আলোকে তিমিরে

তরুণদের মতো এখন বয়স্কদের পরিপক্বতা দেখাতে হবে


১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪৪

॥ মাহবুবুল হক ॥
২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের সূচনা করেছিল কিশোর-তরুণ-শিক্ষার্থীরা। তাদের যে বয়স ছিল, সে বয়সে সাধারণত শিক্ষার্থী-তরুণরা মায়ের ন্যাওটা হয়ে থাকে। এই বয়সে বাবার ন্যাওটা খুব কম শিক্ষার্থী থাকে। আমরা যদি ধরে নিই- এই বিপ্লবটা করেছে ১৪ থেকে ২৪ বছরের শিক্ষার্থীরা, তাহলে মনে হয় খুব বেশি ভুল বলা হবে না। ক্লাস এইট থেকে অনার্স পর্যন্ত শিক্ষার্থীরাই বিপ্লব ঘটিয়েছে। কেন এই বয়সের তরুণরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠে, বিদ্রাহ-বিপ্লব করে, সেটা আমাদের খুব বেশি জানা নেই। বিপ্লবের পর আমাদের মনস্তত্ত্ববদগণ সেসব নিয়ে খুব আলোচনাও করেননি।
কেন পাশ্চাত্যজগৎ ১৮ বছর পর্যন্ত মানবসন্তানকে শিশু করে রেখেছে, সেটাও ভাববার বিষয়। আসলে আমরা সবাই জানি, শিশুত্ব তো চলে যায় ১০ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। কিন্তু কেন পাশ্চাত্যজগৎ তা স্বীকার করেনি বা কোনোদিনও করবে না, তার বড় কারণ হলো ২টি। এক. শিশু মনস্তত্ত্ব থেকে তারা যেন খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতে না পারে। সে কারণে প্রচেষ্টার কোনো অন্ত নেই। শিশুদের বইপত্র, আনন্দ-বিনোদন, চলচ্চিত্র, নাটক, খেলাধুলা, বিজ্ঞান, আবিষ্কার সবকিছু মিলেই শিশুদের জন্য যত আয়োজন রয়েছে পাশ্চাত্যে, তার চেয়ে কম রয়েছে তরুণদের জন্য। কারণ তরুণরা তখন পেশাজীবী হয়ে যায়। ১৮ বছর পরই তো নিজের গৃহে চলে যায় তরুণরা। নিজের মতো করে পেশা বাছাই করার কাজটাও তারা নিজেরাই করে। সংসার শুরু করতেও কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড ইত্যাদি অর্থ কী? সহজ-সরলভাবে তাদের মনস্তত্ত্ব যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে এর যোগফল হলো জীবনসঙ্গী খোঁজা। আমরা যে বিষয়টিকে অবৈধ বলছি, তারা সে সময়টিকে বৈধ বলছে। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবন গড়তে হলে ৩টি জিনিস খুব বেশি দরকার- ঈমান, ঐক্য ও শৃঙ্খলা। এখানে ঈমান বলতে আমরা যা বুঝি, পাশ্চাত্য বোঝে সেটার সাথে অর্থাৎ ধর্মের সাথে আরও কিছু। ধর্ম সেখানে পজিটিভ বিষয় নয়। আবার গড়ে নেগেটিভও নয়। মাঝামাঝি একটা অবস্থান। এখানে এসে তারা আদর্শ ও মতবাদ খোঁজে। ঐক্যের মধ্যে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া দুনিয়াব্যাপী বিভক্ত নয়। বাকি থাকে শৃঙ্খলা- এটা কেনা মানে। এই শৃঙ্খলার জন্যই পরিবারের প্রয়োজন। শিক্ষা থেকে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। ইসলামের বড় সুবিধা হলো, ধর্ম তথা জীবনবোধ ও জীবনবিধানের মধ্যেই শৃঙ্খলার বিষয়টি ‘ইনবিল্ড’ হয়ে আছে। আইন-কানুন ও মোরালিটি ইসলামের জায়গায় একীভূত। যিনি মোরাল, তিনি অবিশ্যম্ভাবী লয়াল এবং লিগাল। কিন্তু অসুবিধা হলো মুসলিমরা এখন নিজের জায়গায় নেই। তারা মুসলমান (মাসেলম্যান), মোসলেম, তারা বাঙালি মুসলমান আবার কেউ কেউ শুধু বাঙালি। আর আন্তর্জাতিকভাবে চিন্তা করলে আমেরিকান মুসলিম, ব্রিটিশ মুসলিম, কানাডিয়ান মুসলিম, পাকিস্তানি মুসলিম, আফগানিস্তানি মুসলিম, জার্মান মুসলিম অর্থাৎ নানারকম শৃঙ্খলার মধ্যে আমরা আবদ্ধ। ধর্ম বা জীবনবিধান, জীবনের সব শৃঙ্খলাকে আবদ্ধ করতে পারছে না। স্থানীয় সংস্কৃতির প্রাবল্য রয়েই যাচ্ছে। তবে এ কথা ঠিকÑ একজন মুসলিম যদি মুমিন হন, অর্থাৎ ‘তাকওয়া’সম্পন্ন মুসলিম হন, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই হবেন একজন ‘ভালো মানুষ।’ এই ভালো মানুষটি একজন মোরাল মানুষ। তার জন্য ‘রুল অব ল’ কোনো সমস্যা নয়। কারণ তিনি তো ‘রুল অব আল্লাহর’ মধ্যেই রয়েছেন।
