ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই ছিল নবী সা.-এর সবচেয়ে বড় কাজ


১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:১৯

॥ ড. ফিরোজ মাহবুব কামাল ॥
মুসলিম উম্মাহর জীবনে আজ নানারূপ ব্যর্থতা; তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাটি হলো ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ করতে না পারা। এ ব্যর্থতা মুসলিম উম্মাহর সকল অর্জনকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে এবং দ্রুত ধাবিত করছে পতনের দিকে এবং সবচেয়ে ভয়ানক ব্যর্থতাটি অপেক্ষা করছে আখিরাতে। বেশি বেশি রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কলকারখানা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করেও পতনের পথে এ যাত্রা থামানো যাচ্ছে না। যাত্রীদের ভাষা, গায়ের রং বা বেশভূষার কারণে গন্তব্যে পৌঁছা কখন অসম্ভব হয় না। বরং অসম্ভব হয় গাড়িটি অচল হলে বা অজ্ঞ ও অযোগ্য চালকের হাতে পড়লে। তেমনি একটি জাতির জীবনে অতি গুরুতপূর্ণ হলো রাষ্ট্র। জনগণ কতটা সভ্য, ভদ্র ও পরিশুদ্ধ জীবন পাবে এবং জান্নাতের যোগ্যরূপে বেড়ে উঠবে, সেটি তাদের পানাহার, ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে রাষ্ট্র কতটা সফলভাবে নির্মিত হলো ও পরিচালিত হলো- তার ওপর। তেমনি জাতি কতটা অসভ্য, দুর্বৃত্ত ও জাহান্নামের বাসিন্দারূপে বেড়ে উঠবে, সেটিও নির্ভর করে রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ওপর। অর্থাৎ একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করে তার রাষ্ট্র। মরুবাসী গোত্রীয় মানুষদের থেকে উন্নত রাষ্ট্রে বসবাসকারী মানুষের গুণাগুণ এজন্যই ভিন্নতর হয়।
মহান নবীজী সা. তাই শুধু কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও অজু, মেসওয়াক শেখানোর জন্য আসেননি; তিনি এসেছিলেন একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের জন্যও এবং সে রাষ্ট্রের নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠা ছিল নবীজী সা. ও তাঁর সাহাবাদের জীবনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বড় কাজ। অর্ধেকের বেশি সাহাবী সে কাজে শহীদ হয়ে গেছেন। সে যুগের গোত্রে গোত্রে বিভক্ত অসভ্য আরবগণ যেভাবে দ্রুত স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও বিশ্ব শক্তির মর্যাদা পেল, তার কারণটি তাদের নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও তাসবিহ পাঠ ছিল না। বরং সেটির কারণ ছিল ইসলামী রাষ্ট্র, যা প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল নবীজী সা.। সে রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা নবীজী সা.-এর কাছে এতই গুরুত্ব পেয়েছিল যে, মদিনায় হিজরতের পর নিজের জন্য গৃহনির্মাণ না করে রাষ্ট্র নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন। তাঁর নির্মিত সে রাষ্ট্রই হলো মানবইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রের ওপর নির্মিত হয় সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতা। শিক্ষা ফরজ হয় প্রতিটি নর-নারীর ওপর। প্রতিষ্ঠা পায় আইনের শাসন, নারীরা পায় সমঅধিকার এবং পায় সম্পদের ওপর অধিকার। দাসেরা পায় স্বাধীন জীবনের স্বাদ। অথচ এর আগে আরবের বুকে কোনো রাষ্ট্র ছিল না। তৎকালীন দুটি বিশ্ব শক্তি পারস্য সাম্রাজ্য ও রোমান সাম্রাজ্যের শাসকদের নজরে মরুবাসী আরবদের গুরুত্ব এতই কম ছিল যে, আরব ভূমি দখলে নেয়ার জন্য তারা কোনো চেষ্টাই করেনি। অথচ নবীজী সা.-এর নির্মিত রাষ্ট্রের বদৌলতে তাঁরা পায় বিশ্বশক্তির সম্মান। সেরূপ একটি রাষ্ট্রের নির্মাণ হলো আজকের মুসলিম জীবনের সবচেয়ে উপেক্ষিত ও অবহেলিত খাত।
পূর্ণ ইসলাম পালন অসম্ভব অনৈসলামী রাষ্ট্রে
