দেশে দেশে গণঅভ্যুত্থান ও বিপ্লব, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ


৮ জুলাই ২০২৬ ২০:২১

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
যুগ যুগ ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসন, ঔপনিবেশিকতা এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে অসংখ্য সফল ও ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থান ঘটেছে। এসব গণঅভ্যুত্থানের কোনোটা সফল হয়েছে আবার কোনোটা ব্যর্থ। অভ্যুত্থান পরবর্তীতে কোনো কোনো দেশে সফল বিপ্লব সাধিত হয়েছে। পরবর্তীতে কোনো বিপ্লব সফল হয়েছে আবার কোনো বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছে। তবে অভ্যুত্থান ও বিপ্লব সফল হোক আর ব্যর্থ হোক, সাধারণ জনগণকেই তাদের রক্ত দিতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে। ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী শাসন ও শাসকের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ জনগণ যখন অসহ্য হয়ে উঠেছে, তখন বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। তারা তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বৈরাচারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলছে। জনগণ যখন স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে, তখন অধিকাংশ আন্দোলনেই সফল হয়েছে তথা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্টদের পতন হয়েছে। তবে মুক্তি ও কল্যাণের যে প্রত্যাশা নিয়ে তারা আন্দোলন সংগ্রাম করে জীবন দিয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আন্দোলন পরবর্তীতে ফ্যাসিস্টদের পতনের পর যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা মুক্তিকামী মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করেনি বা পূরণ করতে চায়নি। তাই আজকে প্রশ্ন উঠেছে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে গণআকাক্সক্ষা তথা প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবপত্তর করার।
ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, যখনই কোনো শাসক বা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার ও জুলুমের সীমা পার করেছে, তখনই তীব্র গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের জন্ম হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলা এবং শাসনব্যবস্থা বদলে দেওয়া বড় বড় কয়েকটি গণঅভ্যুত্থান নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনাই হচ্ছে এ কলামের আসল উদ্দেশ্য।
ফরাসি বিপ্লব ১৭৮৯
ফরাসি রাজপরিবারের বিলাসী জীবন, চরম অর্থনৈতিক সংকট এবং সাধারণ মানুষের ওপর বৈষম্যমূলক করের বোঝা যখন প্রতিনিয়ত বাড়ানো হচ্ছিল, তখন ফ্রান্সের সাধারণ জনগণ ফুঁসে ওঠে। এক পর্যায়ে ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ প্যারিসের বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে। এর ফলে ফ্রান্সে শত বছরের রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, রাজা ষোড়শ লুইকে গিলোটিনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং ‘সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা’ (Liberty, Equality, Fraternity) স্লোগানের মাধ্যমে আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয়। পরবতীতে ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে আর একটি গণঅভ্যুত্থান হয়, যার নেতৃত্ব দেয় ছাত্র ও শ্রমিক জনতা। ঐতিহাসিক ঐ গণবিক্ষোভে ফরাসি সমাজ ও রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনে এবং প্রেসিডেন্ট চার্লস ডি গলের ক্ষমতাকে নাড়িয়ে দেয়।
রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব ১৯১৭
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ার চরম ক্ষয়ক্ষতি, তীব্র খাদ্য সংকট এবং জার দ্বিতীয় নিকোলাসের স্বৈরাচারী শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে রুশ জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। তখন রুশ কমিউনিস্ট পার্টি জারের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে। এক পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ভ্লাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা গণঅভ্যুত্থান করে। জারের শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে লেলিনের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতা গ্রহণ করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করে। কমিউনিস্ট নেতা লেনিনের নেতৃত্বে এটাই হচ্ছে বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র যা পরবর্তিতে সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) নামে গঠিত হয়।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু কয়েক দশকের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ফলাফলে দেখা গেছে সোভিয়েত রাশিয়ায় অর্থনৈতিক মুক্তি তো আসেনি বরং সংকট বেড়েছে এবং জনগণের বাকস্বাধীনতা হরণ করে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে বাতিল করে দিয়ে আর এক স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। রাশিয়ায় কমিউনিস্টরা যে অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে হাজার হাজার মানুষ জীবন দিয়েছিল তাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়, তাদের প্রকৃত মুক্তি মেলেনি।
ইরানের ইসলামী বিপ্লব ১৯৭৯
