গল্প দাদুর আসর-৩

আমাদের হজ ও কুরবানি


৭ জুন ২০২৬ ১০:৩৮

॥ মাহবুবুল হক ॥

আলহামদুলিল্লাহ। গল্প দাদুর আসর চলছে। কিন্তু ভালোভাবে চলছে না। অল্প সদস্য নিয়ে ভালোভাবে ক্লাব চালানো যায় না। কিন্তু দাদু ভাইয়ের বসার রুমে খুব বেশি জায়গাও নেই। এজন্য আরিজ ও আমিরা খুব দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছে। বন্ধুরা আসতে চায়, কিন্তু জায়গা তো নেই। দাদা ভাইয়ের টাকাও নেই যে বড় বাসা নেয়া যাবে। মাঝে মাঝে বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ গ্রামে যায়। কেউ কেউ বিদেশে যায়। কেউ ওমরাহ করতে যায়। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফলে আসরে সদস্য কমে যায়। ৪-৫ জন হলে ভালো লাগে না। ৮-১০ জন না হলে কি চলে। নতুন সদস্য নিলে আবার পুরোনোরা যদি রেগুলার এসে যায়, তাহলে তো মহাবিপদ।
আমিরা : বিপদ আবার কী? কেউ চেয়ারে বসবে। কেউ সোফায় বসবে। কেউ নিচে বসবে। আমি তো বসিই না। আমাকে খালি তোমরা খাটাও। এটা কর, ওটা কর। আমি তো বুবুমনি ও মাকে ম্যানেজ করি। ওদের আবার রান্নাবান্না থাকে।
আরিজ : বেশি বকবক করো না। আর মাত্র ১৫ মিনিট বাকি আছে। এর মধ্যে সবাই চলে আসবে। তখন তো সব দোষ হবে আমার। আমি নাকি ক্যাপ্টেন। আমি নাকি লিডার। আমি নাকি মনিটর। কত বড় বড় নাম আমার।
আমিরা : তবুও তো তোমার অনেক ‘গুড নেইম’। আমি তো হলাম ‘ওয়েটার’। কেউ কিছু বলবে আর আমি দৌড় দিয়ে সেটা করে দেব। আমি তো আসরের গল্পগুলো ভালো করে শুনি না। আসি আর যাই।
আরিজ : ঠিক আছে আমাদের সমস্যাগুলো আমরা নিজেরাই দাদু ভাইয়ের সাথে ঠিক করে নেব। এখন তাড়াতাড়ি করে সব কাজ সেরে ফেল।
আমিরা : ইয়েস অল রাইট। কাম এন্ড জয়েন্ট মি।
আরিজ ঘরটা ঝাড়ু দেয়। আমিরা সোফা, ডিভানসহ সবকিছু ঝাড়া-মোছা করে। বাবা আসরের জন্য গতকাল ফুলের তোড়া এনেছিল। ওয়াশরুম থেকে সেটা এনে সাজায়, নানা ফুলের সুগন্ধে রুমটা সুবাসিত হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে এক এক করে বন্ধুরা আসতে শুরু করে। আরিজ সবার বসার ব্যবস্থা করে। সবার হাতে শিশু-কিশোরদের ম্যাগাজিনগুলো পৌঁছায়। এসব ম্যাগাজিনের কোনো কোনোটায় দাদা ভাইয়ের লেখা থাকে। সেসব আনন্দের সাথে দেখায়। বলে জান, দাদা ভাই শুধু সব জায়গায় কথা বলে না। ভোরে নামাজ পড়ে এসে আমাদের জন্য লেখেও। তোমরা এসব দেখ। আমি ঠিক ১০টার মধ্যে দাদু ভাইকে নিয়ে চলে আসবো, ইনশাআল্লাহ। নয়ন বলে ওঠে, এই রুমে একটা হোয়াইট বোর্ড থাকলে ভালো হতো। যেখানে আজকের সাবজেক্টটা লেখা থাকতো, যা দাদু ভাই ক্লাসের মতো কিছু দেখাতে পারতেন। আরিজ বলে, তুমি ঠিক বলেছ নয়ন। বিষয়টা আমার মাথায়ও এসেছিল। কিন্তু আমিরার সারাক্ষণ বকবকানিতে কোনো কাজই আমার মনে থাকে না। যাক সব হবে বলেই সে দৌড় দেয়। ২ মিনিটের মধ্যেই লাঠিভর দিয়ে হাঁটা দাদু ভাইকে নিয়ে সিটিং রুমে প্রবেশ করে। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়। অর্থাৎ সালাম বিনিময় হয়।
দাদু ভাই : ভাইয়ারা তোমরা কে কেমন আছ। তোমাদের আব্বা-আম্মাসহ সবাই কেমন আছে।
সবাই সমস্বরে বলে ওঠে, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা ভালো আছি। শুধু সুবোধ বলে ওঠে, ভগবানের ইচ্ছায় আমরা ভালো আছি। সাথে সাথে রোজারিও বলে, ঈশ্বরের ইচ্ছায় ভালো আছি। এবার তিনি আরিজকে উদ্দেশ করে বলেন, দাদা ভাই আজকের সাবজেক্টটা কী?
