জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি চলবে না
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২১:০৬
॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন হিসাব মেলাতে যাই, কেন যেন হিসাব সঠিকভাবে মেলে না। স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল দীর্ঘ ১ মাইল দূরে, তদানীন্তন মাইন স্কুল বর্তমানে বেড়া হাইস্কুল। বর্ষাকালে বাঁশের সাঁকো পাড়ি দিতাম মাত্র ৩টা। হাতে বইয়ের ব্যাগ ছিল না। হাতে করেই বই নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছাতাম। হেড মাস্টার ছিলেন তারাপদ রায়। ধুতি পরতেন। তার ছেলেমেয়েরা সবাই গানে পটু ছিল বলে তদানীন্তন রেডিও পাকিস্তানে গান গাইতেন। সবার সাথেই আমাদের সম্পর্ক ছিল ভালো। স্কুল জীবন শেষে ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে ছাত্র নেতাদের সাথে তখনই পরিচয় হয়েছিল। পরে তারাও অনেকে মন্ত্রী হয়েছিলেন।
হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখি, দল-মত নির্বিশেষে সবাই যেন রূপ পাল্টে ফেলেছে। চা পানি খেয়ে আগে মিছিল-মিটিং শেষে মধুর ক্যান্টিনে দল-মত নির্বিশেষে তাদের সাথে কুশল বিনিময় হতো। হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। যার কথা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে প্রকাশ করতে হতো যে, যাকে সমর্থন করতো, তাকেই নেতা বানাতো। এমনকি ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের সাথে কথা হতো, বিদ্বেষ ছিল না। এখন যখন কোনো নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তায় যেতে দেখে বেশিরভাগ মেয়েরা শালীন পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন আফসোস করে পত্রিকায় লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে আসছিলাম মনে হচ্ছিল এটি একটি মাদরাসা হয়ে গেছে।
তাই তো গত ডাকসু নির্বাচনে শিবির প্যানেল জিতে প্রমাণ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাদরাসা হয়নি, বরং মাদরাসার নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু তাই নয়, রোকেয়া হলেও শিবির সমর্থিত প্যানেল জিতেছে। বলতে পারেন- ছাত্র-ছাত্রীরা এতদিন ছাত্রনেতাদের অনৈতিক কাজ, ফাও খাওয়া, আদুভাইদের প্রভাব গণরুম কালচারে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। এই সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ও ইসলামী ছাত্রী সংস্থা ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষার মান, নৈতিক প্রভাব, সত্য-ন্যায়ের পথে চলার দিশা দিতে সক্ষম হয়। বিশেষ করে ছাত্রীরা শিবিরের উন্নত চরিত্রবান ছেলেদের কাছে তারা নিরাপদ।
গোটা দেশের অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান নিয়ে চিন্তিত। দীর্ঘদিন আমাদের দেশ পরিচালনায় সৎ, নৈতিকমানের লোকেরা ইউনিয়ন থেকে শুরু করে উপজেলা, জেলা, বিভাগ, এমপি-মন্ত্রীসহ দেশের সর্বোচ্চ স্থানে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের চিন্তা-চেতনার লোক আমরা বসাতে পারিনি। চোর-বাটপার, চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ লোকেরাও মাস্তান পুষে চর দখলের মতো পদগুলো দখল করে জনগণকে শোষণের হাতিয়ার বানিয়ে দেশ চালিয়ে দেশকে রসাতলে নিয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, নিত্যপণ্যের দাম জনগণের আওতায় নেই। এমন অবস্থায় আমাদের জনগণকে ঐকমত্যে আসতেই হবে। দল-মতের ঊর্ধ্বে আমাদের আসতেই হবে, কোনো বিকল্প নেই। মনে রাখতে হবে, আমাদের প্রত্যেকের কাজের হিসাব দুনিয়াতেই দিতে হবে। আর কাল কিয়ামতে মহান আল্লাহ প্রত্যেক অণুপরিমাণ ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব নেবেন। কোনো সন্দেহ নেই।