ইসলাম শুধু আল্লাহ তায়ালা, নবী রাসূল, ফেরেশতা, আখিরাত ও কুরআনের ওপর বিশ্বাসের কথা বলে না। শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও দোয়া-দরূদ পালন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম নয়। বরং পূর্ণ ইসলাম পালনে প্রতিষ্ঠা দিতে হয় ইসলামের ধর্মীয়, রাজনৈতিক, শিক্ষা সাংস্কৃতিক, বিচারিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ বিষয়ক সকল কুরআনি নির্দেশনাকে। ইসলামী রাষ্ট্র দেয় সে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের সহায়ক রাষ্ট্রীয় সামরিক ও বেসামরিক প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। প্রতিষ্ঠা দেয় সহায়ক আদর্শিক, রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ। অনৈসলামী রাষ্ট্রে সে সুযোগ কখনো মেলে না। এমনকি সুযোগ মেলে না আদালতে শরীয়া পালন, শাসনতন্ত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, স্কুল-কলেজে কুরআন শিক্ষা, সমাজ থেকে পাপাচার নির্মূল, মসজিদ নির্মাণ ও হিজাব পরিধানের মতো ইসলামী অনুশাসন নিয়ে বাঁচা। ইসলাম পালনের অর্থ পূর্ণ ইসলাম পালন; এখানে আংশিক ইসলাম পালনের কোনো সুযোগ নাই। নবীজী সা.ও পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের সুযোগ তাঁর জন্মভূমি মক্কায় পাননি; তাঁকে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছে এবং সেখানে পূর্ণ ইসলাম পালন নিশ্চিত করতে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিতে হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে হিজরত তাই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নবীজী সা. তাঁর ১০ বছরের মাদানী জীবনকে কাজে লাগিয়েছেন ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণে এবং পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠা দিতে। খোলাফায়ে রাশেদার আমলে সাহাবাগণ বেঁচেছিলেন সে পূর্ণাঙ্গ ইসলামের পূর্ণ পালন নিয়ে এবং নবীজী সা.-এর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রকে আরো শক্তিশালী করে। এরই ধারাবাহিকতায় মুসলিমগণ পরিণত হয় বিশ্বশক্তিতে। মুসলিম হওয়ার অর্থই হলো সে ঈমানী দায় নিয়ে আমৃত্যু বাঁচা। নইলে ঈমান নিয়ে বাঁচাতে চরম ফাঁকিবাজি হয়; আর সে ফাঁকিবাজির নাম হলো মুনাফিকি।
পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনে অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্র
নবীজী সা.-এর যে নফল ইবাদতগুলো পালন করেছিলেন, সেগুলো আজ পালিত হয় সুন্নত রূপে। নবীজী সা.-এর সে নফলগুলো পালন না করলে কেউ কাফের হয় না। অথচ ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের কাজটি নবীজী সা.-এর কোনো নফল কর্ম ছিল না। সেটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ কর্ম। সে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা না পেলে মহান রবের ভূরাজনৈতিক, বিচারিক ও জনকল্যাণ মূলক এজেন্ডা, তাঁর সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরীয়া আইন স্রেফ কিতাবে থেকে যেত। তখন ব্যর্থ হয়ে যেত কুরআন নাজিল ও নবী প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য। মুসলিমদের তাই শুধু নামাজ রোজা ও হজ, জাকাতের ন্যায় ইবাদতগুলো পালনের ক্ষেত্রে নবীজী সা.-এর অনুসরণ করলে চলে না, অনুসরণ করতে হয় তাঁর রাষ্ট্র নির্মাণের সুন্নতগুলোও। নইলে তাঁর অনুসরণের কাজটি হয় না; বরং বিদ্রোহ হয়। পরিতাপের বিষয় হলো, বাংলাদেশের মতো অধিকাংশ দেশের মুসলিমগণ রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্র নবীজী সা.-এর শেখানো পদ্ধতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহী। আর যাদের বিদ্রোহ নবীজী সা.-এর বিরুদ্ধে, তাদের বিদ্রোহ তো আল্লাহর বিরুদ্ধেও। এরূপ বিদ্রোহ নিয়ে কি কেউ মুসলিম হতে পারে?
