হাসপাতালের সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় বদলে গেছে সেবার মান


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৬:০৬

মিজানুর রহমান, ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান যোগদানের পর থেকে বদলে গেছে চিকিৎসাসেবার মান। হাসপাতালটিতে জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের সেবা নিশ্চিত করতে সকল অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়মাফিক চিকিৎসা দিতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। সরকারি ওষুধ নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে দামি ইনজেকশনগুলো মিলছে হাসপাতালটিতে। ভালো খাবার দেওয়ার পাশাপাশি হাসপাতাল আঙিনায় বসানো হয়েছে ফুলের টপ। নতুন করে ৪ জন পরিছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা রোগীদের পরিচ্ছন্ন টয়লেট ব্যবহার নিশ্চিতকরণসহ মিলছে সার্বিক বিষয়ে সেবা। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ সুশীল সমাজের প্রশংসায় ভাসছেন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ঝিনাইদহ পৌর এলাকার হায়দায় আলী নামে এক ব্যক্তি তার ফেসবুকে লিখেছেন, এখন থেকে বেশ কয়েক বছর পূর্বে ঝিনাইদহ জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছিলাম। সেসময় সেবা পাওয়ার জন্য ডাক্তার, নার্স এবং কর্মচারীদের কাছে বার বার নিবেদন করেও ফল পাওয়া কষ্ট হতো। কোনো ওষুধ পাওয়া যেত না, খুব বেশি হলেও কয়েকটা প্যারাসিটামল, হিস্টাসিন, তাছাড়া অন্যান্য দু-একটা সস্তা ওষুধ পাওয়া যেত। আজ পাঁচদিন হলো, বেশ শারীরিক জটিলতা নিয়ে একই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখন পর্যন্ত কাউকেই কিছু বলতে হয়নি। প্রায় ১১ প্রকার ওষুধ লাগছে, কোনো ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়নি। ওইসব ওষুধের মধ্যে একটির দাম ১৩০০ টাকা, যা প্রতিদিন ৫টি করে লাগে। জাদুটা কী বুঝলাম না, কেউ বুঝলে জানাবেন? এমনিভাবে চিকিৎসা নিতে আসা মিঠুন শিকদার নামে এক রোগী জানান, হাসপাতালের অনেক অনিয়ম এখন প্রকাশ্যে এসেছে, যা রোগীসহ অনেকেই অবগত। যার ফলে চুরি, সিন্ডিকেটসহ সকল অনিয়ম এখন বন্ধ করেছে, নতুন তত্ত্বাবধায়ক। আমি সেবার মান বৃদ্ধি হওয়ায় সন্তুষ্ট প্রকাশ করছি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালে মোট ডাক্তারের প্রয়োজন ৬৪ জনের। তার মধ্যে ২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ৩৯ জন ডাক্তার দ্বারা হাসপাতালটি পরিচালিত করা হচ্ছে। যার ফলে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়াটা ডাক্তারদের পক্ষে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তাসহ সিনিয়র স্টাফ, নার্স এবং অন্যান্য পদে পদসংখ্যা ৯১ জন। তার মধ্যে ৭১ জন কর্মরত, বাকি ২৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এছাড়া ৩য়, ৪র্থ শ্রেণি ও আউটসোর্সিংয়ে অনেক পদ শূন্য রয়েছে।
জানা যায়, ২০২১ সালে ঝিনাইদহ ১০০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালটি ২৫০ শয্যা হাসপাতালে উন্নীতকরণ করা হয়। তার পর থেকে সরকারের পর্যাপ্ত বাজেট থাকলেও নানা অনিয়ম, দুর্নীতির কারণে রোগীরা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট নতুন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান যোগদানের পর সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দেন। তারপর থেকে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তিনি ন্যায়ের পক্ষে লড়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে হাসপাতালটির আঙিনায় বসানো হয়েছে ফুলের টপ। সেপটিক ট্যাংক, টয়লেট পরিষ্কার করা, বিল্ডিংয়ের গ্লাস লাগানো, খুলে পড়া টাইলস বসানো, মেইনগেট লাগানো, খাবারের মান উন্নত, নষ্ট হওয়া সিসি ক্যামেরা মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের চিকিৎসা বহি তৈরি করা হয়েছে। সকলের চিকিৎসা বহির মাধ্যমে তারা প্রয়োজন হলে ওষুধ সংগ্রহ করবেন, যা তাতে লিপিবদ্ধ থাকবে। অন্যথায় স্বজনপ্রীতি করে ওষুধ সংগ্রহ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া মেডিসিন, সার্জারি এবং গাইনি বিভাগের প্রত্যেক ওয়ার্ড ইনচার্জকে প্রতি ছয় মাস পর এক্সচেঞ্জ করা হবে। যার ফলে সিস্টাররা সকল বিষয়ে প্রশিক্ষণ লাভ করবে।
