আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪১
॥ কবির আহমদ ॥
বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা.-কে পাঠানো হয়েছিল আল্লাহপাকের মনোনীত জীবনবিধানকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিজয়ী মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, তিনি সেই সত্তা, যিনি তার রাসূলকে হেদায়েত ও সত্যদীন সহকারে পাঠিয়েছেন, যাতে করে সকল প্রকার জীবন ব্যবস্থার ওপর ইসলামকে বিজয় করা যায়। রিসালাতের দায়িত্ব পালনের অপরিহার্য করণীয় হিসেবেই তিনি স্বীয় জন্মভূমি মক্কাতেই এই মহান কাজে ব্রতী হন। এখান থেকেই শুরু হয় এ উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে এক প্রাণান্তকর আন্দোলন ও সংগ্রামের সূচনা। এ আন্দোলনের মৌলিক দাবি অন্যের নিকট এর দাওয়াত পৌঁছানো। আর এ কাজের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে প্রতিক্রিয়াশীল এবং শুরু করে নিপীড়ন, নির্যাতন, অপপ্রচার ও মিথ্যা ভাষণ। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে তদানীন্তন ক্ষমতাসীনদের রীতি-নীতি ও কার্যক্রমে পরিশুদ্ধি আনয়নের মাধ্যমে রাসূল সা. যে সামাজিক বিবর্তনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন, স্বাভাবিকভাবেই তিনি এ কাজে প্রচণ্ড বিরোধিতার সম্মুখীন হন। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি চরম সংযম ও ধৈর্যের সাথে অগ্রসর হতে থাকেন স্বীয় উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে। পরবর্তীতে কৌশল অবলম্বন ও বিভিন্ন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ক্রমেই তিনি প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ শক্তি ও জনবল গড়ে তুলেন। সমরক্ষেত্রে বিরোধীদের প্রতিহত করার দক্ষতা অর্জন করার সাথে সাথে তিনি বিভিন্ন অভিযানে তাদের মোকাবিলা করেন। এরই ফলে প্রতিপক্ষের শক্তির তামাম দাপট চূর্ণ হয়ে যায়।
বিজয় নিশানকে ছিনিয়ে এনে শেষে ঈপ্সিত পরিবেশে আল্লাহর কালেমাকে বুলন্দ করা হয়। সবর ও বাহাদুরীর সাথে তিনি এ সার্বিক জিহাদ পরিচালনা করেন।
এসব কর্মকাণ্ডের সকল চড়াই-উৎরাই পার হবার পরেই রাসূল সা. বিজয়ীর বেশে বিশ্ববাসীর সম্মুখে এক মহান ও আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে নিজের অবস্থানকে দৃঢ় ও মজবুত করতে সক্ষম হন। শুধু তাই নয়, বরং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিশ্বের সকল নায়কদের সাফল্যের শীর্ষ শিখরে আরোহণ করেন। কবিদের ভাষায় ‘বালাগাল উলা বি কামালিহি, কাসাফাদ্দুজা বি জামালিহি।’ স্বয়ং রাব্বুল আলামিনের ভাষায় ‘ওয়াহুয়া বিল উফুকিল যা’লা’।
একজন সফল ও আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মহানবী সা. সমগ্র বিশ্ববাসীর সম্মুখে জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভৌগোলিক আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে রাব্বুল আলামিনের তরফ থেকে প্রেরিত রাহমাতুল্লিল আলামিন ছিলেন এবং চিরকালের জন্য তাঁর আদর্শ সকল মানুষের ইহলৌকিক জীবনের সবগুলো ক্ষেত্রেই দিক নির্দেশনা প্রদান করে যাবে অন্য কোনো ধর্মীয় বিধানেই মানুষের জীবনমুখী সমস্যাবলীর বাস্তবোচিত সমাধান পেশ করা হয়নি। এদিক থেকে একমাত্র উম্মী নবী ও মহান রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সা. তাঁর নবুয়্যতি দায়িত্ব পালনের স্বার্থে এবং ইসলামের ধর্মীয় বিধানাবলী কার্যকর করার লক্ষ্যে এর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক, শিক্ষাবিষয়ক ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে মৌলিক বিধান ও নীতিমালা, দুনিয়াবাসীকে আল্লাহর তরফ থেকে সেরা নেয়ামত হিসেবে উপহার দিয়ে গেছেন।
একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাসূলুল্লাহর সা. পক্ষে সম্ভব হয়েছিল জাহেলিয়াতের নিকষ আঁধারে নিমজ্জিত এক জাতিকে ইসলামের আলোকোজ্জ্বল রাজ তোরণে টেনে আনা। অবিচার, জুলুম, নিপীড়ন ও অধিকার বঞ্চনার শিকার মানবগোষ্ঠীকে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলকে, তিনি মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। মানুষের ওপর অন্যের প্রভুত্বের অবসান ঘটিয়ে সকল মানুষকে একমাত্র আল্লাহর গোলামির বেষ্টনীর মাঝে তিনি নিয়ে আসেন। লাঞ্ছিত, বঞ্চিত ও দুঃশাসনে জর্জরিত মানবতার মাঝে তিনি ‘ক্বিসত’, ‘আদল’, ‘ইহসান’, ন্যায় ও কল্যাণকর রাজনীতির প্রতিস্থাপন করেন। জঙ্গি, হিংস্র, প্রতিহিংসাপরায়ণ ও যাবতীয় অমানবিক দোষে দুষ্ট মানুষের মাঝে তিনি এমন সোনার মানুষের একটি সুসংগঠিত দল তৈরি করতে সক্ষম হন, যাদের প্রভাবে তখন সানয়া থেকে হাজরা মউত পর্যন্ত সেই দুস্তর মরুপথেও একজন সুন্দরী রমণী নির্বিঘ্নে ও শঙ্কাহীনচিত্তে একা সফর করতে সক্ষম ছিল। মক্কার বুকে মুহাম্মদের সা. ধর্মীয় কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে যে কজন লোক ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসেছিলেন সফল রাষ্ট্রনায়ক রাসূলের সা. নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের কল্যাণের প্রভাবে এর তুলনায় বহুগুণে বেশি আপামর জনগণ তখন দলে দলে আল্লাহর মনোনীত এই কল্যাণময় জীবন বিধান নিজেদের বাস্তব জীবনক্ষেত্রে মেনে নিয়েছিল।
মুহাম্মদ সা. রাষ্ট্র শাসনের বৈশিষ্ট্য : রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাসূল সা.-এর চারিত্রিক পবিত্রতা রাষ্ট্র পরিচালনার উপায় ও পন্থার পবিত্রতা সাধন এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে উদ্দেশ্যের পবিত্রতা রক্ষা করলে সেখানে ইসলামী রাষ্ট্রের শাসন তথা কুরআনের নির্দেশিত রাষ্ট্র ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। আল-কুরআনের রাজনৈতিক নির্দেশনার আলোকে রাসূলের সা. রাষ্ট্র শাসন ব্যবস্থার নিম্নোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আল্লাহর আইনের কর্তৃত্ব : আল-কুরআনের বহু আয়াত (সূরা-নিসা : ৫৯, ৬৪, ৬৫, ৮০, ১০৫, আল-আরাফ : ৩, আন-নূর : ৫৪, ৫৫) এবং রাসূলের সা. অসংখ্য বাণীতে এ মূলনীতি জোরালোভাবে পেশকরা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘আল্লাহ কিছু করণীয় নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা তা নষ্ট করো না। কিছু হারাম বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন, তোমরা তাতে ঢুকে পড়ো না। কিছু সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তোমরা তা অতিক্রম করো না। ভুল না করেও কিছু ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করেছেন, তোমরা তার সন্ধানে পড়ো না।’ (মিশকাত)।
‘আমি তোমাদের যে বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছি, তা গ্রহণ করো, আর যে বিষয় থেকে বারণ করেছি তা থেকে তোমরা বিরত থাক।’
সুবিচার প্রতিষ্ঠা : বিচারকের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রপ্রধান থেকে আরম্ভ করে সামান্যতম চৌকিদার পর্যন্ত সকলেরই মানবিক গুরুত্ব সমানভাবে পরিগণিত হবে। মুখ দেখে এক একজনের জন্য আইনের প্রয়োগ এক এক রকম হবে না। আল-কুরআনে রাসূলকে সা. এ বিষয়ে ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ‘তোমাদের মাঝে সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে হুকুম করা হয়েছে।’ (আশ শুরা : ১৫)।
রাসূল সা. বলেন ‘তোমাদের পূর্বে যে সব উম্মত অতিক্রান্ত হয়েছে, তারা নিম্ন পর্যায়ের অপরাধীদের আইনমত শাস্তি দিতো, আর ওপর ওয়ালাদের কেউ অপরাধ করলে তাকে ছেড়ে দিতো। ঐ সত্তার শপথ, যাঁর মুঠিতে মুহাম্মদের সা. প্রাণ নিহিত ফাতেমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে ফেলতাম।’ (বুখারী)।
