সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করুন
৮ জুলাই ২০২৬ ২১:১১
॥ জামশেদ মেহদী ॥
আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনসমূহকে নিষিদ্ধ করার জন্য জামায়াতে ইসলামী এবং জুলাই বিপ্লবের তরুণ নায়করা (তখনো এনসিপি গঠিত হয়নি) জুলাই বিপ্লবের অব্যবহিত পর থেকেই দাবি করে আসছেন। প্রথমে দাবি উঠেছিল ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার। কিন্তু বিএনপির তরফ থেকে বলা হয় যে, তারা কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার বিরোধী। তারা তাত্ত্বিকভাবে বলে যে, একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ না করে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যান করা তারা সমর্থন করেন। নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দলকে জনগণ প্রত্যাখ্যান করলে সেই দলের ক্ষমতা অনেক কমে যায়। বিএনপির এই বক্তব্যে জুলাই বিপ্লবীরা এবং ইসলামী দলসমূহ তুমুল সমালোচনা করে। তারপরও জুলাই বিপ্লবীদের অব্যাহত চাপের মুখে তৎকালীন ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হন। সেই থেকে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ রয়েছে।
এর কয়েকদিন পর জুলাই বিপ্লবীরাসহ জামায়াতে ইসলামী এবং অন্যান্য ইসলামী দল আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠন যুবলীগ এবং অন্যান্য সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার দাবি তোলেন। এবারও বিএনপি আগের কথা বলে। এবার তারা বলে যে, নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কোনো দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী তারা নয়। এ ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেও ভিন্নমত ছিলো। ড. আসিফ নজরুল ছিলেন আইন উপদেষ্টা। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের ব্যাপারে তিনি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম মত দেন। যেমন, ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা সমীচীন হবে না। তার যুক্তি ছিল, সংবিধানে সংগঠন করার স্বাধীনতা রয়েছে। অপরাধ করলে ব্যক্তির বিচার হবে, কিন্তু দলের সদস্যদের কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা ঠিক নয়।
আবার এই আসিফ নজরুলই ২০২৫ সালের মে মাসে বলেন, আওয়ামী লীগ বা এর কোনো সহযোগী সংগঠন নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি তিনি একটি সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করেন, নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে যখন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তখন বিষয়টি রাজপথে নিয়ে আসেন বিপ্লবী তরুণরা। ততদিনে তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। সেটি হলো এনসিপি। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে তারা শাহবাগে অবস্থান শুরু করেন। কিন্তু শাহবাগের জনসমাবেশ খুব বড় হয়নি। তখন বৃহত্তর স্বার্থে জামায়াত এনসিপিকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন দেয়। জামায়াতের সমর্থনের পর শাহবাগে জনসমাবেশের কলেবর প্রতিদিন বিপুলভাবে বাড়তে থাকে। ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন লক্ষ করে অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকার ঐ দাবির কাছে নতি স্বীকার করে। তবে সরাসরি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সমস্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। সেই থেকে এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরাসরি নিষিদ্ধ না হলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি পরোক্ষভাবে নিষিদ্ধই রয়েছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার কারণেই গত নির্বাচনে ও গণভোটে আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করতে পারেনি।
বেশ কিছুদিন পর সম্প্রতি আবার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কথা উঠেছে। এবার এ সম্পর্কে বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী (আইসিটি) ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন যে, দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি এটিকে সরকারের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও বলেছেন যে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার আইন রয়েছে। তিনি আরো বলেন যে, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার কাজ; বিশেষ করে পেপার ওয়ার্ক এগিয়ে চলছে।
শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পালিয়ে যাওয়ার পর এক বছর ১১ মাস অর্থাৎ ২৩ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দৃশ্যমান কোনো প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে না। অথচ যাদের আমরা উন্নত দেশ বলি, যাদের আমরা সভ্য দেশ বলি, সেই জার্মানি এবং ইতালিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে হিটলারের নাৎসি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়। হিটলারের পতন তথা জার্মানিতে যুদ্ধের সমাপ্তির মাত্র ৫ মাসের মধ্যেই নাৎসি দল এবং এর অধীনস্থ সমস্ত সংগঠনকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ ও বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
বিশ্ববিখ্যাত ও ঐতিহাসিক নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি নেতৃত্বের বিচার হয়। আন্তর্জাতিক মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে নাৎসি শাসনের কয়েকটি সংগঠন (যেমন এসএস ও গেস্টাপো)-কে অপরাধমূলক সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। নাৎসি দলটির নেতৃত্ব ও কার্যক্রমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসী যুদ্ধের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তির Allied Control Council Control Council Law No. ২-এর মাধ্যমে নাৎসি পার্টি বিলুপ্ত ও নিষিদ্ধ করা হয়। দলটির সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং পুনর্গঠন নিষিদ্ধ করা হয়। নাৎসি মতবাদ গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মৌলিক মানবাধিকারের বিরোধী ছিল। একদলীয় একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং স্বাধীন নির্বাচন বিলুপ্ত করার কারণে এটিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
