আলোকে তিমিরে

বিচারের আগে নির্বাচন নয়


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৫:৪৪

॥ মাহবুবুল হক ॥
দেশ ও জাতির জীবনে অনেক বড় বড় সমস্যা থাকলেও সবকিছুকে নির্মমভাবে উপেক্ষা করে নির্বাচনের কথাই আমাদের এখন ভাবতে হচ্ছে। আমরা সহজ-সরল মানুষ। আমরা স্বাভাবিকভাবে ভেবেছিলাম, প্রয়োজনীয় জাতীয় সংস্কার সেরে আস্তে-ধীরে সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হবো। কিন্তু তা মনে হয় হতে যাচ্ছে না। মহান আল্লাহ ভালো জানেন।
আগামী ডিসেম্বরেই যদি নির্বাচন করতে হয়, তাহলে প্রথম যে কাজ দিয়ে শুরু করতে হবে, তা হলো জনগণের সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট নেয়া। একটা রেফারেন্ডাম বা ‘হ্যাঁ বা না’র ব্যবস্থা করা। কারণ দেশবাসীসহ বিশ্ববাসী জানে, আমাদের দেশের জনগণ এ মুহূর্তে কোনো অবস্থায় নির্বাচন চাচ্ছে না। তারা চাচ্ছে বিচার। যারা দেশ ও জাতি ধ্বংস করেছে, দেশের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছে, দেশের সম্পদ লুটপাট করেছে, তাদের আগে বিচার হোক। বিচারে কী শাস্তি হবে, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো, এসব নরপিশাচদের ন্যায্য বিচার হওয়া জরুরি। বিচার না হলে পাপ ও অপরাধের সিলসিলা অব্যাহত থাকবে। এতে করে দেশকে কোনোভাবে সাজানো যাবে না। দেশের অন্তত ৫০ শতাংশ পরিবার অত্যাচার, নির্যাতন, খুন, গুম, হতাহতের শিকার হয়েছে। বহু মানুষের বাড়িঘর, বহু এলাকার স্কুল-কলেজ-মাদরাসা, বহু মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থল এবং কল-কারখানা ধ্বংস করা হয়েছে। এরা এখন দারুণ কষ্টকর ও মানবেতর জীবনযাপন করছে। এদের শুধু বিচারের বাণী শোনালেই হবে না, পুনর্বাসনের জন্য সরাসরি সাহায্য-সহযোগিতা করতে হবে। সুতরাং নির্বাচনের কাজ শুরু করতে হলে বিচার বিভাগের কাজ ত্বরান্বিত করতে হবে। বিচারের কাজ ফেলে রেখে নির্বাচনের কাজে বাস্তবভাবে অগ্রসর হওয়া যাবে না।
রমাদান এসে গেছে। খাদ্যদ্রব্যসহ জিনিসের দাম অবশ্যই কমাতে হবে। জনগণ আশা করে আছে, ড. ইউনূস সাহেবের সরকার এ কাজটি করতে অবহেলা করবে না। অর্থ এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা বার বার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, এবারের রমাদানে সব ধরনের জিনিসের দাম কমবে। অর্থ উপদেষ্টাকে আরবান এলাকার জনগণ চেনেন জানেন আর বাণিজ্য উপদেষ্টাকে চেনেন দেশের আপামর জনসাধারণ। তার বাবার কারণে তাকে চেনেন, তার কারণে নয়। তার বাবা ছিলেন দেশের স্বনামধন্য দরদি শিল্পপতি মরহুম আকিজুদ্দীন। আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নেই। তার সন্তানরা আছেন। তারা মরহুম পিতার আদর্শ অনুসরণ করছেন। এসব উপলব্ধি করেই ড. ইউনূস সাহেব অন্তর্বর্তী সরকারে মরহুম আকিজুদ্দীনের এক সচেতন সন্তানকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইতোমধ্যে লক্ষ করা গেছে যে, তিনি আন্তরিকভাবে তার দায়িত্ব পালন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাণিজ্য খাতে স্বৈরাচারী সরকার যে সিন্ডিকেট রচনা করে গেছে, তা অনেকটা দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মতো। এই প্রাচীর ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করার সাধ্য ও সামর্থ্য কেউ প্রদর্শন করতে পারেনি। এর একটা মূল কারণ আছে, আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ, সরকার, মিডিয়ার সিনিয়র বিশেষজ্ঞরা জানেন, ব্যবসায়িক বা বাণিজ্যিক সিন্ডিকেটটি কোনো একক দলের নিয়ন্ত্রণে কখনো ছিল না। সবসময় বড় দুই দলের বা তিন দলের আওতায় ছিল। যাদের সাথে প্রতিবেশী দেশের বিজনেস ম্যাগনেটদের সব সময় যোগসাজশ ছিল। আমাদের ব্যাংকে টাকা না থাকলেও এ সিন্ডিকেটের ব্যবসায়িক পুঁজির অভাব কখনো হয়নি। এখনো হয় না।
সুতরাং বর্তমান বাণিজ্য উপদেষ্টা এ শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে পরাভূত করতে পারবেন বলে মনে হয় না। সিন্ডিকেট চালাকি করে সাময়িক কিছু ছাড় দিতে পারে, কিন্তু সেটা জনগণকে খুব স্বস্তি দেবে বলে মনে হয় না। সুতরাং খাদ্যদ্রব্যসহ জিনিসপত্রের দাম নিয়ে নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে।
এখন আসুন একটু দেখে নিই, কোন অবস্থায় এখন আমরা আছি। রমাদান তো প্রায় শুরু হয়ে গেল। রমাদানে রাজনৈতিক কার্যকলাপ বাস্তব কারণে কিছুটা স্থবির হয়ে যায়। সরকারি কাজকর্মেও ঢিলেমি পড়ে যায়। এ সময় হয়তো সরকারের কাজকর্ম সংস্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রমাদান চলে গেলে স্বৈরাচারী সরকারের দোসর ও প্রতিবেশী দেশের যোগসাজশে পুরনো ‘মব’সহ নতুন নতুন ‘মব’ শুরু হবে। বিরোধীদের লক্ষ্য থাকবে সরকার যেন সবসময় অস্থির থাকে, পেরেশান থাকে। গত ছয় মাসে এসবই তো আমরা দারুণভাবে প্রত্যক্ষ করলাম।
নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পূর্বে তো নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু হবে না। যদি আমরা ধরে নিই, তফসিল ঘোষণা করতে করতে মে-জুন হয়ে যায়, তাহলে একদিকে যেমন কুরবানি ঈদ সামনে এসে যাবে; অপরদিকে সাথে সাথে বর্ষাকালও এসে যাবে। বর্ষাকালে প্রতিবেশী দেশ কী ভূমিকা পালন করবে, সেটা তো আমরা আন্দাজ করতেই পারি। যেভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি গত জুলাই-আগস্টে। দেশবাসী যখন বিপ্লব বা অভ্যুত্থানে ব্যস্ত, তখন প্রতিবেশী দেশ অন্তত চারবার উত্তর দিক থেকে বন্যায় প্লাবিত করে ছাড়ে দেশের একটা বিরাট অংশ। অপরদিকে প্রতিবেশী দেশ যে কাজটি অতীতে তেমনভাবে করেনি, সে কাজটাও তারা করে ফেলে। যেমন পূর্বদিক থেকে দুবার তারা পানি ছেড়ে দিয়ে মহাপ্লাবনের সৃষ্টি করে। সেই প্লাবনে যেসব জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা এখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেনি। আমাদের সরকার তখন কী করবে? বন্যার পানি তো আমরা উজানে ফেরত দিতে পারব না। সুতরাং স্পষ্টভাবে ধরেই নেয়া যায় যে, আগামী বর্ষায় সরকারসহ দেশবাসী মহাবিপদে পড়ে যাবে। সরকার বা দেশবাসী কিছুটা বাঁচতে পারবে, যদি এখন থেকে সবাই বন্যার তাণ্ডব থেকে বাঁচার জন্য সুষ্ঠু বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এ কারণে আমরা বার বার সরকারকে বলে আসছি মজা-খাল, বিল, হাওর, নদী-নালা এসব পুনর্খনন ও ড্রেজিংয়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। সেই বিকল্প ব্যবস্থাপনার সুবর্ণ সময় কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মিডিয়ায় পুনর্খননের সামান্য ছবি দেখা গেল। পরবর্তীতে সেসব ছবি দৃশ্যমান থেকে হারিয়ে গেল। শীত ও বসন্তে সবসময় এ কাজটি সুন্দরভাবে করা যায়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের এ স্থায়ী কাজটা সেভাবে হয়ে ওঠে না।