ইসলামের দৃষ্টিতে পিতা-মাতার হক ও সন্তানের দায়িত্ব


২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫৪

॥ আব্দুস সাত্তার সুমন ॥
একটি পরিবারের কথা বলা যাক। পরিবারের বাবা মারা গেলেন। রেখে গেলেন স্ত্রী, সন্তান এবং ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের বড় ছেলের ওপর এসে পড়ল সংসারের বড় দায়িত্ব। তখন তার নিজেরও সংসার হয়েছে, স্ত্রী আছে, সন্তান আছে। কিন্তু নিজের সংসারের পাশাপাশি মায়ের দায়িত্ব, ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্বও তাকে নিতে হলো।
বাবার রেখে যাওয়া সংসার তো আর থেমে থাকতে পারে না। বড় ছেলে নিজের উপার্জন থেকে মায়ের চিকিৎসা, ছোট ভাই-বোনের লেখাপড়া, খাবার-পোশাকসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে থাকলেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানের অনেক প্রয়োজন হয়তো সবসময় পূরণ করতে পারেননি। তাদের কিছু আবদার অপূর্ণ থেকেছে। স্ত্রীও হয়তো কখনো কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু সেই মানুষটি তখন নিজের আরামের কথা না ভেবে পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
ইসলামের ইতিহাসেও এমন একটি ঘটনা পাওয়া যায়। সাহাবী জাবির ইবন আবদুল্লাহ রা.-এর বাবা ইন্তেকাল করেন এবং কয়েকজন কন্যাসন্তান রেখে যান। জাবির রা. তাদের দায়িত্বের কথা চিন্তা করে এমন একজন নারীকে বিয়ে করেন, যিনি তাদের দেখাশুনা করতে পারবেন। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর এই সিদ্ধান্তের কথা শুনে তাঁর জন্য বরকতের দোয়া করেন। (সহিহ বুখারি : ৫৩৬৭)।
এই ঘটনা আমাদের দেখায়, পরিবারের অসহায় সদস্যদের দায়িত্ব নেওয়া ইসলামে তুচ্ছ বিষয় নয়। তবে একইসঙ্গে নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের অধিকারও ভুলে যাওয়া যাবে না। ইসলাম প্রত্যেকের হক আদায়ের শিক্ষা দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করো।’ (সূরা আল-বাকারা : ৮৩)।
আর সূরা আল-ইসরায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমার রব নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তিনি ছাড়া কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না এবং তাদের ধমক দিও না; তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।” (সূরা আল-ইসরা : ২৩)।
এরপরের আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘হে আমার রব! তাদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সূরা আল-ইসরা : ২৪)।
লক্ষ করার বিষয় হলো, আল্লাহ তায়ালা এখানে শুধু পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে বলেননি; বিশেষভাবে বার্ধক্যের সময়ের কথা বলেছেন। কারণ মানুষ যখন বৃদ্ধ হয় তখন তার শক্তি কমে যায়, উপার্জনের ক্ষমতা কমে যায় এবং অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন বাড়ে। তাই কোনো বাবা বৃদ্ধ হয়ে গেলে তার সন্তানদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
কেউ বলতে পারে, আমাদের জন্ম দেওয়া বাবার দায়িত্ব ছিল। আমাদের পড়াশোনা করানো, খাওয়ানো, পোশাক দেওয়া সবই তো তাঁর দায়িত্ব ছিল। কথাটি এক দিক থেকে সত্য। সন্তানদের ভরণ-পোষণ বাবার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু ইসলাম দায়িত্বকে একমুখী করে দেখেনি। সন্তান যখন অসহায় থাকে তখন বাবা-মা তার দায়িত্ব নেন। আর বাবা-মা যখন বার্ধক্যে দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন সন্তান তাদের প্রতি ইহসান করবে এটাই কুরআনের শিক্ষা। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তুমি এবং তোমার সম্পদ তোমার পিতার জন্য। (সুনান ইবনে মাজাহ : ২২৯১)।
