সংক্ষিপ্ত বিশ্ব সংবাদ


১৫ জুলাই ২০২৬ ২১:১১

আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে বিশ্ব
২০২৩ সালের মার্চে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো জোটের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে চীনের ওপর নির্ভরতার ‘ঝুঁকি কমাতে’ ইউরোপকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিন বছর পর, সেই ইউরোপীয় নেতারা ক্রমবর্ধমানভাবে আমেরিকাকেই বৃহত্তর কৌশলগত অনিশ্চয়তার উৎস হিসেবে দেখছেন। ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দ নীরবে ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাত শক্তিশালী করছেন এবং চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করছেন, যখন মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইলি সামরিক অভিযান আমেরিকার আধিপত্যের লড়াইকে তীব্রতর করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতি চলমান হরমুজ প্রণালী সংকটের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে।আমেরিকার বাণিজ্য সংঘাত, সামরিক আগ্রাসন এবং নীতির অস্থিরতার প্রতিক্রিয়ায় সরকারগুলো এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একই ধরনের পুনর্বিন্যাস করছে। বিশেষজ্ঞের মতে, ওয়াশিংটনের সাম্প্রতিক হামলার মূল লক্ষ্য মার্কিন ভোটারদের এটা বিশ্বাস করানো যে, ওয়াশিংটন একটি কঠোর নীতি অনুসরণ করছে এবং ভবিষ্যতের আলোচনায় তেহরানকে আরও সহযোগিতামূলক অবস্থান নিতে বাধ্য করছে। ইরানের সাথে পরিস্থিতি যদি আগের অবস্থায় ফিরেও যায়, ট্রাম্প এই হামলাগুলোকে আমেরিকান জনগণের কাছে তার দ্ব্যর্থহীন বিজয় হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করবেন। তবে তেহরান যদি আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে ওয়াশিংটন এক অচলাবস্থার সম্মুখীন হবে, কারণ আমেরিকানদের কাছে প্রচলিত অর্থনৈতিক এবং হাইব্রিড পদ্ধতির কোনো উপায়ই অবশিষ্ট নেই। কয়েক দশক ধরে মার্কিন সামরিক সুরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব দেশটির অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাবকে শক্তিশালী করলেও বর্তমানে ওয়াশিংটন থেকে ঝুঁকি কমানোর ক্রমবর্ধমান প্রচেষ্টা এখন সেই সুবিধাগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং চীনের স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করছে। আমেরিকার জন্য এর অর্থনৈতিক মূল্যও বাড়ছে। মুডিসের হিসাবে, ইউরোপ ও এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন ছাড়া পরিচালিত ইরান যুদ্ধের কারণে গ্যাস ও সারের দাম বেড়ে মার্কিন ভোক্তাদের ওপর প্রায় ১৩ হাজার ২শ’ কোটি ডলারের অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। ২০২৫ সালে ইউরোপের সামরিক ব্যয় ১৪ শতাংশ বেড়ে ৮৬ হাজার ৪শ’ কোটি ডলারে পৌঁছালেও মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তাদের ক্রয় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে। একই সময়ে কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে আমেরিকায় আগত বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা ৪০ লাখ কমে যায়, যার ফলে ৮শ’ কোটি ডলারের বেশি ক্ষতি হয়।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর ভর্তি ১৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অন্তত ১শ’ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এই প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে। কানাডা চীনের সঙ্গে নতুন কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে, প্রথমবারের মতো ৫০ হাজার চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বাজার উন্মুক্ত করেছে এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ১৫ হাজার কোটি ডলার বেশি মূল্যের ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা তহবিলে যোগ দিয়েছে। জাপান তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করছে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের কার্যক্রম প্রসারিত করছে এবং ভারত ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গভীর করার পাশাপাশি মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির বিকল্প খুঁজছে। ইউরোপীয় সরকারগুলোও ওয়াশিংটনের সাথে সম্ভাব্য বাণিজ্য সংঘাতের জন্য আপৎকালীন পরিকল্পনা তৈরি করছে, যার মধ্যে আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ সেমিকন্ডাক্টর-সম্পর্কিত রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিও রয়েছে। ভন ডার লেয়েন তিন বছর আগে চীন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘আমাদের সম্পর্ক একেবারে সাদা-কালো নয় এবং তাই আমাদের প্রতিক্রিয়াও অনুরূপ নয়।’ একইভাবে, দেশগুলো আমেরিকাকে পুরোপুরি পরিত্যাগ করছে না, বরং এর ওপর নির্ভরতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনছে। ফলে ট্রাম্পের উত্তরসূরি যিনিই হোন না কেন, তিনি এমন এক বিশ্বের উত্তরাধিকারী হবেন যা ক্রমবর্ধমানভাবে আমেরিকার বিচ্ছিন্নতা, চীনের সম্প্রসারিত অংশীদারিত্ব এবং এই উপলব্ধির দ্বারা গঠিত যে, আমেরিকার ধ্বংসাত্মক আধিপত্যবাদ অনেক দেশকে বৃহত্তর কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অর্জনে প্ররোচিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

ফের উত্তাল নেপাল, এবার বলেন্দ্র শাহের পদত্যাগ চায় ‘জেন-জিরা’
যে তরুণ প্রজন্মের (জেন-জি) আন্দোলনের জোয়ারে ভেসে গত বছর নেপালের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছিলেন ৩৫ বছর বয়সী তরুণ নেতা বলেন্দ্র শাহ, মাত্র এক বছরের মাথায় সেই আন্দোলনের আগুন এবার তার নিজের গদিই টালমাটাল করে দিয়েছে। পুনর্বাসন ছাড়া গণবস্তি উচ্ছেদ এবং আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের প্রতিবাদে এবার বলেন্দ্র শাহের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে নেপাল। গত বছর নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি সরকারের পতনের নেপথ্যে মূল কারিগর ছিল দেশটির যুবসমাজ। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষেধাজ্ঞা, তীব্র বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক সংকটের বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনে ওলিকে পরাজিত করে প্রধানমন্ত্রী হন বলেন্দ্র শাহ। কিন্তু এক বছর পার হতেই সেই জনপ্রিয়তায় বড় ধাক্কা লেগেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে রাজধানী কাঠমান্ডুসহ নেপালের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে বলেন্দ্র শাহের সরকার। প্রশাসনের দাবি, এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৬০০টি বস্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ঘরছাড়া হয়েছেন প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। বাস্তুচ্যুত এই মানুষদের সাময়িকভাবে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হলেও, সম্প্রতি সরকার নির্দেশ দেয় আগামী ৬ জুলাইয়ের মধ্যে সব হোল্ডিং সেন্টার খালি করতে হবে। কিন্তু মাথা গোঁজার বিকল্প ঠাঁই না থাকায় অন্তত ৬০টি পরিবার এই নির্দেশ মানতে অস্বীকার করে। এই উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরেই নেপালে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পরিস্থিতি চরম রূপ নেয় গত শুক্রবার। কাঠমান্ডুর একটি হোল্ডিং সেন্টারে বন্যার পানি ঢুকে পড়লে সেখানকার প্রায় ১৫০ জন বাসিন্দাকে সরিয়ে নেয় নিরাপত্তা বাহিনী।
