প্রতিশোধ নয়, উদারতা
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২৬
॥ ইকবাল কবীর মোহন ॥
কুরাইশরা অস্থির। তাদের চোখে তন্দ্রা নেই। কুরাইশদের মনে শান্তি নেই। আজ নিজেদের গাত্রদাহে নিজেরাই পুড়ছে। ঝলসে যাচ্ছে। আশ্চর্য, কিছুতেই বাগে আনা যাচ্ছে না লোকটাকে। এতিম লোকটা কোনো বাধাই মানছে না। সহায় নেই। সম্বল নেই। অথচ তার গতি থামনোই যাচ্ছে না। একসময় তাঁর সাথে কেউ ছিল না। সমাজের সব লোক তাঁর বিরোধী ছিল। তাঁর নতুন ধর্ম গ্রহণ করার মতো কেউ ছিল না। এখন আস্তে আস্তে তার লোকসংখ্যা বাড়ছে। আগে দীনহীন ও দরিদ্রগুলো মানুষগুলো তাঁর সাথে মিলল। ক্রীতদাসরা তাঁর কথায় আস্থা স্থাপন করত। এখন গোত্রপতিরাও তাঁর সাথে একমত হচ্ছে। মুসলমান হচ্ছে।
গত মাসে গোত্রপতি সুমামা পর্যন্ত মুসলমান হয়ে গেল! সে ইয়ামামার লোক। খাদ্যশস্যের ভাণ্ডার এই ইয়ামামা। মক্কার লোকেরা এই অঞ্চল থেকে খাবার পেয়ে থাকে। সুমামা ইয়ামামার ধনী গোত্রের সর্দার। সেও মুসলমান হয়ে গেল! একি ভাবা যায়!
লোকটা ভেবেছে কী? মদিনায় পালিয়ে গিয়েও আমাদের জ্বালাতে থাকবে এভাবে? আর আমরা তা সহ্য করব বসে বসে? আমরা এতটাই দুর্বল নাকি! আমরা চাইলে লোকটাকে শেষ করে দিতে পারি।
এসব কথা যখন হচ্ছিল, তখন সঙ্গী-সাথীরা গর্জে উঠল, কখনো নয়। আমরা আর সহ্য করব না। এবার লোকটার সবাইকে শেষ করে দেব। এবার আর রক্ষা নেই। পেলেই হলো। দেখবে কত ধানে কত চাল!
মক্কার বাতাসে ঝড় উঠল। যুদ্ধ হবে। যুদ্ধ। আবার একটা ভীষণ যুদ্ধের উত্তেজনায় উন্মত্ত হয়ে গেল সকলে।
কে ওটা? দেখত ঠিক করে। সুমামা না?
একজন বলল, হ্যাঁ সুমামাই ত! ক্রুর হিংস্রতা মুখে মেখে এক রকম খুশি হয়ে উঠল কুরাইশগণ। সর্দার বলল, যা ধরে নিয়ে আয় ওটাকে। একটু মজা দেখানো যাক। সে পেয়েছে কী! আমরা কি মরে গেছি।
একজন কুরাইশ ছুটে গেল। গিয়ে ব্যঙ্গ করে বলল, আছো কেমন! তারপর সুমামার পথ রোধ করে দাঁড়াল। বলল, আমার সাথে এসো। বস ডাকছে। ওই খানটায় তোমাকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য সবাই বসে আছে। এক্ষুণি চল।
সুমামাকে এক রকম ধরেই নিয়ে এলো কুরাইশ। তখন দলের লোকেরা হইচই করে উঠল। বলল, তো কেমন আছেন সদ্দার মশাই। কাবার চত্বরে এসে খুব তো সাহস দেখালে। আমাদের কেয়ারই করলে না। তো এত সাহস কোথায় পেলে!
এমন সময় একজন কুরাইশ পাশ থেকে ছোট্ট একটা পাথরের টুকরো ছুড়ে মারল সুমামার মাথায়। অন্যরা হো হো করে হেসে ওঠে। আরেকজন বলল, বেচারাকে একটু শিক্ষা দে। হাত-পা ভেঙে দে। বুঝুক মজা। কাবার চত্বরে এসে কণ্ঠ উঁচু করে কথা বলার মজা দেখুক। বলেই কয়েকজন সুমামার ওপর হামলে পড়ল। তাকে ভীষণ মারধর করল। মারের চোটে সুমামা মাটিতে পড়ে গেল। তার দেহ থেকে রক্ত গড়িয়ে মাটিতে পড়ল।
আবার থামল কুরাইশরা। পরপর কয়েকবার সুমামাকে লাঞ্ছিত করল কুরাইশ দল। সুমামার অবস্থা খুব খারাপ। সে নড়তে পারছে না। তার দম বেরিয়ে যাবার উপক্রম হলো। এ সময় একটু দূরেই ছিলেন হজরত আব্বাস। নবীজির চাচা। তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে এলেন। তিনি সুমামাকে চিনে ফেললেন। আব্বাস বললেন, ‘এই এই কী করছো তোমরা? তাকে চেন? সে তো ইয়ামামার সর্দার। অনেক সম্মানী লোক। ইয়ামামা থেকে তোমাদের খাবার আসে। ও মারা গেলে ইয়ামামার লোকেরা ক্ষেপে যাবে। তোমরা খাবার পাবে না। তখন না খেয়ে সবাইকে মরতে হবে। ওকে ছেড়ে দাও।
মক্কার কুরাইশরা তখন চমকে গেল। তারা সুমামাকে ছেড়ে দিলো। এরপর বিষণ্ন মনে তিনি দেশে ফিরে গেলেন। ফিরে গিয়ে গোত্রের সকলকে কাছে ডাকলেন। সবার সামনে তার অপমানের বিষয় আলোচনা করলেন। সর্দারের অপমানের কথা শুনে সবাই ক্ষিপ্ত হলো। তারা ঠিক করল, তারা মক্কায় আর কোনোরকম খাদ্যশস্য পাঠাবেন না। এটাই হবে নেতার ওপর অত্যাচার ও অপমানের চরম শিক্ষা।
যেই কথা সেই কাজ। মক্কার সঙ্গে সবরকম লেনদেন বন্ধ হয়ে গেল। ফলে প্রমাদ গুনল কুরাইশরা। আচমকা একটা দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে গেল মক্কার মানুষ। একটু ঠাট্টা করতে গিয়ে এখন তো জীবন নিয়ে টানাটানি। ঘরে ঘরে খাবারের অভাব দেখা দিলো। তাই সবাই আতঙ্কিত হয়ে উঠল। খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎস ছিল ইয়ামামা। খাদ্য আসা বন্ধ। অচিরেই হাহাকার পড়ে গেল মক্কায়।
খাদ্যের জন্য সকলেই অস্থির। মক্কায় দুর্ভিক্ষের অবস্থা তৈরি হলো! দেখতে দেখতে অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করল। তাই সবাই বসল সভায়। ঠিক হলো, একটি কুরাইশ দল যাবে ইয়ামামায়। কথামতো অচিরেই একটি দল ছুটল ইয়ামামায়। গিয়ে তারা জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চাইল। বলল, আমরা ঠিক কাজ করিনি। এমন আর হবে না। তোমরা আবার খাদ্য পাঠাও মক্কায়। নইলে সকলেই মারা যাব। আমাদের নারী, বৃদ্ধ, শিশুরা না খেয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তাই আমাদের ক্ষমা করো। সাহায্য করো।
ইয়ামামার জনসাধারণ বলল, যাও সুমামার কাছে। তাঁর কাছে গিয়ে তোমাদের সমস্যার কথা বলো। তাঁর আদেশ ছাড়া একটা দানাও পাবে না। অগত্যা কুরাইশরা গেল সুমামার কাছে। সুমামা অত্যাচারী কুরাইশদের প্রত্যেককে চিনলেন, কিন্তু তিনি কিছু বললেন না। খাদ্য পাঠানোর জন্য অনুরোধ করলে সুমামা অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘ব্যাপারটা তো এখন আর আমার হাতে নেই। আপনারা সকলে রাসুলুল্লাহর নিকট যান। সেখান থেকে অনুমতি লাগবে। তিনি অনুমতি দিলেই আবার খাদ্যশস্য পাবেন আগের মতো।
