রাজধানীজুড়ে তীব্র গণপরিবহন সংকট

বিশৃঙ্খল অটোরিকশায় তীব্র যানজট


১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৩৬

অনুমোদিত ৪১৮ বাস রুটের ৩২০টি অচল
ঢাকাজুড়ে আন্তঃপরিবহন বাসের চলাচল, তৈরি করছে তীব্র যানজট

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
রাজধানীজুড়ে তীব্র গণপরিবহন সংকটে নাকাল সাধারণ মানুষ। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, কিংবা সাধারণ নাগরিক সবার কর্মঘণ্টা সড়কেই নিঃশেষ হচ্ছে ভালো পরিবহন স্বল্পতায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত বাস। অপরদিকে এ সুযোগে শত শত অটোরিকশা রাস্তা দখল করে গলা কাটছে সাধারণ মানুষের। তৈরি করছে তীব্র যানজট আর বিশৃঙ্খল রাস্তা।
বর্তমানে রাজধানীজুড়ে যাত্রীদের এ নাভিশ্বাস চরমে পৌঁছেছে। নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশার অসহনীয় দাপট আর বিশৃঙ্খল পরিবহন সেক্টর রাজধানীর নাগরিক জীবন বিষিয়ে তুলেছে। রাস্তায় চলাচল যেন এক আতঙ্কের নাম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রোডের বাস কিংবা সিএনজি। এ সুযোগে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা দখল করেছে নগরীর রাস্তা। কী ভিআইপি, কী এলাকার অলি গলি, সব জায়গায় অটোরিকশার দাপট। বর্তমানে শহর কিংবা গ্রাম সব সড়কেই তৈরি হচ্ছে এ বিশৃঙ্খল অবস্থা। অটোরিকশার দুর্দমনীয় চালনায় নিরাপদ সড়ক এখন ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুশীল সমাজসহ সাধারণ মানুষের পক্ষ হতে দাবি উঠছে এদের দ্রুত কঠোর নিয়ন্ত্রণের।
অনুমোদিত ৪১৮ বাস রুটের ৯৮টি সচল
ঢাকায় সাধারণ মানুষের জন্য বিভিন্ন রুটের বাস সার্ভিস কমতে কমতে বর্তমানে ৯৮টিতে এসে ঠেকেছে। নগর পরিবহন বাসের অনুমোদিত ৪১৮টি বাস রুটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র চালু আছে ৯৮টি। আর অচল হয়ে আছে ৩২০টি রুট। ফলে ঢাকার এক প্রান্ত হতে আরেক প্রান্তে যেতে সাধারণ মানুষের কর্মঘণ্টা ও অর্থ— দুটিই বেশি খরচ হচ্ছে। সাথে চরম ভোগান্তি আর পদে পদে হয়রানি যুক্ত হচ্ছে।
রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় বাসের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ আফিল উদ্দিন জানান, ঢাকায় আছি ২৫ বছর। কিন্তু বর্তমান সময়গুলোয় রাস্তায় এমন ভোগান্তি আর হয়নি। বিভিন্ন রোডের জনপ্রিয় বাস সার্ভিসগুলো এখন বন্ধ। এ নিয়ে সরকার বা কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা নেই। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থেকেও পাচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের বাস।
একইভাবে নগরীর কাওরান বাজার এলাকায় গত ১২ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যায় লাব্বায়েক বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন অফিসফেরত বিলকিস বেগম। তিনি বলেন, খিলগাঁও হয়ে সাইন বোর্ড চলাচলকারী এটিই একমাত্র বাস। এ রোডে আর কোনো বাস নেই। ফলে যাত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে এ বাসটির জন্য। অনেক সময় আমাদের মতো মহিলা বা বৃদ্ধ মানুষ উঠার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। সাধারণ মানুষের এ সকল কষ্ট ও ভোগান্তি দেখার কেই নেই। কার কাছে মানুষ বলবে তাদের সমস্যার কথা।
পরিবহনে এমন বিশৃঙ্খলা পৃথিবীর কোথাও নেই
দীর্ঘদিন ইউরোপে কাটিয়েছেন ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা সালেহ রহমান। সেখানকার গণপরিবহনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ঢাকার বাসের মতো বিশৃঙ্খল ব্যবস্থা পৃথিবীর আর কোনো দেশে আপনি পাবেন না। এমনকি আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলোয় ‘বুশ ট্যাক্সির’ নামে যে ভাঙাচোরা সেডান কার বা মাইক্রোবাসগুলো যাত্রী বহন করে, সেগুলোও শৃঙ্খলার দিক থেকে ঢাকার পরিবহনের চেয়ে অনেক উন্নত।
