কানাডার পাবলিক পরিবহণসহ কোথায়ও ইসলামফোবিয়ার জায়গা নেই
২১ জুলাই ২০২৬ ২১:১৬
ফজল মুহাম্মদ ১৪ ই জুলাই ২০২৬। টরন্টো কানাডা থেকে।
কানাডার মেগাসিটি টরেন্টোর পাবলিক পরিবহণের সংক্ষেপ নাম টিটিসি। আর এই টিটিসির বর্তমান চেয়ারম্যান মি. জামাল মায়ার্স এক একান্ত সাক্ষাতকারে বলেছেন, কানাডার পাবলিক পরিবহণসহ কোথায়ও ইসলামফোবিয়ার জায়গা নেই। একই সাথে কালোদের বিরুদ্ধে অথবা সেমিটিক বিরোধী কোনো প্রচারণাকে কানাডার সরকার এবং জনগণ কঠোর ভাবে ঘৃণা করে। তিনি আরো বলেছেন, যে বা যারা কোনো ধর্মের বিরোধিতা করে বা কোনো দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচারণা করে, প্রমাণ সাপেক্ষে কানাডার আদালত চিহ্নিত ঐ দোষী গ্যাংকে শাস্তি দিতে পারে।

কানাডার মেগাসিটি টরেন্টোর পাবলিক পরিবহণের বর্তমান চেয়ারম্যান মি. জামাল মায়ার্সের সাথে প্রতিবেদক ফজল মুহাম্মদ
টিটিসি কানাডার একটি সর্ব বৃহত্তম পাবলিক পরিবহণ সংস্থা।১৯২১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এই পরিবহণ সংস্থা কাজ শুরু করে।তখন এর নাম ছিল Toronto Transporation Commission এবং ঐ সময়ে এটা পুরোপুরি বেসরকারী ছিল। ১৯৫৪ সালে এই পরিবহণ সংস্থার নামকরণ করা হয় Toronto Transit Commission (TTC) এবং টরেন্টো মহানগরী জনসাধারণের জন্যে এটা সরকারী ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে টিটিসির আঠারো হাজার কর্মকর্তা এবং কর্মচারী রয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টিটিসির প্রতিটি বাসে, ট্রেনে, চব্বিশ ঘন্টা ক্যামেরা সচল থাকে। এছাড়াও কর্মচারীদের জন্য বডি ক্যামেরা লাগানো থাকে। সবুজ প্রকৃতিকে রক্ষার জন্য এখন টিটিসির সকল যানবাহণ গুলোকে বৈদ্যুতিক শক্তিতে পরিচালনা করা হচ্ছে। কানাডার সবচেয়ে বড় এবং ব্যয় বহুল এই পরিবহণ সংস্থার ২০২৬ সালের বার্ষিক বাজেট তিন বিলিয়ন ডলার। এটা শুধু পরিচালনা খরচ। উন্নয়ণ বাজেট আলাদা ভাবে বরাদ্দ থাকে। টিটিসির বর্তমানে পাঁচটি রেপিড লাইন, ৭৪টি সাবওয়ে স্টেশন, ৪৩ টি লাইট রেল ট্রেইন স্টপেজ, ১৬৭ টি বাস রুট, ১১টি স্ট্রীটকার লাইনস রয়েছে। ২০২৫ সালে টিটিসি আশি কোটি দুই লাখ বারো হাজার যাত্রীকে সেবা দিয়েছে তথা পরিবহন করেছে।

কানাডার মুসলিম মাইনরিটি পুস্তকের তথ্য যোগাড়ে টিটিসির চেয়ারম্যান মি. জামাল মায়ার্স এর এই সাক্ষাতকার চলতি সালের ১৪ ই মার্চ রেকর্ড করা হয়ে। মি. মায়ার্স বর্তমানে টরেন্টো সিটির ২৩ নং ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলর এবং বিগত তিন বছর যাবত টিটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মুসলিম কম্যুনিটির সাথে সম্পর্ক উন্নয়ণে মি. জামাল মায়ার্স বিগত তিন বছর যাবত উনার সরকারী অফিস ১৫০ বোরো ড্রাইভ সিটি স্বারবোরো দফতরে ইফতার মাহফিল আয়োজন করে আসতেছেন। যেখানে টরেন্টোর মেয়র অলিভিয়া চেও সহ তিন জন লোকাল সিটি কাউন্সিলর হাজির থাকেন এবং বক্তব্য রাখেন। সিটি হল আয়োজিত ইফতার মাহফিলে টরন্টো মহানগরীর বিভিন্ন মসজিদের ইমাম, বিভিন্ন প্রধান প্রধান ইসলামী সংগঠনের নেতাগণ উপস্থিত থাকেন। মি. মায়ার্স টরেন্টোর ক্যাথলিক ইস্কুল থেকে হাই ইস্কুল গ্রাজুয়েশন শেষ করে অন্টারিও ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট হয়েছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করেছেন। এরপর আইন বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন। বিলাতে কানাডার কূটনৈতিক মিশনে বেশ কয়েক বছর চাকুরি করেছেন। আমি যখন তাকে প্রশ্ন করি, মি. মায়ার্স আপনি কী আগামী সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হবেন? জবাবে হেসে দিয়ে বলেছেন, আমি আগামী ইলেকশনে একই কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।মি. জামাল মায়ার্স কানাডার অন্যতম বৃহত্তম ইসলামী সংগঠন‘ইসলামী সার্কেল অব নর্থ আমেরিকার’ স্বারভো এলাকার সিটি পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযানে প্রতি বছর সশরীরে অংশগ্রহণ করে থাকেন।
আমি যখন সাত তারকা রাষ্ট্রের অন্যতম কানাডা একটি দেশ এই উপমা দিয়ে মি. মায়ার্সকে প্রশ্ন ছুড়ে দেই মি. কাউন্সিলর দুনিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় আপনার কানাডার তথা এই টরেন্টো মেগা সিটির পরিবহণ সংস্থা অপ্রতুল। তখন মি. জামাল মায়ার্স একটু বিব্রত হয়ে যান এবং একটু দম নিয়ে জবাব দেন। তিনি বলেন, আমরা টিটিসির যাত্রী সেবা দানে সেরাএবং যাত্রীদের নিরাপত্তা ও আমাদের স্টাফদের নিরাপত্তার শত ভাগ চেষ্টা করি। দিনে দিনে কানাডার এই মেগা সিটি টরেন্টোর জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে। আমরা অচিরেই ২০৩০ সালের মধ্যে টরেন্টো মহানগরীতে টিটিসির সেবার পরিধি লাইন বাড়াবো। ইতিমধ্যে লাইন পাঁচ এর কাজ শেষ হচ্ছে। এছাড়াও অন্টারিও প্রাদেশিক সরকার আরো নতুন নতুন লাইন তৈরি শুরু করেছে যাহা সহজেই টরেন্টো বাসীকে অন্যান্য শহরের সাথে যাতায়াতে অনেক বাড়তি সুবিধা দেবে। আমি (লেখক) দুই হাজার সালের ২১শে জুন থেকে কানাডার এই বৃহত্তম মহানগরী টরেন্টোতে পরিবারসহ বসবাস করে আসছি। এই দীর্ঘ ছাব্বিশ বছরের টরেন্টো শহরের অন্যতম পাবলিক পরিবহন সেক্টরে অনেক মাল্টি ইথনিক কর্মচারীকে চাকুরি করতে দেখতে পাচ্ছি। এখন টিটিসির বাস, ট্রেনে আর সাবওয়ে স্টেশনে বিপুল সংখ্যক এশিয়া, আফ্রিকার মানুষ কাজ করে যাচ্ছে। অনেক মুসলিম নারী এখন হিজাব পড়েও টিটিসিতে কাজ করতে সক্ষম হচ্ছেন। টিটিসির পরিহবন খাতে চীনা, ফিলিপাইন, হিন্দুস্তানী, পাকিস্তানী, বাংলাদেশী, আফগানী,আরব,আফ্রিকার বিচিত্র ভাষাভাষী মানুষেরা এখন চাকুরি করতে পারেন। কানাডার অভিবাসন আইনের সুবিধা নিয়ে সারা দুনিয়া থেকে এখন ঝাকে ঝাকে মানুষ ইমিগ্রশন নিয়ে কানাডাতে আগমন করেছে। অনেকে ছাত্র হিসেবে এসে পড়াশুনা শেষ করে এই কানাডাতে থেকে যাচ্ছে। কানাডা একটি অতি উন্নত রাষ্ট্র। বিশ্বের বিভিন্ন অধিবাসীগণ এই শহরে নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। ঐসব দেশের মানুষজন ওদের বিচিত্র খাবার আর কালচার নিয়ে আসছেন। আজকাল কানাডার এই টরেন্টো মহানগরীতে ইমিগ্রেশন মানুষের জয় জয়কার। বাদামী আর কালো চামড়া মানুষ এই টরন্টো শহরে শতকরা হিসেবে ৮৩% শতাংশ। আর এই বর্ণের প্রতিফলন হচ্ছে যাত্রী পরিবহন টিটিসির প্রতিদিনের রোজনামচায়।
টরন্টো থেকে। ১৪ ই জুলাই ২০২৬ এ লেখা।
ফজল মুহাম্মদ ফজল মুহাম্মদ ১৪ ই জুলাই ২০২৬। টরন্টো কানাডা থেকে মি. জামাল মায়ার্স