উপর্যুক্ত কথাগুলো অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও যে কথার মধ্যে আমরা ছিলাম, তা হলোÑ কেন পাশ্চাত্যজগৎ সন্তানদের ১৮ বছর পর্যন্ত বেঁধে রাখে। এ সময়ের মধ্যে যার যার রাষ্ট্রের ‘রুল অব ল’ তারা ভালোভাবে জানতে পারে। একটি ১৮ বছরের শিশু সেক্যুলারিজম ও ধর্ম সমান সমানভাবেই অনুধাবন করতে পারে। রাষ্ট্রও চায় তাদের দেশের নাগরিক অন্তত সবাই যেন আন্ডার গ্র্যাজুয়েট হয়। আন্ডার গ্র্যাজুয়েট হতে হলে বারো ক্লাস অতিক্রম করতে হয়। এ-লেভেল পাস করতে হয়। যারা গবেষক হবে, বড় প্রফেশনাল হবে, শিক্ষিত হবে, বিজ্ঞানী হবে; তাদের তা হতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু সেটা হবে জয়েন্ট ভেঞ্চার ব্যক্তি ও সরকারের বা ব্যক্তি, পরিবার ও সরকারের সমন্বিত জয়েন্ট ভেঞ্চার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়াজন হয় ব্যক্তিটি মেধাবী কিনা, প্রতিভাশালী কিনা এবং অধ্যবসায়ী কিনা। কোনো মেধা বা প্রতিভাহীন ব্যক্তিকে তারা উচ্চশিক্ষার জন্য সিলেক্ট করতে চায় না।
প্রশ্ন ছিল যে, ১৪ থেকে ২৪ বছরের শিক্ষার্থীরা কেন বিপ্লবের জন্য অগ্রসর হয়ে গেল। একদিকে ছিল স্বপ্ন; অপরদিকে ছিল কঠিন বাস্তবতা। আবার স্বপ্ন এবং বাস্তবতা দুটিরও মিশ্রণ ছিল। যে দেশের লোকেরা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত মোটামুটিভাবে এই তিনভাগে বিভক্ত ছিল, তারা হয়ে গেল অন্তত ৯ ভাগে বিভক্ত। যেমন নিম্নবিত্ত- ভাগ হয়ে গত ৫৪ বছরে সৃষ্টি হলো- ১. হতদরিদ্র, ২. দরিদ্র, ৩. নিম্নবিত্ত, ৪. উচ্চনিম্নবিত্ত। মধ্যবিত্ত ভাগ হলো আরো তিন শ্রেণিতে। যেমন- ১. নিম্নমধ্যবিত্ত, ২. মধ্যবিত্ত, ৩. উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত ভাগ হলো- ১. ধনী ও ২. লুটেরা শ্রেণিতে।
এই চক্রাকারে আবর্তিত বিভক্তি; বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে নানাভাবে তছনছ করে দিচ্ছিল। মধ্যবিত্তরা ক্রমান্বয়ে নিম্নমধ্যবিত্তে নামছিল, এখনো নামছে। তারা দেখছিল, তাদের বন্ধুরাÑ যারা ইংরেজি মাধ্যমে লেখাপড়া করছিল, তারা এ-লেভেল করেই আইএলটিএসসহ ছোট ছোট প্রশিক্ষণ নিয়ে হরদম দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাদের পিছে পিছে তাদের বাবা-মা, পরিবারের অন্য সদস্যরা চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই নিম্নবিত্তের ছাত্রদের পিতা-মাতারা তাদের জন্য কিছু করতে পারছে না। তখন তাদের মধ্যে একটা বিরাট অংশ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ‘কিশোর গ্যাং’-এ পরিণত হচ্ছে, মাদকাসক্তে লিপ্ত হচ্ছে। উপজেলা লেভেল থেকে শহর-নগর-বন্দরের রাজনৈতিক গডফাদারদের শিষ্য হচ্ছে। ইভটিজিং, খুনি, ধর্ষণকারী, ছিনতাইকারী, ডাকাতি যেখানে যা প্রয়োজন, সেখানে মার্সিনারিতে পরিণত হচ্ছে। বেশিরভাগ পিতার সঙ্গে এদের সংযোগ বা যোগাযোগ ছিল না বা এখনো নেই। তাদের বেশিরভাগ একরকম দাসরূপে মধ্যপ্রাচ্যসহ দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে চাকরি-বাকরি বা সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে। এদের অধিকাংশই মা ন্যাওটা। লেখাপড়া না করে অভাবের সংসারে তারা টাকা-পয়সা এনে দিতে পারে। সে কারণে সমাজে নিন্দিত হলেও পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে তারা নন্দিত।
