হালাল অর্থনীতি : মালয়েশিয়া ও মুসলিম বিশ্ব


২৫ জুন ২০২৬ ১০:৪৮

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
হালাল অর্থনীতি কী?
হালাল অর্থনীতি কী? হালাল অর্থনীতি বলতে কী বোঝায়, তা আজকে অনেকের কাছেই নতুন ধারণা। মুসলিমদেরও একটা অংশেরও হালাল শিল্প ও হালাল অর্থনীতি নিয়ে তেমন চর্চা নেই। তবে এটা ঠিক বর্তমান বিশ্বে হালাল অর্থনীতি তথা হালাল শিল্প ধারণা ও তার কার্যক্রমটা অনেকটা নতুন। নতুন হলেও হালাল শিল্প ও হালাল অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ১৯৭৪ সালের দিকে হালাল অর্থনীতির ধারণাটি শুরু হয়। তারপর তা মুসলিম বিশ্বসহ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অন্যতম মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া হালাল অর্থনীতি তথা হালাল শিল্পটির বিকাশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে।
হালাল অর্থনীতি (Halal Economy) বলতে ইসলামের শরিয়াহ বা নিয়মনীতি মেনে পরিচালিত সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝায়। সহজ কথায়, পণ্য উৎপাদন, সেবা, অর্থায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যা কিছু ইসলামে বৈধ তথা হালাল, সেগুলোকে ভিত্তি করে যে বিশাল বৈশ্বিক বাজার গড়ে উঠেছে, সেটাই হালাল অর্থনীতি। এটি শুধু মুসলিমদের জন্য নয়, বরং এর নৈতিক, স্বাস্থ্যকর এবং নিরাপদ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে বর্তমান বিশ্বে এটি একটি অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক খাত।
হালাল অর্থনীতির খাত
হালাল অর্থনীতি মূলত কয়েকটি প্রধান খাতের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। যেমন হালাল খাদ্য ও পানীয়, ইসলামিক ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং, হালাল কসমেটিকস ও ওষুধ, হালাল পর্যটন ও শালীন পোশাক ও ফ্যাশন ইত্যাদি।
হালাল খাদ্য ও পানীয় : এটি এই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় খাত। শুধু শূকরের মাংস বা মদ বর্জন করাই নয়, বরং পশুপাখি জবাইয়ের ইসলামিক পদ্ধতি থেকে শুরু করে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং এবং লজিস্টিকস সবকিছুতেই শতভাগ পবিত্রতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক।
ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ব্যাংকিং : ইসলামে সুদ (Riba), জুয়া বা অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা (Gharar) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাই হালাল অর্থায়নে সুদের পরিবর্তে অংশীদারিত্ব (Profit-Loss Sharing) এবং সম্পদের ওপর ভিত্তি করে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়।
হালাল কসমেটিকস ও ওষুধ : এই খাতে ব্যবহৃত কাঁচামালে কোনো ধরনের নিষিদ্ধ উপাদান যেমন: অ্যালকোহল বা হালাল উপায়ে জবাই না করা পশুর চর্বি থাকা যাবে না। যদি থাকে তাও ওষুধ ও কসমেটিকসের প্যাকেটে লিখা থাকতে হবে।
মুসলিমবান্ধব পর্যটন (Halal Tourism) : মুসলিম পর্যটকদের জন্য হালাল খাবার, নামাজের সুব্যবস্থা, মদ্যপানমুক্ত পরিবেশ এবং পারিবারিক বিনোদনের সুযোগ নিশ্চিত করে এমন হোটেল ও রিসোর্টসংবলিত পর্যটন ব্যবস্থা। বাংলাদেশেও হালাল পর্যটনের ধারণা আস্তে আস্তে বিকশিত হচ্ছে।
শালীন পোশাক বা ফ্যাশন (Modest Fashion) : আধুনিকতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে শালীন পোশাকের ডিজাইন ও বিপণন, যা বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে তরুণীদের হিজাবের মাধ্যমে শালীন পোশাক একটি হালাল পণ্য।
সর্বোপরি হালাল অর্থনীতি হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা সম্পূর্ণভাবে ইসলামী শরিয়াহ বা নিয়মনীতি মেনে পরিচালিত হয়। এটি মূলত মুসলিম ও অমুসলিম ভোক্তাদের জন্য নৈতিক, স্বচ্ছ এবং ধর্মীয়ভাবে বৈধ পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করার একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম।
২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির বাজারমূল্য ৭ লাখ ৭০ হাজার কোটি (৭.৭ ট্রিলিয়ন) মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হালাল অর্থনীতি এবং ইসলামী অর্থনীতি
হালাল অর্থনীতি প্রকৃতপক্ষে ইসলামী অর্থনীতিরই পরিপূরক বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড। হালাল অর্থনীতি এবং ইসলামী অর্থনীতি প্রায়ই একই সূত্রে গাঁথা মনে হলেও এদের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। ইসলামী অর্থনীতি হলো সামগ্রিক অর্থনৈতিক কাঠামো, আর হালাল অর্থনীতি হলো সেই কাঠামোর আওতাভুক্ত ব্যবসা, পণ্য এবং সেবাসমূহের বাস্তব রূপায়ণ।
ইসলামী অর্থনীতির (Islamic Economics) মূল দর্শন হচ্ছে এটি কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশিত একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ইসলামী অর্থনীতির মূলনীতি হচ্ছে এই ব্যবস্থার ভিত্তি হলো সম্পদের সুষম বণ্টন, সুদমুক্ত লেনদেন, জাকাত প্রদান এবং গরিব ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা। এখানে সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং মানুষ কেবল তার আমানতদার বা ব্যবহারকারী।
হালাল অর্থনীতির (Halal Economy) মূল দর্শন হলো এটি হলো শরীয়াহসম্মত মানদণ্ড মেনে পরিচালিত বৈশ্বিক বাণিজ্যিক খাত ও ইকোসিস্টেম।
হালাল অর্থনীতি মূলত পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও সেবাকে হালাল বা বৈধ উপায়ে পরিচালনার ওপর জোর দেয়। শুধু ব্যাংকিং বা অর্থায়ন নয়, এর পরিধি খাদ্য, পর্যটন, পোশাক তথা মডেস্ট ফ্যাশন, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং প্রসাধন পর্যন্ত বিস্তৃত।
এককথায় ইসলামী অর্থনীতি মূলত একটি দেশের অর্থনৈতিক সিস্টেম, ব্যাংকিং ও নীতিমালা নিয়ে কাজ করে। অপরদিকে হালাল অর্থনীতি হলো একটি বহুমাত্রিক বাণিজ্যিক বাজার (Market Ecosystem)। ইসলামী অর্থনীতির প্রধান উদ্দেশ্য সামাজিক ইনসাফ ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। হালাল অর্থনীতির উদ্দেশ্য হলো মুসলিম (এবং অমুসলিম) গ্রাহকদের জন্য নৈতিক ও শরীয়াহ-সম্মত পণ্য ও সেবা সরবরাহ করা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে হালাল শিল্প এজেন্ডা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দুই দেশের আলোচনায় হালাল শিল্প অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে একান্ত বৈঠক শেষে গত ২২ জুন সোমবার দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। দুই দেশের সম্মতিতে ৯টি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৩৩টি পয়েন্টের একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানানো হয় এবং এতে হালাল শিল্পটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এ বৈঠকের আলোচনার একটি অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হালাল শিল্প। দুটি ভাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশের মধ্যে আলোচনায় হালাল শিল্পকে গুরুত্ব দেয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জানান, দুই দেশের আলোচনায় রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর, শ্রমিক কল্যাণ, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়।
বিশ্বে হালাল অর্থনীতির আকার ও পরিধি
বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক বাজারে হালাল অর্থনীতির আকার এবং এর নেতৃত্বদানকারী দেশগুলোর অবস্থান বেশ শক্তিশালী। বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা Dinar Standard-এর সর্বশেষ ‘State of the Global Islamic Economy’ রিপোর্ট এবং বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী ২০২৩ সালে মুসলিম ও নৈতিকতাসম্পন্ন গ্রাহকদের মোট হালাল কনজিউমার স্পেন্ডিং তথা খাদ্য, পোশাক, ওষুধ, কসমেটিকস ও ভ্রমণ খাতের আর্থিক আকার ছিল প্রায় ২.৪৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আশা করা হচ্ছে এটি ২০২৮ সালের মধ্যে ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
ইসলামিক ফাইন্যান্স বা ব্যাংকিং খাতের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪.৯৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৭.৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। বর্তমান বিশ্বে হালাল খাদ্য ও পানীয়ের বাজারপ্রায় ১.৪৩ ট্রিলিয়ন এবং ২০২৬-এ ২.২ ট্রিলিয়নে পৌঁছে যাবে। শালীন পোশাকের (Modest Fashion) বাজার প্রায় ৩২৭ বিলিয়ন, মুসলিমবান্ধব ভ্রমণ ও পর্যটন প্রায় ২৮০ বিলিয়ন, মিডিয়া ও বিনোদন প্রায় ২৬০ বিলিয়ন, হালাল ওষুধ (Pharmaceuticals) প্রায় ১০৭ বিলিয়ন, হালাল কসমেটিকস প্রায় ৮৭ বিলিয়ন ডলার।