তাকওয়াভিত্তিক মর্যাদা : বংশ, ভাষা, বর্ণ ও আঞ্চলিকতা নির্বিশেষে সকল মুসলমানের অধিকার সমান। মর্যাদার ভিত্তিতে নেতৃত্বে থাকবেন তিনি যিনি অধিকতর মুত্তাকী। সূরা হুজুরাত : ১০ আয়াতের সরলার্থ ‘হে মানবমণ্ডলী! এক পুরুষ এবং এক নারী থেকে আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি। আর তোমাদের নানা গোত্র, নানা জাতিতে বিভক্ত করেছি। যেন তোমরা একে অপরকে চিনতে পারো। মূলত আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি সম্মানিত যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করে।’
রাসূল সা. বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা কিংবা ধনসম্পদের দিকে তাকাবেন না বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কার্যাবলীর দিকে তাকান।’ (ইবনে মাজা)।
কর্তব্যের বিষয়ে জবাবদিহি : রাসূল সা. বলেন, ‘সাবধান! তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে কড়া জবাবদিহি করতে হবে।’ হযরত ওমর (রা.) বলেন ‘ফোরাতের পাড়ে একটি ছাগলছানাও যদি যথাযথ পরিচর্যার অভাবে ধ্বংস হয় তবে আমার ভয় হয়, আল্লাহ আমাকে সেজন্য জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।’
পরামর্শভিত্তিক শাসন
সূরা আশ্ শুরার ৩৮নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর তাদের কাজকর্ম সম্পন্ন হয় পারস্পরিক পরামর্শক্রমে।’ হযরত ওমর (রা.) বলেন ‘পরামর্শ ব্যতীত কোন খেলাফত নেই।’
কল্যাণকর কাজে আনুগত্য
স্বয়ং রাসূলুল্লাহর সা. আনুগত্যের ক্ষেত্রেও সূরা মুমতাহিনা : ১২ আয়াতে মারুফের আনুগত্যের শর্তে শর্তযুক্ত করা হয়েছে। কোন মারুফ কাজে তারা তোমার নাফরমানী কিংবা অবাধ্যতা করবে না। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘লা তায়াতা লি মাখলুকিন ফি মায়াশিয়াতিল খলিক।’
দীন কায়েমের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা
এ বিষয়ে সূরা হজের ৪১নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তাদের পৃথিবীতে ক্ষমতা দেয়া হলে তারা সালাত কায়েম করে, জাকাত দেয়, ভালো কাজের নির্দেশ দেয় ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করে।’ সূরা আশ্ শুরার ১৩নং আয়াতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ‘দীন কায়েম কর এবং তাতে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’
আমর বিল মারুফ ও নেহি আনিল মুনকার
এ প্রসঙ্গে সূরা আল-মায়েদায় বর্ণিত হয়েছে, ‘নেকী ও তাকওয়ার কাজে পরস্পর পরস্পরের সাহায্য করো এবং গুনাহের কাজে সাহায্য করো না।’ রাসূল সা. বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি কোনো খারাপ কাজ হতে দেখে, তবে তার উচিত হাত দিয়ে সেটা ঠেকানো। তা যদি না পারো তবে মুখ বা ভাষার প্রয়োগ করে এই বিষয়ে বাধা সৃষ্টি করবে। তাও যদি না পারো তখন অন্তর দিয়ে খারাপ জেনে ভিতরে ভিতরে এর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে হবে।’
মজবুত প্রতিরক্ষা
সূরা আনফালের ৬০নং আয়াতে এ বিষয়ে তাকিদ দিয়ে বর্ণিত হয়েছে, ‘তোমাদের নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বাধিক পরিমাণ শক্তি (সৈন্য বাহিনী) ও সদাপ্রস্তুত ঘোড়া (যুদ্ধ যান) তাদের মোকাবিলার জন্য জোগাড় করে রাখো। এর দ্বারা তোমরা ভীতসন্তস্ত্র করবে আল্লাহর শত্রুকে এবং অন্য এমন সব শত্রুকে যাদের তোমরা চিনোনা কিন্তু আল্লাহ তাদের চেনেন।’
ভারসাম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা ও সমাজ সংস্কার
রাসূল সা. আল কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী একটি ভারসাম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করেন। মদীনার প্রতিষ্ঠিত নবীন ইসলামী রাষ্ট্রটি তিনি গড়ে তোলেন মিরাজের প্রাপ্ত হেদায়েতের ভিত্তিতে, যা দফাওয়ারি সূরা বনী ঈসরাইলে বর্ণিত হয়েছে।
