আমলহীন দাওয়াতের পরিণতি


৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৬:১০

॥ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবু হানিফ খান ॥
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা যা কর না, তা তোমরা কেন বল? আল্লাহর দৃষ্টিতে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ব্যাপার যে, তোমরা বলবে এমন কথা, যা তোমরা কর না’। (সূরা আস-সফ : ২-৩)। দাঈ ইলাল্লাহর জন্য আল-কুরআনের এই সতর্কবাণী খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক দাঈ ইলাল্লাহ যেমন দাওয়াতদানে তৎপর থাকবেন, তেমনে দাওয়াতের কথা নিজে আমল করতেও সচেষ্ট থাকবেন। আমলবিহীন দাওয়াতদানের ব্যাপারে ভয়াবহ পরিণতির কথা আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসে বহুবার বর্ণনা করা হয়েছে এবং সঠিক পথে দাওয়াতদানের ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় পুরস্কারের কথাও বলা হয়েছে। দাঈ ইলাল্লাহর দীনের দাওয়াতের কাজ হতে বিরত থাকার ইসলামে যেমন সুযোগ নেই, তেমনি আমলবিহীন দাওয়াতদানের সুযোগও ইসলামে নেই।
দাওয়াতদানে কঠোর নির্দেশ : দীনের দাওয়াতদানের ব্যাপারে শ্রেষ্ঠ রাসূল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও মহান আল্লাহ তায়ালা কঠোর সতর্কবার্তা জানিয়েছেন, ‘হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাজিল হয়েছে, তা প্রচার করুন, যদি না করেন। তবে তো আপনি তার বার্তা প্রচার করলেন না।
আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফির সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না’। (সূরা আল-মায়েদা : ৬৭)। গণমানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহেলি যুগে যুল-মাজায বাজারে গিয়ে জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘হে লোক সকল! তোমরা বল, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এতে তোমরা সফলতা লাভ করবে’। অ
াবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) হতে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার কথা পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি এক আয়াতও হয়। আর বনী ইসরাঈলের ঘটনাবলী বর্ণনা কর। এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছে করে আমার ওপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্দিষ্ট করে নিল’। (বুখারি)।
দাওয়াত অনুযায়ী আমল করা : দাওয়াতের কাজ সঠিকভাবে করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— দাঈ ইলাল্লাহ তার দাওয়াত অনুযায়ী নিজে যথাযথ আমল করবেন। অর্থাৎ দীনের আহ্বায়ক যে আদর্শের দিকে লোকদের ডাকবেন; নিজে সে বিষয়ের প্রতি গভীর বিশ্বাস পোষণ করবেন, আমলে পরিণত করবেন এবং মন-মানসিকতায় তার প্রতি গভীর আশ্বস্ত থাকবেন। দাওয়াতের বিষয়ের বিশুদ্ধতা, সীমা ও প্রভাব সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত থাকবেন। একইসাথে অন্যের মাঝে যাতে দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য সৃষ্টি হয়; তার জন্য দৃঢ় আশাবাদী থাকবেন। এ প্রসঙ্গে হজরত হাসান বিন আলী রা.-এর একটি ঘটনা প্রণিধানযোগ্য। তিনি এক বক্তার ভাষণ শুনছিলেন, কিন্তু তা তার কাছে ভালো লাগেনি। তাতে তিনি বক্তাকে লক্ষ করে বললেন, ‘হয় তোমার অন্তরে পাপ আছে; নয় আমার অন্তরে’। আমলবিহীন দাওয়াত যেমন উদ্দীষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব সৃষ্টি করে না, তেমনি মহান আল্লাহ তায়ালার নিকটও তা অত্যন্ত অপছন্দের কাজ।
আমলহীন দাওয়াতের পরিণতি : দাঈ ইলাল্লাহর জন্য আমলহীন দাওয়াত সম্পর্কে সতর্ক এবং অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির কথা বলা হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে দাঈ ইলাল্লাহ সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কি মানুষকে সৎকর্মের নির্দেশ দাও এবং নিজেরা নিজেদের ভুলে যাও, অথচ তোমরা কিতাব পাঠ কর। তবুও কি তোমরা চিন্তা কর না?’ (সূরা বাকারা : ৪৪)। আমলহীন দাওয়াতদাতার পরিণতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, উসামা (রা.) বললেন, আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে আনা হবে।
অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তখন আগুনে পুড়ে তার নাড়িভুঁড়ি বের হয়ে যাবে। এ সময় সে ঘুরতে থাকবে যেমন গাধা তার চাকা নিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকে। তখন জাহান্নামবাসীরা তার নিকট একত্রিত হয়ে তাকে বলবে, হে অমুক ব্যক্তি! তোমার এ অবস্থা কেন? তুমি না আমাদের সৎকাজের আদেশ করতে আর অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতে? সে বলবে, আমি তোমাদের সৎকাজের আদেশ করতাম বটে, কিন্তু আমি তা করতাম না আর আমি তোমাদের অন্যায় কাজ হতে নিষেধ করতাম, অথচ আমিই তা করতাম। (সহীহ বুখারী)।
কথায়-কাজে মিল থাকতে হবে : আনাস (রা.) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মিরাজের রাতে আমি বহু লোককে দেখেছি যে, তাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাইল! এরা কারা? জিবরাইল (আ.) বললেন, এরা আপনার উম্মাতের মধ্যে বক্তাগণ, যারা লোকেদের ভালো কাজের আদেশ করত; কিন্তু নিজেদের ভুলে যেত। অর্থাৎ নিজেরা সৎকাজ করত না। (শারহুস্ সুন্নাহ্ ও বায়হাক্বী’র ‘শুআবুল ঈমান’-৫১৪৯)।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি— (১) যখন কথা বলে মিথ্যা বলে; (২) যখন অঙ্গীকার করে ভঙ্গ করে এবং (৩) আমানত রাখা হলে খিয়ানাত করে। (মুসলিম)। অপর বর্ণনায়, আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে হবে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়— (১) আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে। (২) কথা বললে মিথ্যা বলে। (৩) চুক্তি করলে ভঙ্গ করে এবং (৪) বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালি দেয়। (সহীহ বুখারী)।
দাওয়াতে প্রদর্শনেচ্ছার পরিণতি : আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তিকে বিচারের জন্য পেশ করা হবে সে হবে একজন শহীদ। তাকে আল্লাহর নিকট নিয়ে যাওয়া হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে স্বীয় নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। তারপর আল্লাহ তাকে জিজ্ঞেস করবেন, এসব নিয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ? সে উত্তরে বলবে, আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য যুদ্ধ করেছি; এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ; বরং তুমি লড়াই করেছ এজন্য যে, তোমাকে বাহাদুর বলা হবে। এমনকি তোমাকে তা বলাও হয়েছে। অতএব তার ব্যাপারে আদেশ করা হবে। তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
অতঃপর ওই ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যে নিজে ইলম শিক্ষা করেছে ও অপরকে শিক্ষা দিয়েছে এবং কুরআন অধ্যয়ন করেছে। আল্লাহ তাকে তাঁর নিয়ামত স্মরণ করাবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে।
অতঃপর আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, এই নিয়ামতের জন্য তুমি কী আমল করেছ? সে বলবে আমি ইলম শিক্ষা করেছি এবং অপরকে শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন অধ্যয়ন করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ।
