সরকারের প্রতি জনগণের অনাস্থা ঢাকতে দৃষ্টি অন্যদিকে নিতে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা করা হচ্ছে : মিয়া গোলাম পরওয়ার

সোনার বাংলা অনলাইন
২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৩০

সরকারের প্রতি জনগণের সৃষ্ট অনাস্থা ঢাকতে দৃষ্টি অন্যদিকে নিতে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার।

সোমবার ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা অবনতিশীল অবস্থা নিয়ে জরুরি ব্রিফিংয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারের সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে এবং তাদের এমপি ও সংরক্ষিত নারী এমপিরা ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাক। জনগণ ধীরে ধীরে সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। কারণ জুলাই সনদের আলোকে সংকীর্ণ দলীয়করণের ঊর্ধ্বে গিয়ে মানবিক, নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল জনগণের। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় গিয়ে নির্লজ্জভাবে মহনগর, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম-গঞ্জে সিন্ডিকেট করে সব জায়গায় নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব নিয়ে গোটা দেশকে ফ্যাসিবাদী পন্থায় একটি দলের মুঠোয় নেয়ার চক্রান্ত করছে। যে কারণে দেশে সন্ত্রাস বাড়ছে।

তিনি বলেন, গ্রামগঞ্জে সার ডিলার, ইমাম-খতিবের ভাতা, কৃষক ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, তালিকা ও সুপারভাইজারি করাসহ প্রত্যেকটি ইস্যুতে নিজেদের মধ্যে মারামারি ও গণ্ডগোল করছে, সার বিতরণ নিয়ে ইউএনও অফিসে হামলা করছে। দেশ চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে চলছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় দেশের ইতিহাস, অনুশীলন ও নজিরকে উপেক্ষা করে ভেরিফিকেশনের নামে এক শ্রেণিকে নিয়োগপত্র দেয়া হচ্ছে না। বেছে বেছে যুবদল, ছাত্রদল যারা করেছে তাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ফলে শাহবাগে এখন নিয়োগবঞ্চিত সমস্ত শিক্ষিত নারী-পুরুষ তাদের অধিকার আদায়ে আহাজারি করছে, কান্নাকাটি। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে- আগামী নির্বাচনে পোলিং ও প্রিসাইডিং হিসেবে বেছে বেছে বিএনপির লোকদের নিয়োগ দেয়া হবে। এই খারাপ মনোভাব থেকে এসব করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, মহিলা এমপিদেরও এই দলীয়করণে যুক্ত করা হচ্ছে। নির্বাচিত এমপিদের উপর অনির্বাচিত সংরক্ষিত মহিলা এমপিদের খবরদারি করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নির্বাচিত এমপিদের ডিও লেটার খারিজ করে সংরক্ষিত মহিলা এমপিদের ডিও লেটার দিয়ে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, যা অতীতে ছিল না। মহিলা এমপির ইন্ধনে, মদদে দেশজুড়ে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজি হামলা-ভাঙচুর হচ্ছে। এসময় মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ভাঙচুর ও মূল্যবান সামগ্রী লুটপাট, ইসিবিতে সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলাসহ সারা দেশের নানা জায়গায় সরকারদলীয় লোকের ইন্ধনে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সকল অপরাধের পিছনে মদদ দিচ্ছে সরকারদলীয় নেতাকর্মী ও মন্ত্রীরা। সন্ত্রাসীরা সুযোগ পাচ্ছে সরকারের উপর লেভেল থেকে সিগনাল পাওয়ার কারণে। সরকার অপরাধের সাথে জড়িত নিজের দলের লোকদের কথা বলে না, বিরোধীদলের উপর চাপাতে চায়। এমতাবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো সম্ভাবনা নাই, কারণ বেড়ায় ক্ষেত খাচ্ছে। অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের নিবৃত্ত ও গ্রেফতার করে শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, রাজধানীতে যদি মানুষের জীবন ও মাল নিরাপদ নাই। একইভাবে সারা দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীন অবস্থায় রয়েছে। সরকার দ্রব্যমূল্য, সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসন করতে না পারা এবং গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করায় তাদের প্রতি মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে- সেটি ঢাকতে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা করে জনগণের দৃষ্টিকে অন্যদিকে নিয়ে যেতে চায়। যাতে বিরোধীদল আসল এজেন্ডায় কথা বলতে না পারে।

তিনি বলেন, সরকার গণভোটকে সরাসরি অস্বীকার করে, গণরায়কে কার্যকর না করে আরও ভয়ংকর পথে হেঁটেছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য যে ফরম্যাট করে দিয়েছিল ঐকমত্য কমিশন- সেটি বাদ দিয়ে এবং সংস্কার না করে জাতিকে আরেকটি চ্যালেঞ্জ ও সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকার ধৃষ্টতা দেখিয়ে এবং অপরিণামদর্শী হয়ে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষের রায়কে উপেক্ষা ও গণভোট বাতিল করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলে নিজেদের দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের নামে শুভঙ্করের ফাঁকি দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার পথ ধরেছে। এতে জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে, আমাদের কর্মসূচি অব্যাহত আছে সংসদের ভিতরে ও বাইরে। দাবি আদায়ে আমরা সোচ্চার আছি, থাকবো। অতীতে যারা গণরায়কে উপেক্ষা করে জনগণের উপর ছড়ি ঘোরাতে চেয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে, তারা কেউ টিকতে পারেনি। ইতিহাসের করুণ পরিণতির দায় নিয়ে তাদের বিদায় নিতে হয়েছে। গণবিরোধী কাজে সরকার গেলে তীব্র প্রতিবাদ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সেক্রেটারি জেনারেল এসময় সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- হামলায় জড়িত সব দুর্বৃত্ত ও তাদের নেপথ্যের পৃষ্ঠপোষকদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত করে গ্রেফতার ও দ্রুত বিচার; লুট হওয়া টিকা, টিকাদানের রেজিস্টার ও নথি উদ্ধার, যাতে কোনো শিশুর টিকার ধারাবাহিকতা ব্যাহত না হয়; স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে বিকল্প স্থানে টিকাদান কার্যক্রম চালু; স্থাপনা পুনর্নির্মাণ ও ক্ষতিপূরণ, এবং জমি দখলের যেকোনো অপচেষ্টা প্রতিহত করা; ঘটনার সময় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা।

এসময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, মাওলানা আবদুল হালিম, এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ, জনাব মোবারক হোসাইন, নুরুল ইসলাম বুলবুল এমপি, ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি ও ড. রেজাউল করিম; কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন; কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ইয়াছিন আরাফাত ও আতাউর রহমান সরকার।