তারেক রহমানের সফর : ভারতের বাড়াবাড়ি সন্দেহজনক


২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৪

॥ আবু হামীম ॥
সম্প্রতি ভারতের সাথে বিভিন্ন প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রের সম্পর্কের গতি প্রকৃতি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কখনো ভারতে যাবেন না- এমন কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য না দিলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি হলেই কেবল তিনি এই সফরে আগ্রহী। অথচ পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে ভিন্নভাবে- ভারত এখনই এই সফরের জন্য কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই এই তাড়াহুড়া ও চাপ সৃষ্টি করা স্বাভাবিকভাবেই নানা সন্দেহের অবকাশ তৈরি করে। প্রশ্ন হলো- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেই কেন ভারতে যেতে হবে, যেখানে সেদেশের সরকারের ভিভিআইপি মেহমান হিসেবে আছেন ছাত্র-জনতার বিক্ষোভে ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট হাসিনা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অথবা প্রতিমন্ত্রী তার প্রতিনিধি হিসেবে সম্পর্কোন্নয়নের জন্য সফরে গেলে সমস্যা কোথায়? কেন কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে এত চাপ এবং অসৌজন্যতা?
কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন : বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক যখন একটি নতুন মোড় নিচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবালের একটি বিতর্কিত মন্তব্য ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
সাবেক কূটনীতিক কানওয়াল সিবালের একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত মন্তব্য তীব্র প্রতিক্রিয়া ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। গত ১৭ আগস্ট সোমবার কানওয়াল সিবাল তার ভেরিফাইড এক্স হ্যান্ডল (@KanwalSibal) থেকে একটি পোস্ট করেন।
এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, “He (Tarique Rahman) has dug a hole from which he will not be able to extricate himself. Linking his visit to India to Hasina’s extradition is playing hardball. This is petulance, not diplomacy…’ অর্থাৎ ‘তারেক রহমান এমন এক গর্ত খুঁড়ছেন (নিজের কবর নিজে খুঁড়ছেন অর্থে), যেখান থেকে তিনি আর বের হতে পারবেন না। তার ভারত সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করাটা একটি কঠোর অবস্থান। এটি কোনো কূটনীতি নয়, বরং খামখেয়ালিপনা।’
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা একজন সাবেক শীর্ষ কূটনীতিকের মুখ থেকে এমন অসংবেদনশীল ও অসৌজন্যমূলক বক্তব্য স্বাধীন-সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানের প্রতি চরম অসম্মান এবং স্পষ্ট কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছেন।
ভারতীয় হাইকমিশনারের বক্তব্য : ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গেলে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে, তিনি যে সম্মানের যোগ্য, তাকে সেভাবেই সম্মান জানানো হবে এবং সফরটি স্মরণীয় করে তোলা হবে।’ গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির (সিআইআই) সফররত প্রতিনিধিদলের সম্মানে আয়োজিত এক সংবর্ধনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
সন্দেহ, সংশয় ও ভয়ের কারণ: ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যে কূটনৈতিক মারপ্যাঁচ আছে উল্লেখ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক বলেন, ‘তিনি যে সম্মানের যোগ্য, তাকে সেভাবেই সম্মান জানানো হবে’- এ কথার বিভিন্ন অর্থ করা যায়। ভারতের অনুগত হাসিনা সরকার ভিত্তিহীন অভিযোগে তারেক রহমানকে দেয়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে রায় দিয়েছে। তখন ভারত নীরব সম্মতি জানিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়াকে প্রতিহিংসার বশে বাড়িছাড়া করে কারাগার রেখে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার সাথেও ভারতের নীরব সায় ছিলো- এমন অভিযোগও আছে। সেই ভারত সরকার ফুঁসলিয়ে ও চাপ দিয়ে তাদের দেশে নিয়ে তারেক রহমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবেন? ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এক নাটকীয় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ধরে নিয়ে কারাগারে আটক রেখেছে।