মধ্যবিত্তের বিষয়টি একটু আলাদা। তারা ধীরে ধীরে নিম্নমধ্যবিত্তের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তারা দেশের ‘লাইন স্টাফ’। তাদের সঙ্গে সংযোগ ও যোগাযোগ থাকে উচ্চমধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, ধনী ও লুটেরাদের। কিন্তু এই শ্রেণির লোকেরা কিছুটা ঐতিহ্যবাহী ও ক্লাসিক মধ্যবিত্তের বলয়ে সন্তরণ করে শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, আমদানি ও রফতানিকারক, চাকরিজীবী, উদ্যোক্তা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রবাসী, সৃজনশীল ও মননশীলকর্মী, শিল্প-সাহিত্যকর্মী- এদের সঙ্গে সংযোগ থাকে। রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীদের সংস্পর্শে তারা সবসময় বিচরণ করে। এরা খুব একটা দলকানা হয় না। দলকানা হয় নিম্নমধ্যবিত্তরা। এরা আলোচক, সমালোচক। এরা রাতে বাসায় ফিরে সংবাদপত্রের পাতা উল্টায়। টিভি দেখে। মোবাইলে চোখ রাখে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এদের অংশগ্রহণ অনেক বেশি। এদের একটা অংশ কল্যাণকামী ও মঙ্গলাকাক্সক্ষী। এরা পরিবর্তন চায়, কাজও করে, কিন্তু লক্ষ্য অর্জন করতে পারে না। যগে যুগে বিভিন্ন দেশে দেশে এরাই বিপ্লব এনেছে, পরিবর্তন এনেছে। পরিবর্তনের জন্য জীবনবাজি রেখেছে। আমাদের দেশেও ৪৮, ৫২, ৫৪, ৬৯, ৭০, ৭১ এবং পরবর্তীতে দেখা গেছে মধ্যবিত্তরা এবং তাদের ছেলেমেয়েরাই আন্দোলন-সংগ্রামে পথিকৃত ছিল।
শিক্ষার্থীদের ওপরমহল যখন দেখেছে, পাস করলে কী হবে, গ্র্যাজুয়েট হলে কী হবে, মাস্টার্স হলে কী হবে, দেশে তো চাকরি নেই। চাকরি-বাকরি তো পূর্ব থেকেই বণ্টন করা আছে। এই কোটা, সেই কোটা এবং তার ভেতরে রয়েছে অনেক ভুয়া কোটা। তারাই চাকরি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ তো আর চাকরি-বাকরি পাবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হচ্ছে, নিজের পায়ে দাঁড়াতে। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায়, গ্রামে-= গ্রামে কৃষিপণ্য বাড়াতে। মৎস্য, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির খামার, ছাগল-ভেড়া-দুম্বার খামার, বৃক্ষরোপণ, শাসকসবজি, তরকারি, মসলা, ফলফলাদি, ফুল গাছের চারা এসব করতে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনোটাই দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় না। প্রথম প্রথম দীর্ঘ উৎসাহের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে মাৎস্যর্য ও পরশ্রীকাতরতায় ভেঙে পাড়ে। হিংসা-বিদ্বেষ-রাজনৈতিক দলাদলি এসব কারণেও কৃষি ক্ষেত্রের বিপ্লব অধরাই থেকে যায়।
