লাইব্রেরি ও জ্ঞানচর্চা


২৩ জানুয়ারি ২০২৫ ১১:১৭

॥ মুহাম্মাদ কুতুব উদ্দীন ॥
বিশ্বস্রষ্ট্রা মহান আল্লাহ আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে যে আসমানী নির্দেশটি সর্বপ্রথম পাঠিয়েছিলেন, সেটি হচ্ছে ‘ইকরা’ মানে পড়। আদম (আ.)-কে সৃষ্টির পরপরই যে প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেটি হচ্ছে ‘জ্ঞান’ আর আদম (আ.) সে প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন বলেই আমরা আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টির সেরা। বর্তমান সময়েও যারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত ও সেরা, তাদের বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়। যুগে যুগে বিভিন্ন মুসলিম ও অমুসলিম মনীষী পৃথিবীর একমাত্র নির্ভুল গ্রন্থ আল-কুরআনের অনুবাদ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। বাংলা ভাষায় প্রথম কুরআন মাজীদ অনুবাদ করেন গিরিশ চন্দ্র সেন, ইংরেজি ভাষায় আলেকজান্ডার বস, ফরাসি ভাষায় আন্দ্রে ডুরোয়ার, উর্দু ভাষায় অব্দুস সালাম মুহাম্মদ, ফার্সি ভাষায় কামালুদ্দীন হোসাইন, হিন্দি ভাষায় আহমদ শাহ মসিহি, কাশ্মীরি ভাষায় মুহাম্মদ ইয়াহইয়া শাহ, জার্মান ভাষায় সলেম স্কেইজার, ইতালিয়ান ভাষায় আন্দ্রে অ্যারি ভ্যারিনি, রুশ ভাষায় পিওটর ভি পেস্টানিকভ, গুজরাটি ভাষায় কারিরি লোকনান, রুমানিয়া ভাষায় সিলডেস্টোও কন্ট্রাভিয়ান, চীনা ভাষায় টিয়েং লি, আফ্রিকান ভাষায় ইসমাইল আব্দুর রাজ্জাক, সুদানি ভাষায় এইচ কামরুদ্দীন সালেহ এবং কোরিয়ান ভাষায় মংসান কিম প্রথম কুরআন মজিদ অনুবাদ করতে সক্ষম হয়েছেন তাদের জ্ঞান সাধনার কারণেই। জ্ঞান সাধনার একটি সহায়ক শক্তি হিসেবে লাইব্রেরি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।
তাই যুগে যুগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মনীষীগণ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠায় অবদান রেখেছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্রন্থাগার ‘দ্য লাইব্রেরি অব কংগ্রেস’। এতে বই রয়েছে ২৮ মিলিয়ন। পাবলিক লাইব্রেরি শাহবাগ প্রায় দুই লাখ বইয়ের এক বিশাল রাজ্য, প্রায় এক লাখের মতো বই সংগ্রহে রয়েছে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র লাইব্রেরিতে, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরিতে ২৫ হাজার বইয়ের বিশাল এক সংগ্রহশালা, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ লাইব্রেরিতে প্রায় সাত হাজার বই এবং গ্যেটে ইনস্টিটিউট লাইব্রেরি পাঁচ হাজারের বেশি বইয়ের মাধ্যমে আলোকিত মানুষ তৈরির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রায় ৪ লক্ষাধিক বই নিয়ে জ্ঞান সাধনায় ভূমিকা রাখছে। তবে দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, শতকরা প্রায় ১০ ভাগ শিক্ষার্থী তার নিজের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থাগার ব্যবহার করে না। বইয়ের পরিবর্তে যুবসমাজ এখন মাদকাসক্তে ডুবে যাচ্ছে। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ তামাকের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছে। তাই মানুষকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে মধ্যযুগের মুসলমানরা বিশ্বময় আলো ছড়ানোর জন্য ব্যাপকভাবে লাইব্রেরি গড়ে তুলেছিলেন। ৮৩০ সালে খলিফা আল মামুন ইরাকের বাগদাদে বায়তুল হিকমা নামে বিশাল এক গ্রন্থাগার, অনুবাদকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তৎকালীন সেই পাঠাগারে সংরক্ষিত ছিল ছয় লাখ গ্রন্থ। চতুর্থ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম মুসলিম পণ্ডিত ও প্রশাসক সায়েব বিন আব্বাস আরব জাহানে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রবর্তন