হাসপাতালের মহিলা মেডিসিন ওয়ার্ডের সিনিয়র নার্স মিথিলা খাতুন জানান, তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান যোগদানের পর থেকে সঠিকভাবে সেবা দিতে পারছি। রোগীদের জীবন বাঁচানোর জন্য যে মেডিসিন ও ইনস্ট্রুমেন্ট আগে আসতো, তা রোগীদের সঠিকভাবে সাপ্লাই দিতে পারতাম না, এখন তা সম্ভব হয়েছে। সব থেকে দামি এন্টিবায়োটিক যেমন এক গ্রাম মেগাপাইম, এক গ্রাম মেরোপেনাম রোগী প্রতি তিনবার করে দিতে পারছি। রোগীর বেডসিট, বালিশের কাভার পর্যাপ্ত ছাপ্লাই দেওয়া হচ্ছে। সেবার কাজে যেকোনো সরঞ্জাম পর্যাপ্ত পরিমাণে পাচ্ছি। আমাদের পরিশ্রমি নার্সরা সেবা দেওয়ার পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। ক্ষমতাসীন নার্সদের চেঞ্জ করে দিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ে চাহিদা চেয়ে আমাদের নার্সদের শূন্যপদের স্থানে ইতোমধ্যে ৫ জনকে নিয়োগ দিয়েছেন, আরও ১০ জনের নিয়োগ প্রক্রিয়া ফাইনাল করা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। যার ফলে আমাদের সেবা দিতে অনেক সহজ হবে। জরুরি বিভাগের ওয়ার্ড বয় সাইফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে জরুরি বিভাগে ব্যবহৃত সুতা, ভায়োডিন, ক্রিম, টলি, নিডিল, নতুন হুইল চেয়ারসহ যাবতীয় ইকুইপমেন্ট নতুন তত্ত্বাবধায়ক যোগদানের পর পর্যাপ্ত পাচ্ছি। সেবা দিতে আমাদের কোনো কিছুর ঘাটতি নেই এখন।
ফার্মেসি বিভাগের ওয়ার্ড বয় সাকিব আহমেদ তন্ময় জানান, আগে সরকারি স্টাফরা সট স্লিপ ব্যবহার করে ওষুধ তুলতে পারতো। যার ফলে অনেক ওষুধ হিসাবের বাইরে চলে যেত, কিন্তু এখন হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী সকলকে নতুন তত্ত্ববধায়ক চিকিৎসা বহির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আগে অনেকে ক্ষমতার ব্যবহার করে বেশি করে ওষুধ নিয়েছে, এখন সেগুলো বন্ধ আছে। আমাদের কাছে ওষুধ এলে আমরা এখন রোগীদের নিয়মাফিক ওষুধ প্রদান করতে পারছি।
অপারেশন থিয়েটারের ওটি বয় মেহেদী হাসান জানান, ওটির পরিষ্কার-পরিছন্নতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোপূর্বে রোগীর অপারেশন করার আগে অতিরিক্ত ওষুধ লেখা হতো, যা ব্যবহারের পর ফেরত দেওয়া হতো না। কিন্তু এখন অপারেশন শেষে কোনো ওষুধ থেকে গেলে সেটি ফেরত দেওয়া হয়। অপারেশন সংক্রান্ত জীবাণুনাশক ওষুধ যেমন ভায়োডিন, হেক্সিসল, হাইড্রজেন পার আক্সাইড, ইউজলসহ বিভিন্ন সামগ্রী প্রয়োজন বাদে রোগীকে ফেরত দেওয়া হয়। বর্তমানে প্রত্যেকটা অপারেশন সিরিয়াল অনুযায়ী করা হয়।
এ ব্যাপারে ঝিনাইদহ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে হাসপাতালটি ছিল জর্জরিত। আমি যোগদানের পর থেকে সকলকে নিয়ম মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছি। আগে হাতে রিসিভ লিখে টাকার লেনদেন হতো, বর্তমানে কম্পিউটার অপ্টিমাইজ পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সকল ডা. কর্মকর্তা এবং স্টাফ সঠিক টাইমে আসবেন এবং তাদের ডিউটি শেষ করে হাসপাতাল ত্যাগ করবেন। এছাড়া হাসপাতাল সংক্রান্ত যেকোনো অপরাধের সাথে জড়িত হলে যেই অপরাধী হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি দালাল সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে সকল অনিয়ম রুখতে ঝিনাইদহবাসীসহ সকলের সহযোগিতা কামনা করেছেন।