গত কিছুদিন পূর্বে যেমন আল্লাহর দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক হাসিনাকে পালাতে বাধ্য করেছেন ছাত্র-জনতার আন্দোলনে। আর মধ্যপ্রাচ্যের আমেকিান দালালদের উচিত শিক্ষা দিয়েছেন। আল্লাহ ছাড়া মুসলমানদের কোনো সাহায্যকারী নেই। ইতোমধ্যেই পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরব সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। কাতার, মিশরসহ অন্যান্য দেশও এই চুক্তিতে শরিক হবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ দীর্ঘদিন দুনিয়ার দুষ্কৃতবান শাসকদের চালচলন উপলব্ধিতে এনে আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহর ক্ষমতার জানান দিয়েছেন। সামনে আমরা আরো কিছুর অপেক্ষায় রইলাম।
গোটা দুনিয়া ইহুদি ও ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের কবলে পড়ে আজ মুসলমানদের কৃষ্টি-কালচার নৈতিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলছে। ইহুদি ও হিন্দুত্ববাদের ছোবলে মধ্যপ্রাচ্যের সব বিমান অফিসে এবং বিমানবালারা তাদের কূটকৌশলে মুসলমানদের চরিত্র ধ্বংসের ফাঁদে ফেলে আর্থিক ও পদবি পেতে তৎপর। আমার বিমানে চলার পথে এবং বিমানগুলোর অফিসে বাস্তব অভিজ্ঞতা হয়েছে। তাহলে কি বলব, আমরা কি হেরে যাচ্ছি!
না, আমাদের চৈতন্য ফিরে পেতে হবে। আমাদের ইমান ও নৈতিক চরিত্র ও উত্তম ব্যবহার দিয়ে সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে মুসলমানদের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হবে। শুরু হয়েছে তুরস্ক ও ইরানের লোকদের বাস্তব জীবনে ইসলামের দিকে ফিরে আসার যাত্রা। কামাল আতাতুর্কের দেশে যেখানে আজান বন্ধ করে দিয়েছিল, সেখানে এখন রজব তৈয়ব এরদোগানের নেতৃত্বে গোটা মুসলিম দেশে দেশে ইসলামের দিকে ফিরে আসার পথ দেখা যাচ্ছে। যেখানে মসজিদগুলোয় আজানের বাণী শোনা যেত না, এখন সেখানে দলে দলে মানুষ হারানো সালতানাতের দিকে ফিরে আসছে। এই তো কয়েকদিন পূর্বে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সামরিক চুক্তি করে ফেলল। খুবই আসার কথা। আসলে সৌদি আরবের মক্কায় রয়েছে মুসলিমদের কাবাঘর। নবী মুহাম্মদের রওজা মোবারক মদিনায় অবস্থিত। এছাড়া হাজার হাজার সাহাবী শুয়ে আছেন মক্কা-মদিনায়। মুসসলমানরা গোটা দুনিয়া থেকে হজ পালনের জন্য প্রতি বছর হজের মৌসুমে পবিত্র কাবা, আরাফাত ময়দান, মদিনায় যায়। এটা সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য জীবনে একবার ফরজ। এখন তো ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণে অনেক সহজ হয়েছে হজী সাহেবদের হজ পালনে।
গোটা দুনিয়ায় হজকে কেন্দ্র করে যদি মুসলিম দেশগুলোর নেতারা বিশ্ব সম্মেলনের ব্যবস্থা করে। মুসলিমদের এক বছরের পরিকল্পনা যদি এই সময়ে নেয়া হয় এবং গত বছরের পরিকল্পনার রিভিও করা হয়, তবে মুসলিম দেশগুলোর সব সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে, ইনশাআল্লাহ। আমাদের মনে রাখতে হবে নেতাদের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা নিয়েই হবে আমাদের পরিকল্পনা। জনগণের চাহিদা পূরণ করেই দুনিয়া ও আখিরাতের পাওনা বুঝে নিতে হবে।