ইরানের মার্কিনপন্থী শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভীর স্বৈরাচারী শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি তথা ইসলামবিরোধী আইন জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদের সাধারণ জনগণ; বিশেষ করে আলেম ওলামারা আন্দোলন শুরু করে। ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। আন্দোলনের একপর্যায়ে তা গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং গণরোষের ভয়ে শাহ দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়।
শাহ দেশ ছেড়ে মিশরে গিয়ে আশ্রয় নেয় এবং ইরানে আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। ধর্মীয় নেতাদের নেতৃত্বে একটি ইসলামী বিপ্লব হয় এবং ইরানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ জনগণের রক্ত ঘাম ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অসংখ্য মানুষের জীবনের বিনিময়ে ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রটি প্রতিষ্ঠিত হলেও পাশ্চাত্য অপশক্তির চরম বিরোধিতার কারণে অর্থনৈতিকভাবে সফল হতে পারেনি। বিগত কয়েক শতাব্দীর মধ্যে ইরানের আয়াতুল্লাহরাই একটি সফল ইসলামী বিপ্লব করে। তবে পাশ্চাত্যের চরম বিরোধিতার মুখেও ইরানের বিপ্লব বিগত পাঁচ দশক ধরে টিকে আছে।
কিউবা বিপ্লব ১৯৫৩-১৯৫৯
কিউবার বিপ্লব ছিল একটি ঐতিহাসিক সশস্ত্র সংগ্রাম, যার মাধ্যমে ফিদেল কাস্ত্রো ও চেগুয়েভার নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী কিউবার মার্কিন-সমর্থিত স্বৈরশাসক ফুলগেনসিও বাতিস্তার সরকারকে উৎখাত করেন।
১৯৫২ সালে কিউবার সম্ভাব্য নির্বাচনে নিজের নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে বাতিস্তা রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন এবং নির্বাচন বাতিল করে দেন। বাতিস্তার শাসনামলে ব্যাপক দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দেখা দেয়। সাধারণ কিউবানরা চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটালেও মুষ্টিমেয় ধনী ব্যক্তি ও মার্কিন মাফিয়ারা দেশ শাসন ও সম্পদ লুট করতো। সেসময় কিউবার অর্থনীতি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর নির্ভরশীল ছিল, যা কিউবার সার্বিক স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করছিল। কাস্ত্রোর নেতৃত্বে সাধারণ জনগণের আন্দোলন সংগ্রামের ফলে ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারি বাতিস্তা দেশ থেকে পালিয়ে যান । ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতা গ্রহণ করে কিউবাকে একটি সমাজতান্ত্রিক বা কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে পরিণত করেন। কাস্ত্রোর অধীনে কিউবায় সমাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
আরব বসন্ত ও গণমুক্তি
মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোয় দীর্ঘদিনের একনায়কতন্ত্র, দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কারণে আরব দেশের জনগণ ফুঁসে উঠতে থাকে। প্রথমে তিউনিসিয়ায় এ গণজাগরণ শুরু হয় তারপর তা পুরো উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে। তিউনিসিয়ায় শুরু হওয়া এই গণজোয়ার দ্রুত মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেন ও সিরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে তিউনিসিয়ার বেন আলি, মিশরের হোসনি মোবারক এবং লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফির মতো শক্তিশালী একনায়কদের পতন ঘটে। কিন্তু সাধারণ জনগণের মুক্তি মিলেনি এখনো। আবারো মিশরসহ আরব দেশগুলোয় সিসির মতো স্বৈরাচাররাই ক্ষমতা দখল করে বসে আছে।
মিশরের গণঅভ্যুত্থান ও ক্ষমতা বদলের ধাপ
২০১১ সালের গণঅভ্যুত্থান (আরব বসন্ত) প্রেক্ষাপট : তিন দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের দুর্নীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ২৫ জানুয়ারি মিশরে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়।
রাজধানী কায়রোর তাহরীর স্কয়ার লাখ লাখ মানুষের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে অবশেষে ১১ ফেব্রুয়ারি হোসনি মোবারক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
মুরসির ক্ষমতা গ্রহণ ও চ্যালেঞ্জসমূহ (২০১২-২০১৩) নির্বাচন : মোবারকের পতনের পর ২০১২ সালের জুনে মিশরের ইতিহাসে প্রথম অবাধ ও গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতা ড. মোহাম্মদ মুরসি ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
মুরসি মাত্র এক বছর ক্ষমতায় ছিলেন। মুরসি ক্ষমতায় আসার পরপরই ধর্মনিরপেক্ষ দল, বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর (যাদের বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ তথা রাষ্ট্রের ভিতর আর এক রাষ্ট্র) তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েন তিনি। এ সময় সাংবিধানিক ক্ষমতা বৃদ্ধি নিয়ে জনগণের একটি বড় অংশের মাঝে অসন্তোষ তৈরি করা হয়।
সামরিক অভ্যুত্থান করে গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত
মুরসির এক বছর পূর্তিতে ২০১৩ সালের ২৮ জুন তার বিরোধীরা নতুন করে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু করে। লাখ লাখ মুরসিবিরোধীর উপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেন। সংবিধান স্থগিত করে মুরসি ও মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষনেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে বিচার চলাকালীন অবস্থায় কারাগারে মুরসির মৃত্যু হয়।
সিসির ক্ষমতা দখল ও বর্তমান : মুরসিকে হটানোর পর সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি নিজের অবস্থান পোক্ত করেন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। বিরোধীদলগুলোকে কোণঠাসা ও বয়কট করার মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। বর্তমানে সিসির শাসনামলে মিশরে কঠোরভাবে ভিন্নমত ও বিক্ষোভ দমন করা হয়। দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করার অভিযোগ রয়েছে।
তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব ২০১০
মোহাম্মদ বুয়াজিজি নামের এক ফল বিক্রেতার আত্মাহুতির পর শুরু হওয়া গণআন্দোলনে দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা স্বৈরশাসক জিন আল-আবেদিন বেন আলির পতন ঘটে, যা পুরো আরব বিশ্বে ‘আরব বসন্ত’ নামে ছড়িয়ে পড়ে।
শ্রীলঙ্কার আরাগালয়া আন্দোলন ২০২২
২০২২ সালে তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে শ্রীলঙ্কায় ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। স্থানীয়ভাবে ‘আরাগালয়া’ নামে পরিচিত। গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজাপাকসে সরকারের পতন ঘটে এবং প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে রনিল বিক্রমাসিংহে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন, তবে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের একটি তীব্র আকাক্সক্ষা তৈরি হয়।
২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কায় নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনূঢ়া কুমার দিশানায়েকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। নির্বাচনে তিনি ৪২.৩১% ভোট পেয়ে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করেন এবং দেশের ৯ম নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। বর্তমান সরকার শ্রীলঙ্কার ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন করে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবে শ্রীলঙ্কার গণঅভ্যুত্থানের কিছুটা সফলতা জনগণ পাচ্ছে বলে জানা গেছে।
বড় বড় বিপ্লব ছাড়াও বিশ্বের অনেক দেশে স্বল্পসময়ের আন্দোলন সংগ্রামে অনেক গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। তন্মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় আরব বসন্ত, শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থান, ফিলিপাইনের গণআন্দোলনে মার্কোসের পতন, নিকারাগুয়ায় বিপ্লব ইত্যাদি।
ফিলিপাইনের পিপলস পাওয়ার রিভূলিউশন ১৯৮৬ : একনায়ক ফার্দিনান্দ মার্কোসের দুর্নীতি ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের অহিংস গণঅভ্যুত্থান, যার ফলে দীর্ঘ ২০ বছরের স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতন ঘটে এবং মার্কোস দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।
ইউরোপ ও উত্তর ইউরেশিয়ার গণঅভ্যুত্থান
চেকোস্লোভাকিয়ায় কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ অহিংস ও শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থান ঘটে, যার ফলে সেখানে ৪১ বছরের একদলীয় শাসনের অবসান হয়।
রোমানিয়ার বিপ্লব ১৯৮৯ : রক্তাক্ত এক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রোমানিয়ার কুখ্যাত কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কুর পতন ঘটে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ইউক্রেনের কমলা বিপ্লব ২০০৪-০৫ : নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে দেশটির সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে আসে এবং তীব্র আন্দোলনের মুখে পুনরায় সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় সরকার।
বার্লিন প্রাচীর পতন ও পূর্ব ইউরোপের বিপ্লব ১৯৮৯ : সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত পূর্ব জার্মানি, পোল্যান্ড, রোমানিয়াসহ বিভিন্ন দেশে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটে।
বুলডোজার বিপ্লব ২০০০, সার্বিয়া : গণবিক্ষোভের মুখে সার্বিয়ার একনায়ক স্লোবোদান মিলোশেভিচ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
ইউক্রেনের ইউরোমাইদান আন্দোলন ২০১৩-১৪ : রাশিয়া-পন্থী প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের বিরুদ্ধে কিয়েভের মাইদান স্কয়ারে বিশাল গণঅভ্যুত্থান গড়ে ওঠে, যার ফলে ইয়ানুকোভিচ দেশ ছেড়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যান।
নিকারাগুয়ান বিপ্লব ১৯৭৯ : সানদিনিস্তা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের নেতৃত্বে ব্যাপক গণআন্দোলন ও সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে সোমোজা পারিবারিক একনায়কতন্ত্রের অবসান ঘটে।
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান, প্রাপ্তির হিসাবপত্তর
পূর্ব পাকিস্তান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ২০২৪ পর্যন্ত সময়কালে দেশে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধার এক কথায় জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসজুড়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি গণঅভ্যুত্থান, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিনটি হচ্ছে ১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪।
১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান : শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগ ১৯৬০ দশকে প্রতিনিয়ত প্রচার করেছে পাকিস্তানি ও পাকিস্তান সরকার বাঙালিদের অধিকার দিচ্ছে না। সাধারণ জনগণ তাদের কথা বিশ্বাস করে রাজপথে নেমে জীবন দেয়, ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থান হয়, তারপর ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভাগ করে বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সৃষ্টির পর কি এদেশের জনগণের মুক্তি এসেছে। বরং ১৯৭২ সালে দেশে একটি স্বৈরাচারি শাসন কায়েম করা হয়, শুধু তাই নয় শেখ মুজিব ১৯৭৪ সালে দেশে একদলীয় শাসন চালু করে। তাই আর এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ মুজিবের বাকশালী শাসন থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করা হয়। তারপর ১৯৮০-র দশকে আর এক সামরিক শাসক এরশাদ জোর করে ক্ষমতা দখল করে দেশে আবার স্বৈরাচারী শাসন চালু করে।