বরং তুমি এজন্য ইলম শিক্ষা করেছ, যেন তোমাকে বিদ্বান বলা হয় এবং এজন্য কুরআন পড়েছ যাতে তোমাকে ক্বারী বলা হয়। তোমাকে বিদ্বান ও ক্বারী বলা হয়েছে। অতঃপর তার সম্পর্কে আদেশ করা হবে। তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর এমন ব্যক্তিকে বিচারের জন্য উপস্থিত করা হবে, যাকে আল্লাহ বিপুল সম্পদ দান করেছেন। আল্লাহ প্রথমে তাকে তার নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন এবং সেও তা স্মরণ করবে। অতঃপর তাকে জিজ্ঞেস করবেন এসব নিয়ামতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছ? সে বলবে, যেসব ক্ষেত্রে সম্পদ ব্যয় করাকে আপনি পছন্দ করেন তা হাতছাড়া করিনি। আপনার সন্তুষ্টির জন্য সবক্ষেত্রেই সম্পদ ব্যয় করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এ জন্য দান করেছ যে, তোমাকে দানবীর বলা হবে। এমনকি তোমাকে তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্পর্কে আদেশ করা হবে, তাকে উপুড় করে টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’ (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত)।
দাওয়াত না দেওয়ার শাস্তি : দীনের জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি দীনের দাওয়াতদানে বিরত থাকলে তার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, এক রাতে আমি স্বপ্নে দেখলাম, দুজন ফেরেশতা আমার হাত ধরে বায়তুল মুক্বাদ্দাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমি রাস্তায় কতগুলো আশ্চর্যজনক দৃশ্য দেখলাম। তার মধ্যে একটি দৃশ্য দেখলাম যে, একজন আলিমের মাথা পাথর দিয়ে মেরে ভেঙে চৌচির করা হচ্ছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, অতঃপর আমাকে এমন এক ব্যক্তির নিকটে নিয়ে এলেন, যে ব্যক্তি চিৎ হয়ে শুয়ে আছে এবং একজন ব্যক্তি বড় পাথর হাতে নিয়ে তার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। যখন পাথরটি তার মাথায় মারছে, তখন তার মাথা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং পাথরটি ছিটকে দূরে চলে যাচ্ছে। লোকটি পাথরটি নিয়ে আসার জন্য সেদিকে যাচ্ছে। পাথর নিয়ে আসার পূর্বেই তার চূর্ণবিচূর্ণ মাথা ঠিক হয়ে যাচ্ছে এবং যেমন ছিল তেমন হয়ে যাচ্ছে। পুনরায় সে ফিরে আসছে এবং তার মাথায় মারছে। … পরবর্তীতে ফেরেশতাদ্বয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, ওই যে আপনি দেখলেন, এক ব্যক্তির মাথাকে ভেঙে চৌচির করা হচ্ছে সে ব্যক্তি একজন আলিম।
আল্লাহ তাকে বিদ্যা দান করেছিলেন কিন্তু সে রাতে ঘুমিয়ে থাকত বিদ্যা চর্চা করত না এবং দিনে বিদ্যা অনুযায়ী আমল করত না। আপনি যেমন দেখলেন, এরূপ তার শাস্তি চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত’ (বুখারী, মিশকাত)। এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ যাদের ইলম দান করেছেন, তাদের রাতে বিদ্যাচর্চা করতে হবে এবং বিদ্যা অনুযায়ী আমল করতে হবে। অর্থাৎ অপরকে আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে হবে এবং দাওয়াত অনুযায়ী নিজেকে আমল করতে হবে। যেসব দীনের আলিম বা দাঈ ইলাল্লাহ ইলম অনুযায়ী আমল করে না কিয়ামত পর্যন্ত তাদের মাথাকে পাথর দ্বারা ভেঙে চৌচির করা হবে।
ভ্রান্ত দাওয়াতে তিরস্কার : দাঈ ইলাল্লাহর জন্য পুরস্কারের পাশাপাশি তিরস্কারের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোনো ব্যক্তি যদি বিদ্যাবিহীন অবস্থায় ফতোয়া প্রদান করে, আর ওই ফতোয়া অনুযায়ী যত লোক আমল করবে, তাদের সব আমলের পাপ ফতোয়া প্রদানকারীর ওপর বর্তাবে। যে ব্যক্তি তার কোনো মুসলিম ভাইকে এমন কাজের ইঙ্গিত করে যে, সে জানে কল্যাণ এটি ব্যতীত অন্যটিতে রয়েছে, তবে সে তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল।’ (আবু দাউদ, মিশকাত)।
অন্য হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি সঠিক পথের দিকে ডাকে, তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য পরিমাণ ঘাটতিও হবে না। আর যে ব্যক্তি বিভ্রান্তির দিকে ডাকে, তার ওপর সেই রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য পরিমাণও হালকা করা হবে না। (সহীহ মুসলিম, আবু দাউদ)।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর দীনের যোগ্য দাঈ হিসেবে কবুল করুন। আমিন।