চিরনিদ্রায় শায়িত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, জানাজায় লাখো মানুষের ঢল


৮ জুলাই ২০২৬ ২০:৫৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে অষ্টম শিয়া ইমাম রেজার (রা.) মাজারে দাফন করা হয়। এর আগে দেশটির এই সর্বোচ্চ নেতার লাশ ইরাকের নাজাফে পৌঁছায়। সেখানে একটি শোক র‌্যালির আয়োজন করা হয়েছে। এতে লাখো অনুসারী যোগ দেন। গত ৮ জুলাই বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইরাকি গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরাকসহ আশপাশের বিভিন্ন দেশের অনুসারীরা র‌্যালিতে যোগ দিয়েছেন। এতে উপস্থিতির সংখ্যা লাখ ছাড়িয়েছে। ইরাকের আল-আহদ টিভি জানিয়েছে, ভোর হওয়ার আগেই হাজার হাজার অনুসারী নাজাফে এসে পৌঁছেছেন। র‌্যালি শুরু হওয়ার অপেক্ষায় তারা রাস্তায় ও ইমাম আলীর (রা.) মাজারের চারপাশে অবস্থান নেন। নাজাফে অবস্থিত ইমাম আলীর (রা.) মাজারে লাশ পৌঁছানোর পর সেখানে এক জাঁকজমকপূর্ণ শোক র‌্যালির আয়োজন করা হয়। এ সময় লাখো ইরাকি কফিন কাঁধে করে বহন করেন। সরকারি সময়সূচিতে বলা হয়েছে, বুধবার বিকেলে কফিন পবিত্র নগরী কারবালায় নিয়ে যাওয়া হয়। এর আগ পর্যন্ত এটি নাজাফে ছিল খামেনির লাশ। এই ধর্মীয় নেতার জানাজায় বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। জানাজায় তেহরান ও বিভিন্ন শহরে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিই খামেনির জনপ্রিয়তার সাক্ষী হয়ে থাকলো। বিশ্লেষকদের মতে, এই শোকানুষ্ঠান কেবল একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; এটি ইরানের রাজনৈতিক ঐক্য, রাষ্ট্রের সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং ইসলামী বিপ্লবের আদর্শের প্রতি সমর্থন প্রদর্শনেরও একটি বড় উপলক্ষ্য হয়ে উঠেছে। ইরানের নেতৃত্ব এই জনসমাগমকে জাতীয় সংহতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে।
সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানে যা ছিল
গত ৩ জুলাই শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় আয়াতুল্লাহ খামেনির কফিনে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এর মধ্য দিয়ে দাফন প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ৪ জুলাই শনিবার ও ৫ জুলাই রোববার যথাক্রমে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তা উন্মুক্ত রাখা হয়। গত ৬ জুলাই সোমবার ইরানের রাজধানী তেহরানে শোক র‌্যালির আয়োজন করা হয়। এ সময় লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে শহরের রাজপথ পরিপূর্ণ হয়ে যায়। গত ৭ জুলাই মঙ্গলবার শহীদ নেতার জানাজার নামাজ আদায় করতে কোমের পবিত্র জামকারান মসজিদে লাখো অনুসারী সমবেত হন। গত ৮ জুলাই বুধবার নাজাফ শহরে নেওয়া হয় খামেনির লাশ, সেখানে শোক র‌্যালো অনুষ্ঠিত হয়। শহীদ নেতার ইচ্ছানুযায়ী, ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে অষ্টম শিয়া ইমাম রেজার (রা.) মাজারে আয়াতুল্লাহ খামেনিকে দাফন করা হয়। সেখানে তার শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে লাখ লাখ মানুষ অংশ নেন।
অশ্রুসিক্ত লাখো মানুষের ঢল, কালো পতাকায় মোড়া রাজধানী এবং ধর্মীয় আবেগের এক অভূতপূর্ব পরিবেশে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে শুরু করেছে দেশটির জনগণ। রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হওয়া জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান পরিণত হয়েছে ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাবেশে। ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম পার্স টুডে ও অন্যান্য সরকারি সংবাদমাধ্যমের বর্ণনা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ তেহরানে এসে জড়ো হন। সরকারি প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে শোক মিছিলে অংশ নেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তেহরানের শোকানুষ্ঠানে বিপুল জনসমাগমের কথা উল্লেখ করেছে। জানাজা ও শোক র‌্যালি উপলক্ষে রাজধানী তেহরানের প্রধান সড়কগুলো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। কালো পোশাকে নারী-পুরুষ, হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা ও খামেনির প্রতিকৃতি নিয়ে লাখ লাখ মানুষ শোক মিছিলে যোগ দেন। অনেকের হাতে ছিল ধর্মীয় পতাকা এবং শহীদদের স্মরণে লেখা ব্যানার। বিভিন্ন স্থান থেকে শোনা যায় ধর্মীয় স্লোগান, কুরআন তেলাওয়াত এবং দোয়া-মোনাজাত।
ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে খামেনির লাশ জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে রাখা হয়। তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষা করেন সাধারণ মানুষ। অনেকে আবেগাপ্লুত হয়ে কফিনের দিকে ফুল ছুড়ে দেন, কেউ কুরআন হাতে দোয়া করেন, আবার কেউ অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় জানান দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতাকে। ইরানের সরকার সাত দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। এ সময় দেশজুড়ে সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। তেহরান, কোম, মাশহাদসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোয় ধারাবাহিক শোকানুষ্ঠানের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। পরে জানাজার আনুষ্ঠানিকতা ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়ও শেষ করা হয়।