আরিজ : তুমিই তো বলেছিলে আজকের সাবজেক্ট হবে আমাদের হজ ও কুরবানি ঈদ। সব ভুলে যাও। তোমাকে দিয়ে আর কিছু হবে না।
দাদু ভাই : ঠিক বলেছ। এখন তোমরাই সব চালাবে। আমি তো অচল হয়ে যাচ্ছি।
তান্না : আরিজ তুমি বুঝতে পারোনি। তুমি দাদু ভাইয়ের মনে কষ্ট দিয়েছ।
মান্না : তোমাকে ধন্যবাদ। তান্না তুমি ঠিক কথাই বলেছ।
আরিজ : দাদু ভাই তুমি কি সত্যিই মনে কষ্ট পেয়েছ- বলেই সে দাদু ভাইকে জড়িয়ে ধরে। আর কপালে চুমু খায়। দাদু ভাই মুখে বলে, না, দাদু ভাই আমি কষ্ট পাইনি।
দাদু ভাই : আসো এবার আমরা কথা বলি। কাকে যেন দেখছি না।
আরিজ : ফটিকদের বৌদ্ধপূর্ণিমা আছে। সে কারণে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে গেছে। এখনো ফিরে আসেনি। দাদা ভাই তুমি এখন শুরু করো। আধাঘণ্টা চলে গেছে, ১২টায় তো আবার শেষ করতে হবে।
দাদু ভাই : আজ আমার শরীরটা ভালো নেই। মাঝে মাঝে আমি তোমাদের প্রশ্ন করে দেখবো, তোমরা যদি ইতোমধ্যে জেনে থাক। তাহলে আমরা দুবার কথা বলবো না। আচ্ছা নয়ন তুমি বলো তো হজ বলতে তুমি কী বোঝ।
নয়ন : ইসলামের ৫টি মূল স্তম্ভের মধ্যে শেষ স্তম্ভ হলো হজ। মক্কা শরীফে প্রতি বছর আরবি মাসের ৮ জিলহজ হতে ১২ জিলহজ পর্যন্ত আরাফাত ময়দান, মুজদালিফা, মিনা, জামারাহ, কাবা শরীফে উপস্থিত থেকে হজের অনুষ্ঠানগুলো পালন করাকেই হজ বলা হয়ে থাকে। এটা সকল মুসলিমের জন্য ফরজ নয়। যাদের হজ পালনের উদ্দেশ্যে এই সময় মক্কা নগরীতে যাওয়া-আসাসহ অন্যান্য খরচ বহন করার সামর্থ্য আছে, তারাই শুধু হজ পালন করার উপযোগী হয়। হজ জীবনে একবারই পালন করা ফরজ। হজকালীন সময় মক্কা নগরীতে প্রতিটি হাজকে নিজের কুরবানি দিতে হয়। এ কারণেই দাদু ভাই তুমি হজ ও কুরবানির কথা একসাথে বলেছ। আমরা ভেবেছিলাম দুটি বিষয়। কিন্তু আসলে ইবরাহীম (আ.) ইসমাইল (আ.)-এর অতি গুরুত্বপূর্ণ একটা সুন্নতকে মহান আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে আবশ্যক করেছেন ও যাতে সকল হাজী এই ত্যাগ স্বীকার করে আল্লাহকে খুশি রাখে। মহান আল্লাহ এটাকে মানবজাতির সামনে উজ্জ্বল করে রেখেছেন।
দাদু ভাই : আলহামদুলিল্লাহ। তুমি আমার দিলকে খুশি করেছ। তুমি মূল কথাগুলো বলেছ। এবার এর বিস্তৃত বিষয়গুলো তুমি ভালোভাবে পড়ে নেবে। আমার উপদেশ হলো, পড়ালেখা শেষ করে কিছুদিন চাকরি বা ব্যবসা করার পর যুবক থাকতে থাকতেই সময় করে এই ফরজ কাজটি করে ফেলবে। আমাদের দেশে আমাদের পূর্বপুরুষরা ছেলেমেয়ের লেখাপড়া, বিয়ে-শাদী এবং নাতি-নাতনিদের বিয়ে-শাদী শেষ করে হজে যান। তখন তাদের বয়স হয়ে যায় ৬০ থেকে ৮০ বছর। হজে শারীরিক ও মানসিক শক্তির প্রয়োজন হয় এবং সকল রেওয়াজ হজ পালনকারীকেই সমাপ্ত করতে হয়। বাস্তবে বুড়ো বয়সে শারীরিক ও মানসিক কষ্টকর কাজগুলো করা সম্ভব হয় না। কারণ হজের সমস্ত কাজ শেষ করতে এবং কয়েকদিন মদিনা শরীফে অবস্থান করতে প্রায় এক থেকে দেড় মাস সময় লাগে। হজে যাওয়ার পূর্বেও হজের শর্তগুলো পূরণ করার জন্য অনেক সময় লাগে। বাস্তব কথা হলো- জীবনে অন্তত ১টি বছর হজের জন্য সাধনা করতে হয়। সুতরাং বুঝতেই পারছ, বুড়ো বয়সে এতসব কিছু পালন করা বা সম্পন্ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা ছাড়া দুনিয়ার অধিকাংশ মুমিন-মুসলমান বুড়ো হওয়ার আগেই এবং যুবক থাকাকালেই হজ সম্পন্ন করতে থাকে। আমরা এ বিষয়ে এখনো অজ্ঞ রয়েছি বা অবহেলা করছি।