দুনিয়ার জীবন খুবই ক্ষণস্থায়ী। আখিরাতের তুলনায় একফোঁটা পানির সমতুল্য। আমরা এই দুনিয়ার পাওয়ার জন্য বৈধ-অবৈধ কামাইয়ের জন্য জনগণের চাহিদার প্রতি লক্ষ না করে শুধই চাই আর চাইয়ের পাল্লা নিয়ে দুনিয়ায় চষে বেড়াচ্ছি। এই আমাদের নেতা বা রাজা-বাদশাহরা কিন্তু খালি হাতেই ৩টি সাদা কাপড় নিয়ে কবরে যাই। এখানে কিন্তু ধনী-গরিব, বাদশাহর কোনো পার্থক্য হয় না। তবে আমরা যারা নেতার আসনে বসে থাকি, তারা কিন্তু একবারও মনে করি না আমাদের খালি হাতেই বিদায় নিতে হবে। আবার দুনিয়ার কাজ ফাঁকি দিতে পারলেও আখিরাতে কিন্তু ফাঁকি দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের প্রতি অণুপরিমাণ ভালো ও মন্দ কাজের হিসাবে আল্লাহ লিখে রাখার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। আল্লাহর এ রাডার থেকে কোনো হিসাব বাদ পড়বে না। মানুষকে দেখানো হবে এই তোমার আমলনামা। তখন কিন্তু কেউ তার বিরোধিতা করতে পারবে না। শুধুই দরকার আমাদের সচেতনতা। যারা বুদ্ধিমান, তারা কিন্তু ঠিকই আখের গোছানোর কাজ করে রাখছে। এরাই হলো আল্লাহর প্রিয় বান্দার মধ্যে শামিল। এরাই হবে জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিবাসীÑ যার শুরু আছে, শেষ নেই। আসুন, জান্নাতুল ফেরদাউসের আশায় বুকবেঁধে চলি। মহান আল্লাহ আমাদের সৎকাজের মূল্যায়ন করবেনই।
ইদানিং বাংলাদেশের ওপর অনেক ঝড়-ঝাঁপটা গেল। ঢাকা শহরে প্রায় ৫৫ বছর কেটে গেল। অনেক নেতা-দল দেখলাম। ক্ষমতায় গিয়েই যে লাউ সেই কদু হয়ে যায়। অনেক চড়াই-উৎরাই, ত্যাগ-কুরবানির মাধ্যমে আমরা ৩৬ জুলাই পেলাম। দেশের ছাত্র-জনতা কোলের শিশুকে নিয়ে যে মায়েরা মাঠে ছিল স্বৈরাচার হাসিনার পেটোয়া বাহিনীর রোষানল উপেক্ষা করে। এমন অল্প বয়সী মাকে দেখেছি মাঠে, যে বলছিল, ‘পেছনে পুলিশ সামনে স্বাধীনতা’। আমরা স্বাধীনতার জন্য মাঠে আছি সুদূর রংপুর থেকে এসেছি।
আজকে যারা ক্ষমতার মসনদে বসে বড় বড় কথার ফুলঝুরি ছাড়ছেন, কই তাদের অনেককেই মাঠে-ময়দানে বা জেলখানায় দেখা যায়নি। রুহুল কবির রিজভী, গোলাম পরওয়ার ভাইকে আমরা জেলে পেয়েছি। তাদের ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ইদানীং বিএনপির কোনো কোনো নেতার বক্তব্যে মনে হচ্ছে আমরা ৩৬ জুলাই ভুলতে বসেছি। সরকারি দলে ভালো লোকের অভাব নেই। কিন্তু নূর, রাশেদসহ বেশকিছু নেতা শুধু চাটুকারিতার কারণে এবং বিরোধীদলের বদনাম গাওয়ার জন্য মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন, যা দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। খুব তাড়াতাড়ি ছাত্র-জনতা এদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। আগের মতো ভয়ভীতি নিয়ে আর ছাত্র-জনতা বসে থাকবে না। ছাত্র-জনতা এখন অনেক সচেতন।
দেশে ভালো মানুষের অভাব নেই। আসুন না, ১৮ কোটি মানুষের স্বার্থে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভালো ও ত্যাগী দুর্নীতিমুক্ত লোকদের নিয়ে দেশ চালানোর ব্যবস্থা নিই। এতে নেতা, দল, জনগণের কল্যাণ বয়ে আনবে। চাটুকারীদের বিদায় হবে। দেশ এগিয়ে যাবে। মহান আল্লাহর সাহায্য আসবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com