এই হাদিসের অর্থ এমন নয় যে, বাবা সন্তানের সব সম্পদের মালিক হয়ে যাবেন। বরং পিতা প্রয়োজনগ্রস্ত হলে সন্তানের সম্পদ থেকে তার প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতার বিষয়টি এখানে স্পষ্ট হয়। অন্যদিকে মায়ের মর্যাদাও ইসলামে অত্যন্ত উচ্চ। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা. কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার উত্তম ব্যবহারের সবচেয়ে বেশি হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা। লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। তৃতীয়বারও বললেন, তোমার মা। চতুর্থবার জিজ্ঞেস করলে বললেন, তোমার বাবা। (সহিহ বুখারি : ৫৯৭১; সহিহ মুসলিম : ২৫৪৮)। অর্থাৎ মায়ের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, কিন্তু বাবার অধিকারও সুস্পষ্ট।
তাহলে যদি কোনো পরিবারে মায়ের প্রয়োজন হলে সন্তানরা খরচ করে, কিন্তু বাবা বৃদ্ধ হওয়ার পরও কিছু আয় করেন বলে তাঁর প্রয়োজনের সময় কেউ এগিয়ে না আসে, বিষয়টি নতুন করে ভাবা দরকার। বাবা আয় করছেন এটাই শেষ কথা নয়। প্রশ্ন হলো— সেই আয় দিয়ে কি তাঁর প্রয়োজন এবং পরিবারের প্রয়োজন যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে?
যদি একজন বৃদ্ধ বাবা সামান্য আয় করেন, কিন্তু সেই আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটানো কঠিন হয়ে যায়, তাহলে সামর্থ্যবান সন্তানদের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো। এটা বাবার প্রতি দয়া দেখানো নয়; বরং নিজের দায়িত্ব ও কৃতজ্ঞতার পরিচয়। তবে এখানেও ইসলামের ভারসাম্য রয়েছে। একজন পুরুষের ওপর তার স্ত্রী ও সন্তানদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব আছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, সর্বোত্তম সদকা হলো যা নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত থেকে করা হয় এবং যাদের ভরণ-পোষণ তোমার দায়িত্ব, তাদের দিয়ে শুরু কর। (সহিহ বুখারি : ৫৩৫৬)।
সুতরাং সন্তানকে বাবার সহযোগিতা করতে গিয়ে নিজের স্ত্রী-সন্তানের মৌলিক অধিকার নষ্ট করতে হবে এমন কথা ইসলাম বলেনি। আবার স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব আছে বলে বৃদ্ধ বাবাকে একেবারে ভুলে যেতে হবে এ কথাও ইসলাম বলেনি। দুটি দায়িত্বকে সামর্থ্য অনুযায়ী সুন্দরভাবে সামলাতে হবে।
যে বাবা নিজের বাবার মৃত্যুর পর বড় ছেলে হিসেবে মা ও ছোট ভাই-বোনদের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তিনি হয়তো নিজের স্ত্রী ও সন্তানদের অনেক চাওয়া পূরণ করতে পারেননি। তার জীবনে হয়তো কিছু ভুলও ছিল। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব পালনের চাপে নিজের স্ত্রী-সন্তানকে সময় দিতে পারেননি। সেই বিষয়টি আলাদাভাবে বিচার করা যেতে পারে। কারণ স্ত্রী ও সন্তানদেরও ন্যায্য অধিকার রয়েছে। কিন্তু আজ সেই মানুষটি যখন বৃদ্ধ, তখন তাঁর জীবনের আগের ত্যাগগুলোও সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া কি ন্যায়সংগত?