মুসলিমদের ওপর ফরজ হলো পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন। আংশিক ইসলাম পালনের কাজটি ঈমানদারের কাজ নয়; সেটি শয়তানের। শয়তান সে পথে গিয়ে অভিশপ্ত হয়েছে। শয়তানের অপরাধ, সে মহান রবের একটি মাত্র হুকুম অমান্য করেছিল। সে হুকুমটি ছিল হযরত আদম আ.-কে সিজদার। আর আজকের মুসলিমগণ বিদ্রোহে শয়তানকে ছাড়িয়ে গেছে। তারা বিদ্রোহ করছে মহান রবের বহু হুকুমের বিরুদ্ধে। সে বিদ্রোহের নজির হলো, মুসলিম দেশের আদালতে মহান আল্লাহর শরীয়া নাই; শাসনতন্ত্রে তাঁর সার্বভৌমত্ব নাই। পতিতাপল্লীগুলোয় চলছে জেনার বাণিজ্য এবং ব্যাংকগুলোয় চলছে সুদ। পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজটি শুধু বিপুল সংখ্যায় মসজিদ-মাদরাসা গড়লে এবং ওয়াজ মহফিল করলে হয় না। শুধু নামাজি, রোজাদার ও হাজীদের সংখ্যা বাড়ালেও হয় না। বাংলাদেশে কি তাদের সংখ্যা কম? কিন্তু তাতে কি পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন হচ্ছে? প্রতিষ্ঠা পেয়েছে কি মহান রবের সার্বভৌমত্ব ও তাঁর শরীয়া? নির্মূল হয়েছে কি দুর্বৃত্তি?
পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের জন্য অতি অপরিহার্য হলো ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। নইলে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালনের বিষয়টি কেবল কিতাবেই থেকে যায়। এজন্যই নবীজী সা. মদিনায় হিজরতের পর নিজের জন্য গৃহনির্মাণ না করে ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন। কারণ সেটি তাঁর নিজের গৃহনির্মাণের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে এবং সে রাষ্ট্রের সুরক্ষায় ও ভূগোল বাড়াতে আমৃত্যু জিহাদে লিপ্ত থেকেছেন। নবীজী সা. ২৮টি যুদ্ধে সশরীরে শরিক হয়েছেন এবং ৫৫টি যুদ্ধ নিজে শরিক না হয়ে পরিচালনা করেছেন। তবে নবীজী সা. যা কিছু করেছেন সেটি তাঁর নিজের আবিষ্কার ছিল না, বরং সেগুলো তিনি করেছেন মহান আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে। অথচ আজকের মুসলিমগণ একাজে নেই; তাদের কাছে গুরুত্ব পায় না ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ মুসলিম হওয়ার জন্য নবীজী সা.-এর মতো শুধু নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত পালন করলে চলে না, তাঁর ন্যায় রাষ্ট্রও নির্মাণ করতে হয়। এবং সে রাষ্ট্রের নির্মাণে ও সুরক্ষায় জিহাদও করতে হয়। সেটি না করলে নবীজী সা. পূর্ণ অনুসরণ যেমন হয় না, তেমনি পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হওয়ার কাজটিও হয় না। অপূর্ণাঙ্গ মুসলিম তো তারাই, যারা বাঁচে মহান রবের হুকুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নিয়ে। সেটি শয়তানের সুন্নত; শয়তান বিদ্রোহ করেছিল হযরত আদম আ.-কে সিজদা করার হুকুম অমান্য করে। আর আজকের মুসলিমগণ শয়তানের সুন্নত পালন করছে নিজ দেশের আদালতে শরীয়া এবং সংবিধানে মহান আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা না দিয়ে এবং বিদ্রোহ করছে দেশ থেকে দুর্বৃত্ত নির্মূলের জিহাদ না করে।