গত ১১ জুলাই শনিবার জেন-জি প্রজন্মের একদল প্রতিনিধি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে তাদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করে বলে অভিযোগ ওঠে। এতে একজন আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হলে ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো দেশজুড়ে। উচ্ছেদ ও পুলিশি অ্যাকশনের বিরুদ্ধে সরব হওয়ায় ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন সমাজকর্মী, ছাত্র এবং সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করেছে বলেন্দ্র শাহের সরকার। এর প্রতিবাদে গত ১২ জুলাই রোববার ‘যৌথ জাতীয় বস্তিবাসী ফ্রন্ট’-এর ডাকে কাঠমান্ডুর একটি সরকারি দপ্তরের সামনে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। আন্দোলনকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিলÑ ‘গরিবের ওপর অত্যাচার বন্ধ করো’, ‘মানবাধিকার রক্ষা করো’, ‘বেআইনি গ্রেপ্তার চলবে না’ এবং ‘ভূমিহীনদের পুনর্বাসন দাও’। যে জেন-জি যুবকদের হাত ধরে নেপালে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছিল, এখন সেই যুবসমাজই প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, পুনর্বাসনের যথাযথ ব্যবস্থা না করে এমন কঠোর পদক্ষেপ নেপালি তরুণদের শাহ সরকারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট।

১৩ জুলাই কাশ্মীরী শহীদ দিবস : আজান সম্পন্নে ২২ শহীদের কাহিনী
আজান সম্পূর্ণ করার অদম্য আকাক্সক্ষায় একজন নিহত হলে আরেকজন এগিয়ে আসেন এবং একে একে ২২ জন কাশ্মীরী মুসলিম নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। ১৯৩১ সালের এই দিনে ডোগরা রাজতন্ত্রের বাহিনীর হাতে নিহত ২২ জন কাশ্মীরী মুসলিমের স্মরণে গত সোমবার (১৩ জুলাই) কাশ্মীরী শহীদ দিবস পালিত হয়। একটি আজান যথাযথভাবে শেষ করতে গিয়ে একে একে ২২ জন কাশ্মীরীর নিহত হওয়ার সেই ঘটনা আজও স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের এক অমোঘ প্রতীক হয়ে আছে।
তৎকালীন মহারাজা হরি সিংয়ের আমলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী চরম অর্থনৈতিক শোষণ ও ধর্মীয় বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানিয়েছে, ১৯৩১ সালের এই দিনে শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেলের বাইরে জড়ো হয়েছিল হাজার হাজার প্রতিবাদী মানুষ। জোহরের নামাজের সময় হলে এক যুবক আজান দেয়া শুরু করেন।
কিন্তু ডোগরা গভর্নরের নির্দেশে তাকে সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করা হয়। আজান বন্ধ হয়ে গেলে সেই স্থান থেকে আজানের বাকি অংশ শেষ করতে আরেকজন বিক্ষোভকারী এগিয়ে আসেন এবং তিনিও গুলির শিকার হন। এভাবে আজান সম্পূর্ণ করার অদম্য আকাক্সক্ষায় একজন নিহত হলে আরেকজন এগিয়ে আসেন এবং একে একে ২২ কাশ্মীরী মুসলিম নিজের জীবন উৎসর্গ করেন।
২০১৯ সালের আগস্টে ভারত ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে এই রাষ্ট্রীয় ছুটির দিনটি বাতিল করা হয়। বর্তমানে ভারত শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে শহীদ মাজার ভারী ব্যারিকেড ও কাঁটাতার দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। উপত্যকাজুড়ে বেসামরিক মানুষের ওপর দমন-পীড়ন জোরদার করা হয়েছে। ৯ লাখের বেশি নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন থাকায় এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম ঘন সামরিকীকৃত এলাকায় পরিণত হয়েছে।
তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে সেখানে প্রায়ই কারফিউ ও ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়। কালো আইনের কারণে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও স্বাধীন সাংবাদিকরা তীব্র সেন্সরশিপের মুখে পড়েছেন। মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও রাজনৈতিক কর্মীদের বিনা বিচারে আটকে রাখা হচ্ছে। সশস্ত্র বাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইনের (আফস্পা) কারণে নিরাপত্তা কর্মীরা আইনি দায়মুক্তি পাওয়ায় বেসামরিক আদালতে তাদের বিচার করা যাচ্ছে না।
জনসমাগম রুখতে ওমর আবদুল্লাহ ও মেহবুবা মুফতির মতো শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদেরও গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে। এক্সপ্রেস ট্রিবিউন।
গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : আবদুল কাইউম খান