বাংলাদেশের ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান : গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেয়া ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতার দাবিতে ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটে। একটি তত্তাবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট শাসিত সরকার থেকে রূপান্তর করে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করা হলেও প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তারপর ১৯৯০ সালে একটা গণঅভ্যুত্থান হলেও, জনগণ কি তাদের মৌলিক অধিকার ফিরে পেয়েছে, বরং পরবর্তীতে শেখ হাসিনার মতো আর এক ফ্যাসিস্ট সরকার আসে। আর এ ফ্যাসিস্ট সরকারের জাঁতাকলে নিষ্পিষ্ট হয়ে হাজার হাজার মানুষকে জীবন দিতে হয়েছে। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতিত হয়েছে। জাতির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বকে জুডিশিয়াল কিলিং করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার অত্যাচার নির্যাতনে জেল জুলুম গুম খুনের কারণে বাংলাদেশ একটি কারাগারে পরিণত হয়। হাজার হাজার মানুষকে খুন করা হয়, লাখ লাখ মানুষকে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়, লাখ লাখ মানুষ জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে চলে যায়। যেসব নেতারা দেশে ছিল তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় জামায়াত নেতাদের বিচারের নামে ফাসি দিয়ে হত্যা করা হয়। এমনি একটি পর্যায়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূত্র ধরে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন পরবর্তীতে শেখ হাসিনার পতনের একদফা দাবিতে রূপ নেয় এবং তীব্র গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনা নয় তার দলের সবাইকে তথা এমপি মন্ত্রী নেতা পাতি নেতাদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছে।
ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাদের নেতৃত্বে ২০২৬ সালে ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি জাতীয় সংসদের অধিকাংশ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে এবং ৭৭ আসন পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট বিরোধীদল হিসেবে ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশেও ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে জনগণের আকাক্সক্ষা হচ্ছে গণতান্ত্রিক একটি কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে, জনগণের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এমন একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশপ্রেমিক সব রাজনৈতিক দলের সম্মতিতে একটি জুলাই সনদ স্বাক্ষর করেছে। জুলাই সনদের পক্ষে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে এখনও বিএনপি সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জন আকাক্সক্ষা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা। কিন্তু জুলাই সনদটি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং নির্বাচন পরবর্তীতে বিএনপি সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে।
বাকস্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের জন্য এক কথায় সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে সাধারণ জনগণ আন্দোলন করতে রাজপথে নেমে আসে। রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারী সরকারের অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়, অনেককে জীবন দিতে হয়। জনগণ জীবন দেয় তাদের মুক্তির লক্ষ্যে, কিন্তু তাদের মুক্তি কি আসে।
লেখক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ আগামীর সময় পত্রিকায় এক কলামে লিখেছেন, ‘কিন্তু গত পাঁচ মাসে রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, নির্বাচনী ব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, পুলিশি ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে ঔপনিবেশিক কাঠামোর বদলে হাত দেয়নি বিএনপি। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেয়নি।
ফলে গণঅভ্যুত্থান কার্যত একটা নির্বাচন ছাড়া ইতিবাচক কিছু উপহার দিতে পারেনি দেশকে। অথচ কথা ছিল নতুন বন্দোবস্তে দেশের যাবতীয় নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীকেন্দ্রিক হবে না। প্রত্যাশা ছিল স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়বে। আশা ছিল, পুলিশ বিভাগ ও বিচার বিভাগ বাড়তি স্বাধীনতা পাবে। বিচার বিভাগের পুরো কর্তৃত্ব যাবে প্রধান বিচারপতির কাছে। কিন্তু আগের ১৯ মাসের পর গত পাঁচ মাসেও এসবে মৌলিক কোনো অদল-বদল হয়নি।’
তারপরও জনগণ বুক ভরা আশা নিয়ে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশ প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, সংবিধান সংস্কার বা প্রয়োজনে পুরো পরিবর্তন করে জনকল্যাণমুখী একটি প্রশাসন ও সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে আইনের শাসন ফিরে আসবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। সর্বোপরি জনগণের এ প্রত্যাশা পূরণ হোক বাংলাদেশ হবে একটি কল্যাণরাষ্ট্র।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com