কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে এখনো অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষা
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৫০
আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ : বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা কিশোরগঞ্জ। এই জেলাটি ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। ১৩টি উপজেলার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার চারটি উপজেলাকে অনেক আগেই হাওর উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করেছে। হাওর উপজেলাগুলো হলো— নিকলী, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও ইটনা। এই উপজেলাগুলো এমনিতেই জেলার অন্যান্য উপজেলার চাইতে বিভিন্ন দিক থেকে অবহেলিত। তন্মধ্য শিক্ষা খাত অন্যতম। এই চারটি হাওর উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রধান শিক্ষক এবং সহকারী শিক্ষকের অনেকগুলো পদ শূন্য থাকায় প্রাথমিক শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে শিক্ষা অফিসগুলোর সূত্র জানা গেছে।
শিক্ষক স্বল্পতার পাশাপাশি রয়েছে আবাসন সমস্যা। ওয়াস ব্লক জনিত সমস্যার কারণে ঝুঁকিতে পড়েছে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা। অবিলম্বে প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকদের শূন্য পদগুলো পূরণ করার দাবি জানিয়েছে হাওর অঞ্চলের মানুষ।
সরেজমিন দেখা গেছে, জেলার হাওর অঞ্চলের চারটি উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন চিত্র ধরা পড়েছে।
জেলার অন্যতম হাওরা জনপদ নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম এই চার উপজেলায় সর্বমোট ৩১টি ইউনিয়ন রয়েছে। চারটি হাওর উপজেলায় লোকসংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে সরকারি ২৯০টি, ও কিন্ডারগার্টেন রয়েছে ৫৩টি।
এই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় শিক্ষক সংকটে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
অধিকাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষকের পদশূন্য থাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষাকার্যক্রমসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম। এছাড়া বেশকিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে শ্রেণি সংকট। শ্রেণি সংকটের কারণে কোনো কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে বসানো হয়। বিদ্যালয়ে দুই শিফটে ক্লাস নিতে হয়। হাওরের চারটি উপজেলায় বর্তমানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৬২ হাজার ৪৫৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত রয়েছে। বেশিরভাগ স্কুলগুলোয় বিনোদনের ব্যবস্থা নেই, খেলার মাঠ নেই। ওয়াশরুম এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম থাকা শিক্ষার্থীরা রয়েছে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে। শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, চারটি উপজেলায় ২৯০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এর মধ্যে ১০৮ জন প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন। প্রধান শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ১৮২টি।
১ হাজার ৫৪২ জন সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন ১ হাজার ৩৭৭ জন। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ রয়েছে ১৬৫টি।
এই সকল শূন্য পদের কারণে হাওর উপজেলাগুলোয় নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে বলে স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষকরা জানান।
অষ্টগ্রাম উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, এই উপজেলায় আটটি ইউনিয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭ হাজার তিনশত। ৮৩ জন প্রধান শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত আছেন ২৫ জন। প্রধান শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে ৫৩টি। এই উপজেলায় ৪১০টি সরকারি শিক্ষকের পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছে ৩৯১ জন সহকারী শিক্ষকের পদ খালি আছে ১৯টি।
নিকলী শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে ৬০টি। এর মধ্যে ২৭টিতে প্রধান শিক্ষক কর্মরত থাকলেও ৩৩টি প্রধান শিক্ষকের পদ খালি রয়েছে। সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩৩১টি এর মধ্যে কর্মরত আছে ৩১১ জন। সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে ২৮টি। এই উপজেলায় কিন্ডারগার্টেনসহ মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১৬ হাজার ৩৪ জন।
ইটনা উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা ৯টি ইউনিয়নে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রয়েছে ৭২টি। এই উপজেলায় বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ হাজার ৬২৯ জন। ৭২ জন প্রধান শিক্ষকের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৬ জন প্রধান শিক্ষক। পদ শূন্য রয়েছে ৪৬টি। সহকারী শিক্ষক পদে ৩৭২ জনের মধ্যে কর্মরত রয়েছেন ৩৪৪ জন। সহকারী শিক্ষকের পদ খালি ২৮টি।
মিঠামইন উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৭৫টি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত প্রধান শিক্ষকের সংখ্যা ২৫ জন পদ শূন্য রয়েছে ৫০টি। সহকারী শিক্ষকের পদ রয়েছে ৩৫০টি বর্তমানে কর্মরত আছে ২৯০ জন। সহকারী শিক্ষকের পথ শূন্য আছে ৬০টি।
নিকলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি মহাম্মদ খাইরুল ইসলাম এই প্রতিনিধিকে জানান, চারটি হাওর উপজেলার মধ্যে তিনটি হাওর উপজেলা অষ্টগ্রাম, মিঠাইমন, ইটনা এই উপজেলাগুলোতে ২০২২ সাল থেকে সরকার ঘোষিত হাওর ভাতা পেলেও এখন পর্যন্ত আমাদের উপজেলা শিক্ষকবৃন্দ হাওর ভাতা পাননি।
সরেজমিন এই উপজেলাগুলোয় গেলে বেশ কয়েকজন অভিভাবক এই প্রতিবেদককে বলেন, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে বিদ্যালয়গুলোয় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, ফলে আমাদের ছেলেমেয়েরা পড়ালেখায় ভালো করছে না।
শিক্ষা অফিস সূত্রে আরও জানা গেছে, এই চারটি উপজেলার বেশকিছু প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। তন্মধ্যে নিকলী উপজেলায় ১৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিদ্যালয়গুলোয় যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীরা কোনো কোনো সময় মূল ভবনের বাইরে গাছের নিচে পড়ালেখা করে। কিছু কিছু বিদ্যালয় আছে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা লেগে থাকে।
নিকলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আবু সিদ্দিক জানান, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি বিষয়ে মামলার কারণে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক পদে বহু বছর ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। গত জুলাই মাসে সেই মামলার রায় হয়েছে। আমরা আশা করছি, অচিরেই প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদ পূরণ করা হবে।
কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হারুন অর রশিদ গণমাধ্যমকে বলেন, শিক্ষক স্বল্পতার কারণে বিদ্যালয়ে পাঠদান কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতির তালিকা মন্ত্রণালয় পাঠানো হচ্ছে। সেখান থেকে অনুমতি এলে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে পদায়ন শুরু হবে। নিয়োগ ও বদলি সমন্বয়ের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ ও পূরণ করা হবে।