অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনে রোজা


১৩ মার্চ ২০২৫ ১৬:১৯

॥ প্রফেসর ড. এবিএম মাহবুবুল ইসলাম ॥
বিষয়টি নিঃসন্দেহে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জটিল। এ সংক্রান্ত বিষয়ে জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার জন্য প্রয়োজন যা জানার, তা হলো, অপরাধ কী? কেন অপরাধ সংঘটিত হয় এবং অপরাধের ধরন কী কী? অনুরূপভাবে জানতে হবে সিয়ামের মৌলিক ও ব্যবহারিক অর্থ, সিয়ামের গুরুত্ব ও ভূমিকা। একই সাথে জানতে হবে সিয়ামের লক্ষ্য অর্জনের পন্থাসমূহ, কোনো প্রকার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছাড়াই এমন একটি কঠিন ইবাদত আল্লাহ তায়ালা আরোপ করেননি। যে পবিত্র আত্মা বা নিরপরাধ আত্মা নিয়ে, সে পৃথিবীতে এসেছিল এমন নির্মল আত্মার অধিকারী হওয়ার অর্থই হলো অপরাধমুক্ত হওয়া। আর এ নির্মল আত্মা নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারলেই তার মরণ হবে ত্রুটিমুক্ত আর তার পরকাল হবে আনন্দঘন। মৌলিক ইবাদতের মধ্যে সিয়াম সাধনাই হচ্ছে মানবত্মাকে অপরাধমুক্ত রাখার চূড়ান্ত মাধ্যম। সিয়ামের ভূমিকা আলোচনার পূর্বে অপরাধ এবং কারণ ও ধরন বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রয়োজন।
অপরাধ ও ইসলাম : ইসলাম প্রাথমিকভাবে (ংরহ) পাপকে নির্মূল করতে চায়। অন্যায়ের মাত্রা সীমা অতিক্রম করলে তা অপরাধ (জিনায়া) এর পর্যায়ে পড়ে যায়। কেন পাপ করে? তা করে তার প্রবৃত্তির তাড়নায়। (ওহহবৎ ঁৎমব) অর্থাৎ অসৎ নফসের চাহিদা পূরণের জন্যই সে পাপে জড়িয়ে পড়ে। যেমন হিংসাপরায়ণতা, ইর্ষাপরায়ণতা, অতিরিক্ত লোভ-লালসা। তা দমন করতে না পারলে এর সব চাহিদা ও কর্ম আরও বৃহৎ আকার ধারণ করে অপরাধের জন্ম দেয়। অপর কারণ হলো পারিপার্শ্বিক প্রভাব এবং অপরাধ সংঘটনে উদ্দীপনা দান। অপরাধ সংঘটনের কারণসমূহ চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে ভোগবাদী দর্শন ও ইসলামী দর্শনের ক্ষেত্রে প্রায় অভিন্ন মিল রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যে মৌলিক বে-মিল রয়েছে তা হলো আত্মা বা নফসের ভূমিকা।
সিয়াম অর্থ: সিয়াম আরবী শব্দ। সাউম এর বহু বচন। বাংলায় তা পরিচিতি লাভ করেছে রোজা হিসেবে। রোজার আরবী প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘সাওম’। সাওম অর্থ কোনো কিছু করা থেকে বিরত থাকা, উপোস থাকা, সংযম সাধনা করা ইত্যাদি। তাহলে রোজা অর্থ শুধু উপোস থাকা নয়, বরং রোজা বা সাওম হচ্ছে পান ও আহার থেকে নিয়ে সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত যাওয়া পর্যন্ত এমন সব কর্ম থেকে বিরত থাকা, যা করাকে আল্লাহ নিষেধ করেছেন এবং এমন কিছু কর্ম যাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে দিনের বেলা ঐ সকল কর্ম সম্পাদন থেকেও বিরত থাকার নামই হচ্ছে রোজা।