৭০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন
তেহরানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় জানাজা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি পরিণত হয় মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সমাবেশেও। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচির ভাষ্য অনুযায়ী, ৭০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন। ইরানি কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পার্লামেন্টের স্পিকার, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশেষ দূত এবং ধর্মীয় নেতারা তেহরানে উপস্থিত হন। পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ছিল সীমিত, তবে এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন।
রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন দেশটির নিরাপত্তা পরিষদের উপ চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ। মস্কোর পক্ষ থেকে তাঁর উপস্থিতিকে ইরান-রাশিয়া কৌশলগত সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দুই দেশের মধ্যে সামরিক, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা গত কয়েক বছরে আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে অংশ নেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করতেই এই সফর। একই সঙ্গে দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। ভারতও একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদল পাঠায়। দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে ইরানের সঙ্গে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং চাবাহার বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে এই অংশগ্রহণ তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইরাক থেকে প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদি এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা জানাজা ও পরবর্তী ধর্মীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন। পরে খামেনির লাশ নাজাফে পৌঁছালে সেখানেও তাঁরা আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানান।
এছাড়া আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের প্রতিনিধিরা, আর্মেনিয়া, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, ওমান, কিউবা, জর্জিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি ও কূটনীতিকেরা তেহরানে উপস্থিত ছিলেন। আনাদোলু এজেন্সির তথ্যানুযায়ী, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং বিশেষ দূতও শোকানুষ্ঠানে অংশ নেন।
শেষ বিদায় অনুষ্ঠান ছিল ‘মুসলিম বিশ্বের সংহতির প্রতীক’
এদিকে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের আলেম, ইসলামী সংগঠনের প্রতিনিধি এবং আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই অংশগ্রহণকে ‘মুসলিম বিশ্বের সংহতির প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যদিও পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, এতে মূলত ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিত্বই বেশি ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, এত বড় আন্তর্জাতিক উপস্থিতির মাধ্যমে তেহরান একদিকে শোক প্রকাশের আয়োজন করেছে; অন্যদিকে বিশ্বকে একটি রাজনৈতিক বার্তাও দিয়েছে যুদ্ধ ও নেতৃত্ব পরিবর্তনের মধ্যেও ইরানের কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক প্রভাব অটুট রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরাক এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করেছে।
সর্বোচ্চ নেতার ব্যক্তিগত জীবন ও বিপ্লবী নিয়ে যা জানালেন মোস্তফা খামেনি
এক সাক্ষাৎকারে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনির জ্যেষ্ঠ পুত্র আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনি তাঁর পিতার বিপ্লবী কর্মকাণ্ড, পারিবারিক জীবন এবং ব্যক্তিগত চরিত্র সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেন। নিচে তাঁর বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো-