হালাল অর্থনীতি প্রসারে মালয়েশিয়ার উদ্যোগ
সারা বিশ্বে হালাল অর্থনীতি তথা হালাল পণ্যে প্রসার ঘটাতে অন্যতম মুসলিম রাষ্ট্র মালয়েশিয়াই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। মালয়েশিয়ার সরকার হালাল পণ্যের বিষয়ে হালাল সার্টিফিকেশন পদ্ধতিও চালু করেছে। মালয়েশিয়ার সরকার জাকিম (JAKIM – Department of Islamic Development Malaysia) নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করছে। জাকিম (JAKIM) হচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার পরিচালিত একটি ইসলামী উন্নয়ন বিভাগ। এটি মালয়েশিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে পরিচালিত একটি শীর্ষ ধর্মীয় ও প্রশাসনিক সংস্থা। মালয়েশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য দেশে হালাল ইকোসিস্টেম এবং ইসলামিক কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত সুপরিচিত একটি সংস্থা।
জাকিমের প্রধান কাজ হচ্ছে পণ্যের হালাল সনদ প্রদান। কোনো পণ্য বা সেবা ইসলামী শরীয়ার হালাল নীতিমালার আলোকে প্রস্তুত, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত করা হচ্ছে কিনা, তা যাচাই করে হালাল সনদ ইস্যু করে।
বৈশ্বিক মান নিয়ন্ত্রণ : বিশ্বব্যাপী হালাল পণ্যের বাজারে মালয়েশিয়ার মান ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে বিশ্বমানের হালাল সার্টিফিকেশন প্রদান ও মান নিয়ন্ত্রণ করে।
ইসলামিক ব্যবস্থাপনা : মালয়েশিয়ায় ইসলামিক শিক্ষা, ফতোয়া, মসজিদ পরিচালনা এবং পারিবারিক আইন বাস্তবায়ন তদারকি করা।
মালয়েশিয়ার হালাল ইকোসিস্টেম ও সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায়, বর্তমানে বাংলাদেশও তাদের হালাল খাতের উন্নয়নে জাকিমের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা গ্রহণ করছে।
তাদের কঠোর ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হালাল সনদের কারণে জাকিম অনন্য অবস্থানে রয়েছে। উন্নত ইসলামিক ফাইন্যান্স ব্যবস্থা এবং সরকারি নীতিমালার কারণে তারা এই খাতের প্রধান প্রতিষ্ঠান। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হালাল অর্থনীতিতে বিশ্বব্যাপী এক নম্বর স্থান ধরে রেখেছে মালয়েশিয়া।
সম্প্রতি বাংলাদেশের হালাল অর্থনৈতিক খাতের উন্নয়নেও মালয়েশিয়া সহায়তা প্রদানের জন্য দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার যৌথ উদ্যোগে হালাল সনদ, নীতিমালা উন্নয়ন, গবেষণা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই খাতের প্রসার ঘটানোর কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
হালাল অর্থনীতিতে সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া ও আমিরাত
সৌদি আরব : ইসলামিক ফাইন্যান্সের বিশাল বাজার এবং মুসলিমবান্ধব পর্যটনের (বিশেষ করে ওমরাহ ও হজকেন্দ্রিক) কারণে তারা দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া : বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হিসেবে ইন্দোনেশিয়া অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ওপরে উঠে এসেছে (বর্তমানে ৩য় স্থানে)। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যে দেশে আমদানিকৃত ও উৎপাদিত পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক হালাল সার্টিফিকেশন আইন কার্যকর করার কারণে বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো এখন ইন্দোনেশিয়াকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যবসা সাজাচ্ছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত : হালাল খাতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে দুবাই এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত শীর্ষ সারিতে অবস্থান করছে।
হালাল অর্থনীতি ও বাংলাদেশ
