সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কিশোরগঞ্জ জেলায় পানের চাষাবাদ ব্যাহত


৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:১৫

আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ: কিশোরগঞ্জ জেলায় পানের চাষাবাদ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিলুপ্ত হতে চলেছে কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া, বাজিতপুর, হোসেনপুরসহ জেলার অন্যান্য উজান এলাকায় বিভিন্ন ধরনের পানের আবাদ। স্থানীয় পান চাষিদের ভাষ্যমতে, আবহাওয়ার তারতম্যের পাশাপাশি খরচের দিক বিবেচনা করে বর্তমানে এসব এলাকায় পানের চাষাবাদ করে লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। সরকারিভাবেও দেয়া হয় না কোনো ধরনের প্রণোদনা। যে কারণে জেলার এসব এলাকায় বিলুপ্ত হতে চলেছে পানের আবাদ। জেলা কৃষি অফিস সূত্রও এমন তথ্য নিশ্চিত করেছে। জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর ও নগরের পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যে সকল জাতের পান পাওয়া যায় তাদের অধিকাংশই রাজশাহী, মহেশখালী, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ অঞ্চলের বলে জানা গেছে। এসব অঞ্চলের পান বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে পান চাষিরা বলে জানা গেছে। নিকলী উপজেলা সদরের পান ব্যবসায়ী দিলীপ পাল জানান, তিনিসহ কয়েকজন মিলে সপ্তাহের ৪ দিন ঝিনাইদহ থেকে রোদার পুড্ডা বাজারে ৬-৭ লাখের অধিক টাকার পান সারা উপজেলায় আমদানি করে থাকেন। এতে তারা মাত্র শতকরা ১০ ভাগ কমিশন পান বলে জানান। তবে এলাকায় পানের বরজ থাকাকালীন তাদের লাভ বেশি হতো বলে উল্লেখ করেন। মাঝারি সাইজের কুড়ি বিড়া পান ১ হাজার টাকা বিক্রি করেন বলে জানান। তবে সাইজ অনুযায়ী পানের মূল্য কম-বেশি হয়ে থাকে বলেও উল্লেখ করেন। নিকলীর আঠার বাড়িয়ার গুপিরায় বাজারের খুচরা পান বিক্রেতা বাচ্চু মিয়া বলেন, সারা বছর পান বিক্রি করলেও তুলনামূলক শীতকালে বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। তবে এলাকার পানের চাষ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পাইকারের কাছে থেকে চালানি পান কিনার কারণে লাভের পরিমাণটা অনেক কমে গেছে। বাজিতপুর উপজেলার কামালপুরে পান বরজ মালিক স্বদেশ চন্দ্র ভদ্রের সাথে সরেজমিন কথা হলে অভিযোগের সুরে তিনি বলেন, পান চাষে এখন আর পোষায় না। তুলনামূলক বেশ উঁচু জমি লাগে, উর্বর মাটি ভরাট করতে হয়। এতে খাটুনি অনেক বেশি। কঞ্চি ও বাঁশের দামসহ শ্রমিকদের মজুরি দিয়ে এখন আর পোষায় না। আগে বেশ কয়েকটি পান বরজ ছিল, এখন শুধু একটা আছে বলে উল্লেখ করেন। আবহাওয়াজনিত সমস্যা এখন পান চাষে বাধা বলে জানান। অতিরিক্ত গরমেও পানে পচন ধরে আর অতিরিক্ত শীতেও পানের ক্ষতি হয়।
বৈজ্ঞানিকভাবে পানের উপকারিতা এবং অপকারিতা দুটোই রয়েছে। সাধারণত বাংলাদেশে সাঁচি মিঠা পান, লাল ডিঙ্গি পান, গোলাব পান, জর্দা পান, কহিনুর পান, বেনারসি পানসহ বেশ কয়েক জাতের পান রয়েছে। আবহাওয়া ও জাতভেদে পানের আকার ও বর্ণের পরিবর্তন হয়ে থাকে। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তনের ফলে ফলনেও তারতম্য দেখা দেয় বলে জানা যায়। গবেষকদের তথ্যমতে, পান পাতায় রয়েছে অ্যান্টি-হাইপারগ্লাইসেমিক যৌগ, যা মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। আয়ুর্বেদ তথ্যমতে, পানের ভেষজের বহুগুণ রয়েছে। শুধু খাবার হজমে নয়, পান পাতা ডায়াবিটিসজনিত, বাতের ব্যথাসহ অনেক ধরনের ব্যথাও নিয়ন্ত্রণ করে বলে উল্লেখ রয়েছে। পান পাতায় রয়েছে এক ধরনের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল যৌগ, যা মুখের দুর্গন্ধও দূর করে। পান পাতায় রয়েছে গ্যাস্ট্রো প্রটেকটিভ, অ্যান্টি-ফ্লটুলেন্ট এবং কার্মিনেটিভ এজেন্ট, যার কারণে পান চাবানোর সময় মুখে স্যালাইভা তৈরি হয়, যা খাবার হজম করতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামান্য পরিমাণ পানের পাতা প্রতিদিন চিবোতে পারলে দাঁত এবং মাড়ির স্বাস্থ্য ভালো থাকে। পান পাতার অ্যান্টিসেপটিক গুণ দাঁতে ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমণ রোধ করে। শুধু তাই নয়, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা দূর করতেও পান পাতা ছেঁচে সেই রস খেলেও উপকারের কথা কথিত রয়েছে। পানের উপকারিতার পাশাপাশি ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। মূলত তামাকজাত দ্রব্যের মিশ্রণে পান চিবানোতে মাড়ির ক্ষতি, দাঁতের ক্ষয়জনিত ক্ষতি হয়। মুখে এক ধরনের ক্যান্সার ও দুর্গন্ধ হয়। ক্যান্সার সম্পর্কিত গবেষণা সংস্থা (আইএআরসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংগঠন (ডব্লিউএইচও) বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে, পান কুইড ও সুপারি বাদাম চিবানো মূলত ক্যান্সারজনক উপাদানের অন্যতম। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, আরকা বাদামের সাথে তামাকসহ পানে ৯.৯ এবং ৮.৪ গুণ মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। তাইওয়ানে একটি গবেষণায়, বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন সুপারি কুইড (পান) চিবানোর কারণে মুখের ক্যান্সার ছাড়িয়ে পরার ঝুঁকির সম্ভাবনা থাকে তামাকের অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও। মুখের ক্যান্সার ছাড়াও খাদ্যনালি, যকৃত, অগ্ন্যাশয়, স্বরযন্ত্র, ফুসফুস এবং সমস্ত শরীরে পান পানসেবীদের মধ্যে ক্যান্সার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা বেশিরভাগ সুপারি চিবায় এবং ধূমপান সিনারজিস্টিক্যালি মিথস্ক্রিয়া করে তাদের অর্ধেকেই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পরে। পান পাতা চিবানো মানুষের আয়ুকাল কমে বলেও বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন। একটি ল্যানসেট অনকোলজি প্রকাশনায় দাবি করা হয়েছে যে, পান মসলার ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে টিউমার হতে পারে। এটি কেবল মুখ গহ্বরের সীমাবদ্ধ থাকে না পর্যায়ক্রমে পুরো শরীরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। গর্ভাবস্থায় পান চিবানো সম্পর্কে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিশেষকরে তাইওয়ান, মালয়েশিয়া এবং পাপুয়া নিউগিনির একদল বৈজ্ঞানিক জানিয়েছেন যে, গর্ভাবস্থায় যে মহিলারা পান চিবায়, তাদের গর্ভকালীন শিশুর ওপরেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। এ প্রভাবগুলো গর্ভাবস্থায় অ্যালকোহল বা তামাক সেবনকারী মহিলাদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ বলে জানা গেছে। এতে করে ওজন কম এবং বামন আকৃতির শিশুর জন্ম দেয় বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।