রোজা পালনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে কুরআনের ঘোষণা, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর, যেন তোমরা পরহেযগারী অর্জন করতে পার। (সূরা বাকারা : ১৮৩)। অপরাধ দমনে রোজার ভূমিকা: অপরাধ সংঘটনের সূত্র ও বাহন হলো দুটো। যেমন মানবাত্মা এবং তার দেহ বা বৈষয়িক অবয়ব। রোজা মানব জীবনের এ দুটি প্রধান বিষয়ের তদারক ও উন্নয়ন সাধন করে। যেমন- ১. আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, ২. এবং বৈষয়িক উন্নয়ন। এ দুটো বিষয়ই মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে কাভার করে থাকে। মানুষের গঠন দুটি প্রধান উপাদানের সমন্বয়। যেমন (১) আত্মা (ঝড়ঁষ), (২) দেহ (ইড়ফু)। একটি অপরটির পরিপূরক।
অপরাধমুক্ত হওয়ার জন্য অর্জন ও বর্জনীয় বিষয়: অপরাধমুক্ত হতে হলে একজন ব্যক্তির যে কতিপয় জিনিস অর্জন ও বর্জন করা বাঞ্চনীয়, এর কয়েকটি হলো: ১. আল্লাহভীতি অর্জন করা। ২. গুনা বা পাপমুক্ত হওয়া। ৩. শয়তানের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা। ৪. নফসের যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি বা কামনা নিয়ন্ত্রণে থাকা। ৫. মিথ্যা, প্রতারণামূলক যাবতীয় কর্ম থেকে মুক্ত থাকা। ৬. যৌন, কর্ম, অজ্ঞতাপূর্ণ ও ফেতনা-ফাসাদ থেকে রিবত থাকা। ৭. প্রত্যাশিত ফল তথা জান্নাতপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকা। ৮. রোজা ব্যক্তি, পরিবার ও সম্পদের ওপর অন্যায় আচরণের প্রায়শ্চিত্তদানে সক্ষমকারী ইবাদত। ৯. রোজা তার মনিব আল্লাহর একান্ত প্রিয়পাত্র হওয়া নিশ্চয়তাদানকারী ইবাদত। ১০. রোজা রাইয়ান বা সর্বোত্তম দরজা দিয়ে জান্নাতে যাওয়ার নিশ্চয়তাদানকারী ইবাদত।
১। রোজা পালনের মাধ্যমে তাকওয়া অর্জিত হয় : এর অর্থ হলো যাবতীয় কার্য সম্পাদন আল্লাহ্ সমর্থিত কিনা, তা বিবেচনায় রেখে কাজ করা। প্রতিটি বলা, শুনা, দেখা, দেয়া-নেয়ার ক্ষেত্রে হক-না হক্ বিবেচনা করে কাজ করার নামই হলো তাকওয়া। আর রোজার মাধ্যমে এ গুনটি অর্জন হতে পারে। এর নিশ্চয়তাই দেয়া হয়েছে সূরা আল বাকারার ১৮৩নং আয়াতে। “যে আল্লাহকে ভয় করলো প্রকৃত অর্থে তার দ্বারা কোন অপরাধ-অপকর্ম হতেই পারে না।” সিয়ামের মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া অর্জিত হলে বাকি সবগুলো আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়ে যাবে। তাকওয়া অর্জনকারী হচ্ছে মুত্তাকি। আর কুরআন নাজিলের একমাত্র উদ্দেশ্যেই হচ্ছে মুত্তাকিকে পরিচালিত করা। একজন মুত্তাকি একজন ঈমানদার, খাটি মুসলিম, তিনি আল্লাহর একান্ত বন্ধু। আল্লাহ সব সময়ই মুত্তাকিদের সাথেই থাকেন। আকাশ-জমিনসহ বিশাল জান্নাত মুত্তাকিদের জন্য তৈরি করা হয়েছে। মুত্তাকিদের কারণেই বিভিন্ন প্রকারের এমনকি অচিন্তনীয় উৎস থেকেও আল্লাহ রিজিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। অর্থাৎ মুত্তাকি নেই তো পথের দিশা নেই, মুত্তাকি নেই তো শান্তি নেই, মুত্তাকি নেই রিজিকের ব্যবস্থা নেই, মুত্তাকি নেইতো জান্নাত খালি আর জাহান্নাম টইটুম্বুর। এই যখন তাকওয়া আর মুত্তাকির অবস্থান তখন এই মুত্তাকি তৈরির উপাদানই হলো সিয়াম সাধনা। তাকওয়া বা ভয়ের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এর প্রভাব পড়ে দেহের ওপর আর আত্মার