করেন। ১৯১২ সালে আমেরিকা অঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে পাঠাগার যাতায়াত করত বিভিন্ন লোকালয়ে। ফ্রান্সে এটা শুরু হয় ১৯২০ সালে। বর্তমান পৃথিবীতে গাড়িতে করে বহনযোগ্য গ্রন্থাগার প্রায় সব দেশেই চালু আছে। বাংলাদেশে প্রথম ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির উদ্যোগ নেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। আধুনিককালে তুরস্কের ‘সোলাইমানিয়া’ লাইব্রেরিটির অবস্থান শীর্ষে। পর্যায়ক্রমে মিশরের দারুল কুতুব, ইরাকে আব্দুল্লাহ মারাশি নাজাফি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত লাইব্রেরি, পবিত্র মদীনার মাকতাবাতু আবদিল আজীজ অগ্রগণ্য। নোবেল বিজয়ী লিও টলস্টয়কে বলা হয়েছিল জাতীয় উন্নয়নের জন্য আপনি যুবসমাজের প্রতি কিছু বলুন, তিনি বলেছিলেন আমার তিনটি পরামর্শ আছেÑ ১. পড়, ২. পড় এবং ৩. আর পড়। এটি যেন মহান আল্লাহর সেই প্রথম বাণী ‘পড়, তোমার প্রভুর নামে’ এরই প্রতিফলন। আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, যুবসমাজ ও জ্ঞানের দিগন্তকে আলোকিত করতে ভালোমানের সমৃদ্ধ লাইব্রেরির বিকল্প নেই। বিশেষ করে বর্তমান পথহারা ও ভবঘুরে যুবসমাজের হাতে হাতে মানবতার একমাত্র আদর্শ বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনচরিত পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমাদের এগিয়ে আসা সময়ের অপরিহার্য দাবি। পৃথিবীর আলোকিত মনীষীগণ বইকেই অন্তরঙ্গ সঙ্গী বানিয়েছিলেন বলেই তারা সমাজকে আলোকিত করতে পেরেছিলেন। বরেণ্য জ্ঞানসাধক ইবনে রুশদ বিয়ে ও পিতার মৃত্যুর রাত ছাড়া আর কোনো রাতেই বই পড়া বন্ধ করেননি। জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নিত্যসঙ্গী ছিল বই। তার ব্যাপারে একটি মজার কাহিনী আছেÑ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের নির্জনকক্ষে বসে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছিলেন, গ্রন্থাগার বন্ধ হয়ে গেলেও সেদিকে তার খেয়াল ছিল না। খেয়াল হওয়ার পর উঠে দেখলেন জানালা-দরজা বন্ধ। বাইরে থেকে দরজায় তালা লাগানো। এক পথচারীর খবরে গার্ড ছুটে এসে গ্রন্থাগারের দরজা খুলে মুক্ত করেন বইপ্রেমিক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে। বিখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী আল বেরুনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে একদিন অসুস্থ অবস্থায় শুয়ে আছেন। পাশে অবস্থানরত তার এক বন্ধুকে বললেন, জ্যামিতির একটি সংজ্ঞা আমার জানা দরকার। বন্ধুটি বললেন, তুমি মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। এসব এখন জেনে কী লাভ হবে? আল বেরুনি প্রত্যুত্তরে বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর আগে আমি এটা জেনে যেতে পারলে হয়তো আমার জীবনটা আরও ধন্য হবে।’ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, জাতি হিসেবে আমরা বইবিমুখ। বই পড়ার প্রতি আমাদের ছাত্র ও শিক্ষক সমাজের সমূহ অনীহা ও অজুহাত। বই থেকে আমরা এমনভাবে দূরে থাকি, মনে হয় বই আমাদের শত্রু। একজন শিক্ষককে সারা জীবন ছাত্রই থাকতে হয় (বই পড়তে হয়); তাহলেই তিনি ভালো শিক্ষক। এশিয়াখ্যাত ঐতিহাসিক প্রফেসর ড. আবদুল করীম যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন, তখন তার একজন শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, ‘শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছ, কিন্তু তার অর্থ হলো সারা জীবন ছাত্র হয়ে থাকতে হবে, মনে রেখো অ ঃবধপযবৎ রিঃযড়ঁঃ নড়ড়শ রং ষরশব ধ ংড়ষফরবৎ রিঃযড়ঁঃ ধ মঁহ. অর্থাৎ বইবিহীন একজন শিক্ষক বন্ধুক (অস্ত্র) ছাড়া একজন সৈনিকের মতো। বইপাঠ মানুষের উদ্বিগ্নতা, দুশ্চিন্তা ও দুঃখ-বেদনা দূর করে, মিথ্যায় ডুবে থাকা থেকে বেঁচে থাকা যায়, বাগ্মিতা ও স্পষ্ট বক্তব্যের গুণ লাভ করা যায়, চিন্তাভাবনাকে বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে, স্মৃতি ও বোধশক্তিকে উন্নত করে, বিজ্ঞদের প্রজ্ঞা ও পণ্ডিতদের বোধ দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, মনকে বিক্ষিপ্ত হওয়া এবং সময় অপচয় থেকে রক্ষা করে, শব্দের ওপর দক্ষতা অর্জন করা যায়, সর্বোপরি ধারণা করার ও বোঝার ক্ষমতা উন্নত হয়। কেননা ‘আত্মার পুষ্টি ধারণা করার ও বোঝার মাঝেই খাদ্য ও পানির মাঝে নয়।’ পৃথিবীতে যারাই সফল মনীষী হয়েছেন, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, কবি, সাহিত্যিক, চিকিৎসাবিদ, প্রকৌশলী, চিন্তানায়ক, আবিষ্কারক সবার ব্যক্তিগত সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল এবং তারা প্রচুর বই পড়েছেন। আরেকটি দুঃখজনক তথ্য হচ্ছে, পুরো মুসলিম উম্মাহর মধ্যে যারা আদতে কিছু পড়তে বা লিখতে পারে না, তাদের অনুপাত প্রায় ৩৭ শতাংশ। অথচ ইসলামী বিশ্ব তার জাতীয় উৎপাদনের ৪% এরও কম খরচ করে শিক্ষা-দীক্ষার পেছনে। উল্লিখিত নিরক্ষরতা ও অশিক্ষা ছাড়াও উম্মতের মধ্যে আরও বিভিন্ন ধরনের অস্পষ্ট নিরক্ষরতা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন তাদেরকেও আমরা এক ধরনের নিরক্ষর বা অশিক্ষিত বলতে পারিÑ যারা হয়তো খুব ভালো পড়তে ও লিখতে পারেন। কিন্তু প্রচলিত ধারার তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা শেষ হয়েছে তো পড়ালেখাই ছেড়ে দিয়েছেন। এখন আর বই ধরে না বই পড়ে না। বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি হাদীস বর্তমানে খুবই প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছেÑ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের অন্তর থেকে টেনে বের করার মাধ্যমে জ্ঞান উঠিয়ে নেবেন না; বরং জ্ঞানীদের উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে জ্ঞান উঠিয়ে নেবেন। এমনকি যখন দুনিয়ায় কোনো জ্ঞানী অবশিষ্ট রাখবেন না, তখন মানুষ মূর্খ লোকদের নেতা হিসেবে গ্রহণ করবে। অতঃপর তাদের নিকট মাসয়ালা জিজ্ঞেস করা হবে আর তারা না জেনেই ফতোয়া দেবে। ফলে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।’ বুখারী ও মুসলিম। হতাশাগ্রস্ত মুসলিম এ উম্মাহ যদি শান্তির ঠিকানা পেতে চায়, তাহলে তাদের বিপ্লবী গ্রন্থ কুরআন মাজীদ অধ্যয়নের পাশাপাশি মানবতার বন্ধু বিপ্লবী নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও আসহাবে রাসূলের ব্যবহারিক জীবন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে সে অনুযায়ী জীবনকে পরিচালিত করতে হবে; তবেই মিলবে উভয়জগতের কাক্সিক্ষত শান্তি। তাই বর্তমান বিভ্রান্ত যুবসমাজকে আলোর দিশা দিতে পারিবারিক ও এলাকাভিত্তিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। সরকারের তরফ থেকেও ইউনিয়নভিত্তিক একটি পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
লেখক : প্রভাষক (আরবী), জলদী হোসাইনিয়া কামিল (স্নাতকোত্তর) মাদরাসা, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।

০০০০

মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স বাড়াতে প্রয়োজন আরবি ভাষা শিক্ষা
॥ তাজুল ইসলাম কাউসার ॥
আরবি ভাষা আমাদের কাছে একটি বিদেশি ভাষা। এটি পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
আরবি ভাষা বিশ্বের প্রায় ২৮টি দেশের মাতৃভাষা। ২৫ কোটি মানুষ আরবিকে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে। এ ভাষার অনেক গুরুত্ব থাকার কারণে ১৯৭৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে আরবি ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। ইউনেস্কো ২০১২ সালে সর্বপ্রথম ১৮ ডিসেম্বরকে আরবি ভাষা দিবস হিসেবে নির্ধারণ করে। ২০১৩ সালে ইউনেস্কোর উপদেষ্টা পরিষদ আরবি সংস্কৃতি তুলে ধরার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী এ দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আফ্রিকান ইউনিয়ন, ওআইসিসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিসিয়াল ভাষা আরবি। শুধু তাই নয়, (ঞৎধফব খধহমঁধমব) ব্যবসায়িক ভাষা হিসেবে এ ভাষা অনারব দেশের প্রায় প্রতিটি পণ্যের মোড়কে শোভা পায়। পণ্যের গুণগতমান ও বিজ্ঞাপনসংবলিত আরবি লেখা আমাদের দেশের ৫ টাকার বিস্কুটের প্যাকেট লক্ষ করা যায়। এতে অতি সহজেই আমাদের কাছে আরবি ভাষার মর্যাদা, গুরুত্ব ও এ ভাষা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুমিত হয়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশে আরবি চর্চা হয়। অমুসলিমরা আরবির চর্চা করে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কিংবা ইসলামকে জানার জন্য। আর মুসলমানরা আরবি শেখে ধর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের জনগণ ধর্মীয় কারণ ছাড়াও অর্থনৈতিক কারণে আরবি ভাষাকে গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তি হচ্ছে রেমিট্যান্স আর এ রেমিট্যান্সের সিংহভাগ আসে আরববিশ্ব থেকে। বিশ্বব্যাংকের এক রিপোর্টে জানা যায়, ২০২০ সালে সকল অধিবাসীগণ ২১.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে পাঠায়। এ বিপুলসংখ্যক রেমিট্যান্সের ৭৩ শতাংশ আসে (এঈঈ) ঈড়ঁহঃৎরবং অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের এ বিশাল শ্রমবাজারের প্রধান অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা এবং তা উত্তরোত্তর সমৃদ্ধ করার জন্য বাংলাদেশ সরকার আরো উদ্যোগী হবে।
প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য মানুষ জীবিকার তাগিদে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাচ্ছে আরববিশ্বে। অথচ আরবি ভাষার সঙ্গে তাদের পূর্ব কোনো সম্পর্ক থাকছে না। তারা পেশাগতভাবে আরবি ভাষায় দক্ষ না হওয়ায় যথাযোগ্য বেতন ভাতা ও নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ বিশাল শ্রমশক্তি আরবি ভাষায় সুদক্ষ না হওয়ায় যথাযথ মর্যাদা পাচ্ছেন না।
বিশিষ্ট গবেষক ড. মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, কাজের ক্ষেত্রে একসময় ভাষাগত দক্ষতা না থাকলেও তেমন সমস্যা হতো না, কিন্তু বর্তমানে বিদেশি কোম্পানিগুলো আরবি ভাষা জানা শ্রমশক্তিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। ভারত, চীন, জাপান, কম্বোডিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো আমাদের দেশেও যদি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিদেশগামী শ্রমশক্তিকে ভাষাগত দক্ষ করে প্রেরণ করা যেত, তাহলে আরবিভাষী দেশগুলোয় নিজেদের অবস্থান আরো মজবুত ও সুদৃঢ় করতে পারত এবং দেশের আরো অধিক পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা (ঋড়ৎবরমহ পঁৎৎবহপু) আসত।
এসব বিবেচনায় জাতীয় উন্নয়নের স্বার্থে দক্ষ ও পারদর্শী জনশক্তি (ঝশরষষবফ গধহঢ়ড়বিৎ) তৈরি করার নিমিত্তে আরবি ভাষা শিক্ষা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি আরবের সাবেক ইকোনমিক কাউন্সিলর ও মিনস্টার ড. মোহাম্মদ আবুল হাসান ‘মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দেশের রেমিট্যান্সপ্রবাহ বাড়াতে আরবি ভাষা শিক্ষা অপরিহার্য’ শীর্ষক সেমিনার প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, আমরা আরবি ভাষা শিখি ধর্মীয় কারণে কিন্তু দুনিয়ার কারণে আরবি ভাষা শেখেন ফিলিপিন, চাইনিজ, শ্রীলঙ্কা ও ভারতীয়রা। আমি পুরো আরবি ভাষায় বক্তৃতা শুনেছি রিয়াদের চাইনিজ অ্যাম্বাসেডর ও শ্রীলঙ্কান অ্যাম্বাসরকে। আমার দেখা বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তা যেমনÑ হজ কাউন্সিলর, জেদ্দা, ডিফেন্স অ্যাটাচে, রিয়াদ, সৌদি