ইউরোপের বেশিরভাগ বাস বা ট্রাম স্টপগুলোয় জানা যায় কতক্ষণের মধ্যে বাহনটি এসে পৌঁছাবে। এটা করতে খুব অল্প টাকার ডিভাইস বা অ্যাপ দরকার হয়। আবার অনেক জায়গায় যাত্রীরা এমনিই দাঁড়িয়ে থাকেন। বাস এসে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যাত্রীদের তুলে নিয়ে রওনা দেয়। কারণ বাস কোম্পানি জানে, যার যাওয়ার সে যাবেই। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি করার কিছু নেই।
নব্বই দশকের শেষে ঢাকার একটি মোটরগ্যারেজে কাজ করতেন মফিজুর রহমান। তিনি বলেন, গুলিস্তান সিনেমা হলের পাশ থেকে বাসগুলো ছাড়ত। তার আগে সহকারীরা যাত্রী সংগ্রহের জন্য হাঁকডাক করত। কিন্তু এত বছর পরও রাজধানীর নগর পরিবহনের একই অবস্থা। বর্তমানের হেলপারদের ভাষ্য, “রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে ডাকাডাকি না করলে যাত্রী উঠবে কী করে। গাড়ির সিস্টেমই এমন। পেছনে একই রুটের গাড়ি থাকলে হেলপার সিগন্যাল দিবে। এক রুটের গাড়ি বেশি হইলে কন্ডাক্টর আবার খ্যাচ-খ্যাচ শুরু করে, ‘গ্যাপ ধরতে’ বলে। তখন এক জায়গায় মাথা বাইর কইরা পইড়া থাকতে হয়।”
‘এখন আমি গ্যাপ ধরছি, আমার আগে অন্য গাড়ি চইলা গেলে আবার গ্যাপের প্যাসেঞ্জার ওই গাড়ি উডাইবো, এইডা আবার হইতে দেওন যাইবো না। তহন পিছনের গাড়ির ড্রাইভার আইসা আমার বাম্পারে গুঁতাইবো।’
এক হেলপার উজ্জ্বল বলেন, এই গুঁতাগুঁতির কারণে ঢাকার বাসগুলোর বাইরের দিক (বডি) অল্পদিনেই এবড়োখেবড়ো হয়ে পুরো গাড়ি লক্কড়ঝক্কড় হয়ে যায়। তারপর আছে ঢাকার ধুলো। বাসকর্মীরা গাড়ি পরিষ্কার করাটাকেও কর্তব্য বলে মনে করে না।
বাসচালকদের একজন মফিজুর রহমান বলেন, ‘চলতে শুরু করার পর গ্যাপ ধরা নিয়ে শুরু হয় পাড়াপাড়ি। যে আগে যাবে, যাত্রী বেশি সেই তুলতে পারবে।’
বাসচালকরা জানান, গ্যাপ ধরা মানে একই রুটের দুটি গাড়ির মাঝখানে একটা নির্দিষ্ট সময় বিরতি রাখা। যাতে কিছু যাত্রী জমে যায় এবং চালক তার বাসে তাদের তুলতে পারে।
ঢাকার বাসে দীর্ঘদিন হেলপার হিসেবে কাজ করা কয়েকজন জানান, যখন আপনি চুক্তিতে গাড়ি ড্রাইভার-হেলপারের কাছে ছাইড়া দেবেন, তখন ওরা গাড়ি রাস্তার ওপর রাইখা গ্যাপ বানাবে। ওদের কারণে আমাদেরও চলতে সমস্যা। ওরা নিজেরাও রাস্তায় পইড়া থাকবে, আমাদের গাড়িও যাইতে দেবে না। ফলে সবার ভোগান্তি।
সরকার গেলে পরিবহন শুধু হাতবদল হয়
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তনের আশা দেখছেন না রাজধানীর মেঘলা পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম। বাসটি কলাবাগান হতে ভুলতা পর্যন্ত চলে। জনপ্রিয় এ সার্ভিসটি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। ঢাকার বাসে ‘চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট ব্যবস্থা রয়ে গেছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, পরিবর্তন বললেই তো হবে না। মানুষের পরিবর্তন লাগবে। পরিবহনে শুধু হাতবদল হইছে। এনায়েতুল্লাহরা (ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতুল্লাহ) গেছে, কিন্তু অন্যরা চলে আসছে। যে আশায় তরুণরা প্রাণ দিয়েছিল, সেটি ছিনতাই হয়ে গেছে। এ জাতির ভাগ্যে কী আছে, আল্লাহই জানে।
ঢাকার বাস চলাচলের চিত্র তুলে ধরে এই বাস মালিক বলেন, ঢাকার বাসের ক্ষেত্রে দৈনিক জমার ভিত্তিতে চালক-হেলপারের কাছে বাস দেওয়া ছাড়া আয় পাওয়ার কার্যকর কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। গাড়ির ব্যবসায় নেমে ক্ষতির মুখে পড়ে অনেকেই ব্যবসা ছেড়েছেন।
আমরা ‘ওয়েবিল’ ব্যবস্থা শুরু করেছিলাম। কিন্তু এটি সঠিকভাবে কাজ করেনি। আর ভালো দিক ছিল কতজন যাত্রী ক্যারি করতেছি বিষয়টা জানতে পারতাম। ‘এরপর এনায়েত খন্দকাররা ভাড়া আদায়ের একটা ‘পজ মেশিন’ চালু করল। ওটা একটা ডিজিটাল চাঁদাবাজি। পজ মেশিনের জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে টাকা দিতে হতো। আবার এমনি টাকা তো নিতই। আমরা পজ মেশিন চালুর পর পুরো বিজনেসটা চলে গেল ড্রাইভার-হেলপারদের হাতে। তারা মালিককে যে টাকা দেয় সেটাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই ব্যবসা থেকে সরে গেলেন। আমরা অনেক কোম্পানি বন্ধ করলাম।’ এসব ব্যাপারে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ‘বাধ্য হয়ে মালিকরা দৈনিক জমার ভিত্তিতে বাস দিতে বাধ্য হন। আবার অনেক মালিক ঝামেলা এড়াতে গাড়ির তেল-মোবিল, মেরামতির একটা অংশ, পথখরচ (চাঁদা, ঘুষ) সবকিছুই ড্রাইভারের ওপর ছেড়ে দিয়ে জমা হিসাব করেন। এর ফলে চালকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।’
