ইতিহাসের আয়নায় সাহিত্য-সংস্কৃতি
১৮ জানুয়ারি ২০২৫ ১৬:৫৫
॥ আসাদুজ্জামান আসাদ ॥
মহান আল্লাহ মানুষকে সেরা জাতি হিসেবে সৃষ্টির করে ভাষা শিক্ষা দিলেন। তিনি ভাষার স্রষ্টা। ভাষার মাধ্যমে আমরা কথা বলি, মনের ভাব প্রকাশ করি। রচনা করি সাহিত্যসম্ভার। লিখলেই সাহিত্যের রূপ আসে না। সাহিত্যে ভাব, চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধি, জ্ঞান থাকতে হয়। তবেই সাহিত্যভাণ্ডার মজবুত ও শক্তিশালী রূপে বহিঃপ্রকাশ পায়। ফোটে দুঃখ-বেদনা, সুখ-শান্তি, হাসি-কান্নার বাস্তব চিত্র। একজন সাহিত্যকর্মী শব্দচয়ন, ছন্দবিন্যাস, অনুপ্রাস, মাত্রা, মুক্তক, ছন্দ, মিত্রাক্ষর ছন্দ, অমিত্রাক্ষর, স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, অক্ষর বৃত্ত, অন্তমিল ও অলংকরণ গঠনের উপাদান তুলে ধরেন। এসব উপাদানের স্বার্থ গ্রহণে, প্রচুর অধ্যয়ন ও সাধনার প্রয়োজন। অপরদিকে সংস্কৃতি হচ্ছে সাধনার বিষয়। সংস্কৃতির ইতিহাস মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস। ইসলামের ওপর প্রতিষ্ঠিত সংস্কৃতিই হচ্ছে আদর্শিক সংস্কৃতি। জাতিগত সংস্কৃতি হচ্ছে আদর্শহীন সংস্কৃতি। সংস্কৃতির নানারূপ লিখে প্রকাশেই হচ্ছে সাহিত্য। সাহিত্য মানে ছড়া, কবিতা, গল্প, ইতিহাস, নাটক, সিনেমা-উপন্যাস সেমিনার ইত্যাদি।
আল্লাহ প্রত্যেক নবী ও রাসূলকে স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘আমি সব নবীকে তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি। যাতে তাদের পরিষ্কার বোঝাতে পারেন। অতঃপর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা সৎপথ প্রদর্শন করেন। তিনি পরাক্রান্ত, প্রজ্ঞাময়’। (সূরা ইবরাহিম)। নবী-রাসূলগণ নিজ ভাষায় মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। আমরা দিন-রাতে পাঁচবার নামাজ আদায় করি। নামাজে কুরআন তিলাওয়াত করি, তা আরবি ভাষায়। বিশ্বনবী সা. বলেন, ‘আমি তিন কারণে আরবি ভাষাকে ভালোবাসি। আমার মাতৃভাষা আরবি, কুরআনের ভাষা আরবি এবং জান্নাতের ভাষা আরবি’। আল্লাহ বলেন, ‘আমি এ কুরআনে মানুষের জন্য সব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেছিÑ যাতে তারা অনুধাবন করে। আরবি ভাষার এ কুরআন বক্রতা মুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে’। (সূরা আল জুমা)। নবী ও রাসূলগণ প্রত্যেক কর্ম-কাজে মাতৃভাষা ব্যবহার করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি আপনার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছিÑ যাতে তারা স্মরণ রাখে’। (সূরা আদ দুখান)। সুতরাং বোঝা গেল, মাতৃভাষায় সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা করা যাবে। যে জাতি-গোষ্ঠী, সমাজ সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেছে, সে জাতি-গোষ্ঠী ও সমাজ তত বেশি সমৃদ্ধি লাভ করেছে। সাহিত্যকে অবহেলা করে কোনো জাতি উন্নতি লাভ করতে পারেনি। বিশ্বনবী সা. আসার পূর্বে আরব সমাজে প্রচুর সাহিত্যের প্রভাব ছিল। কবি ছিল অধিকাংশ আরববাসী। তবে সেসব সাহিত্যে কোনো আদর্শ বিদ্যমান ছিল না। পারিবারিক যুদ্ধের ময়দান, গোত্রীয় ভাব-প্রভাব, প্রতিপত্তি প্রকাশে কবিরা ছিল মধ্যমণি। রাজা-বাদশাহ, গোত্র ও বংশের কাছে কবি ছিল সম্মানের পাত্র। বিশ্বনবী সা. বিশিষ্ট কবি আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহাকে দিয়ে কাফেরের বিরুদ্ধে কবিতা লিখতে উৎসাহ দিয়েছেন। বিশ্বনবী সা. কবিদের সম্মানিত, রয়্যালিটি প্রদানের ব্যবস্থা করেন। সেই সম্মান সারা বিশ্বে এখনো চালু আছে। সাহিত্যে থাকবে রুচিশীল শব্দভাণ্ডার, জ্ঞান, বুদ্ধি, অর্থবহ শব্দ গাঁথুনি, ছন্দের যাদু, উপমা, রুচিমূলক শব্দমালার মহাসমুদ্র। যদি সাহিত্য কলুষিত, যৌনতাপূর্ণ, নগ্ন, অশ্লীলতার পরিপূর্ণ থাকে, সেসব শব্দ পরিহার করে, রুচিসম্মত শব্দ ব্যবহার করা অতি জরুরি। বিশ্বনবী সা. বলেন, ‘মানুষ মারা যাওয়াার পর তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের সওয়াব সদকায়ে জারিয়া হিসেবে পেতে থাকে। তার একটি হচ্ছে উপকারী ইলম। সাহিত্যের পাঠক যাতে সহজেই জ্ঞান-বুদ্ধি অর্জন করতে পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এরশাদ হচ্ছে, ‘তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহকে খুব স্মরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে না। নিপীড়িনকারীরা শিগগিরই জানতে পারবে তাদের গন্তব্য স্থল কীরূপ”। (সূরা আশ শোয়ারা : ২২৭)। আরো বলা হয়েছে, ‘বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে’। