পালাবদল নয়, প্রত্যাশা ব্যবস্থার বদল
৫ নভেম্বর ২০২৬ ১৫:৫৩
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
আগামী ৯ নভেম্বর সোমবার থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এই অধিবেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন একসময়ে সংসদের এই অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নানা ধরনের সংকট ক্রমেই গভীর হচ্ছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিপর্যয়, খেলাপি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, বিনিয়োগ ও উৎপাদনে সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিচারাঙ্গনে ন্যায়বিচারের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ— সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ক্রমেই একটি জটিল সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
ইতোমধ্যে গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে বিভিন্ন অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, পক্ষপাতিত্ব এবং নির্বাচন কমিশনের একগুঁয়েমি ও হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে চিত্র জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে, তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্নের অবতারণা করেছে। নির্বাচনের মাঠে সংঘটিত এসব ঘটনা এবং নির্বাচন পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশ এখনো স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে যে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছিল, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের অভিজ্ঞতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার একটি গভীর ব্যবধান তুলে ধরেছে।
এমনই এক তিক্ত নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখে আগামী ৯ নভেম্বর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই অধিবেশন কেবল সংসদের নিয়মিত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নয়; বরং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি সুদৃঢ় করা, নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংসদের ভূমিকা কতটা কার্যকর হবে, তা মূল্যায়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের আন্দোলন দমনের ঘটনা উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গত ১ নভেম্বর রোববার থেকে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের হামলা, গ্রেপ্তার এবং লাঠিপেটার যেসব দৃশ্য জাতি প্রত্যক্ষ করেছে, তা গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও আন্দোলন মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এমন আচরণ অতীতের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার স্মৃতিই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শ্রমিকের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, জনগণের সামনে আশার প্রদীপ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। সরকার ইতোমধ্যে তার কার্যকালের সাড়ে আট মাস অতিক্রম করেছে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে রাষ্ট্র সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা কিংবা জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দৃশ্যমান হয়নি। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্যে প্রধান বিরোধীদলকে লক্ষ করে যে ধরনের ভাষা ও রাজনৈতিক আক্রমণ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, রাজনীতিতে পুরোনো প্রতিহিংসা ও সংঘাতের সংস্কৃতি থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি।
এমন একটি বাস্তবতায় আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন জাতির কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এই অধিবেশন কেবল সংসদীয় কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা রক্ষার অধিবেশন নয়; বরং রাষ্ট্র সংস্কার, গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংসদের কার্যকর ভূমিকা প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সংসদ প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে রক্তাক্ত ইতিহাস ও জনগণের প্রত্যাশা
আবারও স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বহু আন্দোলন, সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে এই সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর পেছনে রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ ও বেদনাবিধুর অধ্যায়। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এ দেশের মানুষের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছিল। মানুষ রাষ্ট্রের প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামোর পরিবর্তন, গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল।
সেই প্রেক্ষাপটে জনগণের প্রত্যাশা ছিল— রাষ্ট্র সংস্কার হবে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্য দিয়ে মানুষ তার হারানো অধিকার ফিরে পাবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে সংবিধান ও আইনের অধীনে পরিচালিত হবে। ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্তৃত্ববাদী শাসন, দলীয়করণ ও দুর্নীতির পথ বন্ধ হবে।
এই সংসদের কাছে জনগণের প্রধান প্রত্যাশা ছিল, এটি কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রতিনিধিত্ব করবে না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করবে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার সরকার পরিবর্তিত হয়েছে, সংসদ গঠিত হয়েছে, সংসদ ভেঙে গেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন হয়েছে, সংবিধানও একাধিকবার সংশোধিত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামোয় এমন কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি, যার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের দলীয়করণ, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং সংসদের দুর্বলতা থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
এ কারণেই জনগণের প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্রব্যবস্থা ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক শাসন থেকে প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে।
প্রশ্ন ছিল— সংবিধান কি ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছা বাস্তবায়নের দলিল হিসেবে ব্যবহৃত হবে, নাকি জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার সর্বোচ্চ আইনি ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে?
