সম্পাদকীয়

সরকারের ৬ মাস : রাষ্ট্রের মালিকানা বুঝে পায়নি জনগণ


১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:১৬

২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারের শাসন চলছে। সরকার গঠন করে ক্ষমতার মসনদে আছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। বিরোধীদলের আসন অলংকৃত করেছে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় ঐক্য। এ পথপরিক্রমা শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারিতে ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর। ছাত্র-জনতার দুর্বার আন্দোলনে পালিয়েছে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের সকল সদস্য।
দেড় দশক হাসিনার দুঃশাসনের অবসানের পর জনগণ বড় আশায় বুক বেঁধেছে, তারা দেশটি নিজের করে পাবে। এখন থেকে রাষ্ট্রের মালিক তারা। কেউ আর বিনা উসকানিতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, বাজার সিন্ডিকেট করে অবৈধভাবে জনগণের জানমাল নিয়ে টানাটানি করার দুঃসাহস দেখাবে না। কিন্তু না, জনগণের সেই আশায় গুঁড়েবালি। পোশাক বদলে আগের সেই গোষ্ঠীই দেশটাকে আবার জনগণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বাবার দেশে পরিণত করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া দাম কমানো বা সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও তীব্র তাপদাহ ও চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট কাটেনি।
নির্বাচনপূর্ব সমাবেশে দলীয় নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি ছিল নির্বাচিত সরকার এলেই সংকটের দ্রুত সমাধান সম্ভব। তবে ক্ষমতার প্রথম ছয় মাসে পূর্বতন জটিলতাগুলো হুট করে দূর করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট ভাঙায় প্রত্যাশিত গতি না থাকায় জনমনে হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ও দল-মত নির্বিশেষে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করার আশ্বাস বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। অসাধু সিন্ডিকেট দমন করে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে প্রাতিষ্ঠানিক মনিটরিং টিভির পর্দা আর খবরের কাগজে দেখা গেলেও, বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। যে যার ইচ্ছেমতো দাম হাঁকছে, ভোক্তাদের করার কিছুই নেই।
জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাতীয় নির্বাচনে জনগণের মতামত চেয়েছে। জনগণ ব্যাপকভাবে সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি থেকে নির্বাচিতরা শপথ নেয়নি। বিরোধীদল রাজপথে এবং জাতীয় সংসদে বিষয়টি নিয়ে যতটা সরব, সরকারি দল ততটাই নীরব। তারা কমিটি গঠনের কথা বলছেন। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদ ছাড়া এ নির্বাচন বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ একই সাথে দুটি ভোট হয়েছে। কারণ দুটি ভোট একই নির্বাচনী তফসিলে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিএনপির পক্ষে যত ভোট পড়েছে, তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ভোট বেশি পড়েছে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে। তারপরও এমন টানবাহানা জনগণ সহ্য করবে না। কিন্তু সরকার বুঝতে চাচ্ছে না, তাদের চারদিকে ঘিরে থাকা ফ্যাসিস্টদের দোসরদের কারণে।
জ¦ালানি খাত নিয়ে তারা এমনভাবে কথা বলছে, মনে হয় এর আগে তাদের পতনের অন্যতম কারণ ছিল এ খাত; তা মনে হয় ভুলে গেছে। ব্যর্থতার দায়ে যার মন্ত্রিত্ব চলে গিয়েছিল, তাকেই আবার সেই একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ায় জনমনে হতাশা বাড়ছে। সাথে সাথে একে একে বন্ধ হচ্ছে কলকারখানা। বেকারত্বও বাড়ছে। রাষ্ট্রের মালিকানা বুঝে পায়নি জনগণ, তাই সঙ্কট তীব্রতর হচ্ছে। এমন অবস্থা যে অশুভ ইঙ্গিত দিচ্ছে, তা আমাদের কারো কাম্য নয়।
অতএব এখনই সরকারকে সতর্ক হতে হবে। জুলাই আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখতে বিরোধীদলকে সাথে নিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবজি, দখলবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, দলীয়করণ রুখতে হবে। আধুনিক সভ্যতার চালিকাশক্তি জ¦ালানি খাতকে শক্ত করতে এই বছর না, সেই বছর নীতির বদলে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারের পারফরম্যান্স চ্যালেঞ্জিং হলেও, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিরোধীদলের পরামর্শকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে সঙ্কট কাটিয়ে উঠে দেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।