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের কাজটা শুরু হতে হতে জুলাই মাস লেগে যাবে। যদি আমরা ধরেই নিই, জুলাইয়ে আমরা নির্বাচনের কাজ ভালোভাবে শুরু করতে পারব, তাহলে আমাদের হাতে সময় থাকে মাত্র পাঁচ মাস। আমরা বিভিন্ন সোর্স থেকে জানতে পেরেছি, ৬ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে।
যেমন ১. শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী দুর্বৃত্ত ও তাদের দোসরদের বিচার দ্রুত করতে হবে। গণহত্যার সাথে জড়িতদের বিচার করতে হবে।
২. নিত্যনতুন দাবি-দাওয়াগুলো সামলানো। এর মধ্যে কিছু আছে ন্যায্য, অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। না করলেই নয়। কিছু আছে অযথা ও অবান্তর। তারপরও তো বিষয়গুলো এড্রেস করতে হবে।
৩. গত ছয় মাসে আইনকানুন ও নৈতিকতা উপেক্ষা করে যে সমস্ত স্থায়ী ও অস্থায়ী সম্পত্তি দখল করা হয়েছে, সেগুলো থেকে দখলদারদের উচ্ছেদ করা।
৪. সরকারি আমলা ও কর্মচারীগণ যে দোদুল্যমান অবস্থায় এখনো বিরাজমান রয়েছেন, তাদের সে অবস্থা থেকে সরে এসে সরকারের সাথে সঙ্গতি স্থাপন করা। গত পনেরো বছর যাবত একটি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী সরকার নিজেরা যেমন ফ্যাসিস্টে রূপান্তরিত হয়েছে, তেমনি তারা দেশময় ফ্যাসিস্ট সরকারি বাহিনী তৈরি করেছে। এ সক্রিয় ও সতেজ ফ্যাসিস্ট বাহিনীকে হঠাৎ করে উৎখাত করা, উচ্ছেদ করা বা নির্মূল করা কখনো সম্ভব নয়। এদের মধ্যে নানা মনোভাব, নানা আদর্শ ও নানা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যক্তি রয়েছেন। যারা রাষ্ট্রবিরোধী, মানবাধিকারবিরোধী বা নৈতিকতাবিরোধী পাপ ও অপরাধে সংশ্লিষ্ট ছিলেন, তারা ছাড়া অন্যদের মধ্যে মোটিভেশনের প্রক্রিয়া শুরু করা অত্যন্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সব ধরনের অপরাধীকে চিহ্নিত করে তাদের জন্য কী ধরনের ন্যায্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, সেটা সরকারকেই ভাবতে হবে। এর বাইরে যারা দলীয়ভাবে পরিচিত তাদের বিনা কারণে হেয়, অসম্মান-অপদস্থ, ছোট বা খাটো করা কোনো অবস্থাতেই সঠিক নয়। অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার এ বিষয়ে যথেষ্ট ধৈর্য, সহনশীল, সহমর্মিতা প্রদর্শন করেছে বলে দেশবাসী অবগত আছেন। তারপরও অনিবার্য বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। এদিকে এ দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা র‌্যাব, পুলিশ, আনসার বাহিনীতে নানারকম পেরেশানি বিরাজমান রয়েছে। রেজাল্ট ওরিয়েন্টেড কাজকর্ম হচ্ছে না। অথচ সরকার গলা পর্যন্ত সমস্যায় ডুবে আছে। তাদের নিশ্বাস নেয়ার সময় পর্যন্ত নেই।