পূর্বে কৃষান-কৃষানি ও কৃষির সাথে সম্পর্কিত যুবক-যুবতীরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই স্বপ্নটা বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। শহীদ জিয়াউর রহমান কিছু কিছু নতুন আইটেম সংযোগের চেষ্টা করেছিলেন। যেমন প্রতি বাড়িতে ৫টি করে পাম গাছ। যাতে ভোজ্যতেল আমদানি করতে না হয়। রাবারের চাষ, খাল খনন ও পুনঃখনন করে কৃষিতে বারো মাস পানির ব্যবস্থা রাখা। তার খুব ইচ্ছা ছিল জমি-জিরাত পতিত না রাখা। রবিশস্য বাড়ানো। কৃষিপণ্য আমদানি বন্ধ করে তরিতরকারির ফলন বাড়ানো, ধান, আটা, পাট, চা, মাছ এসবের উৎপাদন বাড়ানো, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ভেড়া-দুম্বার চাষ বাড়ানো। মোদ্দাকথা, অ্যাওয়ারনেস, তথা সচেতনতা বৃদ্ধি করা। একদম পারেননি, তা নয়। চেষ্টা তো করেছেন। এই চেষ্টা-প্রচেষ্টাই তার জন্য কাল হয়।
শহীদ জিয়ার পর ভারত ও চীনপন্থীরা তার দলে ব্যাপকভাবে আশ্রয় নেয়া শুরু করলে খাল খনন ও পুুনঃখননের মহতি প্রোগ্রাম অকস্মাৎ বন্ধ হয়ে যায়। ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলন রহিত হয়ে যায়। কৃষি থেকে মানুষের মনকে অন্যদিকে ফেরানো শুরু হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে দর্জিগিরি এবং দাস রফতানি শুরু হয়। কিষান-কিষানি হয় দর্জি, না হয় দাস-দাসী হিসেবে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন ও পরিকল্পনায় মত্ত হয়ে ওঠে। বেগম জিয়া এসবের ভেতরেও নারী শিক্ষাসহ আমাদের ক্লাসিক বিষয়গুলো ধরে রাখা বা সংরক্ষণের চেষ্টা করতে থাকেন। যেমন- ডিম বিতরণ, হাঁস-মুরগির ছানা বিতরণ, ছাগল-ভেড়ার ছানা বিতরণ, সীমিতভাবে গরু-মহিষের বাচ্চা বিতরণসহ মাছের পোনা, মাছের চাষ বৃদ্ধির উদ্যোগ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করতে থাকেন।
সবকিছুর ওপর সওয়ার হয় এরশাদীয় দুর্নীতি। এক দশক ধরে মানুষকে বোঝানো হয়, এসব ছোট-খাটো কাজ করে কোনো জাতি বড় হতে পারেনি। নগদ টাকা লাগবে, নগদ টাকা। এরশাদ সব ধরনের ইনস্টিটিউশনে দুর্নীতির বীজ বপণ, মোরালিটি ধ্বংস করা, নারীদের পণ্য বানানো, ধর্ম ব্যবসায়ীদের উজ্জীবিত করা, মসজিদ-মাদরাসাকে স্বপ্নের মুলা বানানো, সামরিক বাহিনীসহ সকল বাহিনীকে করাপ্ট করা এবং এর মাধ্যমে দেশব্যাপী গডফাদার তৈরি করে কিশোর, নবীন ও তরুণ-তরুণীদের মূল্যবোধ ধ্বংস করে নবতর এক জাতি সৃষ্টির প্রয়াস পেলেন। জাতি ভারতপন্থী ও ভারতবিদ্বেষীতে বিভক্ত হয়ে গেল। জাতির ঐক্য ভণ্ডুল হয়ে গেল।
তারপর ভারতীয় এরশাদের উত্তরসূরি হিসেবে যারা এলো, তারা তো ‘ব্যাংক’ করলো, দেশে গড়ে ওঠা গডফাদার, ধনী, লুটেরা, সন্ত্রাসী, চোর-চোট্টা, ডাকাত, হাইজাকার, নব্য ব্যবসায়ী, পুলিশ, আনসার, দুর্নীতিবাজ, রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, নদী-খাল-বিলের আত্মসাৎকারী, দুর্নীতিবাজ সমাজনেতা, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কিশোর লীগ (গ্যাং), শিশু লীগ, মহিলা লীগ, আলেম লীগ, আলেমা লীগ, খুনি লীগ, হাইজাকার লীগ, বস্তি লীগ, ফুটপাত লীগ, টোল লীগ, বাজার দখল লীগ, রাস্তা দখল লীগ, বন-বাদাড় দখল লীগ, গুম লীগ, আয়নাঘর লীগ, চর দখল লীগ, হিন্দু সম্পত্তি দখল লীগ, মসজিদ দখল লীগ, মাদরাসা দখল লীগ, হাসপাতাল-ক্লিনিক দখল লীগ, ব্যাংক-বীমা-ইনভেস্টমেন্ট দখল লীগ; সর্বোপরি দেশ দখল লীগ। অর্থাৎ ‘আমরা আর মামুরা লীগ।’
