সুন্দরবনে বাড়ছে ভ্রমণপিয়াসীদের ঝোঁক


৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১৯:১০

এস এ মুকুল, খুলনা : বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে বাড়ছে ভ্রমণপিয়াসীদের ঝোঁক। সেখানে প্রতি বছর ছুটছেন দেশি-বিদেশি লাখ লাখ পর্যটক। মানুষের এ আগ্রহ সামনে রেখে এগিয়ে এসেছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। গেল ছয় বছরেই সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটক টানতে যুক্ত হয়েছে ২৯টি বিলাসবহুল নৌযান। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এসব নৌযানের কোনো কোনোটিতে সুইমিংপুলসহ তিন তারকা মানের সেবা দেওয়া হয়। এর পেছনে লগ্নি হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
তবে সুন্দরবনে পর্যটকের পদচারণায় বনের জীববৈচিত্র্যের ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। বিপন্ন হচ্ছে প্রাণ-প্রকৃতি। অতিরিক্ত নৌযান ও পর্যটকের চাপ বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যাতে ক্ষতি না করে, এজন্য ২০১৪ সালে সুন্দরবন ভ্রমণ নীতিমালা তৈরি করা হয়। এতে বনের অভয়ারণ্যের ওপর চাপ কমিয়ে প্রান্তসীমায় নতুন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার পাশাপাশি জোর দেওয়া হয় প্রকৃতিবান্ধব পর্যটনে। তবে নীতিমালা উপেক্ষা করে এখন দৈনিক গড়ে ৩০টি নৌযান অভয়ারণ্যে দিনভর অবস্থান করে। ইকো-ট্যুরিজমের কথা বলা হলেও বন ভ্রমণের নামে পিকনিক পার্টি বসে নৌযানে।
বাংলাদেশ অংশে সুন্দরবনে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের পুরোটাই সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এর ৫৩ শতাংশ এলাকাকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে সম্পদ আহরণ ও বনজীবীর প্রবেশ নিষিদ্ধ। সুন্দরবনের ভেতরে বন বিভাগের ১১টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অভয়ারণ্য এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে চারটি। গত ২৫ বছরে সুন্দরবনে পর্যটক প্রবেশের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় পর্যটক দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪ গুণ। ২০০১-০২ অর্থবছরে বন ভ্রমণ করেছিলেন ৫৯ হাজার ১৬৯ পর্যটক। ২০০৯-১০ অর্থবছরে তা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৩ জন এবং পরের বছর বন ভ্রমণে যান ২ লাখ ১১ হাজার ৫৭ জন। গত আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঁচ মাসে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৯৯ জন পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণে গেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, পর্যটকের সুন্দরবনযাত্রা এবার অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে।
এদিকে ভরপুর পর্যটন ব্যবসার আড়ালে চাপা পড়ছে পর্যটকের নিরাপত্তার বিষয়। সুন্দরবন উপকূলে চলাচল-নিষিদ্ধ নৌযানে মেটানো হচ্ছে পর্যটকের ভ্রমণ-তৃষ্ণা। ট্রলার, জালি বোটে বনের গহিনে চলে যাচ্ছেন পর্যটক। আবার বনের ভেতর কোনো পর্যটক হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হলে সে ব্যক্তিকে উদ্ধারের কোনো পথ নেই। সুন্দরবন ভ্রমণের উপায় দুটি। এক দিনের মধ্যে প্রান্তসীমায় থাকা পর্যটনকেন্দ্র ঘুরে দেখা। অন্যটি বনের গহিনে ঘুরে বেড়াতে পর্যটকবাহী নৌযানে তিন দিনের সফর। এক দিনের জন্য সাধারণত ছোট ট্রলার ও জালি বোট ব্যবহার করা হয়।
সুন্দরবনে পর্যটনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সালমা বেগম। তিনি বনের প্রান্তসীমায় থাকা পর্যটনকেন্দ্রে দৈনিক ৪ হাজার ২১৬ জন পর্যটক থাকলে পরিবেশের ক্ষতি হবে না বলে সুপারিশ দিয়েছিলেন। তবে তা আমলে নেওয়া হয়নি।