পুরনো সমস্যার সাথে সাথে নতুন নতুন সমস্যা যুক্ত হচ্ছে। সময়ের কারণে দেখভাল করা যাচ্ছে না। হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘিত হচ্ছে। সুতরাং যাদের বিরুদ্ধে মারাত্মক কোনো অভিযোগ নেই, তাদের অঙ্গীকারের বিনিময়ে সাধারণ ক্ষমা করা যায় কিনা, বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিতে বিবেচনা করার সময় এসে গেছে। একটা সংহতির মধ্যে ফিরে না আসতে পারলে সরকারি ঘোড়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে। উদ্দমতাহীন ঘোড়া গাধার নামান্তর। হয়তো বোঝা বইতে পারবে, কিন্তু সময়মতো পৌঁছাতে পারবে না। সামনে নির্বাচন। সুতরাং ঘোড়াকে আরবীয় ঘোড়া হতে হবে। ড. ইউনূসের নিরপেক্ষ সরকার এ প্রয়োজনীয় মহৎ কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
৫. অন্তর্বর্তী সরকার ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। কমিশনগুলো সময়মতো তাদের রিপোর্টও পেশ করেছে। কিন্তু সেসব নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা, বৈঠক, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম বা ডায়ালগ কোনো কিছু সম্পন্ন হতে দেখা যাচ্ছে না। কেউ কেউ বলছেন, এসব বাক্সবন্দি হয়ে থাকবে। নতুন সরকারকে এ রিপোর্টগুলো বর্তমান সরকার উপহার বা উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করবে। এ নিয়ে জাতির মনে নানা ধরনের দ্বিধা ও সংশয় রয়েছে। সবার ধারণা ছিল অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত চার/পাঁচ বছর সময় পাবে। এ সময়ের মধ্যে এ সরকার কিছু না কিছু পরিবর্তন সূচনা করবে, যা দেশ ও জাতির জন্য নিরপেক্ষ আবহসহ সমাজের কল্যাণ ও মঙ্গল ডেকে আনবে। কিন্তু সেই সুযোগ কেন তাদের দেয়া হলো না। কে বা কারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এ কল্যাণ ও মঙ্গলকে নস্যাৎ করে দিল, গভীরভাবে তা ভাবাও হলো না। হঠাৎ করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের ঘণ্টা যেন বেজে উঠল। এটা এক অবিশ্বাস্য ও অচিন্তনীয় আয়োজন। চিরটাকাল আমরা এক পা বাড়াই সাথে সাথে আবার তিন পা পেছাই। ঐতিহাসিকভাবে সত্য ছিল যে, মোটামুটিভাবে সংস্কার শেষ করে নির্বাচন করা। আজ না হোক কাল, কাল না হোক পরশু এ কথাই বিশেষভাবে প্রমাণ হবে।
৬. নির্বাচনের জন্য ন্যাশনাল আইডি কার্ডই যথোপযুক্ত ছিল। যেসব ভোটারের ন্যাশনাল আইডি কার্ড নেই, তাদের সেই কার্ড তৈরি করে যথাযথভাবে প্রদান করার ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে। বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখা ঠিক হবে না।
৭. প্রবাসে আমাদের প্রায় দেড় কোটি ভোটার রয়েছে, যা দেশের মোট ভোটারের ১৩ শতাংশ, তাদের ভোট কীভাবে কাস্ট হবে। এখনো তা জনগণের সামনে আসেনি। অথচ এ ভোট যথাযথভাবে কাস্ট না হলে আমাদের নির্বাচনের ফলাফল কোনোভাবেই সঠিক হবে না।
৮. একটি রাজনৈতিক দল ছাড়া সকল রাজনৈতিক দল ও জনগণ জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু এ দাবিকে এখনো উপেক্ষা করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছে শুরুতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এ প্রক্রিয়া যে জাতির জন্য বুমেরাং হবে, তা সরকার ও নির্বাচন কমিশন কোনোভাবেই উপলব্ধি করতে পারছে না। আমরা সবাই জানি, গত ১৬ বছর এদেশে নির্বাচন হয়নি। সেক্ষেত্রে একটা ট্রায়াল ইলেকশন হওয়া খুব