জাতীয় সংসদ কি সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, নাকি স্বাধীন বিতর্ক, কার্যকর জবাবদিহি এবং জনস্বার্থে আইন প্রণয়নের কেন্দ্রে পরিণত হবে? রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কি সংবিধান ও আইনের অধীনে স্বাধীনভাবে কাজ করবে, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাবের অধীনেই পরিচালিত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই জনগণ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দিকে তাকিয়ে আছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার সংকট
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, সরকার পরিবর্তন হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তিত হয়েছে; এমনকি সংবিধানেও একাধিকবার সংশোধনী আনা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের দলীয়করণ, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সংসদের কার্যকর জবাবদিহির প্রশ্নগুলো বারবার সামনে এসেছে।
দুঃখজনকভাবে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং বিভিন্ন সময়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতা থেকে জনগণের প্রত্যাশা হচ্ছে— ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এমন একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে, যা শুধু বর্তমান সরকারের জন্য নয়, ভবিষ্যতে যে দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদেরও সাংবিধানিক সীমার মধ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে বাধ্য করবে। অর্থাৎ এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, যেখানে কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকার রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার একক নিয়ন্ত্রকে পরিণত হতে পারবে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করবে। সংসদ সরকারের ওপর নজরদারি করবে। বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে বিচারিক দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে। প্রশাসন দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে আইন ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে।
অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার সব সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পথ বন্ধ করাই হওয়া উচিত এই সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের এগারোটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে, জুলাই সনদে তার বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক প্রতিফলন রয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এই প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার ভারসাম্য, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হচ্ছে—
১. প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা : প্রধানমন্ত্রীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করে নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর কার্যকর সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২. প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ-সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা : রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে দীর্ঘদিন ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার সুযোগ সীমিত করার জন্য কার্যকর মেয়াদ-সংক্রান্ত বিধান প্রণয়ন করতে হবে।
৩. রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা ও ভূমিকার পুনর্বিন্যাস : রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক অবস্থানকে আরও কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে— যাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা অর্থবহ হয়।
৪. নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা : অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি সুস্পষ্ট করতে হবে।
৫. নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা : নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, কার্যক্রম ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. সংসদের উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা : দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আইন প্রণয়নে দ্বিতীয় কক্ষের ভূমিকা নির্ধারণ করতে হবে। এর মাধ্যমে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা, ভারসাম্য ও প্রতিনিধিত্বের পরিসর বাড়বে।
৭. সংসদে বিরোধীদলের কার্যকর অংশগ্রহণ : ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে বিরোধীদলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে সংসদে ক্ষমতাসীন ও বিরোধীদলের মধ্যে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি হবে।
৮. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা : বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, বিচারক নিয়োগের স্বচ্ছতা এবং বিচারপ্রাপ্তির কার্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৯. মৌলিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা : মতপ্রকাশ, সভা-সমাবেশ, সংগঠন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকের অন্যান্য মৌলিক অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত করতে হবে।
১০. স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী করা : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর, ক্ষমতায়িত ও আর্থিকভাবে সক্ষম করতে হবে— যাতে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
১১. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি : জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
এই প্রস্তাবগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রের কোনো একটি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি কিংবা রাজনৈতিক দলের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে না দেওয়া। একটি কার্যকর পদ্ধতিগত ব্যবস্থার মাধ্যমে সুশাসন, স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করাই এর লক্ষ্য।
সাড়ে আট মাসেও সংস্কারের দৃশ্যমান অগ্রগতি কোথায়?
প্রশ্ন হচ্ছে— ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ইতোমধ্যে সাড়ে আট মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান ও কার্যকর অগ্রগতি কতটুকু?
