এবারের রোজায় নিত্যপণ্য মূল্য স্থিতিশীল


৬ মার্চ ২০২৫ ১২:২৭

স্টাফ রিপোর্টার : এবারের রোজায় নিত্যপণ্যের বাজার গত কয়েক বছরের চেয়ে স্থিতিশীল রয়েছে। সয়াবিন তেলে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রেখেছে একটি চক্র, আর মাছের মূল্য স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি, লেবুর মূল্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলেও গত রমজানের চেয়ে কম। এছাড়া প্রায় সব নিত্যপণ্য মূল্য রয়েছে স্থিতিশীল। কোনো কোনো পণ্যমূল্য গতবারের চেয়ে অনেক কম। বাজার ঘুরে এবং বিভিন্ন পণ্যের দাম বিশ্লেষণে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।
গত বছর রোজায় এ সময় পেঁয়াজের কেজি ছিল মান ভেদে ১২০ টাকা থেকে শুরু করে ১৬০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু এ বছর এক কেজি পেঁয়াজের মূল্য মানভেদে ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ টাকা। অর্থাৎ এবার রোজায় কেজিপ্রতি অনেক কম মূল্যে পেঁয়াজ খেতে পারছেন ভোক্তারা।
প্রায় একই অবস্থা ডিমের মূল্যের ক্ষেত্রেও। গত রোজায় এক ডজন ডিমের মূল্য ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত, কিন্তু এবারের রোজায় এক ডজন ডিমের খুচরা মূল্য ১২৫ টাকা। গোল আলুর ক্ষেত্রেও মূল্য কমেছে যথেষ্ট। দীর্ঘ কয়েক বছর গোল আলুর মূল্য ছিল কেজি ২০ টাকার মধ্যে, কিন্তু গত দুই বছর ধরে গোল আলুর কেজি মূল্য বেড়ে সর্বোচ্চ ৭০ টাকায় গড়ায়। কিন্তু এবার মূল্য কমেছে এবং স্থিতিশীলও রয়েছে। নতুন আলু ওঠার পর আলুর কেজির মূল্য ১৫ থেকে ২৫ টাকার মধ্যে রয়েছে বেশ কিছুদিন ধরে। রোজা এলে আলুর ব্যবহার বাড়লেও মূল্য বাড়েনি। রোজার আগে মূল্য যেমন ছিল রোজায়ও একই মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে আলু। এখন বাজারে আলুর মূল্য মানভেদে কেজি ২০ টাকা থেকে ২৫ টাকা। রোজায় বেগুন দিয়ে বেগুনি বানানো হয়, যা ইফতারিতে একটি কমন আইটেম, এবার সেই রোজা শুরু হওয়ার পর বেগুনের মূল্য বেড়েছে। এক মাস আগে বেগুনের মূল্য ছিল সর্বোচ্চ ৬০ টাকা কেজি, রোজা শুরু হওয়ার পর সেই বেগুনের মূল্য ৮০ থেকে ১০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বেগুনের এ মূল্য গত বছরের চেয়ে কম। গত বছর রোজায় বেগুনের ম্ল্যূ ১৫০ টাকা ছিল। তখন শেখ হাসিনা বেগুনের পরিবর্তে কুমড়া খেতে নসিহত করেছিলেন।
গত রোজায় চিনি ছিল ১৫৫ টাকা কেজি, এবার ১২৫ টাকা কেজি।
এসব পণ্য রোজার কমন পণ্য। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, সয়াবিন তেলের তেলেসমাতি নিয়ে। রোজা শুরুর অন্তত দুই সপ্তাহ আগে মজুদদাররা সয়াবিন তেল কিনে দোকানে না দিয়ে মজুদ করে রাখেন। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়, যা একটি অপরাধ। সরকারের তরফ থেকে অভিযানও পরিচালনা করা হয়, কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সব স্থানে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে রোজা শুরু হলেও অনেক দোকানে সয়াবিন তেলের সংকট দৃশ্যমান হয়েছে।
