প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি
২৫ আগস্ট ২০২৬ ২১:০৫
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে : সংগঠন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার পথে
২০০৫ সালের সংসদ নির্বাচনে ইখওয়ান-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে এবং সংগঠনটি মিশরের বৃহত্তম বিরোধী শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত হয়। (Council on Foreign Relations)।
এরপর আসে ২০১১ সালের বিপ্লব।
হোসনি মোবারকের দীর্ঘ শাসনের পতনের পর মিশরের রাজনৈতিক আকাশে যেন বহুদিনের বন্ধ জানালা খুলে গেল।
নিষিদ্ধ সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে এলো।
নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠল।
মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেল।
আর ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি দ্রুত মিশরের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হলো।
২০১২ সালের সংসদ নির্বাচনে দলটি নিম্নকক্ষে প্রায় অর্ধেক আসন লাভ করে। (Council on Foreign Relations)
কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চমক তখনো বাকি।
মুরসি : দীর্ঘ সংগ্রামের রাজনৈতিক পরিণতি
২০১২ সালে ইখওয়ান-সমর্থিত প্রার্থী ড. মুহাম্মদ মুরসি মিশরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হন।
এটি ছিল শুধু একটি নির্বাচনী বিজয় নয়।
ইখওয়ানের বহু দশকের দাওয়াহ, সংগঠন, কারাবাস, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, নির্বাচনী সংগ্রাম এবং সামাজিক ভিত্তি- সবকিছু যেন এসে মিলিত হলো নীল নদের তীরে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে।
মুরসি দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে আহমেদ শফিককে পরাজিত করে প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তিনি ছিলেন মিশরের প্রথম নির্বাচিত বেসামরিক প্রেসিডেন্ট। (Council on Foreign Relations)।
একজন শিক্ষক থেকে রাষ্ট্রপতি।
একটি নিষিদ্ধ সংগঠনের কর্মী থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাচিত পদে আরোহণ।
কারাগারের অন্ধকার থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনের আলো।
ইখওয়ানের ইতিহাসে এটি ছিল এক অভাবনীয় বাঁক।
কিন্তু বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো নতুন পরীক্ষা।
গণতন্ত্রের দরজায় পুরোনো রাষ্ট্র
মুরসির বিজয়ের পরও রাষ্ট্রের পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো অক্ষত ছিল। সামরিক বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা কাঠামো এবং পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রভাব বহাল ছিল।
২০১২ সালের জুনে সুপ্রিম কনস্টিটিউশনাল কোর্টের একটি রায়ের পর পিপলস অ্যাসেম্বলি ভেঙে দেওয়া হয়। একই সময়ে সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিজেদের ক্ষমতা সংরক্ষণ করে। (Council on Foreign Relations)।
এটি ছিল মুরসির জন্য প্রথম বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
একদিকে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন প্রেসিডেন্ট;
অন্যদিকে কয়েক দশকের পুরোনো রাষ্ট্রযন্ত্র।
একদিকে বিপ্লবের স্বপ্ন;
অন্যদিকে পুরোনো ক্ষমতার কাঠামো।
একদিকে গণতান্ত্রিক বৈধতা;
অন্যদিকে রাস্তার প্রতিবাদ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংঘাত।
মুরসির সরকারও ভুলের ঊর্ধ্বে ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং বিরোধীদের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপড়েন তাঁর সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়ে তোলে। একইসঙ্গে তার বিরোধীরা অভিযোগ করতে থাকে যে, ইখওয়ান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। (Council on Foreign Relations)
অতএব মুরসির প্রথম বছরকে শুধু ষড়যন্ত্রের ইতিহাস কিংবা শুধু ব্যর্থতার ইতিহাস, কোনো একক কাঠামোয় ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।
এটি ছিল একটি নবজাত গণতন্ত্রের ভেতরে বহু পুরোনো শক্তির সংঘর্ষের সময়।
স্বপ্ন, সংগ্রাম ও পতনের পূর্বক্ষণ
মুরসি ক্ষমতায় এসে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর প্রথম বিজয়ী ভাষণেও তিনি নিজেকে শুধু ইখওয়ানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়, সমগ্র মিশরের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেন। (Council on Foreign Relations)
কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল নির্মম।
মুরসির বিরুদ্ধে বিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হতে থাকে। অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক মেরুকরণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। সামরিক বাহিনী অবশেষে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। এর পর ইখওয়ানের ওপর আবার নেমে আসে ব্যাপক দমন-পীড়ন। (Council on Foreign Relations)।
যে সংগঠনটি কয়েক দশকের কারাগার পেরিয়ে ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতার দরজায় পৌঁছেছিল, তার রাজনৈতিক বিজয় মাত্র এক বছরের মধ্যেই সামরিক হস্তক্ষেপে থেমে গেল।
কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্ন রয়ে গেল-
হাসান আল-বান্নার সেই স্বপ্ন কি সত্যিই শেষ হয়ে গেল?
নাকি ইতিহাসের গভীরে কোনো স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে না, শুধু তার রূপ বদলে যায়?
একটি স্বপ্নের দীর্ঘ ছায়া
হাসান আল-বান্নার জীবনকে কেউ দেখেন ইসলামী পুনর্জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে, কেউ দেখেন আধুনিক রাজনৈতিক ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে, আবার কেউ তাঁর সংগঠনের গোপন সশস্ত্র কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে কঠোর সমালোচনা করেন। ইতিহাসবিদদের মূল্যায়নেও ইখওয়ানের ভূমিকা নিয়ে গভীর বিতর্ক রয়েছে।
কিন্তু বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি ঐতিহাসিক সত্য রয়েছে-
১৯২৮ সালে ইসমাইলিয়ার এক শিক্ষক যে সংগঠনের সূচনা করেছিলেন, তা কয়েক বছরের মধ্যে মিশরের অন্যতম শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হয়েছিল; পরবর্তীকালে তার প্রভাব মিশরের সীমানা ছাড়িয়ে আরব ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। (Encyclopedia)।
তার পথ ছিল কখনো দাওয়াতের,
কখনো শিক্ষার,
কখনো সমাজসেবার,
কখনো রাজনৈতিক সংগ্রামের,
আবার কখনো কঠিন ও বিতর্কিত সংঘাতের।
এই ইতিহাসে আছে আলো, আছে অন্ধকার; আছে ত্যাগ, আছে ভুল; আছে আদর্শ, আছে রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন হিসাব।
তবু হাসান আল-বান্নার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে একটি দৃশ্য বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে-
একজন তরুণ শিক্ষক মানুষের দরজায় দরজায় যাচ্ছেন।
তাঁর হাতে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা নেই।
নেই বিশাল অর্থভাণ্ডার।
নেই সেনাবাহিনী।
আছে শুধু একটি বিশ্বাস মানুষকে বদলানো সম্ভব।
সেই বিশ্বাস থেকেই একটি সংগঠনের জন্ম।
সংগঠন থেকে একটি সামাজিক আন্দোলন।
আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক শক্তি।
আর বহু দশক পর সেই শক্তির একজন সন্তান ড. মুহাম্মদ মুরসি মিশরের প্রেসিডেন্টের আসনে বসেন।
ইতিহাসের দীর্ঘ নদীতে কখনো কখনো কয়েক দশক যেন এক মুহূর্তে এসে দাঁড়ায়।
১৯২৮-এর ইসমাইলিয়া থেকে ২০১২-এর কায়রো-
এই পথটি শুধু একটি সংগঠনের পথ নয়।
এটি একটি স্বপ্নের পথ।
একটি বিশ্বাসের পথ।
একটি জাতির আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের আকাক্সক্ষার পথ।
আর সেই পথের প্রতিটি বাঁকে লেখা আছে কারাগারের অন্ধকার, শহীদের রক্ত, জনতার মিছিল, ব্যালটের কাগজ, ক্ষমতার প্রাসাদ এবং শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের নির্মম প্রশ্ন-
একটি আদর্শ যখন রাষ্ট্রক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তার প্রকৃত পরীক্ষা কোথায়- কারাগারে, রাজপথে, নাকি ক্ষমতার আসনে?
হাসান আল-বান্নার জীবন সেই প্রশ্নের সূচনা করেছিল।
সাইয়েদ কুতুবের কারাগার সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছিল।
আর মুহাম্মদ মুরসির প্রেসিডেন্সি সেই প্রশ্নকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছিল।
ইখওয়ানের ইতিহাস তাই শেষ হয়নি মুরসির পতনে।
বরং সেখানে শুরু হয়েছে আরেক অধ্যায়-
স্বপ্ন যখন ক্ষমতার মুখোমুখি হয়, তখন আদর্শের প্রকৃত মূল্য কত?
সময়ের আদালতই হয়তো তার চূড়ান্ত উত্তর দেবে।