ওপর। সাধারণ দৃশ্যমান ভয়ের প্রভাব প্রতিটি অঙ্গের ওপর প্রতিফলিত হয়। যেমন হাতের ওপর এর প্রভাব পড়লে সুযোগ থাকার পরও এ হাত অপকর্মে সায় দেয় না। পায়ের ওপর পড়লে পা অপকর্মে চলে না। মুখে পড়লে মুখ দ্বারা অপকথা অপখাদ্য হয় না-সয় না। চোখে পড়লে সুযোগ থাকলেও এ চোখ অশ্লীল অশ্রাব্য কিছুই দেখে না। যার সব দেহই ভয়ের কারণে ভীত তার আবার অপরাধী সাধন কীসে? এই তো হলো দেহ। ভয়ের আর একটি প্রভাব পড়ে মানবত্মার ওপর। যে আত্মাই হলো প্রধান- মানুষ সেই আত্মায় ভয়ের প্রভাবের কারণে প্রথমত, ঐ আত্মা পূর্ব হতে সকল কালিমা দূরীভূত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ঐ আত্মায় শুধু ভালো আর ভালোর সমাহার ঘটে। সর্বোপরি তাতে খারাপ বা পাপমুক্ত কোনো কাজ করার যোগ্যতাই এমন আত্মায় আর থাকে না।
একজন ব্যক্তি মুত্তাকি হলে, পরিবারের সবাই, ঐ বাড়ি শান্তির বাড়ি, পাড়ার সবাই মুত্তাকি হলে- ঐ পাড়ার সবাই সুখী, এক গ্রামের সবাই মুত্তাকি হলে ঐ গ্রাম হয়ে যাবে শান্তির গাঁ। একটি ইউনিয়ন হলে ঐ ইউনিয়নের পরিচালকসহ সব হেদায়েতপ্রাপ্ত নির্বাচনী এলাকার সকল মানুষ মুত্তাকি হলে আইন পরিষদের প্রতিনিধিত্ব করবেন একজন মুত্তাকি। সারা দেশের সকল অঞ্চলের লোক মুত্তাকি হলে গঠিত হবে মুত্তাকির সমন্বয়ে জাতীয় সংসদ। আর এ সংসদের তৈরি প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীপরিষদ, সচিববৃন্দ, বিচারকবৃন্দ. কূটনীতিকবৃন্দ, পুলিশ, আর্মি সবাই হবেন মুত্তাকি। অর্থাৎ নিরপরাধ বা অপরাধমুক্ত এমন একটি দেশ ও সরকার গঠন করতে পারলে শুরু হয়ে যাবে বিশ্বব্যাপী মুত্তাকিদের সরকার গঠনের আন্দোলন। মহানবী (সা.) এজন্যই বলেছিলেন, সফলও হয়েছিলেন তাই আজকের এ দিনে অপরাধমুক্ত সমাজ, সরকার, রাষ্ট্র ও বিশ্ব রাষ্ট্র গঠনের একমাত্র দাওয়াই হচ্ছে তাকওয়া অর্জন করে মুত্তাকি হওয়া।
২. রোজা অতীতের যাবতীয় গুনাহ্ মাফের মাধ্যম : এ প্রসঙ্গে নবী (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি রমাদান মাসে ঈমান ও ইহতেসাবের সাথে রোজা পালন করবে তার অতীতের সকল গুনাহ্ মাফ করে দেয়া হবে।” বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পুণ্যময় জীবনযাপনের শর্ত হচ্ছে অতীতের অপকর্ম থেকে মুক্তি বা অব্যহতি প্রাপ্তি। একমাত্র রোজাই এ গ্যারান্টি দিতে পারে। যে ব্যক্তি অতীতের অপরাধ থেকে মুক্তি লাভ করলো সেইতো নিরপরাধ আর এটাই তো হলো সিয়ামের প্রকৃত উদ্দেশ্য।
৩. রোজা শয়তানের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার ঢাল : এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, “আদম সন্তানের প্রতিটি কর্ম তার নিজের জন্য আর রোজা হলো আমার জন্য। আমিই রোজার পুরস্কার- আর রোজা হচ্ছে ঢালস্বরূপ।
৪. রোজা (যাবতীয়) কুপ্রবৃত্তি দমনের মাধ্যমে: এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, “রাসূলাল্লাহ্ (সা.) বলেন, যার সামর্থ্য আছে তাকে বিয়ে করা উচিত। কেননা বিয়ে চক্ষুকে (পর মহিলা) দর্শন থেকে দমন করে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে অর্থাৎ জেনা থেকে বিরত রাখে। যার বিয়ে করার সামর্থ্য নেই, তার রোজা রাখা উচিত। কেননা রোজা যৌন তাড়না দমন করে।” যৌন অপকর্ম একটা মারাত্মাক অপরাধ, সিয়ামে যেমন দৈহিক দুর্বলতা থাকে তেমনি যৌন কর্ম সম্পাদনে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে তা বৈধ হলেও এর দ্বারা যৌন কুপ্রবৃত্তি দমন হয়ে যায়।