ইসলামী রাষ্ট্রের নির্মাণ নবীজী সা. ও তাঁর সাহাবাদের কাছে এতোই গুরুত্ব পেয়েছিল যে, মুসলিমদের জান, মাল, শ্রম ও সময়ের সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছিল ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা দেয়ার কাজে। তাদের সে কুরবানির বরকতেই মুসলিমগণ যেমন রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা পেয়েছিল, তেমনি পেয়েছিল পূর্ণাঙ্গ দীন পালনের সহায়ক পরিবেশ। বস্তুত ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা এবং সে রাষ্ট্রের সুরক্ষার জিহাদ নিয়ে বাঁচাই নবীজী সা.-এর শ্রেষ্ঠ সূন্নত। সে গুরুত্বপূর্ণ সূন্নতটি বিলুপ্ত হলে অসম্ভব হয় পূর্ণাঙ্গ ইসলাম পালন। ইসলামের গৌরব যুগে নবীজী সা.-এর সে সুন্নত গুরুত্ব পেয়েছিল; তাই সে সুন্নত নিয়ে বাঁচতে দেখা গেছে প্রত্যেক সাহাবীকে। কিন্তু আজ সে সুন্নতটি মুসলিম জীবনে বেঁচে নাই। নবীজী সা. যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা দিয়ে গিয়েছিলেন, সে পূর্ণ ইসলাম মুসলিম বিশ্বের কোথাও বেঁচে নাই। বেঁচে আছে কেবল নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত, দোয়া-দরূদ ও মসজিদ-মাদরাসা নিয়ে আংশিক ইসলাম। এজন্যই বিশ্বের কোথাও প্রতিষ্ঠা পায়নি ইসলামী রাষ্ট্র; ফলে বেঁচে নাই নবীজী সা.-এর প্রতিষ্ঠিত সে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম।
গুরুত্ব পায়নি নবীজী সা.-এর রাষ্ট্র নির্মাণের সুন্নত
মুসলিম বিশ্বে আজ মসজিদ ও মাদরাসার সংখ্যা লাখ লাখ। সেগুলোর আয়তনও বিশাল বিশাল। দেশে দেশে বিশাল আকারে এবং বিপুলসংখ্যায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে কুরআনের তাফসির, আলোচনা সভা, তাবলিগ জামায়াতের ইজতেমা এবং ওয়াজ মাহফিল। কিন্তু সেগুলো মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য বদলায়নি। হচ্ছে না ঈমানদার মানুষ গড়ার কাজ। সুরক্ষা পাচ্ছে না মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা ও জানমালের নিরাপত্তা। আরো দ্বিগুণ বা তিনগুণ মসজিদ-মাদরাসা গড়লেও মুসলিম উম্মাহর ভাগ্য বদলাবে না; সুরক্ষিত হবে না স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা। কারণ সেগুলো সুনিশ্চিত করা মসজিদ-মাদরাসার কাজ নয়। এ বিশেষ কাজগুলো একান্তই ইসলামী রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের কাজ কখনোই মসজিদ মাদরাসা দিয়ে হয় না। নবীজী সা. তাই ইসলামী রাষ্ট্র গড়েছিলেন। মুসলিমদের আজকের দুর্গতির কারণ মসজিদ মাদরাসার কমতি নয়, বরং ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণে চরম ব্যর্থতা। আজ বিশ্বের মানচিত্রে অর্ধশতাধিক মুসলিম রাষ্ট্র; কিন্তু সে রাষ্ট্রগুলোর নির্মাণে ও পরিচালনায় আদৌ গুরুত্ব পায়নি নবীজী সা.-এর সুন্নত। বরং গুরুত্ব পেয়েছে বর্ণ, ভাষা ও অঞ্চলভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ এবং ইসলাম থেকে দূরে সরার সেক্যুলার নীতি। ফলে চরম অবাধ্যতা হয়েছে নবীজী সা.-এর সুন্নতের সাথে। ফলে দ্রুততর হয়েছে ইসলাম থেকে দূরে সরে যাবার কার্যক্রম এবং পতনের ধারা।
