জ্বালানি সংকট উত্তরণে সৌরশক্তি সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:২২
জীবাশ্ব জ্বালানি অফুরন্ত নয়। পরিবেশের জন্যও জীবাশ্ব জ্বালানি মারাত্মক হুমকি। এর উৎসও সব দেশে নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জ্বালানির সিংহভাগই বিদেশ থেকে উচ্চমূল্যে আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজার অস্থির হলে তার প্রভাব পড়ে আমাদের ওপর। এছাড়া সম্প্র্রতি ডলার সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে আমাদের দেশের অর্থনীতির ওপর। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে আজ একে একে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে শিল্প-কারখানা, যা আমাদের সামগ্রিক উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের জন্য এক বড় হুমকি।
এই সংকট থেকে মুক্তির একমাত্র ও কার্যকর পথ হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানি; বিশেষ করে সৌরশক্তি। আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সারা বছরই পর্যাপ্ত সূর্যালোক পাওয়া যায়, যা সোলার পাওয়ার প্লান্ট স্থাপনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। জ্বালানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের বিশাল অব্যবহৃত খোলা জায়গা; বিশেষ করে চা-বাগানগুলোর টিলা কিংবা উপকূলীয় চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিভিন্ন সময়ে উল্লেখ করেছেন যে, জীবাশ্ব জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের সামনে কোনো বিকল্প নেই। একইভাবে এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার ম্যাগাজিনের সম্পাদক মোল্লা আমজাদ হোসেনের মতো জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চর ও পতিত জমিতে বৃহৎ পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করলে তা কেবল জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাবে না, বরং শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেও বিপ্লব ঘটাতে পারবে।
আমরা মনে করি, চা-বাগানগুলোর মালিকপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব অঞ্চলের ছায়াহীন স্থানে সোলার প্যানেল স্থাপন করা সম্ভব। এতে গ্রিড বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে আসবে এবং চা শিল্পসহ অন্য কারখানাগুলো কম খরচে ও পরিবেশবান্ধব উপায়ে শক্তি পাবে। তাছাড়া দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় চরে— যেখানে সাধারণ কৃষিকাজ সীমিত, সেখানে সোলার পার্ক স্থাপন করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে মতামত কলামে উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ চা সংসদের কর্তাব্যক্তিদের বয়ানে জানা গেল যে, এই চা-বাগানগুলোর ৫০-৫২ শতাংশ জমিতে টেকনিক্যালি চা উৎপাদন সম্ভব, বাকি জমির প্রধান অংশে চা জন্মানো প্রাকৃতিকভাবেই সম্ভব নয়। কারণ এসব জমিতে সরাসরি সূর্যের আলো বেশি পড়ায় এগুলোয় চা-গাছ বাঁচতে পারে না। তারা সরকারের কাছে দাবি করেছেন যে, এ ধরনের জমিতে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি প্রদান করে তাদের লিজ-ডকুমেন্ট সংশোধন করা হলে দুই-তিন বছরের মধ্যেই চা-বাগানগুলোতে সোলার প্যানেল স্থাপন করে দেশের বিদ্যুৎ গ্রিডে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ যোগ করা সম্ভব হবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে জেগে ওঠা চরাঞ্চলসমূহ, দেশের সমুদ্র উপকূল এবং নদনদী ও খালগুলোর দুই পাড়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনাটিও খতিয়ে দেখা হোক। বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানায় যে কয়েকশ’ চরাঞ্চল গড়ে উঠছে, সেগুলোয় জনবসতি গড়ে ওঠার আগেই ওগুলোয় যদি বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ-কাম-বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা অগ্রাধিকার-সহকারে বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে অত্যন্ত সাশ্রয়ী পন্থায় কয়েক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই সম্ভব হবে। আমরা বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত খবরে জানতে পেরেছি, জার্মানি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বাংলাদেশকে বিপুলভাবে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। এ সুযোগ আমরা কাজে লাগাতে পারি। যদিও অনেকে নষ্ট স্বল্পতার কথা বলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। তবে বাংলাদেশে জমির তুলনামূলক স্বল্পতার প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে, যদি দেশের বিশাল সমুদ্র উপকূলে একইসঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন প্লান্ট স্থাপনের ব্যবস্থা করা হয়। সমুদ্র উপকূলের কথা জার্মানি বলেছে। আমি এর চেয়েও সম্ভাবনাময় মনে করি বঙ্গোপসাগরে নতুন জেগে ওঠা চরাঞ্চলগুলোকে। এগুলোয় মানববসতি নেই, তাই ভূমি অধিগ্রহণের কোনো ঝামেলাই হবে না। উপরন্তু উৎপাদিত বিদ্যুৎ সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে দেশের মূল ভূখণ্ডের বিদ্যুৎ গ্রিডে নিয়ে আসাও খুব বেশি ব্যয়সাধ্য হওয়ার কথা নয়। সোলার পাওয়ার উৎপাদনে যথাযথ অগ্রাধিকার দিলে আমদানি করা তেল এবং এলএনজির আন্তর্জাতিক দামের ওঠানামা সামাল দেওয়ার অজুহাতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রয়োজন পড়বে না।
এখনই সময় জীবাশ্ব জ্বালানির উচ্চমূল্যের বোঝাপড়া থেকে বেরিয়ে সোলার এনার্জির মতো টেকসই ও সবুজ জ্বালানিনীতি গ্রহণ করার। নীতিনির্ধারকদের এখনই দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে চা-বাগান এবং চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে বৃহৎ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই দেশ জ্বালানি সংকট থেকে মুক্তি পাবে এবং অর্জিত হবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা।