আলোকে তিমিরে

এখন দরকার কিছু তাকওয়াসম্পন্ন মর্দে-মুজাহিদ


২৫ জুন ২০২৬ ১০:৪৯

॥ মাহবুবুল হক ॥
আজ সকালে (২০ জুন ২০২৬) আমার গ্রাম এলাকার কিছু তরুণ সমাজচিন্তক ও কর্মী দয়া করে আমার বাসায় এসেছিলেন। সাধারণত গ্রাম এলাকা থেকে যারা আসেন, তারা হলেন দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষ, যাদের নানারকম সহযোগিতার দরকার। এদের মধ্যে আত্মীয়-স্বজনও থাকেন। এর বাইরে যারা আসেন, তারা হলেন কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক এ ধরনের মানুষ। যারা সরাসরি রাজনীতি করেন, তারা এখন আর আমার কাছে কেউ আসেন না। কারণ তারা খুব ভালো করে জানেন, আমার কাছে রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দুটি বিষয় নেই। এক. টাকা-পয়সা ও দুই. রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তবে আজ যারা এসেছিলেন, তারা এলাকার ইসলামপন্থী তরুণ। যারা ধর্ম, বর্ণ, মতবাদ, আদর্শ নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করতে আগ্রহী। আমি একটু বিস্মিত হলাম এবং বিনয়ের সাথে জানতে চেষ্টা করলাম, সবার জন্য বলতে আপনারা আমাকে কী বোঝাতে চাচ্ছেন। তারা বললেন, আমাদের উপজেলা অঞ্চলে শহরের মতো বড় মাপের কাজ কখনো হয়নি। যতটুকু আমরা জেনেছি, সনাতন ধর্মের লোক যখন প্রভাব ও প্রতিপত্তি ছিল, তখন তারা সনাতন ধর্মের মনীষীদের, শিক্ষাবিদদের, রাজনীতিবিদদের, শিল্প-বাণিজ্যবিদদের তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আবার পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর মুসলিমদের মধ্যে যারা মনীষী পর্যায়ে পৌঁছেছেন অর্থাৎ যারা সমাজের জন্য বা রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণধর্মী কোনো কাজ করেছেন, যেমন স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ, রাস্তাঘাট, পোল-ব্রিজ তাদের নাম-ধাম মুসলিমরাই এককভাবে স্মরণ করেছেন। এর বাইরে সামগ্রিকভাবে এক ধরনের সংকীর্ণতাই বিরাজমান ছিল। সনাতন ধর্মের সমাজকর্মীরা কখনো মুসলিম মনীষীদের তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। আবার মুসলিমরাও সনাতন ধর্মের গুণিজনদের তুলে ধরার চেষ্টা করেনি। এভাবে যুগে যুগে, কালে কালে কিছুটা বিভাজন যে ছিল না, তা নয়। বড়ত্ব ও মহানুভবতা যা ব্রিটিশ আমলের আগে আমাদের সমাজে বিরাজমান ছিল, তা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে। ব্রিটিশরা রাজত্ব কেড়ে নিয়েছিল মুসলিমদের হাত থেকে। সে কারণে মুসলিমরা সাধারণভাবে ইংরেজদের শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। সনাতন ধর্মের মানুষও মুসলিম শাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে সবসময় ভাবতো, এরা বহিরাগত। বিভিন্ন দেশ থেকে এসে এরা ভারতের বিভিন্ন অংশে শাসন করছে। তারা রাজা হচ্ছে, বাদশাহ হচ্ছে, আর আমরা হচ্ছি প্রজা। সুতরাং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা এই বিষয়টি নিয়ে কখনো সন্তুষ্ট ছিল না। সে কারণে মুসলিম শাসকদের ওপর যারাই যেখান থেকে আক্রমণ করত বা আক্রমণ করতে আসত, সনাতন ধর্মের লোকেরা বিষয়টিকে ভগবানের আশীর্বাদ বলে মনে করত। সুতরাং একই সমাজের দুই ধরনের ধারা সবসময় বিদ্যমান ছিল।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান ও ভারত সৃষ্টি হওয়ার কারণে সনাতন ধর্মের উচ্চবিত্ত ও প্রতিষ্ঠিত লোকজন ক্রমান্বয়ে ভারতে চলে যাওয়ার প্রয়াস পেয়েছিল। অপরদিকে ভারত থেকেও; বিশেষ করে পশ্চিমবাংলার বিহার ও ঊড়িষ্যা ও আসাম থেকে মাইগ্রেশনসহ বিভিন্নভাবে এসেছিল। কিন্তু দেখা গেছে, সনাতন ধর্মের মানুষ যারা ভারতে গিয়েছিল, তারা দুই দিকের শারীরিক ও মানসিকভাবে অবস্থান করে আসছিল। কারণ অনেক। বিষয়টি অনেক বড়। এখানে সেই বিষয়টির বিস্তার আলোচনা আমরা আনতে চাচ্ছি না। মূলকথা হলো, শাসক হিসেবে ব্রিটিশরা আসার আগে দুটি বড় সম্প্রদায় মিলে যে একটা যৌথ সমাজ ছিল, তা ভেঙে যায়। বিভক্ত হয়ে যায়। বিভাজিত হয়ে যায়। একসময় হাজী মুহাম্মদ মহসীনের নাম হিন্দু-মুসলমান সবাই স্মরণ করত বা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ অনেক সনাতনধর্মী মানুষের বড় বড় অবদানের কথা হিন্দু-মুসলমান সবাই স্মরণ করত, অনুশীলন করত। পরবর্তীতে দ্বি-জাতিতত্ত্ব সাকসেসফুলভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় এবং দুই জাতির মধ্যে বিভিন্নভাবে করুণতম ইতিহাস তৈরি হওয়ায় সামাজিকভাবে ঐক্যের বিষয়টি দুই জাতি-গোষ্ঠীর মধ্যেই এলোমেলো অবস্থার সৃষ্টি হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির পর সনাতন ধর্মের মনীষীদের নামে রাস্তা-ঘাট বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামের পরিবর্তন যেমন হয়েছে, তেমনি ভারতীয় মুসলমানদের নাম-নিশানা অনেক বেশি পরিবর্তিত হয়েছে। এর তো একটা জের থাকে। বিষয়টি কম-বেশির নয়, বিষয়টি মনোভাবের দৃষ্টিভঙ্গির। চিন্তার, চেতনার। এদিক থেকে বরাবরই মুসলিমরা সনাতন ধর্মের মানুষের থেকে অনেক দিক থেকে বড়ত্ব ও মহানুভবতা দেখিয়েছে। সনাতন ধর্মের মানুষ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার কারণে অনেকটা সংকীর্ণতার পথে পা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার পরও বিভাজনের কারণে মূল যে সমস্যাগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল, তার সমাধান খুব একটা হয়নি। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমান হলেও ইসলাম এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ইসলাম দূরে থাক, মুসলমানিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সবচেয়ে বড় সংকট ছিল কৃষ্টি বা সংস্কৃতি নিয়ে। সেই জায়গাটায় বড় কোনো পরিবর্তন পাকিস্তান আমলে সূচিত হয়নি। বাংলাদেশ আমলে শুরু থেকেই এ এলাকায় সেক্যুলার রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ইসলাম ও মুসলমানিত্বের বিষয়টি পেছনে পড়ে যায়। হিন্দু-মুসলমানের টানাপড়েনের চেয়ে মুসলমানিত্ব ও সেক্যুলার মুসলমানের দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়। গত ৫৪ বছর ধরে একদিকে যেমন হিন্দু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে, তেমনি হিন্দুদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি চলে যায় সেক্যুলার মুসলমানদের কাছে। সাথে সাথে সনাতন ধর্মের সংস্কৃতিকেও সেক্যুলার মুসলিমরা লুফে নেয়। অর্থাৎ সেক্যুলার মুসলমানরা সনাতন ধর্মের লোকদের শুধু সম্পত্তি নয়, তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিরও মালিক বনে যায়। এতে হিন্দু সম্প্রদায় একদিকে কিছু হারালেও অন্যদিক থেকে অনেক বড় বিজয়ের সূচনা করে। নাম যাই থাক, ধর্ম যাই থাক, মুসলমানরাই যখন হিন্দুদের সংস্কৃতি পুরোপুরি গ্রহণ করে নিয়েছে বা নিচ্ছে, তখন আর অসুবিধা কোথায়। ধর্মের মার্কেটিংটাই তো সংস্কৃতি। সেই মার্কেটিংয়ের ফলে হিন্দু সংস্কৃতির সেলস যদি বেড়ে যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। শুধু এ কারণে সহায়-সম্পত্তি হারালেও সনাতন ধর্মের লোকেরা এ যাবত সেক্যুলার মুসলমানদেরই সর্বতোভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে। এমনকি স্থানীয়সহ জাতীয় নির্বাচনের সময় সেক্যুলার মুসলমানদের ভোট দিয়েছে।
এসব প্রেক্ষাপটে জটিল অবস্থানের মধ্যে ২০২৪ সালে আল্লাহর রহমতে দেশে একটা রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটে। এ বিস্ফোরণের মধ্য দিয়েই নন-সেক্যুলার মুসলমানিত্বের একটা বিরাট আবহ সৃষ্টি হয়। আশা করা গিয়েছিল ডান নয়, বাম নয়, একটি মধ্যমপন্থী যুক্তিবাদী ইতিহাসমনস্ক বিপ্লবী সরকার গঠিত হবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বিশ্বের সবকিছু যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের সরাসরি হস্তক্ষেপে আবার সেই সেক্যুলার মুসলমানরাই ক্ষমতা দখল করেছে। যেই শিক্ষার্থীরা এ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল বা বিপ্লব ঘটিয়েছিল, শুরু থেকে তারা ছিল নানামাত্রিক বলতে গেলে বাংলাদেশে বিরাজিত সকল দল ও মতের ছাত্র সংগঠনের শিক্ষার্থীরাই ছিল এই মহাবিপ্লবের স্টেকহোল্ডার। কিন্তু তারা আদর্শের ক্ষেত্রে নানামাত্রিক হওয়ায় একতার ব্যূহ রচনা করতে পারল না। নানা আদর্শ নিয়ে, নানা মতবাদ নিয়ে সাময়িক কোনো লক্ষ্যে পৌঁছাবার জন্য সাময়িক ঐক্য গড়া যায়, সেই ঐক্য কখনো স্থায়ী করা যায় না। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বৈষম্য সামনে রেখে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, শুধু সেটাকে যদি লক্ষ্য স্থির করা যেত, তাহলে হয়তো মধ্যমপন্থী যে আবহ তৈরি হয়েছিল, তা সময় নিয়ে এগিয়ে যেতে পারত। ওইটুকু হলেও তো আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম।
ছাত্র সংগঠনগুলোকে তাদের অভিভাবকরা সঠিক জায়গায় থাকতে দিল না। তাদের চাপে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা দিশেহারা হয়ে পড়ল, অন্যদিকে দেশের রাজনীতিক দলের একটি বড় অংশ যারা বলতে গেলে সেক্যুলার মুসলমান, তারা একটি মাত্র লক্ষ্য স্থির করল, তা হলোÑ জাতীয় নির্বাচন। পতিত সরকার প্রতিবেশী দেশ ও বিশ্বের নিয়ন্ত্রক শক্তিগুলো বহুমুখী চাপ সৃষ্টি করে অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্যসমূহসহ সকল লক্ষ্যকে মিসমার করে দিল। পতিত সরকারের দুটি দল ও পূর্বে উল্লেখিত একটি দল ছাড়া দেশের অন্যসব দল সংস্কারের দিকে যেতে চাচ্ছিল। গেলে অবশ্যই ভালো হতো। কিন্তু তা আর হতে পারেনি। জাতীয় নির্বাচনে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হলো। যে উচ্চ চিন্তা ও উচ্চ আকাক্সক্ষা নিয়ে নির্বাচনে যাওয়া হলো, তা হতে দেওয়া হলো না। বাংলাদেশের মানুষ বিপুলভাবে ভোট দিল ডান ও মধ্যপন্থীদের। অভিজ্ঞতার কারণে ইসলামপন্থীরা পুরোপুরিভাবে ইসলামী আদলে বা ইসলামী চরিত্রে আবির্ভূত বা উদ্ভাসিত হতে চাইল না। ইসলামপন্থীরা নিজেদের মধ্যে মডারেশন আনল। কৌশল পাল্টালো। বিজয়ী হতে হতে হলো না। পাবলিক এই প্রথমবারের মতো সর্বতোভাবে (ডান ও মধ্যমপন্থীসহ) ইসলামপন্থীদেরই ক্ষমতায় চেয়েছিল। তাদের এই বাস্তব আশা পূরণ হয়নি। এর সার্বিক কারণ বাংলাদেশের পাবলিক, তথা আপামর জনসাধারণ ছাড়া দুনিয়ার আর কেউ ইসলামের বিজয় চায়নি।
আল্লাহর রহমতে ইসলামপন্থীদের মধ্যমপন্থী মডারেট কৌশল এ দেশের পাবলিক দারুণভাবে পছন্দ করেছে। সাধারণ মানুষ বুঝতে পেরেছে এতদিন তারা জোনাকির আলো দেখেছে, এবার তারা যেন পূর্ণিমার আলো দেখতে পাচ্ছে। যারা নির্বাচন করেছে, তারাও শ্রান্ত-ক্লান্ত হলেও বিষণ্ন হয়নি। হতাশ হয়নি। টানেলের অপর পাড়ে তারা সূর্যের আলো দেখছে। এখন তারা নিজেরাই সংগঠিত হচ্ছে। নির্বাচনের পর এখন মনে হচ্ছে দেশের শতকরা ৭০ ভাগ আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা ইসলামপন্থীদের কাছে ছুটছে। ইসলাম সম্পর্কে জানতে চাচ্ছে, বুঝতে চাচ্ছে। এরই প্রেক্ষাপটে এতদিন ইসলামপন্থীদের কী কী দুর্বলতা ছিল, তাও জানতে চাচ্ছে। আমার কাছে যারা এসেছেন, তারা আমাদের উপজেলায় পাকিস্তান-পরবর্তী সময়ে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে যারা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের কল্যাণ ও মঙ্গলের জন্য বিপুল অবদান রেখেছেন, তাদের নাম সংগ্রহ করতে চাচ্ছেন। তাদের প্রতি এলাকার পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাচ্ছেন। সংবর্ধনা প্রদান করতে চাচ্ছেন। তারা বলছেন, এখন তো আর দ্বি-জাতিতত্ত্ব নেই। অতীতের সবকিছু ভুলে গিয়ে আমরা সবাই সবাইকে ক্ষমা করব। ইসলাম তো শুধু মুসলমানের জন্য আসেনি। রাসূল ও কুরআনও তো শুধু মুসলমানদের জন্য আসেনি। এসব এসেছে গোটা মানবজাতির জন্য। আমরা এতদিন ভুল করেছি। আর ইনশাআল্লাহ ভুল করব না। আমরা মানবজাতির জন্য না পারি, অন্তত আমাদের এলাকায় ইসলামের স্নিগ্ধ আলো ছড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করব।
আমাদের এলাকায় অন্য ধর্মের যারা আছে, তারা যেন কোনো কারণেই আর দেশত্যাগ করার পরিকল্পনা না করে। সেই বিষয়টি আমরা নিপুণভাবে দেখার চেষ্টা করব। আমরা সবাইকে ভালোবাসবো। কারো প্রতি আমরা হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করব না। আমরা প্রত্যেকের ঘরে ঘরে অর্থসহ কুরআন পৌঁছানোর উদ্যোগ গ্রহণ করব। মসজিদের খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনের কাছে আহ্বান জানাবÑ তারা যেন কষ্ট করে মুসল্লিদের অর্থসহ নামাজ শিখিয়ে দেন।