জনগণের প্রত্যাশা ছিল, সংসদ তার সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে রাষ্ট্র সংস্কারের কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ফলে মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
মানুষ যখন প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে গভীর ব্যবধান দেখতে পায়, তখন হতাশা তৈরি হয়। হতাশা থেকে জন্ম নেয় অস্থিরতা। আর সেই অস্থিরতা যখন রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয় এবং সংসদের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জনগণের ন্যায্য দাবি ও প্রত্যাশাকে দীর্ঘদিন উপেক্ষা করার পরিণতি কখনোই ভালো হয়নি। ভবিষ্যতেও তা ভালো হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আজ যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের উপলব্ধি করতে হবে যে রাষ্ট্রক্ষমতা জনগণের আমানত। জনগণের অধিকার ও প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে না।
সরকারের উচিত বিরোধীদলের সঙ্গে সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে সময় ব্যয় না করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলোর সমাধানে সংসদকে কার্যকর করা। অন্যথায় জনগণের মধ্যে সৃষ্ট হতাশা আরও গভীর হতে পারে এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
সংবিধান সংশোধন নয়, প্রয়োজন মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের যে উদ্যোগ গ্রহণ করছে, তা দিয়ে কি জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব?
সংবিধান সংশোধন এবং সংবিধান সংস্কার এক বিষয় নয়। সংবিধান সংশোধন বলতে সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ, বিধান কিংবা ধারায় পরিবর্তন আনাকে বোঝায়। অন্যদিকে সাংবিধানিক সংস্কারের লক্ষ্য হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক কাঠামো, ক্ষমতার বণ্টন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের সুরক্ষায় একটি সুদূরপ্রসারী ও কার্যকর পরিবর্তন আনা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে সংবিধান বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এক সরকার সংবিধানে পরিবর্তন এনেছে, পরবর্তী সরকার এসে সেই পরিবর্তনের কোনো কোনো অংশ বাতিল করেছে কিংবা নতুন করে পরিবর্তন এনেছে। এভাবে সংবিধান রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটানোর একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এই ধারার অবসান ঘটানো জরুরি
এমন একটি সাংবিধানিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে সরকার আসবে, সরকার যাবে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং জনগণের মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ন থাকবে। কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে যেন নিজের দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তন করতে না পারে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত, সুদূরপ্রসারী ও অংশগ্রহণমূলক সাংবিধানিক সংস্কার। শুধু কয়েকটি অনুচ্ছেদ সংশোধন করে কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে এই প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়।
৯ নভেম্বরের অধিবেশন থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশন রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এই অধিবেশন থেকেই সাংবিধানিক সংস্কারের একটি সুস্পষ্ট সময়সূচি ঘোষণা করা জরুরি। জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, কোন বিষয়গুলোয় সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন, কোন বিষয়গুলোয় নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং কোন প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা হবে— এসব বিষয়ে সংসদে সুস্পষ্ট আলোচনা হওয়া উচিত।
সরকার ও বিরোধীদলকে উপলব্ধি করতে হবে, সংসদ কোনো দলের একক সম্পত্তি নয়। এটি সমগ্র জাতির প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বিরোধীদলের মতামত, সমালোচনা ও বিকল্প প্রস্তাবেরও সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
সংসদকে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন, নীতিনির্ধারণ এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশের সামনে আজ যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং সাংবিধানিক সংস্কারের বাস্তবায়ন।
মনে রাখতে হবে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সেই আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে কেবল ক্ষমতার পালাবদল ঘটালে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
জনগণ আর কোনো ব্যক্তি বা দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেখতে চায় না। তারা এমন একটি রাষ্ট্র চায়, যেখানে সরকার আইনের অধীন থাকবে, সংসদ সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে, বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে এবং নাগরিক তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে।
এই প্রত্যাশা পূরণে আগামী ৯ নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চতুর্থ অধিবেশনকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের একটি সুস্পষ্ট পথনকশা এই অধিবেশন থেকেই তৈরি করতে হবে।
কারণ রাষ্ট্র সংস্কারের এই সুযোগ যদি আবারও হারিয়ে যায়, তাহলে তার দায় শুধু বর্তমান সরকারের ওপরই বর্তাবে না; ইতিহাসের কাছে সমগ্র রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই জবাবদিহি করতে হবে।
সরকার পরিবর্তনই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করাই গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য, যেখানে কোনো সরকারই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে না।
লেখক : আইনজীবী ও কলামিস্ট।