ঢাকার গাবতলীর ওয়ার্কশপ মালিক মো. বাবুল আগের ৮ নম্বর রুট ও ভুঁইয়া পরিবহনের ব্যানারে চলাচলকারী দুটি বাসের মালিক। তিনি বলেন, ‘৮ নম্বর বাসগুলোর সবই চালক ও হেলপারদের কাছে চুক্তিতে দেওয়া। প্রতিদিন ২৩শ’ থেকে ২৫শ’ টাকা পান মালিকেরা। আবার ভুঁইয়া পরিবহন চলে ওয়েবিল সিস্টেমে। এখানে ডেইলি বেসিসে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা ইনকাম আছে।’
ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি পরিচিত শব্দ ‘জিপি’। যার মানে ‘গেট পাস’ হলেও এটা এক ধরনের চাঁদা। কোনো ব্যানারের অধীনে তাদের নির্ধারিত বা রুট পারমিটধারী গাড়িগুলোর বাইরে অতিরিক্ত গাড়ি চললে সেগুলোকে প্রতিদিন জিপি দিতে হয়। প্রত্যেকটা ব্যানার (কোম্পানির আওতায়) ও রুটে এরকম প্রচুর গাড়ি চলে।
তিনি বলেন, ‘আগে জিপি দিতে হইত ৮০০ হতে হাজার টাকা। এখন সেটা চার-পাঁচশ’ টাকায় নামছে। চুক্তিতে গাড়ি দিলে জিপির খরচ চালকের আর ওয়েবিল হিসেবে চললে কোম্পানি জিপি কাইটা পরে টাকা হিসাব কইরা দেয়।’
ঢাকাকে ৩২টি রুটে রূপান্তরের প্রস্তাব
ঢাকার বিভিন্ন রুটে ব্যক্তিমালিকানাধীন ও বিভিন্ন কোম্পানির বাস চলাচল করে। ছোট ছোট রুট এবং একাধিক রুটের মধ্যে ওভারল্যাপিংয়ের কারণে যাত্রী ওঠানো নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যানজট ও দুর্ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি বদলাতে সচল রুটগুলো সমন্বয় করে ৩২টি রুটে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত রুটের প্রায় ৭০ শতাংশ বিদ্যমান রুটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গত ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বাস রুট পুনর্বিন্যাস, কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা, বাস স্টপেজ উন্নয়ন, টিকিট ব্যবস্থায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাসের মান উন্নয়নসহ গণপরিবহনের বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় প্রতিটি রুটে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির বাস চলবে। ব্যক্তিমালিকানায় বাস পরিচালনার পরিবর্তে অনুমোদিত কোম্পানির অধীনে বাস চালানোর সিদ্ধান্তও হয়েছে। বাসের ফিটনেস, চালকের আচরণ, শৃঙ্খলা ও আইন মেনে চলার দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে।
যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ তৈরি ও উন্নয়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের বিবরণসহ বাস স্টপেজের তালিকা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পাঠানো হবে। তিন মাসের মধ্যে স্টপেজগুলোর নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব স্টপেজে যাত্রী ছাউনি ও নিরাপত্তার ব্যবস্থাও থাকবে।
বাস পরিচালনায় কাউন্টারভিত্তিক টিকিটের পাশাপাশি ই-টিকিটিং চালু এবং প্রতিটি বাসে জিপিএস ট্র্যাকার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে বাস চলাচল পর্যবেক্ষণ ও যাত্রীসেবায় শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্য রয়েছে।
