ঈশানকোণে কালো মেঘ, সাবধান!

হারুন ইবনে শাহাদাত
২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৯

দেশটাকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রের নতুন চিত্রনাট্য নিয়ে মাঠে নেমেছে পতিত ফ্যাসিস্ট গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের মদদদাতা ভারত। দেশের স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেয়া একটি শ্রেণি এ ষড়যন্ত্রে সরাসরি জেনেবুঝে অংশ নিচ্ছে। তারা দাবার ঘুঁটি হিসেবে দলান্ধ স্বার্থপর গোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে। তারা দলীয় আবেগে নিজেরাই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারছে। কিন্তু বুঝতে পারছে না। বুঝতে চাচ্ছেও না বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অসম্মান করে ক্ষমতার পালাবদল আটকে দিয়ে চিরস্থায়ী করার সুপ্ত বাসনা থেকেই ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসনের বীজ অঙ্কুরিত হয়। অঙ্কুরিত বীজের সন্ধান করে আধিপত্যবাদী আগ্রাসী অপশক্তি। পরে প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে তাদের স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করে।
এমন প্রলোভনের ফাঁদে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্টিকার লাগালো ব্যক্তিরাও পড়ে। অন্যদিকে পতিত অপশক্তি তো এ আহ্বানকে তাদের জন্য পরম পাওয়া জ্ঞান করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের হঠাৎ টাকাওয়ালা হওয়ার ধান্ধায় থাকা তৃতীয় শ্রেণির কিছু মানুষ দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য নয়, লুটপাটের সুযোগ পাবে- এমন আশা নিয়েই রাজনৈতিক দলে নাম লেখায়। তাদের হাত ধরে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তয়ান জাতির মাথায় সিন্দাবাদের ভূতের মতো সওয়ার হয়। যাকে বিশ্লেষকরা সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, বিচ্ছিন্নবাদ, পঞ্চশক্তি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ইত্যাদি ইত্যাদি নাম দিয়েছেন। সরকার বদল হলে এদের কাজের ধরন ও অবস্থান বদল হয়। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে তাদের কদর কোনোদিন কমে না। কারণ টাকা ভরা বড় বড় বালিশ সরবরাহে তাদের দক্ষতা সত্যি আলাদিনের চেরাগের চেয়েও শক্তিশালী। এমন চেরাগধারীদের তৎপরতায় দেশ আবার অশান্ত হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গন থেকে অলিগলি সর্বত্র চলছে তাদের দাপট। পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও অন্যত্র উগ্রবাদ, যার ভারতের দেয়া পরিভাষা জঙ্গিবাদ। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এর শিকড় অনেক গভীরে।
শিকড় অনেক গভীরে
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত। নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কৌশলগত গবেষকদের মতে, বাংলাদেশকে ঘিরে বিভিন্ন সময় আঞ্চলিক পরাশক্তি এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থগোষ্ঠীর নানামুখী ভূ-রাজনৈতিক খেলা ও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়েছে। বিশেষ করে ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী জাতীয়তাবাদী শক্তি দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেই প্রতিবেশী ভারত ষড়যন্ত্রের ছক বদল করে জঙ্গিবাদী ট্যাগ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চালায়। অন্যদিকে তাদের অনুগত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার চাবি নিজেদের হাতে নিয়ে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের নির্মূলের ছক বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ১৯৪৭-এ ব্রিটিশদের নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ভারত এ চাল চালছে। ১৯৭১ স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস তারা পালন করে ইস্টার্ন কমান্ডের বিজয় দিবস হিসেবে। মানে তারা বোঝাতে চায় যুদ্ধ জয় করে তারা দেশটা পেয়েছে। এখন যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার করবে। এর ব্যত্যয় ঘটলেই ভারতের পক্ষ থেকে দেয়া স্বাধীনতার সাধ বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিহিংসার বিষফল বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক নাগরিকদের বিষিয়ে তোলে। অন্যদিকে তাদের অনুগতদের করছে দেশবিরোধী বিশ্বাসঘাতক, স্বার্থপর। এই দ্বিতীয় গোষ্ঠী দেশটাকে লিমিটেড কোম্পানির মতো ব্যবহার করছে, লুটপাট করে অর্থ বিত্ত কামিয়ে বিদেশে পাচার করার জন্য। দেশে স্থিতিশীলতা আসুক, সুশাসন প্রতিষ্ঠা হোক, তারা তা চায় না। তাই ষড়যন্ত্রকারী আধিপত্যবাদী অপশক্তির সাথে হাত মেলায়।
আঞ্চলিক অপশক্তির ভূমিকা
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ভৌগোলিক ব্যবধান ও কৌশলগত দুর্বলতাকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলে আঞ্চলিক অপশক্তির প্রভাব বাড়তে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের পর থেকে বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক নেতা, জাতীয়তাবাদী বিশ্লেষক এবং স্বাধীনতা-সংগ্রাম পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞরা দাবি করে আসছেন যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে বহিঃশক্তি বিভিন্ন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মাধ্যম ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশ থেকে নানা সুবিধা আদায় এবং আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক ফোরামে বাংলাদেশকে চাপে রাখার জন্য মোটা অঙ্কের বাজেট ও গোপন অর্থায়ন করা হয়।