৫. রোজা মিথ্যা ও প্রতারণামূলক কাজ থেকে বিরত থাকার মাধ্যম : এ প্রসঙ্গে মহানবীর (সা.) ঘোষণা হচ্ছে, ‘রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং যাবতীয় মিথ্যা বা অসৎ কর্ম থেকে বিরত থাকল না- আল্লাহ্ তার খাদ্য এবং পানীয় ত্যাগকরণের কোনো প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না (অর্থাৎ তার রোজা কবুল হলো না।)’
মিথ্যা কী? এর ধরন বলার মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে, আচরণের মাধ্যমে হতে পারে। মিথ্যা কর্ম মিথ্যা বলার চেয়ে ব্যাপক। অসৎ আমল ব্যবসায়ের প্রতারণা, চাকরির ক্ষেত্রে প্রতারণা, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রতারণা ইত্যাদি হতে পারে। এ জাতীয় কর্ম থেকে বাধ্যতামূলকভাবে বিরত রাখার উদ্দেশ্যেই রোজার আগমন। রোজা রেখে বাজেটের হিসাব মেলাতে সঠিক তথ্য প্রদান না করে ভিন্ন তথ্য প্রদানসহ এ যাবতীয় সকল কাজই মিথ্যার শামিল। এর থেকে বিরত থাকতে না পারলে রোজা হলো না। মিথ্যাই অনেক ক্ষেত্রে যাবতীয় অপরাধের দরজা খুলে দেয়। মিথ্যা বন্ধের মধ্য দিয়ে মূলত অপরাধের পথই রোধ করে দেয়।
৬. রোজা যৌনকর্ম, অজ্ঞতাপূর্ণ এবং ঝগড়া ফ্যাসাদ থেকে বেঁচে থাকার উপায়: এ বিষয়ে মহানবীর ঘোষণা হচ্ছে- আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, রোজা হচ্ছে ‘জুন্নাহ’ বা ঢাল। যে ব্যক্তি রোজা রাখে তাকে যৌন সঙ্গম থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যাবতীয় অজ্ঞতামূলক এবং ছেলেমী আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। যদি কেউ তার সাথে মারামারি করতে অথবা ঝগড়া করতে চায় তাকে দুবার বলা উচিত আমি রোজাদার, আমি রোজাদার।
৭। রোজা জান্নাতের নিশ্চয়তা বিধানকারী: এ প্রসঙ্গে নিম্নের হাদিসটি উল্লেখযোগ্য। একদা একজন মরুবাসী মহানবীর নিকট এসে বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন। রোজা সংক্রান্ত বিষয়ের প্রশ্ন এবং এর জবাব হলো … বেদুইন ব্যক্তিটি বললেন, আল্লাহর কসম আমি রমজানের সকল রোজা পালন করবো। মহানবী বললেন, “এ ব্যক্তি যা বলেছে, তা সত্য হলে সে অবশ্যই জান্নাতে যাবে।” জান্নাতের নিশ্চয়তা পাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। আর সিয়ামেই তা দিতে পারে এ মহান সুযোগ। উপরন্তু জান্নাতের সুসংবাদের মাধ্যমে রোজাদার সৎকর্ম সাধনে আরও বেগবান হবেন এটাই সত্য।
৮. রোজা রাইয়ান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশের মাধ্যম : এ বিষয়ে মহানবীর (সা.) বাণী হচ্ছে- জান্নাতে রাইয়ান নামক একটি দরজা আছে, এ দরজা দিয়ে রোজাদার ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। আল্লাহর মেহমান হয়ে রাইয়ান নামক গেট পার হওয়া ব্যক্তি কি অপরাধী (ঈৎরসরহধষ) হবেন?