ঢাকার সড়কে চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও জীর্ণ বাসের কারণে দুর্ঘটনা ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে বলে সভায় আলোচনা হয়। এসব বাসের প্রয়োজনীয় যান্ত্রিক মেরামত এবং ডেন্টিং-পেইন্টিংয়ের জন্য মালিকদের দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মেরামত না করা বাস চলাচল করতে পারবে না। এক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সভায় বিভিন্ন মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জব্দ করা প্রায় ৩৬ হাজার যানবাহন ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। দীর্ঘদিন এসব যানবাহন পড়ে থাকায় জায়গার সংকট তৈরি হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। দ্রুত নিলাম বা অন্য আইনি প্রক্রিয়ায় যানবাহন নিষ্পত্তির জন্য সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন রুটে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ঢাকার আটটি রুটে এসব বাস চালানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), বিআরটিসি ও বাস মালিক সমিতির সঙ্গে সমন্বয় করে উপযুক্ত রুট চূড়ান্ত করা হবে।
সরকারি গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সংস্থাকে ছয় মাসের সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে পাঠাতে বলা হয়েছে। ২০২৭ সালের ১৫ এপ্রিলের মধ্যে সিদ্ধান্তগুলোর দৃশ্যমান ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
গণপরিবহন সংকটে নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা
নিরাপদ সড়ক চাই এর মহাসচিব লিটন এরশাদ জানান, ঢাকার বাইরে ব্যাটারিচালিত অটোর কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে ৪৯ শতাংশ। তিনি বলেন, ‘এই তথ্য বলছে, অটোর কারণে সড়কে নিরাপত্তাহীনতার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মোট দুর্ঘটনার প্রায় অর্ধেক ঘটছে অটোর কারণে। দেশে মোট দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়িয়ে দিয়েছে এই অটো।’
লিটন এরশাদ বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত অটো কোনো গণপরিবহন হতে পারে না। এর সারা গায়ে লোহা। একেক রকম আকার-আকৃতি। গায়ে লাগুক বা অন্য কোনো ধাতব বস্তুতে, এর আঘাত ক্ষত তৈরি করে। এর গতি নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। ব্রেকও কাজ করে না। মানুষ বাধ্য হয়ে অটোরিকশায় চড়ছে।
অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্যানুযায়ী অটোতে দুর্ঘটনার কারণ মোট দুর্ঘটনার ৩৩ শতাংশের মতো। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৭ হাজার ৫৮৪টি। নিহত হয়েছে ৭ হাজার ৩৫৯ জন এবং আহত ১৬ হাজার ৪৭৬ জন। এর মধ্যে থ্রি-হুইলারের যাত্রী রয়েছে ১ হাজার ৩৭৬ জন বা ১৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানায়, ব্যাটারিতে উৎপন্ন বিদ্যুৎচালিত অটোতে দুর্ঘটনায় নিহতের অনুপাত ২০২৩ সালে ২০.৫২ শতাংশ, ২০২৪ সালে ২১.০১ শতাংশ এবং ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ছিল ১৯.৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে ২০২৩ সালের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে ব্যাটারিচালিত অটো-সংশ্লিষ্ট ৯০০টি দুর্ঘটনা ঘটে, যার ৫৮২টি গুরুতর।
ঢাকা মহানগরীতে অটোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনা, নিহত ও আহত কিংবা অটোচালকদের অপরাধপ্রবণতা; বিশেষ করে ছিনতাই নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান নেই ডিএমপিতে। ডিএমপি (ট্রাফিক) ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মিনা মাহমুদা বলেন, এমন তথ্য আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয় বলে আমার জানা নেই।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর প্রভাবে এ রোডে মানুষের কিছুটা স্বস্তি এসেছে। তবে ঢাকার সামগ্রিক যানজট কিংবা ভোগান্তি কমেনি। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত গাড়িকে প্রাধান্য না দিয়ে বাস, রেল ও গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। পথচারীকে প্রাধান্য দিয়ে হাঁটার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। তাহলেই মানুষের ভোগান্তি কমবে। কিন্তু আজও বাংলাদেশে গণপরিবহনের উন্নতিতে সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।