অর্থায়নের পরিমাণ কেমন হতে পারে- এ প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিশ্লেষক জানান, এর সঠিক তথ্য কারো কাছে নেই। কারণ এ ধরনের তৎপরতা সাধারণত বিভিন্ন অপ্রত্যক্ষ খাত, গবেষণা সংস্থা (Think Tank), সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। যেমন পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে চলছে বিচ্ছিন্নবাদী অপতৎপরতা। এ তৎপরতার নেপথ্যে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) আন্তর্জাতিক কনভেনশন বাস্তবায়নের দাবি বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এর দাবির নেপথ্যেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্রবিরোধী শান্তি বাহিনী নামে জুমল্যান্ড আন্দোলনের গোপন কোড। এটি জাতীয় অখণ্ডতার জন্য হুমকি দেশদ্রোহী অপতৎপরতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান) ঘিরে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা। সূত্রে প্রকাশ, ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে পার্বত্য অঞ্চলে পিসিজেএসএস (পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি) এবং এর সশস্ত্র শাখা ‘শান্তি বাহিনী’ গঠন হয়। তারা ভারতের সহায়তা নিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও স্থানীয় বাঙালি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও পার্বত্য অঞ্চলে চিরস্থায়ী শান্তি ফিরে আসেনি। শান্তিচুক্তির পর ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট)সহ একাধিক সশস্ত্র উপদল তৈরি হয়। এসব সশস্ত্র দলের একটি মূল লক্ষ্য হিসেবে পৃথক ‘জুমল্যান্ড’ গঠনের দাবি বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক ফোরামে তোলা হয়। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এই অঞ্চলের সীমান্ত ভারতের ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং মিয়ানমারের সাথে সংযুক্ত থাকায় অস্ত্র পাচার, অবৈধ গোপন প্রশিক্ষণ এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সীমান্ত পারের আশ্রয় লাভ করা সহজতর হয়েছে।
‘আদিবাসী’ মিথ্যা দাবি ও আইএলও কনভেনশন
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) কনভেনশনের শর্ত বাস্তবায়নের জন্য পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িরা নিজের ‘আদিবাসী’ বলে দাবি করে বিতর্ক শুরু করেছে। এ প্রক্রিয়ায় শ্রম আইন সংশোধনের নেপথ্যে আছে বাংলাদেশ ঘিরে ষড়যন্ত্র। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার বা আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে আদিবাসী স্বীকৃতি দেওয়াই বাংলাদেশ থেকে একটি নির্দিষ্ট অংশকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের প্রথম ধাপ হতে পারে।’
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মাহফুজ আহমেদ মন্তব্য করেছেন, ‘আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র অনুসারে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, স্বতন্ত্র তথা স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে। এমনকি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি তারা মনে করে যে, তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকবে না বা ভারতেও যোগ দেবে না; তবে তারা স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপন করতে পারবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রে থাকলেও তারা যে অঞ্চলে বাস করে সেই অঞ্চলের ভূমির মালিকানা বাংলাদেশের হবে না এবং সে অঞ্চলে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। তারা আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বায়ত্তশাসন, স্বশাসিত সরকার ও তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আইনি কার্যক্রম এবং তা পরিচালনার জন্য স্বনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করতে পারবে। উপর্যুক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত হলে প্রকারান্তরে তা এ অঞ্চলের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ খর্ব করবে।’
এডভোকেট সুলতান মাহমুদ হোসাইনী সাপ্তাহিক সোনার বাংলাকে বলেন, ‘শ্রম আইন সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত রিপোর্টে অনেক কিছু আপত্তিকর বিষয় আছে- যা ভূরাজনৈতিক কারণে, আইনগত কারণে ও সামাজিক কারণে আপত্তিকর। শ্রম আইন সংস্কার কমিশন তাদের সীমানার বাইরে গিয়ে কিছু রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে। তারা আদিবাসীদের জন্য আইএলও কনভেনশন ১৬৯-কে আত্মীকরণের Ratification বা অনুসমর্থনের প্রস্তাব করেছে। এ কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞ না অজ্ঞ নাকি বিশ্বাসঘাতক! আদিবাসী শব্দটা প্রয়োগ করা বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সম্পূর্ণ বেআইনি। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই। কনভেনশন ১৬৯-এর Self-Determination-এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। আদিবাসীরা এ কনভেনশন অনুযায়ী দাবি করতে পারে গণভোটের তাদের এলাকায় যে আদিবাসী নামে অভিহিত জনগোষ্ঠী আর বাংলাদেশের সঙ্গে থাকবে না, আদিবাসীরা ইচ্ছা করলে তাদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র বানাতে পারে, ফেডারেশন হিসেবে থাকতে পারে অথবা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে দাবি করতে পারে। এমন দাবি করলে আইএলও কনভেনশন-১৬৯ অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার বাধ্য হবে তাদের দাবি মানতে। দাবি না মানলে তখন সৃষ্টি হবে আরেকটি পূর্ব তিমুর অথবা দক্ষিণ সুদান।’ তিনি আরো বলেন, ‘এ কমিশনের সকল সদস্যকে গ্রেফতার করে রাষ্ট্রদ্রোহীর অপরাধে বিচার করা উচিত। সরকারকে অনুরোধ করছি এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।’
ওরা আদিবাসী নন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী, যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই’। ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কেউই বাংলাদেশে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাস করছে না। তাদের সকলেই বহির্বিশ্ব; বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সময়ে। এ অনুপ্রবেশও স্মরণাতীতকাল পূর্বে ঘটেনি। মাত্র কয়েকশ’ বছর পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার থেকে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের এ উপজাতীয় জনগোষ্ঠী তাদের আদিনিবাস ভারত ও মিয়ানমারে হলেও উল্লেখিত দুটি দেশও তাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকার করে না।
বাংলাদেশে বসবাস করা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তারা সবাই এদেশের বাইরে থেকে এসেছেন।