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তুমি কি দেখ না যে, তারা প্রতি ময়দানেই উ™£ান্ত হয়ে ফেরে? এবং এমন কথা বলে যা তারা করে না।’ (সূরা শোয়ারা : ২২৫)। এ ধরনের সাহিত্যিক দেশ-জাতি ও রাষ্ট্রের জন্য অভিশাপ। সাহিত্য একটি শিল্প। এ শিল্পকে অশ্লীল শব্দ দিয়ে সাজানো নয়, সাজাতে হবে সুন্দর সৌন্দর্য আর মাধুরী দিয়ে।
মহামানব বিশ্বনবী সা. বলেন, ‘অশ্লীল কবিতা দিয়ে তোমাদের দেহ-মন ভর্তি করার চেয়ে রক্ত-পুঁজ দিয়ে পূর্ণ করা অনেক ভালো’। পালাবদলের হাওয়ায় সাহিত্য পরিবর্তনশীল। চিন্তা-ভাবনায় তৈরি করি ইতিহাস। চিন্তাশীল ভাবনা, গঠনমূলক আলোচনা, বিবেচনা, সমকালীন সংস্কৃতি দিয়ে সাহিত্য পূর্ণতা লাভ করে। সাহিত্য কখনোই সংস্কৃতির সীমানা অতিক্রম করতে পারে না। সেজন্য বলছি, ‘মুসলমানের ঐতিহ্যই সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য’। বিশ্বনবী সা. বলেন, ‘কবিতা মূলত কথা, তার ভালোটা ভালো কথা এবং খারাপটা খারাপ কথা’। বিশিষ্ট কবি হযরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহার রচিত, একটি কবিতা শুনে রাসূল সা. বলেন, ‘দেখ তোমাদের ভাইয়ের কবিতা কত অনাবিল ও পরিচ্ছন্ন।’ বর্তমান যুগ, আধুনিক যুগ। কবিতা ও সাহিত্য থেকে মুসলমানের আদর্শ প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে। কলুষিত যৌনতাপূর্ণ, নগ্ন, অশ্লীলতায় ভরপুর শব্দমালা দিয়ে সাহিত্যকে গ্রাস করা হচ্ছে। সাহিত্যের পাতায় মানানসই, রুচিবোধ উঠে গেছে। বৈশাখী, বর্ষবরণ, ঈদ পুনর্মিলন, সেমিনার, নাটক, সিনেমা, সভা-সমাবেশে কুরুচিপূর্ণ বাক্য এবং নষ্টামির ভেলায় সবাই ভাসছি। সাহিত্যের আদর্শকে ভুলে গেছি। সর্বক্ষেত্রে পাঠক হারাতে বসেছে। বর্তমান সাহিত্য ক্যাম্পাসে এক ধরনের বুদ্ধি, জ্ঞানহীন কবি, সাহিত্যিক বিচরণ করছে, যাদের আচার-আচরণ, নগ্নতা, অশ্লীলতা আর যৌনতার পূর্ণ শব্দে পাতা ভরে উঠেছে। শুধু আনন্দ, রস আর উল্লাসেই সাহিত্যে নয়। সাহিত্য হচ্ছে বুদ্ধি ও জ্ঞানের সমুদ্র। বুদ্ধি ও জ্ঞানের কাজ হচ্ছে জীবনের গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করা। এজন্য একজন আদর্শবান কবির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- আল্লাহর প্রতি গভীর বিশ্বাস, আল্লাহকে বেশি স্মরণ করা এবং নিজেকে মানবসেবায় নিয়োজিত রাখা। ‘মুসলমানদের ঐতিহ্যই, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্য’ বিশ্বাসে সাহিত্যসম্ভার গড়ে তোলা। যখনই নিপীড়ন আসবে, তখনই প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আদর্শ সাহিত্য ও সংস্কৃতি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাবমর্যাদা বৃদ্ধি করে। এজন্য মুসলমানের ঐতিহ্যই হচ্ছে, সাহিত্য ও সংস্কৃতি। আমাদের সমাজ জীবন থেকে সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতিকে দূর করতে হবে। সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নগ্নতাকে সরাতে হবে। ইসলামী সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারা চালু রাখার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। তবেই পরবর্তী প্রজন্ম সুস্থ সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে উঠবেÑ এ হোক আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতির চেতনা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গ্রন্থকার।