেশতাদের কাছে সোপর্দ করা হয়। সেখান থেকে আল্লাহর হুকুমে জিবরাঈল (আ.) ২৩ বছর ধরে প্রয়োজন অনুপাতে তা নবী কারীম (সা.)-এর ওপর নাজিল করতে থাকেন। রঈসুল মুফাস্সিরীন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)সহ মুফাস্সিরদের এক বিরাট দলের অভিমত এটি। (খ) এ রাতে রাসূল (সা.)-এর ওপর কুরআন নাজিল করা শুরু হয়। অর্থাৎ রাসূলে করীম (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি এ রাতেই নাজিল হয় এবং এর মাধ্যমে কুরআন নাজিলের মতো মহাকল্যাণকর কাজের সূচনা করা হয়। ইমাম শা’বী (র.)সহ ওলামায়ে কেরামগণ এ অভিমত ব্যক্ত করেন।
লাইলাতুল কদর কখন: লাইলাতুল কদর রমজান মাসেরই কোনো এক রাত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘রমজান মাস যাতে কুরআন নাজিল করা হযেছে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এ কুরআন নাজিল করেছি সম্মানিত এক রাতে।’ (সূরা কদর : ৩)। এ দুটি আয়াত দ্বারা সাব্যস্ত হয়ে যায়, লাইলাতুল কদর রমজান মাসেরই কোনো এক রাত। তবে সেটি কোন্ রাত সে সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস থাকলেও অকাট্যভাবে কোনো রাত তা জানা সম্ভব হয়নি। রাসূল সা. বলেন, ‘রমজানের শেষ দশকে তোমরা লাইলাতুল কদর তালাশ কর। (বুখারী)। এ থেকে রমজানের ২১ রাত থেকে ২৯-এর মধ্যে লাইলাতুল কদর থাকার সংবাদ পাওয়া যায়। অন্য কয়েকটি সহীহ হাদীসে আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে, আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন, রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় তারিখে তোমরা লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর। (বুখারী, আহমদ, তিরমিযী)।
মুসলিম শরীফে উদ্ধৃত হাদীস রযেছে, ‘(রমজানের) শেষ দশ দিনের বিজোড় তারিখের রাতগুলোয় তোমরা লাইলাতুল কদর তালাশ কর।’ এ হাদীসসমূহ থেকে বোঝা যায়, রমযানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতগুলোর মধ্যে কোন একটি রাত লাইলাতুল কদর। প্রায় সকল ওলামায়ে কেরামের মতে এ মতোই সর্বাধিক সম্ভাবনাময় এবং বিশুদ্ধ। বিভিন্ন হাদীস, অভিজ্ঞতা ও যুক্তির আলোকে রাসূলে কারীম (সা.)-এর সাহাবীদের বিরাট একটি দল এ দশ দিনের মধ্যেও ২৭ তারিখের রাতটি নির্দিষ্ট করেছিলেন। এদের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আবু হুরায়রা (রা.), উবাই ইবনে কাবা (রা.), আবু যর (রা.), ওমর (রা.), হুরায়রা (রা.) এর নাম বিশেষভাবে উল্লোখযোগ্য। (ইবনে আবী শাইবা)।
লাইলাতুল কদরের আলামত: উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূল (সা.) লাইলাতুল কদরের সম্ভাব্য তারিখ রমজানের শেষে বিজোর পাঁচটি রাত ও এই রাত ও রাতের ফজিলত বর্ণনার পরে এ রাতের কিছু আলামত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘সে রাত দ্বীপ্তিময়, পূর্ণ স্নিগ্ধ প্রশান্তিময়, মেঘমুক্ত ঝড়ঝাঁপটামুক্ত, গরমও রয়, অতি ঠাণ্ডাও নয় (নাতিশীতোষ্ণ) যেন চন্দ্রোজ্জল রাত এবং সে রাতে নক্ষত্রসমূহ শয়তানকে তাড়াতে ছুটে না। আরও নির্দেশ হলোÑ ভোর বেলায় সূর্য কিরণহীন হয়ে উদিত হয়, তার আলোতে তীক্ষèতা থাকে না, যেন তা চতুর্দশীর পূর্ণ চাঁদ। সূর্যের সাথে শয়তানের আত্মপ্রকাশ আল্লাহ পাক সেদিনের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। (আহমাদ, বায়হাকী)।
লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়ে উত্তম: তাফসীরে জালালাইন, মাযহারী, কুরতুবী, মারেফুল কুরআনসহ প্রায় সবগুলো তাফসীর গ্রন্থেই আল্লাহ তায়ালার এ বাণী দ্বারা এ রাতে এবাদত বন্দেগির সাওয়াব হাজার মাসের এবাদত বন্দেগির সাওয়াবের চেয়ে বেশি করা হয়েছে, যা সূরা আল-কদরের শানে নুযুল ও ব্যাখ্যায় উল্লেখিত হয়েছে। তাফহীমুল কুরআনে এ অর্থের সত্যতা স্বীকার করে একটি জ্ঞানপূর্ণ ও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পেশ করেছেন। তা হলো: ‘হাজার মাস বলতে একেবারে গুণে শুনে তিরাশি বছর চার মাস নয়; বরং আরববাসীদের কথার ধরনই এরকম ছিল। কোনো বিপুল সংখ্যার ধারণা দেয়ার জন্য তারা হাজার শব্দটি ব্যবহার করত। তাই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, এ একাট রাতে এত বড় নেকী ও কল্যাণের কাজ হয়েছে যা মানবতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে কোন দীর্ঘতম কালেও হয়নি। কুরআন নাজিলের রাত মানবজাতির কল্যাণকারিতার দিক দিয়ে যে কোনো সুদীর্ঘ কালের চাইতে বেশি উপকারী। আবার কুরআন নাজিলের এ মহিমান্বিত তারিখটি প্রতি বছরই উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য হাজার মাস বিরতিহীন সৎ আমল ও প্রতিরাত নফল নামাযের এবাদতের চেয়ে বেশি সাওয়াব অর্জনের সুযোগসংবলিত।
লাইলাতুল কদরের ফজিলত: সূরা কদরেই আল্লাহ তায়ালা এ রাতের তিনটি ফজিলত বর্ণনা করেছেন, লাইলাতুল কদর হাজার মাসরে চেয়ে উত্তম। জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদেরসহ এ রাতে আল্লাহর অনুমতিক্রমে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় নিয়ে দুনিয়ায় নাজিল হন। এ রাত সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত পুরোপুরি শান্তিময়। এ সম্পর্কে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে লোক ঈমানের সাথে ও আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাবার আশায় কদরের রাতে এবাদতের জন্য দাণ্ডয়মান হলো, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে।’ (বুখারী ও মুসলিম)। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একদা রমযান মাস উপস্থিত হলে রাসূল (সা.) বললেন, তোমাদের কাছে যে মাসটি উপস্থিত হয়েছে, তাতে এমন এক রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে এই পুণ্যময় রাতে এর কল্যাণ থেকে নিজেকে ফিরিয়ে রাখল, সে সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত থাকে।’ (ইবনে মাজাহ)। আনাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কদরের রাত জিবরাঈল ফেরেশতাদের একটি জামায়াত নিয়ে দুনিয়ায় অবতীর্ণ হন এবং দাঁড়ানো ও উপবিষ্ট অবস্থান যারা আল্লাহর যিকির ও অন্যান্য এবাদতের রত থাকে, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন।’ (বায়হাকী)।
প্রতি বছর লাইলাতুল কদরে আল্লাহ তায়ালার হুকুম অনুযায়ী জিবরাঈল (আ.)-এর নেতৃত্বে ফেরেশতাগণ অবতরণ করেন। তারা পরবর্তী লাইলাতুল কদর পর্যন্ত কার ভাগ্যে কী ঘটবে, সে ভাগ্যলিপি নিয়ে পৃথিবীতে আসেন এবং যত মুমিন নারী-পুরুষ এ রাতে ইবাদতে মশগুল থাকে, তাদের জন্য দোয়া করেন। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর অফুরন্ত নিয়ামত মহামহিমান্বিত লাইলাতুল কদর নসিব করুন। তিনি আমাদের গুনাহসমূহ মাফ করুন, আমিন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।