কীভাবে নিজেকে পরিবর্তন করব?


২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৪৫

॥ এম ওবায়দুল্লাহ আনসারী ॥
পরিবর্তন জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। জীবনে স্থায়ী বলতে কোনো কিছু নেই। সুস্থতা-অসুস্থতা, উন্নতি-অবনতি, মান-অপমান, ক্ষুধা-তৃপ্তি, দারিদ্র্য-সচ্ছলতা, বিয়ে-বিচ্ছেদ, শান্তি-অশান্তি, আনন্দ-বেদনা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সবই পরিবর্তনশীল। এসব পরিবর্তন জীবনের চিরাচরিত নীতি। এখান থেকে পালানোর কোনো জায়গা নেই। যুগে যুগে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহে আমরা এসব পরিবর্তন পাঠ করি। জীবনের পরিবর্তন যখন নেতিবাচকভাবে ঘটে, তখন দুর্বল মনে দুঃখ-বেদনা ও অশুভত্বের নানা ধরনের চিন্তা ভর করে; যা সংকল্পে চিড় ধরায়। সক্রিয় ও তৎপর হয়ে জীবনের পথে চলতে মনকে বাধা দেয়।
মুসলিম ব্যক্তির মৌলিক আকিদা হলো- ভালো-মন্দের ফয়সালা ও তকদিরে বিশ্বাস স্থাপন করা। আল্লাহ তায়ালার হাতেই সব ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ, জীবনের সব পরিবর্তন রবের ইঙ্গিতে ঘটে, তাতে মানুষের দখল নেই- এ কথা নিশ্চিতভাবে মেনে নেয়া। বিপদ ও সংকট ডিঙিয়ে যেতে; দৃঢ়তা ও মনোবল নিয়ে জীবনের কর্ম ও জীবিকা সন্ধানের পথে এগিয়ে যেতে এবং প্রাপ্তির জীবনকে অকেজো হওয়া থেকে বাঁচাতে তকদিরের প্রতি ঈমান আনা একটি শক্তিশালী প্রেরণা। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘জেনে রাখ, গোটা জাতি মিলে তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না। আল্লাহ তোমার জন্য যা লিখে রেখেছেন, তারা শুধু সেটুকু উপকারই করতে পারবে। গোটা জাতি মিলে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ তোমার বিপক্ষে যা লিখে রেখেছেন, তারা শুধু সেটুকু ক্ষতিই করতে পারবে। তকদিরের কলম তুলে নেয়া হয়েছে। ভাগ্যনামা শুকিয়ে গেছে।’
তাই আল্লাহর কাছেই বান্দা প্রার্থনা করবে, সৃষ্টির কাছে নয়। রাসূল (সা.) বলেন, ‘দারিদ্র্যে আক্রান্ত হয়ে কেউ মানুষের দ্বারস্থ হলে তার দারিদ্র্য মিটবে না। আল্লাহর দ্বারস্থ হলে তিনি তাকে অবিলম্বে কিংবা বিলম্বে জীবিকার ব্যবস্থা করবেন।’ বান্দা তার রবের প্রতি সুধারণা রাখবে। মুমিন বান্দা সবসময় সন্তোষ প্রকাশ করে জীবনযাপন করবে। তাহলে তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রশান্তিময় থাকবে। আল্লাহ তায়ালার তকদির ও ফয়সালার ওপর বিশ্বাস মানে বাস্তবতার কারাগারে বন্দি থাকা নয়, জীবনের রুটিনে আবদ্ধ থাকা নয়, হতাশা, ব্যর্থতা ও নৈরাশ্য মেনে নেয়া নয়; বরং তকদিরের ওপর ঈমানের দাবি হলো তকদিরকে তকদির দিয়েই প্রতিহত করা। ধৈর্য ও দৃঢ়তায় উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা। পরিস্থিতিকে আরো ভালোর দিকে নিয়ে যেতে কাজ করে যাওয়া। আল্লাহ তায়ালা অনেক নিঃস্ব লোকের অবস্থাকে সচ্ছলতায় পাল্টে দিয়েছেন। কত দুস্থ লোকের বিপদ কাটিয়ে সুদিন এনে দিয়েছেন। রুগ্ণকে সুস্থ করেছেন। মজলুমের পক্ষ হয়ে জালেমের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছেন।