তার গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, যে ট্রলার বা জাহাজে সুন্দরবনে মানুষ ভ্রমণ করে, সেগুলোর শব্দে বন্যপ্রাণী প্রজননে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। এতে সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া ওই শব্দের কারণে যেসব প্রাণী (বাদুড়, ডলফিন) শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে চলাফেরা করে, তাদের চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। এতে তারা ওই এলাকা থেকে চলে যেতে পারে।
অধ্যাপক ড. সালমা বেগম বলেন, সুন্দরবনে একটি জটিল ও সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র বিদ্যমান। পরিবেশের কোনো উপাদানের সামান্যতম তারতম্য হলে ওই প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব পড়ে। বর্তমানে সুন্দরবনে যে পর্যটন ব্যবস্থা চলছে, তা কোনোভাবেই পরিবেশসম্মত নয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বনে মোট পর্যটকের প্রায় ৮০ শতাংশ এক দিনের জন্য করমজল, হারবারিয়া, কলাগাছিয়াসহ জনপদের কাছের পর্যটনকেন্দ্রে যান। নতুন পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের পর করমজলসহ অন্য কেন্দ্রের ওপর চাপ কমেছে। তবে অভয়ারণ্যের মধ্যে থাকা কটকা, কচিখালী, নীলকমলে (হিরণ পয়েন্ট) আগের চেয়ে চাপ বেড়েছে।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে পর্যটন ব্যবসায়ীরা জানান, নৌযানে যারা বনের ভেতর যান, তাদের প্রথম পছন্দ থাকে কটকা বা জামতলা বিচ; দ্বিতীয় পছন্দ নীলকমল অভয়ারণ্য। পর্যটক ধরে রাখতে ট্যুর অপারেটররা এসব স্থানে যাবেনই। পাঁচ বছর আগে ৩৫ থেকে ৪০টি নৌযানে পর্যটক অভয়ারণ্য এলাকায় যেতেন। এখন ৬৮টি লঞ্চের প্রতিটি সপ্তাহের দু’দিন ওই এলাকায় যায়।
ট্যুর গাইডরা জানান, কটকা, কচিখালী ও নীলকমলে একসময় প্রচুর হরিণ দেখা যেত। সেখানে মিলত বাঘের উপস্থিতিও। অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে বনের ওইসব এলাকায় আগের মতো দেখা যায় না হরিণ।
বনের প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটন নিয়ে কাজ করা খুবির ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, ইচ্ছা হলেই অভয়ারণ্যে যাওয়ার সুযোগ বন্ধ করা দরকার। নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারলে পর্যটকের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবে বেশিরভাগ সময় এটি নিয়ন্ত্রণে থাকে না।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, সুন্দরবনে ২০ বছর মেয়াদি পর্যটন মহাপরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে। এর ফলে পর্যটকবাহী বিশেষায়িত নৌযান ছাড়া বনের মধ্যে অন্যরা প্রবেশ করতে পারবে না। পর্যটকের সংখ্যাও নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। তখন অভয়ারণ্যের ওপর চাপ আরও কমবে।
সুন্দরবনে ভ্রমণের একমাত্র বাহন নৌযান। চলতি মৌসুমে ১৩৩টি নৌযান নিয়েছে সুন্দরবনে পর্যটক পরিবহনের অনুমতি। এর মধ্যে ৬৮টি লঞ্চ, ৬২টি ট্রলার ও দুটি স্পিডবোট। প্রতিটি লঞ্চের সঙ্গে একটি ট্রলার থাকে। তাদেরও নিবন্ধন নিতে হয়। অনুমোদন নেওয়া ৬২টি ট্রলার লঞ্চের সঙ্গেই বাঁধা থাকে।
ব্যবসায়ীরা জানান, সুন্দরবনে চলা নৌযানগুলো প্রথমে নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে সার্ভে সনদ নেয়। এরপর বনে ঢোকার অনুমতি দেয় বন বিভাগ। বিভিন্ন নদীতে চলাচলের জন্য বিআইডব্লিউটিএ এবং পশুর চ্যানেলের জন্য মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। বনে প্রবেশের অনুমতি নিলেও বেশিরভাগ নৌযান চলাচলের অনুমতি নেয় না।
কারণ খুঁজতে গিয়ে জানা গেছে, সুন্দরবনে পশুর, শিবসাসহ বড় নদীতে ছোট নৌযান চলাচলের অনুমতি নেই। তারা বিআইডব্লিউটিএর অনুমতি ছাড়াই নৌপথে চলাচল করে। এছাড়া শীতকালে সাগর শান্ত থাকায় অনুমতি ছাড়াই পশুর চ্যানেলসহ বিভিন্ন পথে পর্যটক বহন করে অসংখ্য ট্রলার ও জালি বোট।
