চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি বদলেছে চাঁদাবাজ


২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৪:১১

স্টাফ রিপোর্টার : পতিত আওয়ামী লীগ সরকার হটানোর পর মোটামুটি সপ্তাহখানেক সড়কে পরিবহনগুলোয় চাঁদাবাজি ছিল না। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরেছে। শুধু পরিবহনেই নয়, রাজধানীর ফুটপাতের দোকানগুলোয় নিয়মিত যে চাঁদাবাজি হতো, সেগুলোও চালু হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আগে যেসব চাঁদাবাজরা হাজির হতো, এখনো হচ্ছে। সারা দেশে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় চাঁদাবাজির অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। চাঁদা না পেয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার কথাও শোনা যাচ্ছে। এছাড়া কয়েকটি চক্র মেতেছে মামলা-বাণিজ্যে। আর তাদের লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কর্ণধাররা। মামলায় আসামি না করার জন্য কৌশলে ব্যবসায়ীদের কাছে দাবি করা হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। দাবি করা টাকা না দিলেই দেওয়া হচ্ছে একের পর এক মামলা। এসব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সচেষ্ট থাকলেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে অসাধু চক্রগুলো।
সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভাইরাল ওই ভিডিওতে দেখা যায়, লালপুর উপজেলার দক্ষিণ লালপুর কলোনিপাড়া গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য জাহাঙ্গীরের বাড়িতে যুবদল নেতা খোকন ও তাঁর দুই ছেলে চাঁদার টাকা গুনছেন। আর ওই ইউপি সদস্য ও তার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা চেয়ে আর্তনাদ করছে। এটি নজরে এলে চাঁদাবাজির অভিযোগে সেনাবাহিনী লালপুর কলোনিপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে ওয়ার্ড যুবদলের নেতা খোকন ও তার দুই ছেলেকে আটক করে লালপুর থানায় হস্তান্তর করে। আটক ব্যক্তিদের ১৫১ ধারায় অপরাধ নিবারণকল্পে অপরাধ প্রতিরোধ আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠায় পুলিশ। অবশ্য গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নাটোর কারাগার থেকে তারা মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিরা হলেন- লালপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও লালপুর কলোনিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা খোকন খাঁ (৫০), তার দুই ছেলে ছাত্রদল কর্মী ফিরোজ (৩০) ও অনিক (২৪)। এসব চাঁদাবাজদের মুক্তিতে এলাকায় ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর মিরপুরে চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া জামাল হোসেন রানা (৩০) নামে এক যুবদল নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক (দাপ্তরিক দায়িত্বপ্রাপ্ত) মো. তানভীর আহম্মেদ খান ইকরাম স্বাক্ষরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার সুনিদিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় ঢাকা মহানগর উত্তরের পল্লবী থানার ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জামাল হোসেন রানাকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করেছেন যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দীন জুয়েল ও সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজ। এর আগে ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মিরপুর ৬ নম্বর কাঁচাবাজারে চাঁদাবাজি করার সময় জামাল হোসেন রানাকে আটক করে সেনাবাহিনীকে খবর দেয় জনতা। চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে জামালসহ পাঁচজনের নামে মামলা করেন মো. নকিব হাছান (৩৭) নামে এক ব্যক্তি। মামলায় অন্য আসামিরা হলেন- শেখ সোহাগ (৩৫), শেখ ইব্রাহীম ইসলাম ইবু (৩৪), মো. সাগর দেওয়ান (৩৩) ও শাওন হাওলাদার (৩২)। এছাড়া ১২ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। তারা সকলে পল্লবী থানার ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে সোহাগ শেখ ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব, অন্যরা সকলে যুগ্ম আহ্বায়ক। এদিকে রানাকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দীন জুয়েল। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যাদের নামে মামলা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে আমরা সাংগঠনিকভাবে তদন্ত কাজ শুরু করেছি।’
খবর নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর তিনটি বাস টার্মিনালে নানাভাবে চাঁদাবাজি হচ্ছে। সায়েদাবাদ মহাখালী ও গাবতলী টার্মিনালে নানাভাবে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে তিনটি বাস টার্মিনালে অভিযানও চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানে অভিযোগগুলোর সত্যতা পাওয়া গেছে। সম্প্রতি রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে অভিযান পরিচালনা করে দুদকের সহকারী পরিচালক আল-আমিন ও সুভাষ চন্দ্র মজুমদারের নেতৃত্বে একটি দল। অভিযানের বিষয়ে দুদক কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, ছদ্মবেশে সায়েদাবাদ বিভিন্ন কাউন্টারে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়েছে। এ সময় প্রতিটি বাস ছাড়ার সময়ে গাড়ি প্রতি ২০০-৩০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ওই চাঁদা উত্তোলন করা হয় মালিক সমিতির স্লিপের মাধ্যমে। চোখ ফাঁকি দিতে রসিদে টাকার পরিমাণ লেখা হয় না, তবে নাম ও বাস নম্বর লিখে রসিদ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিক মহাখালী ও গাবতলী বাস টার্মিনালে দুদকের সহকারী পরিচালক মাহমুদ ও খোরশেদের নেতৃত্বে দুটি টিম অভিযান পরিচালনা করে। দুদক জানায়, অভিযানে দুদকের তিনটি টিম টিকিট কাউন্টার অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ পেয়েছে যাত্রীদের কাছ থেকে। টিকিটের গায়ে নির্ধারিত দামের বেশি টাকা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায়ের প্রমাণ মিলেছে। এসব বিষয় যাচাই করতে মালিক সমিতির অফিসে দুদক টিম গেলে সেখানে তালা দেওয়া পাওয়া যায় কিংবা সমিতির কোনো কর্মকর্তা বা নেতাকে অফিসে পাওয়া যায়নি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি, চাঁদাবাজ পরিবর্তন হয়েছে।