বন্যাদুর্গত বিপন্ন মানবতার পাশে দাঁড়ানো সময়ের অপরিহার্য দাবি
১৫ জুলাই ২০২৬ ২১:২৬
টানা ভারী বর্ষণ আর উজানের দেশ ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বন্যা পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। দেশের উত্তর, দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও উজানের দেশ ভারত থেকে নেমে আসা পানির সাথে পাহাড়ি ঢলে দেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। পাহাড় ধসে ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। পানিবন্দি হয়ে চরম মানবিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন ১০ লক্ষাধিক মানুষ। এরই মধ্যে নতুন করে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, শেরপুর এবং উত্তরাঞ্চলের তিস্তা ও ধরলা নদী অববাহিকার অন্তত ১০টি জেলা বন্যার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। লাখ লাখ পরিবার ঘরবাড়ি, ফসল ও গবাদিপশু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে বা আশ্রয়কেন্দ্রে অন্ন, বস্ত্র ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ভুগছেন। এই জাতীয় দুর্যোগে বিপন্ন ও অসহায় দেশবাসীর পাশে দাঁড়ানো আমাদের নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সফর করছেন, বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস দিচ্ছেন। তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন নিরাপদ পানি ও শুকনো খাবার। তিনি দেশের সামর্থ্যবান নাগরিক ও নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন, যার যার সামর্থ্যানুসারে দুর্গত মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াতে।
আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক ও ধর্মীয় কর্তব্য দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো। দুঃখী ও আর্তমানুষের সেবা সর্বোচ্চ ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরিক করো না। পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।’ (সূরা আন-নিসা : ৩৬)। তিনি পারস্পরিক সহযোগিতার তাগিদ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো।’ (সূরা মায়েদা : ২)। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে বানভাসি মানুষের অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা কোনো দয়া বা করুণা নয়; বরং এটি তাদের প্রাপ্য অধিকার। রাসূলুল্লাহ (সা.) মুসলিম সমাজকে একটি মানবদেহের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যার একটি অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে পুরো শরীর সেই কষ্ট অনুভব করে। আজ যখন দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত, তখন স্বস্তিতে ঘরে বসে থাকা কোনো প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। হাদিস শরিফে পরকালীন মুক্তি ও আল্লাহর রহমত পাওয়ার সহজ উপায় হিসেবে মানুষের দুঃখ দূর করার কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন।’ (সহিহ মুসলিম)। অন্য এক হাদিসে এসেছে, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে-ই, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি)। কুরআনে আরও বলা হয়েছে যে, ‘যারা নিজেরা অভাবী হওয়া সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, তারাই সফলকাম।’ (সূরা হাশর : ৯)। অতএব বন্যার্তদের জন্য ব্যয় করা সম্পদ কখনোই বৃথা যায় না, বরং তা ইহকাল ও পরকালে বহুগুণ প্রতিদান বয়ে আনে। বর্তমান ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল সরকারি উদ্যোগ আশাব্যঞ্জক নয়। প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালাচ্ছে, তবুও দুর্গম এলাকাগুলোয় এখনো হাজার হাজার মানুষ ত্রাণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। সরকারের পক্ষ থেকে আরো কার্যকর উদ্যোগ সময়ের দাবি। সাথে সাথে সকল রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি সংস্থা এবং বিত্তবানদের ঐক্যবদ্ধভাবে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর রোগবালাই প্রতিরোধ ও পুনর্বাসনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার প্রয়োজন হবে। আসুন, আমরা যার যার সামর্থ্যানুযায়ী বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াই। আমাদের ক্ষুদ্রতম সাহায্য হয়তো একটি পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পারে এবং বাঁচাতে পারে একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ। তাই আর অবহেলা নয়। আর বসে থাকা নয়।