৯. রোজা হচ্ছে পরিবার, সম্পদ এবং প্রতিবেশীর প্রতি অন্যায় আচরণের প্রায়শ্চিত্ত বা ক্ষতিপূরণ : মহানবী (সা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেন, রোজা, নামায এবং জাকাত হচ্ছে কোনো ব্যক্তি কর্তৃক তার পরিবার, তার সম্পদ এবং তার প্রতিবেশীর ওপর ক্লেশ বা পীড়াদানের ক্ষতিপূরণ অর্থাৎ রোজা পালন- ক্লেশ সৃষ্টিকারী অপরাধসমূহ মাপ করে দেয়, কেউ কাউকে পীড়া দেয়নি, কারো অধিকার ক্ষুণ্ন করেনি এমন মানুষ কয়জন আছে এ বিশ্বে। যারা আছেন তারা থাকুন- আর যারা নেই তাদের এ অপরাধ মুক্তির কাফ্ফারা হচ্ছে রামাদানের রোজা পালন।
১০। রোজা আল্লাহর একান্ত প্রিয় পাত্র হওয়ার মাধ্যম : এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, সেই আল্লার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ নিবদ্ধ। রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশক আম্বরের চেয়েও অধিক প্রিয়। এটা এজন্য যে, সে আমার জন্য খানাপিনা এবং যৌনকর্ম পরিত্যাগ করেছে। রোজার এ সকল ভূমিকাকে সামনে রাখলেই রোজা পালনের সার্থকতা খুজে পাওয়া সহজ হবে। প্রিয়পাত্র কি কোনো অপরাধী হতে পারেন? প্রিয়পাত্র হওয়া ছাড়া কি জান্নাতপ্রাপ্তি হবে? নিশ্চয়ই না। সিয়ামই পারে রোজাদারকে তার মনিবের প্রিয়পাত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখতে।
রোজার বৈষয়িক উপকার : রোজার আধ্যাত্মিক এবং নৈতিক উপকার ছাড়াও এর অনেক বৈষয়িক উপকার রয়েছে। বৈষয়িক উন্নতি-অবনতিও অপরাধ সংঘটনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। রোজাই বৈষয়িক চাহিদা দমনে সক্ষম। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তিনটি প্রধান জৈবিক বা বৈষয়িক চাহিদা রয়েছে। যেমন (১) পেটের চাহিদা (অন্ন ও পানিয়ের চাহিদা), (২) যৌন চাহিদা এবং (৩) শারীরিক বিশ্রামের চাহিদা। এ চাহিদার প্রথম দুটি দমন করা একান্ত প্রয়োজন এবং শেষ চাহিদাটি পূর্ণ করা প্রয়োজন। প্রতিটি যন্ত্র চায় বিশ্রাম। এগারো মাসের একটানা সার্ভিসের পর রমাদানে দিনের বেলা ১২-১৪ ঘণ্টার জন্য পানাহার থেকে বিরত থাকলে দেহের পাকস্থলি যন্ত্র বিশ্রামের সুযোগ পায়। ফলে এ যন্ত্র নব উদ্যমে সার্ভিস দিতে পারে। কীসের থেকে বিরত থাকাÑ মিথ্যা, গীবত, চুগলখোরি, ছিন্দ্রান্বেষণ, কালোবাজারি, ভেজাল মুনাফাখোরি, প্রতারণা, চুরি, ডাকাতি, হাইজ্যাকিং, সুদ, ঘুষ, জেনা, ব্যভিচারী, কিডনাপিং, জালিয়াতি, ভোট ডাকাতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দান, ইসলামবিরোধী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষা, অপসাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, ইসলামের শত্রুর পক্ষের এজেন্সিগিরি, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ যাবতীয় অন্যায় অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকার নাম; কয়েকটি বৈধ কাজ যেমন- খাওয়া-দাওয়া ও বৈধ স্ত্রী সহবাস থেকে দিনের বেলা বিরত থাকার নামই হচ্ছে সাওম বা রোজা। এসব থেকে বিরত না থেকে শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকলেই রোজার দাবি পূরণ হয় না, হবে না। উক্ত শর্তপূরণ করে রোজা পালন করতে পারলেই একের বিনিময়ে সাতশত গুণ সওয়াব পাওয়া যাবে এবং রাইয়ান নামক গেট দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করা সম্ভব হবে। শর্তপূরণ না হলে রোজা থেকে ফায়দা পাওয়া যাবে কিনা তা সন্দেহ।
প্রচলিত প্রথায় নয় বরং যে উদ্দেশ্যে রোজার আগমন সে উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে রোজা পালন করা দরকার। অর্থাৎ এক্ষেত্রে শুধু উপবাস নয়, বরং যাবতীয় অন্যায়, অশ্লীল ও পাপ কাজ থেকে বিরত থাকার কোনোই বিকল্প নেই। ইসলামের উদ্দেশ্য হচ্ছে অপরাধমুক্ত সমাজ গঠন আর এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিকে অপরাধমুক্ত হওয়া। রমাদানের রোজা পালনই এ উদ্দেশ্য সাধনের মোক্ষম মাধ্যম। অতএব এ রোজা পালনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা যত বাড়বে ইসলামী সমাজ গঠনের লক্ষ্যে দেশ ও জাতি ততই এগিয়ে যাবে আর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সমাজ লাভ করবে তার দীর্ঘায়ু।