যে বাবা নিজের মায়ের জন্য খরচ করেছেন, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ দিয়েছেন, বোনের বিয়ের সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন, পরিবারের প্রয়োজনে নিজের আরাম বিসর্জন দিয়েছেন আজ তাঁর নিজের উপার্জন কমে গেলে সন্তানরা যদি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বলেন, আপনি তো আয় করেন, আপনার খরচ আপনি চালাবেন তাহলে অন্তত কোরআনের ইহসান-এর শিক্ষা তাদের নতুন করে ভাবা উচিত।
আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করো না; আর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করো।’ (সূরা আন-নিসা : ৩৬)। আর সূরা লুকমানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমার প্রতি এবং তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও।’ (সূরা লুকমান : ১৪)।
কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথায় প্রকাশ পায় না। বাবা-মা যখন প্রয়োজনের মধ্যে থাকেন, তখন তাদের পাশে দাঁড়ানোও কৃতজ্ঞতার একটি বাস্তব প্রকাশ। রাসূলুল্লাহ সা. আরও বলেছেন, সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, কার, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার একজন অথবা উভয়কে বৃদ্ধ বয়সে পেল, তারপরও জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। (সহিহ মুসলিম : ২৫৫১)।
এই হাদিসের শিক্ষা খুব গভীর। পিতা-মাতার বার্ধক্যকে ইসলাম শুধু দুর্বলতার সময় হিসেবে দেখেনি; বরং সন্তানের জন্য নেকি অর্জনের একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখেছে। তাই মায়ের জন্য খরচ করব, বাবার জন্য করব এভাবে বিষয়টিকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব দিয়ে দেখা ঠিক নয়। আবার বাবার জন্য করতে গিয়ে নিজের স্ত্রী-সন্তানের ন্যায্য অধিকারও নষ্ট করা যাবে না।
পরিবারের সামর্থ্য অনুযায়ী দায়িত্ব ভাগ করা যেতে পারে। এক সন্তান বাবার চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে পারে, আরেকজন মাসিক খরচে সহযোগিতা করতে পারে, অন্য কেউ বাজার বা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দায়িত্ব নিতে পারে। মূল কথা হলো বৃদ্ধ বাবাকে যেন নিজের প্রয়োজনের জন্য সন্তানদের কাছে হাত পাততে না হয়, অথচ সন্তানদের সামর্থ্য আছে।
একজন বাবা সারা জীবন শক্ত থাকবেন না। একসময় তাঁর আয় কমবে, শরীর দুর্বল হবে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমবে। তখন সন্তানের আচরণেই বোঝা যাবে সে শুধু বাবার কাছ থেকে পাওয়ার সময় সন্তান ছিল, নাকি বাবার প্রয়োজনের সময়ও সন্তান হয়ে থাকতে পেরেছে।
ইসলাম পরিবারে কারও হক নষ্ট করতে বলে না। স্ত্রীর হক আছে, সন্তানের হক আছে, মায়ের হক আছে, বাবারও হক আছে। তবে পিতা-মাতার ক্ষেত্রে কুরআন যে ভাষায় ইহসান, সম্মান ও দয়ার কথা বলেছে, সেটিকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
একজন বৃদ্ধ বাবা যদি সামান্য আয় করেও পরিবারের জন্য চেষ্টা করে যান, কিন্তু সেই আয় দিয়ে সংসারের প্রয়োজন পূরণ না হয়, তাহলে সামর্থ্যবান সন্তানদের এগিয়ে আসাই উত্তম।
কারণ বাবা যখন তরুণ ছিলেন, তখন হয়তো তিনি ভেবেছিলেন আমার মা যেন কষ্ট না পান, আমার ছোট ভাই যেন পড়াশোনা করতে পারে, আমার বোন যেন ভালো থাকে। আজ সেই বাবা বৃদ্ধ। এখন সন্তানের মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমার বাবা যেন কষ্টে না থাকেন, তাঁর প্রয়োজন যেন অপূর্ণ না থাকে আমি কী করতে পারি? এই পরিবর্তনটাই একটি পরিবারের সৌন্দর্য।
বাবা-মায়ের জন্য সন্তান যা করে, সেটি শুধু খরচ নয়; সেটি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ। আর বাবা-মায়ের বার্ধক্যে পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয় এটি আল্লাহর দেওয়া একটি সুযোগ, যার মাধ্যমে সন্তান দুনিয়ায়ও সম্মান পেতে পারে এবং আখিরাতের জন্যও নেকি অর্জন করতে পারে।
লেখক : মানিকদি, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, বাংলাদেশ।