সুমামার কথা শুনে কুরাইশদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মুহাম্মদ বাবা উজ্জার দুশমন, বাবা হোবলের দুশমন। তাঁকে আমরা মক্কা থেকে তাড়িয়েছি। এই পরম শত্রুর কাছে যেতে হবে! কিন্তু কী আর করা যাবে। জীবনের থেকে তো আর বড় কিছু নেই। সুতরাং কুরাইশরা ইয়ামামা থেকে ছুটল মদিনায়।
পথে যেতে যেতে একজন বললে, কেন যে সুমামার পেছনে লাগতে গেলে সব! আর একজন বলল, উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ল সুমামা। যাকে মক্কা থেকে মেরে-ধরে তাড়ালাম, এখন গিয়ে তারই পায়ে ধরতে হবে। একজন কুরাইশ বলল, লজ্জায় আর বাঁচি না। মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আর একজন পাশ থেকে বলল, এত করেও ফলাফল কী হবে কে জানে? মুহাম্মদ তো খারাপ লোক (নাউযুবিল্লা)। সে অবশ্যই এখন বদলা নেবে। আমরা যেন না খেয়ে মরি, সে অবশ্যই তা চাইবে।
এসব জল্পনা-কল্পনা করতে করতে এগিয়ে চলল কুরাইশদের কাফেলা। শেষ তারা পর্যন্ত মদিনায় গিয়ে পৌঁছল। পৌঁছে তারা নবীজিকে সকল কথা খুলে বলল। তারা তাদের অভাব-অনটন ও শোক-দুঃখের কথা জানাল। আতুর-এতিমের নবী মুহাম্মদ। তিনি দীন-দুঃখীর নবী। কুরাইশরা এখন বিপদে পড়েছে। তারা না খেয়ে মারা যাবে। তাই নবীজির মন ব্যথায় দয়ায় বিগলিত হয়ে গেল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে সুমামাকে বলে পাঠালেন, কারো খাদ্য বন্ধ করো না। কারো মুখের গ্রাস কেড়ে নিও না। একজন মুসলমান ক্ষুধাতুরের খাদ্য কেড়ে নেয় না, ক্ষুধাতুরকে খাওয়া দেয়।
নবীজির কথা শুনে কুরাইশরা হতবাক হলো। তারা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলে। তবে তারা যে বলত, মুহাম্মদ ভালো লোক নয়। লোকটা কঠোর! লোকটা নির্মম! লোকটা পাষাণ! তাদের গোপন মনে দোলা লাগল। তারা ভাবতে লাগল, এককথায় যে লোক এভাবে রাজি হয়ে যায়…। সারা পথ এই নিয়ে তাদের মধ্যে ভীষণ আন্দোলন জেগে রইল। মক্কার কাছাকাছি এসে তাদের সর্দার সকলকে উদ্দেশ করে বলল, আরে বুঝলি কিনা-মুহাম্মদ আমাদের দেখে ঘাবড়ে গিয়েছিল। ভয় পেয়ে এমন নির্দেশ দিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু সর্দারের কথায় আর তেমন জোর ছিল না। তার কথায় সায়ও দিল না কেউ। সে নিজেও উপলব্ধি করল, তার কথাগুলো তার নিজের কাছেই যেন উপহাসের মতো শোনাচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে কুরাইশরা মক্কায় ফিরে এলো।
এরই মধ্যে ইয়ামামা থেকে খাদ্যশস্যের আমদানি ফের শুরু হলো। ফলে সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে মক্কা বেঁচে গেল। উপোসি মক্কাবাসী খাদ্য পেয়ে প্রাণ ফিরে পেলো। ফলে সারা মক্কায় আবার জীবনের সমীরণ জেগে উঠল।
প্রাণ ফিরে পেলে কী হবে? এই অন্ধ করাইশরাই আবার প্রাণদানকারীর প্রাণ হরণের জন্য ভীষণ চক্রান্তে লিপ্ত হলো।