নবীজী সা. দাড়ি, টুপি, পাগড়ি, মেসওয়াক ইত্যাদি বহু সুন্নতই মুসলিম সমাজে পালিত হয়। তাঁর চরিত্রের নানা গুণাবলীর ওপরও আলোচনা হয়। তবে সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মপ্রচারক রূপে তিনি যতটা প্রচার পেয়েছেন, সেরূপ প্রচার পাননি সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনির্মাতা, সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপ্রধান, সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক ও সর্বশ্রেষ্ঠ দুর্বৃত্তি নির্মূলকারী মুজাহিদ রূপে। মানুষের কাছে তাঁর লেবাস, পানাহার ও ইবাদতের সুন্নত যতটা গুরুত্ব পায়, ততটা গুরুত্ব পায় না তাঁর রাষ্ট্র নির্মাণের সুন্নত। আজকের মুসলিমদের ইসলাম পালনে এখানেই হলো সবচেয়ে বড় শূন্যতা ও ব্যর্থতা। ফলে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না ইসলামী রাষ্ট্র। ফলে বাড়ছে না মুসলিম উম্মাহর স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও গৌরব। বরং বাঁচছে বিভক্তি, পরাজয় ও পরাধীনতা নিয়ে।
অথচ নবীজী সা.-এর হাতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজটি না হলে এবং সাহাবাদের হাতে সে রাষ্ট্রকে আরো বৃহৎ ও শক্তিশালী করার কাজটি না হলে ব্যর্থ হয়ে যেত মানব সৃষ্টিকে নিয়ে মহান রবের কুরআনে ঘোষিত সে এজেন্ডা। মুসলিমগণ তখন ইসলামী রাষ্ট্রের অভাবে ব্যর্থ হতো পূর্ণ ইসলাম পালনে। কারণ পূর্ণ ইসলাম পালনের কাজটি স্রেফ নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ও দোয়া-দরূদ পালনের মধ্য দিয়ে হয়না। সে কাজটি স্রেফ মসজিদ-মাদরাসা ও পীরের খানকাতে বসেও হয় না। শরীয়া আইনের প্রতিষ্ঠা দিতে প্রশিক্ষিত ইসলামী আইনবিদ, পুলিশ ও আদালত লাগে। জনগণকে কুরআনি জ্ঞানে শিক্ষিত করতে লাগে হাজার হাজার রাষ্ট্রীয় স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সহযোগিতা লাগে দুর্বৃত্তের নির্মূল ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জিহাদে।
অতি পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান যুগের আলেমগণ নবীজী সা.-এর ইসলামী রাষ্ট্র নির্মাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনার সুন্নত নিয়ে বাঁচেন না। সে জিহাদে তারা নাই। এ সুন্নতটি গুরুত্ব পায়নি; এমনকি সাধারণ মুসলিমদের কাছেও এর কোনো গুরুত্ব নেই। অথচ শয়তান ও তার অনুসারিগণ রাষ্ট্র ও রাজনীতির গুরুত্ব বুঝতে ভুল করেনি। ফলে ইসলামের এই শত্রুপক্ষ বাংলাদেশসহ অধিকাংশ মুসলিম রাষ্ট্রের ওপর দখলদারি তারা নিজ হাতে নিয়েছে। বহু আলেম, বহু তাবলিগী, বহু পীর, বহু নামাজি ও হাজী তাদের সে দখলদারিকে সমর্থনও দিয়েছে। ইসলামের এ শত্রুপক্ষের দখলদারির কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের আদালতে শরীয়া পালন অসম্ভব হয়েছে।
লেখক : চিকিৎসক ও ইসলামী চিন্তাবিদ।