পরিস্থিতির অমূলক বিশ্লেষণে নিমজ্জিত হয়ে, অহেতুক ঘটনার পেছনে ছুটে এবং দিবাস্বপ্নের মরীচিকায় বিভোর হয়ে মানুষ তার অবস্থাকে পরিবর্তন করে আরো উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে উদাসীন থাকে। অনেক সময় নষ্ট করে। রাসূল (সা.) বলেন, ‘যা তোমার উপকারে আসবে, সে বিষয়ে মনোনিবেশ করো।’ সন্দেহপ্রবণতা, ক্রোধের মানসিকতা, সময়টা খারাপ বলে বসে থাকা ও সমাজে নেতিবাচক চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার ফলে উচ্চাকাক্সক্ষা মরে যায়। মনোবল ভেঙে পড়ে। উন্নয়ন ভেস্তে যায়। মুমিন ব্যক্তি তার সঠিক বিবেচনা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন পরিবর্তনে যথার্থ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক বিপদ ও সংকটের মাঝে বিজয় এবং সফলতা লুকিয়ে থাকে। মুমিন ব্যক্তি জানে, জীবনের এসব পরিবর্তন একটি বড় নিয়ামত, যা আশার দ্বার খুলে দেয়। এতে নিহিত থাকে উন্নতি, সফলতা ও নির্মাণের সুবর্ণ সুযোগ। বিপদ ঘনিয়ে এলে রাসূল (সা.) আশার বাণী প্রচার করতেন।
আদি ইবনে হাতেম (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবীজির (সা.) কাছে বসা ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে তাঁর কাছে দারিদ্র্যের কথা বলল। আরেকজন এসে ডাকাতের উপদ্রবের অভিযোগ করল। তখন তিনি বললেন, হে আদি! তুমি হিরাত অঞ্চল দেখেছ? বললাম, না; তবে শুনেছি। তিনি (সা.) বললেন, ‘তুমি দীর্ঘ জীবন পেলে দেখতে পাবে- সুদূর হিরাত থেকে নারী মুসাফির বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে আসবে। সে আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাবে না।’ মুসলিম ব্যক্তি নবী করিম (সা.)-এর দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে কল্যাণ ও সত্যের পথ ধরে নেতিবাচক পরিস্থিতিগুলো প্রতিহত করবে। উন্নতির লক্ষ্যে নিজের জীবন, আচরণ ও ব্যক্তিত্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। রাসূল (সা.) নিজের ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনে অনেক পরিবর্তন এনেছিলেন- কর্ম ও কথা উভয় ক্ষেত্রেই। মদিনার আগের নাম ‘ইয়াসরিব’ বাদ দিয়ে ‘তৈয়বাহ’ রেখেছেন। তিনি ভুল চিন্তাগুলোকে পরিবর্তন করে দিতেন। যেমন- তিনি যখন বললেন, ‘তোমরা কাকে বাহাদুর মনে করো? তারা বলল, যাকে লোকেরা ধরাশায়ী করতে পারে না। তিনি বললেন, না, সে নয়; বরং যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেই বাহাদুর।’
কিছু নেতিবাচক তুষ্টি মুসলিম ব্যক্তির চিন্তাকে মিইয়ে রাখে। সেভাবে পরিবর্তন করে উন্নতি করতে সে অক্ষম। এটি মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা, যা ব্যক্তিকে পুরোপুরি পেছনে ঠেলে দেয়। ইতিবাচক তুষ্টি দিয়ে অবশ্যই এর পরিবর্তন দরকার, যা তার মনে ও মস্তিষ্কে গেঁথে দেবে জীবনটা কাজের যোগ্য। সমস্যা যত বড়ই হোক, সমাধান আছেই। দৃঢ় মনোবলসম্পন্ন লোকেরা জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসেন। বৈরিতাকে ভালোবাসায় রূপান্তর করেন। মানুষের জীবনে পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলোÑ নিজের সত্তা ও মনকে পরিবর্তন করা। এরপর সে জ্ঞানের শক্তিতে সজ্জিত হবে, যা সব যুগের সভ্যতা নির্মাণ ও উন্নতির মূল ভিত্তি। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ কোনো জাতির বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করেন না, তারা নিজেরা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন না করা পর্যন্ত।’ (সূরা রাদ : ১১)।
লেখক : সাংবাদিক।