প্রয়োজন। নির্বাচনের অবস্থা ও ব্যবস্থা কেমন আছে, সেটা জানার জন্য হলেও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন পূর্বাহ্নে সম্পন্ন হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। এ সিদ্ধান্ত যদি নবতরভাবে পুনর্বিবেচনা না করা হয়, তাহলে এটা হবে একদিকে যেমন অবাস্তব; অপরদিকে জনমতবিরোধী তথা গণবিরোধী। কারণ সার্ভেতে দেখা গেছে, শতকরা ৬৫ জন নাগরিক জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে স্থানীয় নির্বাচন করার পক্ষে দৃঢ় মতামত প্রকাশ করেছে। এ সিদ্ধান্ত পাল্টাতে হবে। নয়তো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। যদি শুরুতেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে সেক্যুলার গোষ্ঠী লাভবান হবে। অন্য কোনো গোষ্ঠী বা দল লাভবান হবে না। এতে আগস্ট বিপ্লব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। প্রথমেই জাতীয় নির্বাচন হলে জাতি পুনরায় নৈতিকতা হারাবে। দুর্নীতিকে পরাভূত করা যাবে না। সুনীতিকে কায়েম করার পথে অগ্রসর হওয়া যাবে না। স্থানীয় সরকারের অধীনে ইতোমধ্যেই যে অন্যায় ও অনৈতিকভাবে সম্পদের মালিকানায় ওলট-পালট হয়ে গেছে, তা আর কোনো বিচার-বিবেচনায় আসবে না। একই প্রভাব-বলয়ের মধ্যে সবকিছু ‘জিম্মি’ হয়ে যাবে। আবারও বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে। শুরুতেই জাতীয় নির্বাচন করতে গেলে যেসব বাধা-বিপত্তি আসবে, তাকে পরাভূত করে সরকার বা নির্বাচন কমিশন উত্তরণ ঘটাতে পারবে বলে মনে হয় না। কারণ যে দলগুলো নির্বাচনের জন্য সর্বান্তকরণে অংশগ্রহণ করবে, তারা নিজেরাই একাধিক প্রার্থী পুশ করবে। ইচ্ছায় হোক এবং অনিচ্ছায়। একেক সিটে চার-পাঁচজন করে প্রার্থীও হতে পারে (২০১৮ নির্বাচন)। তারা নিজেরা মারামারি, কাটাকাটি, যুদ্ধ-জিহাদ করবে। সেসব থামাবে কে? জনগণের সরকার হলেও অন্তর্বর্তী সরকার অতটা শক্তিশালী নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নড়বড়ে। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত নয়। বিভিন্ন দলের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি বিরাজমান থাকছেই। এ অবস্থায় সেনাবাহিনী কী শান্তিপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি করতে কি অগ্রসর হবে? অতীতে হয়নি। এখনো হবে বলে মনে হয় না। সুতরাং পূর্বের মতোই গডফাদার, কিশোর গ্যাং ও মাস্তান পরিবেষ্টিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা বেশি বলে মনে হচ্ছে।
ড. ইউনূস সরকার অন্য কারো না হোক জাতিসংঘের যে সাপোর্ট অর্জন করেছে, তা বর্তমানকালের জন্য তুলনাহীন। কিন্তু এ মহাসাফল্যকে এখনো সেভাবে অভিনন্দন জানানো হয়নি। আমাদের বুদ্ধিজীবী তথা সুশীল সমাজ চুপচাপ। তারা গোপনে লেজ নাড়ছেন আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেনÑ কখন কী হয় বলা যায় না। সুযোগের সদ্ব্যবহার বলে কথা। আনুষঙ্গিক নানা প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূস সরকার যদি নির্বাচনে সবাইকে সম্পৃক্ত করতে পারে আশা করি, আল্লাহর রহমতে তা তিনি পারবেন। তাহলে হতভাগ্য দেশের জন্য নবতর পাটাতন সৃষ্টি হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।