বাঙালি মুসলমানরাই বাংলাদেশের আদিবাসী

বাংলাদেশের ইতিহাস রচনার পথিকৃৎ গোলাম হোসায়ন জইদপুরি। তিনি বাংলার ইতিহাস নিয়ে ১৭৬৬-১৭৮৮ সালে রচনা করেন ফারসি গ্রন্থ রিয়াজ উস সালাতিন। এ পুস্তকে তিনি হযরত নুহ আ. এর সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসের একটা সম্পর্কের বিষয় উত্থাপন করেছেন। (সূত্র : ড. মোহাম্মদ হাননান : বাঙালির ইতিহাস (প্রাচীন যুগ থেকে ১৯৭৪), আগামী প্রকাশনী, ৩৬, বাংলাবাজার ঢাকা-১১০০, প্রথম বর্ধিত সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃ ২৮)। তিনি লিখেছেন, হযরত নুহ আ. এর পুত্র হামের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিন্দ হিন্দুস্তানে আসার দরুণ এই অঞ্চলের নাম তাঁর নামানুসারে রাখা হয়। সিন্ধু জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সাথে এসে সিন্ধ দেশে বসতি স্থাপন করায় এই অঞ্চলের নাম তাঁরই নামানুসারে সিন্ধু রাখা হয়। হিন্দের দ্বিতীয় পুত্র বং (বঙ্গ)-এর সন্তানেরা বাংলায় উপনিবেশ স্থাপন করেন। আদিতে বাংলার নাম ছিল বঙ। (সূত্র : গোলাম হোসায়ন সলীম : বাংলার ইতিহাস (রিয়াজ-উস-সালাতীনের বঙ্গানুবাদ), আকবরউদ্দীন অনূদিত, অবসর প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ২৪)।