৮১ বছর আগে নাৎসি দল নিষিদ্ধ হয়েছে। ৮১ বছর পরও অর্থাৎ ২০২৬ সালেও জার্মানিতে নাৎসি পার্টি পুনর্গঠন করা অবৈধ। নাৎসি প্রতীক (যেমন স্বস্তিকা) জনসমক্ষে ব্যবহার সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। এছাড়া নাৎসি প্রচারণা বা সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উৎখাতের উদ্দেশ্যে সংগঠন করাও আইনের আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মোটামুটি একই ধরনের অপরাধের কারণে ইতালিতে বেনিটো মুসোলিনীর ফ্যাসিস্ট পার্টিও নিষিদ্ধ হয়। ক্ষমতায় আসার পর বেনিটো মুসোলিনী ধীরে ধীরে ইতালির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অকার্যকর করেন। বিরোধীদল নিষিদ্ধ করা হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা হয় এবং স্বাধীন নির্বাচন কার্যত বিলুপ্ত হয়। ফ্যাসিস্ট দলের আধাসামরিক বাহিনী ব্লাকশার্ট বিরোধীদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল। এছাড়া রাজনৈতিক বিরোধিতা দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে অর্থাৎ ৮১ বছর পরও যে সংগঠনগুলো ঐতিহাসিক ফ্যাসিস্ট পার্টিকে পুনর্গঠন করতে চায়, সহিংসভাবে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা উৎখাতের চেষ্টা করে, বা ফ্যাসিবাদকে এমনভাবে প্রচার করে যা ইতালির সংশ্লিষ্ট আইন লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
ওপরের এই বিবরণী থেকে দেখা যাচ্ছে যে, যেসব কারণে জার্মানিতে নাৎসী দল এবং ইটালিতে ফ্যাসিস্ট দল নিষিদ্ধ হয়েছে, তার প্রায় সবগুলো কারণ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সংগঠনসমূহের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
আওয়ামী ঘরানা, ভারতপ্রেমী এবং কমিউনিস্টরা যুক্তি দেখানোর চেষ্টা করেন যে, নুরেমবার্গ ট্রায়ালে তো শুধুমাত্র মিলিটারি জেনারেলদের বিচার হয়েছে। তারা মিথ্যা তথ্য দেন। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে শতাধিক বেসামরিক ব্যক্তিরও বিচার হয়, যাদের মধ্যে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থনীতিবিদ, ইহুদিবিদ্বেষী সংবাদপত্র এবং সম্পাদক, নাৎসি বিচারক, প্রসিকিউটর, চিকিৎসক, শিল্পপতি, উচ্চপদস্থ আমলা ও কূটনীতিক প্রমুখেরও বিচার হয়।
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বিচার হয়েছে এবং বিচারে তাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এছাড়া অসংখ্য আওয়ামী এমপি, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগ নেতা, পুলিশ, মিলিটারি প্রমুখ অফিসারদেরও বিচার হচ্ছে।
আওয়ামীপ্রেমী ছদ্মবেশী প্রো-ইন্ডিয়ানরা সূক্ষ্ম প্রোপাগান্ডা করে যে, ১৯৭৩ সালের যে আইসিটি আইনে জামায়াত নেতৃবৃন্দের বিচার হয়েছে সেই আইনে ব্যক্তির বিচার করা যায়, কিন্তু কোনো সংগঠনের বিচার করা যায় না। কিন্তু ছদ্মবেশী আওয়ামীপ্রেমীদের জানা উচিত যে, মূল সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ১৮(১) অনুযায়ী সরকার যদি যুক্তিসঙ্গতভাবে সন্তুষ্ট হয় যে কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাহলে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সেই সত্তাকে ‘তফসিলভুক্ত (Enlist in the Schedule) বা নিষিদ্ধ (Proscribe)’ করতে পারে। ২০২৫ সালের সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ দ্বারা ধারা ১৮(১)-এ একটি নতুন বাক্যাংশ যোগ করা হয়। সংশোধনের ফলে সরকার কেবল কোনো সত্তাকে তফসিলভুক্তই নয়, ‘সেই সত্তার সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধ (Proscribe all the activities of the entity)’ করার ক্ষমতাও পায়। এই নতুন ক্ষমতার ভিত্তিতেই আওয়ামী লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
১৫ বছর ৮ মাসের দুঃশাসনে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ যেসব মানবতাবিরোধী কাজ করেছে, সেগুলো সংক্ষেপে (১) বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। (২) জোরপূবর্ক গুম (Enforced Disappearances) (৩) নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু। (৪) মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন (৫) বিরোধীদলের ওপর দমন-পীড়ন (৬) নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করা (৭) শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বল প্রয়োগ (৮) বিচারবিভাগের স্বাধীনতা খর্ব (৯) জুলাই বিপ্লব দমনে মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে ১৪ শত ব্যক্তিকে হত্যা এবং গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ২৬ হাজার ব্যক্তিকে আহত করা, যাদের একটি অংশ এখনো পঙ্গু ইত্যাদি।
এককথায় বলা যায় যে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ (১) ধারা মোতাবেক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার অসংখ্য গ্রাউন্ড রয়েছে। সব শেষ কিন্তু সবচেয়ে ছোট কারণ নয় (Last but not the least)। সেটি হলো, বিদেশে বসে অর্থাৎ ভারতের দিল্লি এবং কলকাতা বসে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতারা চরম বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছেন। ভাবতে অবাক লাগে যে, যার মাথার ওপর ঝুলছে মৃত্যুদণ্ডের তলোয়ার সেই শেখ হাসিনাকে ভারতের মতো বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দাবিদার দেশটিও এসব বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। অথচ এই ভারতীয়রাই সুযোগ পেলেই বলে যে, বাংলাদেশের মাটিতে বসে কোনো প্রকার ভারতবিরোধী কোনো তৎপরতা চালানো যাবে না। তাই যদি হয়, তাহলে ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতাকে নরেন্দ্র মোদির সরকার প্রশ্রয় দিচ্ছে কীভাবে?
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com