ভারতীয় কিছু পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের বাড়াবাড়ি : একইসঙ্গে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় কিছু পত্রপত্রিকা ও সংবাদমাধ্যমের অতি-উৎসাহী এবং অতিরঞ্জিত প্রচারণা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তুলেছে। গণমাধ্যমগুলো দুই দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক কূটনৈতিক দরকষাকষিকে ‘চূড়ান্ত সংঘাত’ হিসেবে চিত্রায়িত করার এক ধরনের বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল একটি ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরি এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়েছে, সেখানে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো একে রাজনৈতিক অহংকার ও একপেশে দৃষ্টিকোণ থেকে প্রচার করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের নীতি রক্ষা করা অপরিহার্য। প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সাবেক কর্মকর্তাদের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য এবং সংবাদমাধ্যমের অহেতুক উসকানি কোনোভাবেই দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জন্য কল্যাণকর নয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবেশী কিংবা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব নতুন কিছু নয়। ভারতের ওপর কূটনৈতিক দিক থেকে অতি-চাপ কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের বহু নজির রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও স্পষ্ট উদাহরণ ছিল ২০১৮ সালে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ভারত সফর।
অসৌজন্যমূলক আচরণের নজির : ২০১৮ সালের সফরের সময় ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ট্রুডোকে অত্যন্ত শীতল বা হালকা অভ্যর্থনা (Snub) জানানো হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জি-২০ (G20) সম্মেলনে যোগ দিতেও ভারত সফর করেছিলেন। ২০২৩ সালের জি-২০ সম্মেলনের সময়ও ট্রুডোর সাথে ভারতের দ্বিপাক্ষিক টানাপড়েন দৃশ্যমান ছিল। সম্মেলন শেষে তার বিমান যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়লে তিনি প্রায় দুই দিন ভারতে আটকে ছিলেন। তখন ভারতের পক্ষ থেকে তাকে অন্য একটি বিমান ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হলেও কানাডা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের ব্যাকআপ বিমান আসার আগ পর্যন্ত হোটেলেই অবস্থান করেছিল। সামগ্রিকভাবে ট্রুডোর ভারত সফরগুলোর সময় ভারত সরকার তাকে কোনো বাড়তি খাতির না দেখিয়ে বরং খালিস্তান ইস্যুতে অত্যন্ত কড়া ও দূরত্বের কূটনৈতিক অবস্থান প্রদর্শন করেছিল।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো আট দিনের এক দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে এসেছিলেন। কিন্তু তার পুরো সফরে ভারত সরকারের যে ধরনের অপেশাদার ও অসৌজন্যমূলক আচরণ দেখা গিয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। ট্রুডোকে সফরের শুরু থেকেই অভ্যন্তরীণ রাজনীতির (বিশেষ করে শিখ ও খালিস্তান ইস্যু) জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রীয় সফরে অতিথি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে ভারতের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহল কৌশলে ট্রুডোকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও চাপ সৃষ্টির রহস্য : কানাডার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে ভারত যেমন নিজ স্বার্থ উদ্ধারে চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ ও কূটনৈতিক শীতলতা দেখিয়েছিল, ঠিক তেমনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে ভারতের অতিরিক্ত আগ্রহ ও চাপ তৈরি করা একই ধরনের ভিন্ন এক কৌশলের অংশ হতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে যখন শীর্ষ নেতৃত্ব ‘উপযুক্ত পরিবেশ’-এর কথা বলছেন, তখন তড়িঘড়ি করে সফর চূড়ান্ত করার জন্য চাপ দেওয়া কোনো শুভ লক্ষণ নয়। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবেশ ও শর্ত অনুকূল হওয়ার আগেই সফর সম্পন্ন করিয়ে নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা এবং বৈশ্বিক অঙ্গনে বাংলাদেশ সরকারকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হতে পারে এ চাপের মূল লক্ষ্য।
কূটনীতি চলে সমমর্যাদা, পারস্পারিক শ্রদ্ধা এবং সুবিধাজনক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে। জোরপূর্বক কোনো শীর্ষ সম্মেলন বা সফর কোনো দেশের জন্য সুফল বয়ে আনে না। কানাডার প্রধানমন্ত্রীর উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে, ভারত নিজ স্বার্থের ব্যাঘাত ঘটলে যেমন কূটনৈতিক শিষ্টাচার বিসর্জন দিতে দ্বিধা করে না, তেমনি নিজের সুবিধার জন্য অন্যায্য চাপ সৃষ্টিতেও পিছপা হয় না। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে নিজস্ব স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং সঠিক সময়ের হিসাব কষেই ভারতে সফরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কোনো বাহ্যিক চাপের মুখে নয়।

আবু হামীম হারুন ইবনে শাহাদাত

ঈশানকোণে কালো মেঘ, সাবধান!
২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৯

সম্পর্কিত খবর