বন বিভাগের অনুমোদন পাওয়া লঞ্চের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ৬৮ নৌযানের মধ্যে ১৬টি এমবি (মোটর বোট) এবং ১০টি এমএল (মোটর লঞ্চ) ক্যাটেগরির। এগুলোর চলাচলের অনুমতি না থাকলেও নিয়মিত পর্যটক বহন করছে। অন্য ৪১ বড় নৌযানের মধ্যে ১১টি এর আগে বিভিন্ন নৌপথে যাত্রী বহন করত। পর্যটন মৌসুমে চার মাস অস্থায়ী কক্ষ তৈরি করে তারা সুন্দরবনে পর্যটক পরিবহন করে। এগুলোর সেবার মান যাচ্ছেতাই। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত এগুলোর চলাচলের অনুমোদন না থাকলেও দেদার তারা পর্যটক বহন করে।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আযম ডেভিড বলেন, নাব্য সংকটের কারণে সুন্দরবনের নদীতে বড় নৌযান চলাচল করতে পারে না। এজন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর থেকে নকশা অনুমোদন নিয়ে কোটি কোটি টাকা খরচ করে পর্যটকবাহী ছোট নৌযান তৈরি করা হয়েছে। একদিকে নকশা অনুমোদন, অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএর বন্ধের নির্দেশ খেয়ালিপনা। বিষয়টি তুলে ধরলে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খুলনায় এসে সব নৌযান দেখে চলাচলের অনুমতি দিয়েছেন।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বছর বন বিভাগের অনুমতি নেওয়া ৬৮ নৌযানই হালনাগাদ সার্ভে সনদ জমা দিয়েছে। প্রতিটি সনদে পর্যাপ্তসংখ্যক লাইফ বয়া, লাইফ জ্যাকেট, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ফায়ার বাকেট, পাম্প, বালু, ফার্স্টএইড বক্স রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে বেশকিছু নৌযান ঘুরে দেখা গেছে, কাগজে ঠিক থাকলেও আদতে অনেক কিছুই নেই। সার্ভে সনদে আবিদা খান নামে নৌযানে ১৩৬টি বয়া, ১৩৬টি জ্যাকেট, ৬টি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র, ৬টি বাকেট থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে বেশিরভাগ সরঞ্জাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র পাওয়া গেছে ইঞ্জিন কক্ষে। একইভাবে ওয়াকিফ খান-১ এ বয়া ৪৩টি, জ্যাকেট সাতটি ও চারটি অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র থাকার কথা। এর মধ্যে বয়া কিছু কম দেখা গেছে। বাকিগুলো প্রয়োজনের তুলনায় কম।
এছাড়া আল-আসকা, ক্রাউন, গ্লোরি, ওয়েভ, রিভার ক্রুজ, আরাল সি, উৎসবসহ বিলাসবহুল কিছু নৌযানে সনদ অনুযায়ী যন্ত্রপাতি রয়েছে। তবে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র ব্যবহার করতে জানেন না অনেক কর্মী। বিশেষ করে বিলাস ভ্রমণ, হাজী শরীয়তউল্লাহ, মোহাম্মদী-২, মিরাজ, শুভ ও রোদেলা নামে কয়েকটি নৌযানের অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, লাইফ জ্যাকেট সবই কম ছিল। এগুলোর ইঞ্জিনও অনেক পুরোনো।
সাধারণত তিন দিনের জন্য প্যাকেজে পর্যটকরা বন ভ্রমণে যান। হঠাৎ কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসার ব্যবস্থা তো নেই-ই, তাৎক্ষণিক লোকালয়ে ফেরারও উপায় নেই। সম্প্রতি এক ব্যবসায়ী বনে হৃদরোগে আক্রান্ত হন। নানামুখী প্রচেষ্টার পর কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে তাকে উদ্ধার করে খুলনার হাসপাতালে নেওয়া হয়।
সুন্দরবনে পর্যটন খাতের ব্যবসায়ী মাজহারুল ইসলাম কচি বলেন, কটকা ও দুবলারচরে চিকিৎসাকেন্দ্র, ভাসমান হাসপাতাল এবং অসুস্থ পর্যটককে উদ্ধারের জন্য একটি স্পিডবোট রাখা জরুরি।
সুন্দরবন ভ্রমণে পর্যটকরা নির্ধারিত টাকা জমা দিয়ে নৌযান ও পর্যটকরা বনে প্রবেশের অনুমতি পান। বিভিন্ন খাতে এই টাকা আদায় করে বন বিভাগ। ৭৫ দেশি পর্যটক বহনের জন্য একটি নৌযানকে সব মিলিয়ে প্রতি ভ্রমণে ন্যূনতম ৫০ হাজার টাকা রাজস্ব দিতে হয়। বিদেশি পর্যটকের ক্ষেত্রে তা কয়েকগুণ।