হালাল পণ্য ও হালাল শিল্প নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে আগ্রহ থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেই। তবে এবারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়ার সফরে দুই দেশের মধ্যে ৩৩ দফার যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়েছে সেখানে হালাল শিল্প নিয়ে একটি দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে হালাল শিল্প অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশ একধাপ এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশে খাদ্য, ওষুধ, কসমেটিকস, পোষাক ও পর্যটনসহ কোনো পণ্যেই এখন পর্যন্ত হালাল সনদ পদ্ধতি চালু হয়নি। অপরদিকে জনগণের মধ্য থেকেও এ ধরনের চাহিদা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কারণ হলো বাংলাদেশে এখনো বাণিজ্যিক পণ্যে; বিশেষ করে ওষুধ ও কসমেটিকসে হালাল চিন্তাভাবনার ধারণাটা খুব বেশি পরিচিত না। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিমের দেশে অধিকাংশ মুসলিমই হালাল উপায়ে তাদের খাদ্য উৎপাদন ও তৈরি করে থাকে। তবে ওষুধ, কসমেটিকস ও প্যাকেটজাত খাদ্যে হালাল উপকরণ ব্যবহার করা নিয়ে কোনো সনদ পদ্ধতি বাংলাদেশে শুরু হয়নি। বিশেষ করে ওষুধ ও কসমেটিকসে হারাম কোনো উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তার কোনো প্রমাণিত সনদ পদ্ধতি নেই। ১৯৯০-র দশকে একটি গ্রুপ এরোমেটিক সাবান নামে একটি হালাল সাবান হিসেবে উৎপাদন ও প্রচার করেছিল এবং এটি ভালো মার্কেট পেয়েছিল। তবে বাংলাদেশে আর্থিক খাতে; বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে হালাল পণ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে হালাল পণ্যের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার যেমন হয়েছে, তার গ্রাহক চাহিদার কারণে জনপ্রিয়ও হয়েছে। যেমন ব্যাংকিং খাতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ সুদবিহীন হালাল পণ্য নিয়ে আসে এবং বাংলাদেশের জনগণ তা সাদরে গ্রহণ করে। ব্যাংকিং খাতে হালাল পণ্যের জনপ্রিয়তার কারণে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় এক ডজন ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতিতে কাজ করছে। সুদযুক্ত ব্যাংকগুলো তাদের হালাল পণ্য তথা ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো খুলেছে। ফিন্যান্স ও বীমা খাতেও হালাল পণ্য তথা ইসলামী পদ্ধতির প্রসার যেমন হয়েছে, তেমনি জনগণ গ্রহণও করেছে। বেশ কয়েকটি ইসলামী বীমা প্রতিষ্ঠানও চালু হয়েছে এবং তাদেরও ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। তবে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার ইসলামবিরোধী শক্তির ইন্ধনে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক, ফিন্যান্স ও বীমা ব্যবস্থাটাকে ধ্বংসের নীলনকশা করেছিল। ২০২৪ সালে ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংক ও বীমা ব্যবস্থাটা কোনোরকমে টিকে আছে। তবে হালাল পণ্য তথা ইসলামী ব্যাংকিংয়ের প্রতি জনগণের চাহিদার কারণে বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত এগিয়ে যাবে বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
হালাল অর্থনীতি বিকাশে গুরুত্বারোপ
হালাল অর্থনীতি তথা হালাল শিল্পের বিকাশ ঘটাতে হলে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকেই জাতীয় ও আর্ন্তজাতিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তবে রাষ্ট্র ও সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি দেশের আলেম-ওলামা ইসলামপন্থি দল ও সংগঠনগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকেও হালাল পণ্য উদ্ভাবন ও প্রসারে দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। আশার কথা হচ্ছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশে হালাল অর্থনীতির প্রসার ও বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, কাতার ও মিশরের মতো মুসলিম দেশগুলো হালাল শিল্প প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে এলে হালাল অর্থনীতি আরো এক ধাপ এগিয়ে যাবে। হালাল অর্থনীতি বিকাশের মাধ্যমেই মুসলিম রাষ্ট্রগুলোয় ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হতে পারে। ইসলামী অর্থনীতি হচ্ছে কল্যাণমূলক অর্থনীতি। ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হলেই রাষ্ট্র কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। মুসলিম দেশগুলো হালাল অর্থনীতি চালুর পথ ধরে ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কল্যাণরাষ্ট্র গঠন করতে পারলে সারা বিশ্ব ইসলামী অর্থনীতির সুফল দেখে ইসলামী অর্থনীতি প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসবে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com