খবর নিয়ে জানা গেছে, রমজানে বাড়তি চাহিদা বেশি থাকায় মাছ লেবু, শসা ও বেগুনের দাম বেড়েছিল। তবে রোজার পণ্য হিসেবে পরিচিত খেজুর, ছোলা, চিঁড়া, মুড়ি ও গুড়ের দাম ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু দুদিনের ব্যবধানে কমেছে ব্রয়লার মুরগি-লেবুসহ বেশকিছু পণ্যের দাম। বাজারে এখন ব্রয়লার মুরগি ১৯০ থেকে ২০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা রোজা শুরুর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার বেড়ে ২২০-২২৫ টাকায় উঠেছিল। অর্থাৎ তিনদিন বাদে আবারও ৩০-৩৫ টাকা কমে আগের দামে এসেছে। অন্যদিকে ইফতারে অনেকেই লেবুর শরবতে চুমুক দিয়ে গলা ভেজাতে চান। তবে এবার চাহিদা থাকায় রোজার শুরুতেই লেবুর দাম ছিল আকাশচুম্বী। কিন্তু ৪ মার্চ আগের তুলনায় লেবুর দামও কিছুটা কমেছে। গত ১ ও ২ মার্চ ঢাকার বাজারে হালিপ্রতি লেবু বিক্রি হয়েছে ৫০-৮০ টাকা দরে। ৪ মার্চ সেই লেবু ৪০-৬০ টাকা হালি বিক্রি করতে দেখা গেছে। একজন বিক্রেতা জানান, রোজার সময় যে পরিমাণে সরবরাহ থাকে তার চেয়ে চাহিদা কয়েকগুণ বেশি থাকে। তাই দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। এখন গত দুদিনে অনেকে লেবু কিনে ফেলেছে, চাহিদা কমছে, সেইসঙ্গে দামও। আরও কয়েকদিন গেলে হালি ২০-২৫ টাকায় নেমে আসবে।
লেবুর মতো দাম বেড়েছিল শসা-বেগুনের। সোমবার শসা কেজিপ্রতি ১০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে। আগে দাম ৫০-৬০ টাকা হলেও এখন ৪০-৫০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে গোল বেগুন ৮০-১০০ টাকার পরিবর্তে ৬০-৯০ টাকা ও লম্বা বেগুন ৬০-৮০ টাকার পরিবর্তে ৫০-৬০ টাকা দরে এসেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মোটাদাগে বলতে গেলে এ বছর রমজানে পণ্যের দাম অন্যান্য বছরের চেয়ে বেশ স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে রয়েছে। রোজা শুরুর আগেই বাজারে যে অরাজকতা অন্যান্য বছর দেখা যেত, সেটা এবার নেই। তবে চার মাস ধরে চলা ভোজ্যতেলের সরবরাহ সংকট কাটেনি। সেটাই একমাত্র বড় অস্বস্তির কারণ ভোক্তার জন্য। এছাড়া চালের দাম বাড়তি। এ বছর এখন পর্যন্ত চিনি, খেজুর, ডাল, পেঁয়াজ ও আলুর দাম কম রয়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, বেশকিছু পণ্যের ভরা মৌসুম, নতুন সরকারের শুল্কছাড়, পর্যাপ্ত আমদানির কারণে বেশিরভাগ পণ্যে স্থিতিশীলতা আছে।
৩ মার্চ একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, ‘রোজা উপলক্ষে আমিরাতে অন্তত ১০ হাজার পণ্য ৫০ শতাংশ ছাড় দিয়ে বিক্রি করছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা।’ কিন্তু বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ মানসিকতা গড়ে ওঠেনি, বরং মূল্য বাড়ানোর হিড়িক পড়ে যায় রোজাসংশ্লিষ্ট পণ্য এবং ঈদ মার্কেটগুলোয়। ভোক্তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের উচিত এ অপকর্ম থেকে বের হয়ে আসা। এতে ব্যবসায়ীরা অপরাধ থেকে বাঁচবেন এবং ভোক্তারাও বাঁচবেন বিপদ থেকে।