মুহাম্মদ সা. মানবতার বিকাশ ও মুক্তির জন্য পরস্পরের মাঝে সমাজে বদান্যতা, ভালোবাসার প্রচলন এবং পরস্পরের মাঝে বোঝার ক্ষেত্রে উন্নতি সাধনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাই তিনি প্রথমেই উদ্যোগ নেন সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার ও অনৈক্য দূর করার।
প্রচলিত বংশগত, গোত্রগত, অবস্থানগত যাবতীয় কারণে সৃষ্ট বৈষম্য ও অনৈক্যের মূলে কুঠারাঘাত করেন। তিনি ঘোষণা করলেন, জন্মগতভাবে মানুষের মাঝে কোনো বৈষম্য নেই, বরং তারা ‘উম্মাতাও অহেদার’ অন্তর্গত। (সূরা বাকারা : ২১৩)।
‘পারস্পরিক পরিচিতি বিন্যস্ত করার লক্ষ্যে তাদের বিভিন্ন গোত্র ও পরিবারে বিভক্ত করা হয়েছে।’ (সূরা হুজুরাত : ১৩)। তিনি রাজা-প্রজা, মনিব-ক্রীতদাসের মাঝে বিভেদ দূর করেন। ক্রীতদাস যায়েদকে সম্মানিত কুরাইশ বংশের লোকের ওপর মর্যাদা দান করেন। অতীতের যাবতীয় বদাভ্যাস এবং কন্যাসন্তান জীবন্ত প্রোথিত করার মতো সবধরনের কলুষতা থেকে আরববাসীর চরিত্র সংশোধন করেন। নিরক্ষর নবী সা. ঘোষণা করলেন, ‘তালাবুল ইলমি ফারিদা’ মুসলমান নারী-পুরুষের সকলের জন্য জ্ঞানার্জন করা ফরজ। প্রাক-ইসলাম যুগের ঘৃণিত, লাঞ্ছিত ও অবহেলিত মায়ের জাতকে পিতার চেয়েও অধিক মর্যাদাবান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। ঘোষণা করলেন, ‘মুমিনের সমাজ একটি দেহ সাদৃশ, তার কোনো অঙ্গ অসুস্থ হলে সমস্ত শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে।’ তিনি সাম্যের নীতি প্রতিষ্ঠা করে ক্রীতদাস প্রথার বিলোপ সাধন করেন।
নাগরিক অধিকার
আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক রাসূল সা. ঘোষণা করেছেন, ‘খাদিমুল কওমী রইসুহুম’। তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ যে বান্দাকে কোনো জনসমাজের ওপর নেতৃত্ব দান করেন সে যদি অধীনস্থদের সাথে প্রতারণা করে মারা যায়, আল্লাহ তার জন্য বেহেশত হারাম করেছেন।’ (মুসলিম)। এ প্রসঙ্গে আরো শক্ত ভাষায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তিই ঈমানদার হতে পারবে না, যদি না সে তার ভাইয়ের জন্য তাই পছন্দ করে, যা সে কামনা করে নিজের জন্য।’ ইসলামী রাষ্ট্র মৌলিক অধিকার হিসেবে সুস্থ অবস্থায় অন্নের সংস্থানের জন্য কাজের ক্ষেত্র, এজন্য যথোপযোগী শিক্ষা, উপযুক্ত চিকিৎসা ও অসহায় অবস্থার সম্মুখীনদের জন্য নিরাপত্তার ও আশ্রয় বিধানের তিনি যথাযথ ব্যবস্থা করেছেন। সামাজিক শৃঙ্খলা বিধানের প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করেছেন।
সরকার সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হলে তা শুধরানোর জন্য তিনি বলেন, ‘ঐ অবস্থায় শাসকের সম্মুখে সত্য ভাষণ উত্তম জিহাদ।’
বিদায় হজের ভাষণে তিনি বলেন, ‘কোনো হাবশী ক্রীতদাসকেও যদি তোমাদের প্রশাসক নিযুক্ত করা হয় এবং তিনি যদি কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন, তাহলে অবশ্যই তোমরা তাকে মান্য করবে।’ তিনি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের স্বীকৃতি দেন এবং সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও সম্প্রদায়ের প্রতি উদার নীতি পোষণ করেন। সমাজের সর্বস্তর থেকে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে তিনি জাকাত ও সাদাকাভিত্তিক অর্থনীতি চালু করেন। সমাজের সর্বস্তর থেকে সুদ, ঘুষ, মদ, জুয়া, পরস্বহরণসহ যাবতীয় অপকর্ম দূর করেন।
আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতি লাখো দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।
লেখক : সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।