এসব কথা বলতে বলতে তারা আমাকে একটা প্রশ্ন করেন- আমরা যা আপনাকে জানালাম এর বাইরে আর কী আছে? আমার খুব সহজ, সরল, সাধারণ জবাব ছিল, এসব তো বাইরের কাজ। বাইরের কাজের মধ্যে একটা কথাই শুধু এখানে আলোচনা হয়নি, তা হলো- আমরা শুধু মানুষের কল্যাণের কথাই বলেছি। সৃষ্টির কল্যাণের কথা কিছু বলিনি। সৃষ্টির দেখভালের দায়িত্বও তো মানুষের। পাহাড়, পর্বত, টিলা, নদী-নালা, হাওর, বাঁওড়, বন-বাদাড়, খাল-বিল, পশু-পাখি, জন্তু-জানোয়ার, কীট-পতঙ্গ সবকিছুর সংরক্ষণ ও পরিচর্যার দায়-দায়িত্বও তো মানুষের।
এবার আসুন, আমরা একটু ভেতরের কথায় আসি। মক্কী জীবনে রাসূল (সা.) প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন নিজের ঘরে-পরিবারে এবং আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে। তাদের তিনি সত্যিকার অর্থে মুসলিম বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই চেষ্টায় তিনি দারুণভাবে সফলকাম হয়েছিলেন। অল্প কিছু মানুষকে তিনি মহান আল্লাহর খাঁটি বান্দায় পরিণত করার প্রয়াস পেয়েছেন। মহান আল্লাহ অহির মাধ্যমে রাসূল (সা.)-কে যা জানাতেন, তিনি তাঁর তৈরি সঙ্গী ও সাথীদের তাই জানাতেন। এই জানাজানির ক্ষেত্রে সবাই যে পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণি পেয়ে গিয়েছিল, তা তো নয়। আমরা দুনিয়ার পরীক্ষায় যেমন প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে বিভক্ত হই, ঠিক তেমনি ছিল তখনকার অবস্থাও। রাসূল (সা.)-এর নিয়মিত পরীক্ষায় যারা সবসময় প্রথম শ্রেণিতে অবস্থান করতেন, তাদের বলা হতো মহসীন বান্দা। তাদের প্রধান উপাধি ছিল তাকওয়াসম্পন্ন সাহাবা বা তাকওয়াধারী সাহাবা। তারাই ছিলেন সত্যিকার অর্থে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি। মহান আল্লাহর খলিফা। আল্লাহ কুরআনে মানুষকে নবী-রাসূলদের একদিকে যেমন তার একান্ত দাস বলে অভিহিত করেছেন; অপরদিকে তার একনিষ্ঠ প্রতিনিধি বা খলিফা হিসেবে সম্মাননা দেখিয়েছেন।
আমাদের এখন কয়েকজন ফকির বিদ্রোহী তিতুমীর, কয়েকজন হাজী শরীয়তুল্লাহ, কয়েকজন সৈয়দ আহমদ বেরলভী, কয়েকজন হযরত শাহজালাল, কয়েকজন শাহ মখদুম, শাহ আমানত, কয়েকজন খানজাহান আলী, কয়েকজন মাওলানা কেরামত আলী খুব প্রয়োজন। এরা সবাই শুধু দাস ছিলেন না। এরা ছিলেন তাকওয়াসম্পন্ন মহান আল্লাহর খলিফা। আল্লাহর রহমতে এদেশে এখন মহান আল্লাহর প্রকৃত দাসের অভাব নেই। সবচেয়ে বড় অভাব তাকওয়াসম্পন্ন দাসের। যারা হবেন মহান আল্লাহর প্রতিনিধি। যারা শুধু আসহাবে সুফফা হবেন না। হবেন শাসক, প্রশাসক, উপদেশক, শিক্ষক, পরামর্শক, বিচারপতি, মন্ত্রী, সেনাপতি, রাষ্ট্রদূত, বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রনায়ক, শিল্পপতি অর্থাৎ যারা হবেন আল্লাহ ও জনগণের সত্যিকার প্রতিনিধি।