মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী: বিরোধীদলীয় নেতা
১৩ আগস্ট ২০২৬ ২৩:২৭
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী:, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান : কোলাজ ছবি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর ডা. শফিকুর রহমান আজ ১৩ আগস্ট সংগঠনের সাবেক নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও বিশিষ্ট মুফাসসিরে কোরআন আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে বলেন, ‘কিছু মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যান, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন অনাদিকাল ধরে। আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (রহ.) তেমনই একজন মানুষ।’ আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করে, সৎকর্ম করে এবং বলে, আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত’। (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)।
আমিরে জামায়াত ডা: শফিকুর রহমান আরো বলেন, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন এই জনপদের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, শহরের মঞ্চ থেকে গ্রামের ধুলোমাখা ময়দানে, একটিমাত্র আহ্বান বুকে নিয়ে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহ্বান নিয়ে, ডেকে ফিরেছেন কুরআনের দিকে। দেশের গণ্ডি অতিক্রম করে বিশ্বেও তার বিচরণ ছিল সমান তালে। শীতের রাতে খোলা মাঠে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে থাকা লাখো মানুষ তার কণ্ঠে কোরআনের তাফসির শুনেছে। বহু মানুষের ধর্মীয় জীবনের মোড় ঘুরে গেছে সেই আলোচনায়। রাসুলুল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়’। (সহিহ বুখারি)।
তিনি বলেন, আল্লামা সাঈদীর জীবনের বড় একটি অংশই কেটেছে এই কাজে, কোরআন শেখা, কোরআন শেখানো, আর কোরআনের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কোরআনের শিক্ষা ও প্রসারের জন্য তিনি নানা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগের সাথে যুক্ত ছিলেন। তার ওয়াজের ময়দান হয়ে উঠেছিল অসংখ্য মানুষের ধর্মীয় শিক্ষার পাঠশালা।
আমিরে জামায়াত বলেন, মানুষের ভালোবাসা তাকে তাফসীরের ময়দান থেকে নিয়ে গিয়েছিল জাতীয় সংসদে। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি কথা বলেছেন ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে, আলিয়া ও কওমি মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে, সাধারণ মানুষের নানা দাবি নিয়ে। সংসদে স্পিকারের সামনে মাথা ঝুঁকিয়ে ঢোকার যে শিরকি রীতি ছিল, আল্লামা সাঈদীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় তা বন্ধ হয়েছিল। তার রাজনীতি ও মতাদর্শ নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে; কিন্তু তার বিপুল অনুসারী আর জনসমর্থন এ দেশের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অস্বীকার করার উপায় নেই এমন বাস্তবতা।
তিনি আরো বলেন, যুগে যুগে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ওপর যেমন জুলুমের খড়গ নেমে এসেছে, তেমনি আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওপরও নেমে এসেছিল নির্মম জুলুম-নির্যাতন। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে যাকে হাজির করা হয়েছিল, সেই সুখরঞ্জন বালি বরং আল্লামার পক্ষেই সাক্ষ্য দিতে এসেছিলেন। আর সেই সাক্ষ্যের কারণেই ফ্যাসিস্টরা তাকে গুম করেছিল।
তিনি বলেন, আল্লামা সাঈদীর ফাঁসির রায়ের দিন দেশজুড়ে নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। প্রিয় মানুষটির প্রতি ভালোবাসা আর তার ওপর জুলুমের প্রতিবাদে অগণিত মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। সেই প্রতিবাদে শহীদ হন দেড় শতাধিক মানুষ। রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল রাজপথ, কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলা যায়নি আল্লামা সাঈদীর প্রতি সেই অকৃত্রিম ভালোবাসা। একদিন বাংলাদেশে আল্লামা সাঈদীর রায়-পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের বিচার করার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কারাগারের দেয়াল একজন মানুষের শরীরকে আটকে রাখতে পারে কিন্তু মানুষের ভালোবাসাকে আটকে রাখতে পারে কোন কারাগার? বছরের পর বছর তিনি কারাবন্দি থেকেছেন। তবুও এ দেশের অসংখ্য ঘরে সন্ধ্যাবেলা বেজেছে তার কণ্ঠে ধারণ করা তাফসিরের রেকর্ডিং; মানুষ শুনেছে, কেঁদেছে, তার জন্য হাত তুলে দোয়া করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তার পরিচয় থেকে গেছে কোরআনের একজন আলোচক ও দাঈ হিসেবে।
তিনি বলেন, আজ আল্লামা সাঈদী আমাদের মাঝে নেই। সময়ের পালাবদলে তাকে বন্দি রাখা সেই ফ্যাসিস্ট শাসনেরও অবসান ঘটেছে। রয়ে গেছে শুধু তার কণ্ঠের স্মৃতি, তার তাফসির, তার কাজ, আর অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। মানুষ চলে যায়, দাওয়াত থেকে যায়। কণ্ঠ থেমে যায়, রেখে যাওয়া আহ্বান থামে না। কারাগারের দরজা একজন মানুষকে বন্দি করতে পারে, মানুষের হৃদয়ে তার জায়গাকে বন্দি করতে পারে না।
কবি আল মাহমুদ লিখেছেন—
‘পৌঁছুতে চাই প্রভু তোমার সান্নিধ্যে
তোমার সিংহাসনের নিচে একটি ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে
যার পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য।’
তিনি আরো বলেন, যে কণ্ঠ অর্ধশতাব্দী ধরে মানুষকে আল্লাহর দিকে ডেকেছে, সে আজ নীরব হয়ে গেছে। কিন্তু কে জানে, হয়তো এই নীরবতাই প্রিয় প্রভুর কাছে পৌঁছে যাওয়া। হয়তো যে মানুষটি সারাজীবন মানুষকে ডেকেছেন প্রভুর দিকে, তিনি আজ সেই সিংহাসনের নিচে একটি ফুরফুরে প্রজাপতির মতো, যার পাখায় আঁকা আছে সেই অনন্ত রহস্য, যার কথা তিনি সারাজীবন বলে গেছেন কিন্তু কোনোদিন পুরোটা বলে শেষ করতে পারেননি।
আল্লাহ তাআলা আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর (রহ.) ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন, তার নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন।