লেজুড়বৃত্তিক প্রশাসন

ক্যাম্পাসে অস্থিরতা


১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৩৫

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় অস্থিরতা কাটছে না। বন্ধ হচ্ছে না শিক্ষার্থী নির্যাতন ও হয়রানি। ফলে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন না তাদের ন্যায্য অধিকার। নিশ্চিত হচ্ছে না গুণগত শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ। অস্থিরতা ও অনিশ্চতায় কাটছে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রম, বিঘ্নিত হচ্ছে উচ্চতর গবেষণা। আর এমন পরিস্থিতির জন্য লেজুড়বৃত্তির প্রশাসনিক কাঠামো ও বিএনপি সরকারের নীতি এবং সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের অপকৌশল দায়ী।
দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক ঘটনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ছাত্র-শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণ ও সংঘর্ষের নেপথ্যে বিএনপি সরকারের নীতি ও ছাত্র সংগঠনের আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি জড়িত বলে গণমাধ্যমের খবরে উঠে এসেছে। বর্তমান সরকার অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন আটকে রেখেছে। আবার যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের মেয়াদ সম্প্রতি শেষ হয়েছে সেগুলোয় নির্বাচন দিচ্ছে না, ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে হতাশা, ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে এবং বিভিন্ন সময় আন্দোলনেও নামছে।
সরকারের অদূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ক্যাম্পাসে অস্থিরতা
সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগকে কেন্দ্র করে। সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টির ভিসি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে গত ২১ সেপ্টেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সরকারের এমন সিদ্ধান্ত চুয়েটের শিক্ষার্থীরা মেনে নেয়নি। ফলে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে অধ্যাপক আবু সাদাতকে পুনর্বহালের দাবিতে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীরা। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘কর্মবিরতি’ পালন করে আসছেন। সৃষ্টি হয় অচলাবস্থার। বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা। সরকারের অদূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে এমন সংকটের তৈরি হয়েছে। নতুন ভিসি দায়িত্ব গ্রহণের পরও আন্দোলনের মুখে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে না পেরে অবশেষে গত ১২ অক্টোবর সোমবার চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতিসহ নেতাদের সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে শিক্ষার্থীদের দেয়া তালা ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করেন এবং শিক্ষার্থীরা আবার তাদের অবরুদ্ধ করে ফেলে। ভবনের বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে দেন তারা। প্রায় ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ডিসি-এসপির সঙ্গে ক্যাম্পাস ছাড়েন ভিসি, চুয়েট শাখা ছাত্রদলের নেতা ও অ্যালামনইসহ ১২ জন। পরে হাসপাতালের বেডে থেকে একটি ভিডিও বার্তা দেন চুয়েট ভিসি।
ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, আমরা চরম অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছি। দুজন অ্যালামনাই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিমান উল্লেখ করে কারো স্বার্থে ব্যবহৃত না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, আমি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে চট্টগ্রামে এসেছি, ব্যক্তিগত স্বার্থ কিংবা কোনো দলের স্বার্থে চট্টগ্রামে আসিনি।
এদিকে চুয়েটের ভিসিকে ক্যাম্পাসে প্রবেশে সহায়তা করা এবং আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আরাফাত রহমানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে গত ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিবৃতি দিয়েছে চুয়েট শিক্ষার্থীরা।
চুয়েটের শিক্ষার্থী ফখরুল ইসলাম জানান, ভিসি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সরানো হয়েছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। আর সদ্য নিয়োগ পাওয়া অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের মদদে স্থানীয় বিএনপির নেতারা গত ১২ অক্টোবর শিক্ষার্থীদের বাসে হামলা চালিয়েছে। ভিসি শেখ শরীফুল আলম পরিচয় গোপন করে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছে। এছাড়া চুয়েটের শিক্ষার্থীরা অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করেনি।
ক্যাম্পাসে পেশি শক্তি ব্যবহার করার সংস্কৃতি ছাত্রদলের নতুন নয়, অনেক পুরোনো। কিন্তু চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর ছাত্রদলের সেই পেশিশক্তির প্রয়োগকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা পাত্তা দিচ্ছেন না, প্রতিরোধ করছে। চুয়েটে দলীয় আধিপত্য বিস্তার করতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নতুন নিয়োগ পাওয়া ভিসিকে সাথে নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ছাত্রদলের নেতারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।
বিএনপির মবে পদত্যাগে বাধ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি
বিএনপি ক্ষমতায় আসার মাত্র সাড়ে সাত মাসের মাথায় মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে পদত্যাগে বাধ্য করা ও হেনস্তা করে ভিসির দফতর থেকে বের করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত ৬ অক্টোবর রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) ভিসি প্রফেসর ড. মো. জাওয়াদুল হকের সাথে এ ঘটনা ঘটে। দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন না করায় তাকে এমন পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয়। পরে অবশ্য বিএনপির সেই অভিযুক্ত নেতাকে মামলায় গ্রেফতার করা হয়। একই সঙ্গে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু গত ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে ভিসি প্রফেসর ড. মো. জাওয়াদুল হককে তার দফতরে নিয়ে যান এবং তার চেয়ারে বসান।
প্রশাসনের গা-ছাড়া ভাব, সহিংসতার শিকার শিক্ষার্থীরা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গা-ছাড়া ভাবে শিক্ষার্থীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়াসহ নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। গত ৪ অক্টোবর পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার সাংবাদিক আহত হয়। এ ঘটনায় সরাসরি সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের পদস্থ নেতারা জড়িত। ওই দিনের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টরিয়াল টিম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ হামলার সময় পুলিশ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের রক্ষায় এগিয়ে আসেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিমও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।
হামলায় আহত সাংবাদিকরা হলেন— বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান কোরবান, দৈনিক আগামীর সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলাম, দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল ও দৈনিক সমকালের মাঈনুল ইসলাম রাজু।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রদলের নেতারা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়ে লোহার এসএস পাইপ দিয়ে বেদম মারধর করছে। এমন ঘটনার পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নাম উল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে চালানো এই হামলার সিসিটিভি ভিডিও ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগ ওঠে।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে করা মামলায় হামলাকারীদের ‘অজ্ঞাতনামা’ করা হয়েছে। তাদের দাবি ছিল, হামলার ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ভিডিও দেখে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব হলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শিক্ষার্থীরা হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী তাদের ছাত্রত্ব বাতিলের দাবি জানান তারা।
রাবি শিক্ষার্থী ইরফান তামিম বলেন, ‘ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও অজ্ঞাতনামা মামলা করে রাবি প্রশাসন হাস্যরসাত্মক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নাম মেনশন (উল্লেখ) করে অভিযুক্ত ছাত্রদল নেতাদের নামে মামলা করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) সাংবাদিক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), দলটির ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) পৃথক বিবৃতিতে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানিয়েছে। একইসঙ্গে অবিলম্বে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘সাংবাদিকদের ওপর হামলার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত ভূমিকা পালন করেছে। গত ২৩ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও একই কায়দায় শাহবাগ থানার ভেতরে ডাকসু নেতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা করে ছাত্রদল। সেই ঘটনায় নির্লজ্জ নির্লিপ্ততার পরিচয় দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দলকানা প্রশাসন। বিএনপি ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা সংবাদমাধ্যমকে ভয় পায়। এজন্য একের পর এক সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে।
রাবির এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালিয়েছে, যা গণমাধ্যমের প্রকাশিত ভিডিওতে স্পষ্ট।
তিনি বলেন, বিভ্রান্তিমূলক তথ্য কিংবা ঘটনাকে ভিন্ন কালার দিয়ে আসল অপরাধীদের আড়াল করার কোনো চেষ্টা চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে আর কল্পনার সুযোগ নেই। কারণ জনগণ সকল কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছে।
বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোয় অস্থিরতা ও নানা ইস্যুতে যতগুলো আন্দোলন হয়েছে তার সবগুলোতেই সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিংবা সরকার সমর্থিত শিক্ষকদের অনিয়মের বিরুদ্ধে হয়েছে। দলান্ধ কিংবা লেজুড়বৃত্তির প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চবিদ্যাপীঠগুলোয়— এমন অভিযোগ শিক্ষার্থীসহ শিক্ষাবিদদের।