আরব, ডেপুটি চিপ অব মিশনে রয়েছেন, যারা আরবিতে অনর্গল কথা বলেছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ভাষা শিক্ষা ও শিখানোর ব্যাপারে তৎপর। বিসিএস প্রশাসন একাডেমিতে ১৯৯৭ সালে মরহুম শহীদুল আলম আরবি ও ফারাসি ভাষা শেখানোর কোর্স চালু করেন, যা ২০০৩ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। আরবি ভাষায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কান্ট্রিজর আইইউটি-ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির টেকনিক্যাল এন্ড ভোকেশনাল এডুকেশন ডিপার্টমেন্ট প্রস্তুত রয়েছে। আমরা ওআইসির ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে অনলাইনে প্রশিক্ষণ অনায়াসে চালু করতে পারি। তাদের অফিসিয়াল ভাষা হলো আরবি ও ফার্সি। আমাদের ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের আরববিশ্বে চাকরির পথ সুগম করতে দ্রুত অনলাইনে আরবি ভাষা প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করা যেতে পারে। বর্তমান সরকার জেনারেল শিক্ষার পাঠ্যক্রমে আরবিকে অন্তর্ভুক্ত করাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। তার সাথে সাথে এ ব্যবহারিক আরবি শিক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে বাংলাদেশর সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে আরো একধাপ এগিয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
দেশে রেমিট্যান্স অর্জনের ক্ষেত্রে আরবি ভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কারণ দেশের বৈদেশিক রেমিট্যান্স অর্জনের শতকরা ৮০ ভাগ আসে আরবি ভাষাভাষী দেশ থেকে। অর্থনৈতিক এ গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতের মতো একটি হিন্দু প্রধান দেশে আরবি ভাষাকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। আরববিশ্বে জনশক্তি রফতানির জন্য তাদের আরবি ভাষায় দক্ষ করে তোলে। একইভাবে পাকিস্তানও সে দেশের নাগরিকদের আরবি ভাষায় প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। অথচ আমরা আরবি ভাষাকে অবহেলার কারণে সৌদি আরবে অধিকাংশ বাঙালিকে নিম্নপর্যায়ের কাজ করতে দেখা যায়। আরবি ভাষায় অদক্ষ হওয়ার কারণে তারা অত্যন্ত নিম্নপর্যায়ে শ্রমিকের মর্যাদা পায়। অপরপক্ষে আরবিতে দক্ষ হওয়ার কারণে ভারত এবং পাকিস্তানের শ্রমিকদের অফিসিয়াল বিভিন্ন কাজে নিয়োগ পেতে দেখা যায়। একটি সমীক্ষায় দেখ যায়, সৌদি আরব থেকে হাজার হাজর বাংলাদেশি যে রেমিট্যান্স পাঠায় তার চেয়ে বেশি পাঠান ডেনমার্কের মাত্র ৩০০ জন সৌদিতে কর্মরত ডেনিস নাগরিকগণ।
সৌদি আরবের কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয় অনারবদের আরবি ভাষা পাঠদান পদ্ধতি এ বিষয়ে মাস্টার্স করার সুবাদে ফিল্ড ওয়ার্ক করতে গিয়ে, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ছোট-খাটো ব্যবসা করতে যে সমস্যা আমি বাস্তবে দেখেছি তা হচ্ছে, বাংলাদেশিগণ বাকালা বা ছোট মুদি দোকান খুলেন কিংবা নানা প্রকার ক্ষুদ্র ব্যবসায় জড়িত হন ফলে তার এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাতে হলে তাকে একজন সুদানি না হয় মিশরীয়কে রাখতে হয়। যারা দৈনিক পত্রলাপ বা যোগাযোগ অথবা আইনগত কার্যদি সম্পন্ন করার জন্য তাদের বিশাল অংকের একটি অর্থ প্রদান করতে হয়। যদি ওই বাঙালি ভালো করে আরবি জানত তাহলে তার এ বিশাল অংকের অর্থ অপচয় হতো না।
তাই আরববিশ্বে ভালোমানের চাকরির বা ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক আরবি শিক্ষা করা আবশ্যক । পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এ ভাষা শিক্ষায় যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, তা একেবারেই অপ্রতুল।
লেখক : উচ্চ শিক্ষার্থী, কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়াদ, সৌদি আরব।