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগের সময়ের কথা স্মরণ করে সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনি বলেছেন, সাবেক পাহলভী শাসনামলে তাঁর পিতা মাসের পর মাস কারাগারে বন্দি ছিলেন। সে সময় পরিবারের সদস্যরা প্রায়ই জানতেন না তিনি কোথায় আছেন। তিনি বলেন, তাঁর মা অসাধারণ ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে সেই কঠিন সময় পার করেছিলেন। স্বামী বারবার কারাবন্দি থাকলেও একাই পুরো পরিবারকে সামলেছেন এবং কখনো অভিযোগ করেননি। তিনি আরও বলেন, শাহ সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাক (ঝঅঠঅক) বহুবার তাঁর পিতাকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং এর ফলে পরিবারকে বারবার হয়রানি ও দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে আবার গ্রেপ্তার হলে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছেÑ এমন সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও সাইয়্যেদ আলী খামেনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করেননি। পরবর্তীতে তাঁকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় এবং নির্বাসনে পাঠানো হয়। তিনি আরও স্মরণ করেন, তাঁর দাদি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা যখন তাঁর পিতাকে গ্রেপ্তার করতে বাড়িতে আসতেন, তখন তিনি নির্ভীকভাবে তাদের মুখোমুখি হতেন।
বন্দিত্বেও অটুট ছিল তাঁর মনোবল
সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনি বলেন, আটক অবস্থায় নির্যাতনের শিকার হয়ে আহত হওয়ার পরও তাঁর পিতা মানসিকভাবে দৃঢ় ছিলেন। নির্বাসনে যাওয়ার আগে একবার তিনি পিতার সঙ্গে দেখা করতে গেলে গ্রেপ্তারের সময় সৃষ্ট তাঁর পায়ের একটি ক্ষত দেখতে পান। কিন্তু সেই আঘাত সত্ত্বেও তিনি হাসিখুশি ছিলেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সেই ক্ষত নিয়েও রসিকতা করতেন।
পিতার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সেবাযত্ন
নিজের পিতা এবং দাদা, মরহুম সাইয়্যেদ জাওয়াদ হোসেইনি খামেনির সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আত্মনিবেদনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি জানান, তাঁর পিতা সবসময় বৃদ্ধ বাবার যত্ন নিতেন। এমনকি ইরানের রাষ্ট্রপতি থাকাকালেও এবং ১৯৮১ সালের হত্যাচেষ্টায় আহত হওয়া হাতের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা থাকা সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগতভাবে পিতার সেবা করতেন। সাইয়্যেদ মোস্তফা বলেন, তাঁর পিতা নিজ হাতে বৃদ্ধ বাবাকে ঘরের ভেতর চলাফেরায় সাহায্য করতেন, গোসল করাতে নিয়ে যেতেন এবং এসব দায়িত্ব অন্য কারও ওপর অর্পণ করতেন না। পরিবারের ঘনিষ্ঠদের মতে, সন্তানদের মধ্যে তিনিই ছিলেন তাঁর পিতার সবচেয়ে কাছের এবং সবচেয়ে যত্নশীল সন্তান।
বিনয়, আত্মসংযম ও মর্যাদাবোধ
দাদার কাছ থেকে তাঁর পিতা যেসব গুণ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন, সেগুলোর মধ্যে তিনি উল্লেখ করেন বিনয়, মহানুভবতা, নম্রতা এবং আত্মসংযম। তিনি বলেন, তাঁর দাদা কখনো ধর্মীয় মর্যাদার কারণে ব্যক্তিগত কোনো সুবিধা নিতে চাইতেন না। এমনকি পাড়ার রুটির দোকানেও অন্যদের আগে তাঁকে সেবা দেওয়ার প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করতেন।
সরল কিন্তু আন্তরিক পারিবারিক জীবন
সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁদের পারিবারিক জীবন ছিল অত্যন্ত সাধারণ, তবে ভালোবাসা ও আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ। তিনি মনে করেন, এই পরিবেশ গড়ে উঠেছিল তাঁর পিতার সাদাসিধে জীবনযাপন এবং সহজ-সরল স্বভাবের কারণে। তিনি আরও বলেন, জীবনের নানা সময়ে কঠোর আচরণের শিকার হলেও তাঁর পিতা প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে মানুষকে ক্ষমা করতেন এবং যারা তাঁর প্রতি অন্যায় করেছে, তাদের জন্যও দোয়া করতেন।
পিতা ও দাদার মিল থাকা বৈশিষ্ট্য
সাক্ষাৎকারের অন্য অংশে সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনি বলেন, তাঁর পিতা ও দাদার মধ্যে বহু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিল। উভয়েই ছিলেন মহান চরিত্রের অধিকারী, আন্তরিক, বিনয়ী এবং জাগতিক ভোগবিলাস থেকে দূরে থাকা মানুষ। তিনি বলেন, তাঁরা দুজনই মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে বিশ্বাস করতেন। কখনো কখনো আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হলেও পরিবার আত্মসম্মান বজায় রেখেছে এবং অন্যের অনুগ্রহ বা বিশেষ সুবিধা চাওয়া থেকে বিরত থেকেছে। তাঁর মতে, এই জীবনধারাই পরিবারে উষ্ণতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। আরেকটি উল্লেখযোগ্য মিল ছিল তাঁদের বই পড়ার প্রতি গভীর অনুরাগ ও জ্ঞানচর্চার প্রতি অঙ্গীকার। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত সংযমী। তাঁর মতে, অল্প আহার ও আত্মসংযম পিতা-পুত্রের আরেকটি অভিন্ন ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ছিল।
সব শেষে আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মোস্তফা খামেনি বলেন, শহীদ নেতা তাঁর পিতার মতোই আজীবন একজন নিবেদিতপ্রাণ পাঠক ছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনার অত্যন্ত ব্যস্ত দায়িত্বের মধ্যেও তিনি প্রতিদিন নিয়মিত বই পড়তেন এবং বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন বিষয়ের বিপুলসংখ্যক গ্রন্থ অধ্যয়ন করে গেছেন।