এই অবস্থা দেখে শিশু থেকে যুবকরা অস্থির হয়ে উঠেছিল। যারা এসব অন্যায় কাজে জড়িত ছিল, তাদের মধ্যকার একটি অংশ দারুণভাবে বিচলিত হয়ে পড়েছিল। অনেকে মানসিক রোগী হয়ে পড়েছিল। দেশে মহান আল্লাহর গজব পড়বে বলে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। দেশবাসীর নিশ্চয়ই মনে আছে, সেই সময়গুলোয় ছাত্রলীগের তুলনামূলকভাবে কম অন্যায়কারী শিক্ষার্থীরা অন্যান্য দলে প্রবেশ করেছিল। অথবা ঢাকা ছেড়ে নিজ নিজ এলাকায় চলে গিয়েছিল। মোদ্দাকথা, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জাতিসত্তা যে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সেটা দেশবাসীর উপলব্ধির মধ্যে সঞ্চালিত হয়েছিল।
এ বিষয়ে আমাদের দেশের কন্যা-জায়া-জননীদের অবদান অবিস্মরণীয়। শিক্ষার্থীরা যখন বাসায় এসে জননীদের সাথে দেশের দুঃখজনক পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতো, তখনই জননীরা তাদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য উপদেশ ও পরামর্শ দিত। জননীদের উৎসাহ না পেলে ২০২৪ সালের বিপ্লব সংঘটিত হতো না। শেষমেশ কী দেখেছিলাম? শিশুসন্তানসহ মধ্যবিত্ত থেকে হতদরিদ্র পরিবারের জননীরাও প্রকাশ্য রাজপথে স্লোগান তুলে পরিবেশ উম্মাতাল করেছিল। দিনের একবেলা দুর্দান্ত মিছিলে অংশগ্রহণ করে বিশ্ববাসীকে বুঝিয়েছিল, এ দেশ আমাদের, অন্য কারো নয়।
সেসময় এ দেশের সিনিয়র সিটিজেনরা নিজেদের আত্মসমালোচনা করতো এইভাবে, “আমরা ভেবেছিলাম, দেশের শিক্ষার্থীর শতকরা শতভাগ ‘মোবাইল-সাগরে’ ডুবে আছে, ওদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই, ওরা হয়তো শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যসহ দুনিয়ার উন্নত দেশগুলোয় দাসগিরি করে জীবন অতিবাহিত করবে। সবাই আমরা ভেবেছিলাম, দুটি জেনারেশন যেন শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মহান আল্লাহর কী ইচ্ছা ‘মোবাইল সাগরে’ ডুবে থেকে তারা যে মণি-মুক্তা সঞ্চয় করেছিল, সেটা তো আমরা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করতে পারিনি।”
মুক্তিযোদ্ধাসহ সিনিয়র সিটিজেনদের অধিকাংশই ২০২৪ সালের বিপ্লবে বিপুলভাবে আশান্বিত হয়ে উঠেছিল। বিপ্লবের সারথীদের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলেছিল। সিনিয়র সিটিজেনদের পক্ষে যা কিছু কঠোর ছিল, দেশে-বিদেশে তারা তাই করার সৌভাগ্য অর্জন করেছে। তারা আবার সত্যি সত্যি আশাবাদী হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী সেক্যুলার লুটেরা বাহিনী প্রতিবেশী দেশ, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও তাদের সহযোগীদের ষড়যন্ত্রে সেই মহাবিপ্লব যেন এখন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
এই মুহূর্তে ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর বুকারজয়ী লেখিকা, সাহিত্যিক ও সমাজ বিশ্লেষক অরুন্ধতি রায় এই মাসে দিল্লির ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে কিছু কথা বলেছেন, যা অনুকরণ করার মতো। তিনি বলেছেন, ‘এখন তরুণরা যা করছে, তা পরিপক্বতায় ভরা, মতপার্থক্য সত্ত্বেও তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ করছে। এই মুহূর্তে প্রাপ্তবয়স্কদেরও সেই পরিপক্বতা দেখাতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেয়ার সময় শেষ। এখন নাগরিকদেরই প্রমাণ করতে হবে, তারা আর নির্যাতন মেনে নেবে না।’
সত্যি সত্যি ৫৪ বছর ধরে এ দেশের বয়স্ক অপরিণামদর্শী মানুষেরা অন্যায় ও অবিচারকে মেনে নিয়েছিল। সহ্য করেছিল, যা একদম ঠিক হয়নি। যার পরিণাম ও প্রায়শ্চিত্ত প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ভোগ করতে হবে।