ইতিহাসের এ সূত্র বিশ্লেষণ করলে যে সত্য পাওয়া যায় তা হলো,  হিন্দুস্তান ও বাংলাদেশের আদিবাসী হলো মুসলমানরা। হযরত নূহ আ. একজন নবী ছিলেন। নবী ও রাসুল আ .গণ সবাই ছিলেন। মুসলমান। বাংলাদেশে প্রথম বসতি স্থাপনকারী হলে নূহ আ, এর প্রপৌত্র বঙ্গ। অর্থাৎ বাঙালি মুসলমানরাই বাংলাদেশের আদিবাসী।

বঙ্গভূমি নামে আরেক ষড়যন্ত্র
বাংলাদেশে উগ্র জাতিগত ও অঞ্চলভিত্তিক ষড়যন্ত্রের অন্যতম বড় উদাহরণ হলো ‘বঙ্গভূমি আন্দোলন’ বা ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ গঠনের অপতৎপতার নামে অস্থিতিশীলতার অপচেষ্টা। ১৯৮০-এর দশকের শুরু দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানরত চিত্তরঞ্জন সুতার ও কালিদাস বৈদ্যের নেতৃত্বে ‘বঙ্গভূমি’ আন্দোলনের জন্ম হয়। তারা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল; বিশেষ করে খুলনা, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলার একটি বিশাল অংশ নিয়ে একটি পৃথক স্বাধীন কথিত হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের সুদূরপ্রসারী ও উগ্রবাদী হিন্দু মৌলবাদী নীলনকশা নিয়ে মাঠে নামে। এর নেপথ্যেও ভারতের হাত স্পষ্ট। কারণ তারা ভারতের মাটি ব্যবহার করছে, কিন্তু সে দেশের সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বিভিন্ন সময় প্রকাশিত বাংলাদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রিপোর্ট এবং সিনিয়র সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বঙ্গভূমি আন্দোলনকারীদের ভারত ভূখণ্ড ব্যবহার করে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ দিচ্ছে। যদিও বাংলাদেশ সরকারের কঠোর কূটনৈতিক এবং বিরোধীদল ও জনগণের সহযোগিতায় সীমান্ত রক্ষা পদক্ষেপের ফলে এই অপতৎপরতা এখনো নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আছে। তবে ভারত সরকারের নীরবতাই বলছে, তারা চায় না এ অপতৎপরতা বন্ধ হোক ।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, দল-মত নির্বিশেষে দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সীমানা রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস না করা। শ্রম আইন সংশোধনী বা আন্তর্জাতিক যেকোনো কনভেনশন গ্রহণের সময় ‘আদিবাসী’ শব্দের সংজ্ঞায়নে সতর্ক থাকা এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ রক্ষা করতে হবে। প্রতিবেশীদের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখলেও কোনো ধরনের চাণক্যবাদী প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দেওয়া।
বাংলাদেশ ১৯৪৭-পরবর্তী ১৯৪৭-১৯৭১-এর ধারাবাহিকতায় অর্জিত এক অনন্য স্বাধীন ভূখণ্ড। আঞ্চলিক পরাশক্তির আধিপত্য বিস্তার, বঙ্গভূমি বা জুমল্যান্ড আন্দোলনের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অপচেষ্টা এবং আন্তর্জাতিক আইন ও শ্রম সংশোধনের নেপথ্যে থাকা কৌশলগত ঝুঁকিগুলো দূর করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশল। রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে দেশের সার্বিক অখণ্ডতা অক্ষুণ্ন রাখাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় জাতীয় অগ্রাধিকার। তা না হলে ঈশানকোণের কালো মেঘের ঝড় লণ্ডভণ্ড করে দেবে সব কিছু। অতএব সাবধান।

 

হারুন ইবনে শাহাদাত

ঈশানকোণে কালো মেঘ, সাবধান!
২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৯

সম্পর্কিত খবর