আরিজ : দাদু ভাই। তুমি তো জান না, নয়নের ফ্যামিলি অনেকেই কী বলে যেন আলেম-ওলামা, ইমাম ইত্যাদি। সে কারণেই আমাদের সবার চেয়ে হজ ও কুরবানি সম্পর্কে সে ভালো জানে। সে আমাদের বলেছে, ছোটকালে বাবা-মায়ের সাথে সেও হজ করেছে। হজের সাথে একটা ছোটও হজও নাকি আছে। সেটার নাম ‘ওমরাহ’। হজের সময় সেটাও সে করেছে।
চয়ন : আরে ও তো হাজী। স্কুলে ঠাট্টা করে অনেকে তাকে হাজী নয়ন বলে ডাকে। সে তো ছোটকাল থেকেই নামাজ-রোজা করে। শিশুকালে কয়েক ক্লাস সে মাদরাসায়ও পড়েছিল।
দাদু ভাই : তাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। তবে কোনো হজ পালনকারীকে হাজী বলা যাবে না। এটা আমাদের দেশে একটা অহংকারী শব্দ। হজকারীকে যদি হাজী বলতে হয়, তাহলে যারা নামাজ পড়ে, তাদের নামাজি বলে উপাধি দিতে হয়। যারা জাকাত প্রদান করে তাদের জাকাতি বলতে হয়। যারা রোজা বা সিয়াম পালন করে, তাদের রোজাদারি বা সিয়ামি বলতে হয়। এসব বললে অহংকার সৃষ্টি হয়, রিয়া সৃষ্টি হয়, ইগো সৃষ্টি হয়। এসব কারণে ইসলামের ব্যাখ্যাকারীগণ এসব বলতে নিষেধ করেছেন, আচ্ছা ঠিক আছে। এবার আমরা ঈদুল আজহা বা কুরবানি ঈদের কথায় আসি। কে বলবে কুরবানি ঈদের কথা। তোমরাই বল।
আমিরা ও কাজের ছেলে রফিক দুজন দুটি বড় ট্রেতে করে তরমুজ, আম, কাঁঠাল ইত্যাদি নিয়ে প্রবেশ করে। আমিরা হাসতে হাসতে এগিয়ে আসে এবং বলতে থাকে, আমি কিন্তু ফার্স্টফুড আনিনি। আমি আগে খুব ফার্স্টফুড খেতাম, আমাদের আব্বা ডাক্তার সাহেব এখন আর ফার্স্টফুড ঘরে আনেন না। ট্রের ওপর আজ যা তোমরা দেখছ, সবই আল্লাহর ডাইরেক্ট ফুড। কোনো হাবিজাবি নেই। তোমরা খাবে আর রফিক ভাইয়ার জন্য দোয়া করবে। সে আজ আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। সে খুব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। বারবার সাবান দিয়ে হাত ধোয়। টিভিতে হাত ধোয়ার একটা বিজ্ঞাপন আছে না, ওটাই তার খুব পছন্দ।
আরিজ : বকবক ছাড়ো। তাড়াতাড়ি আসো।
আমিরা : আচ্ছা বাবা আসছি। না রং বললাম। হি হি হি হি …
তান্না : দাদু ভাই, আমি যতটুকু জানি তুমি অনুমতি দিলে ততটুকু বলার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ। বাকিটা তুমি ঠিক করে দিও।
দাদু ভাই : তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি তো সাহস করে এগিয়ে এলে। যারা এগিয়ে এসে বলতে চায়, এগিয়ে এসে লিখতে চায় এবং এগিয়ে এসে কাজ করতে চায়; আল্লাহর রহমতে তারাই দুনিয়া ও আখিরাতে এগিয়ে থাকে।
তান্না : নয়ন তো হজের কথা বলতে গিয়ে হাজী সাহেবদের কুরবানির কথা বলেছে। নয়ন অনেকটা কাজ করে দিয়েছে। আমি শুধু বলবো, যারা হজে যায়নি, তাদের কুরবানির কথা। কুরবানি সবার জন্য ফরজ না। যেমন জাকাত, হজ সবার জন্য ফরজ নয়। ইসলাম মানুষকে মোটামুটিভাবে দু’ভাবে বিভক্ত করেছে। হ্যাব আর হ্যাব নট। যাদের টাকা-পয়সা ও সম্পদ আছে, তারা হলো হ্যাব-এর দলে। আর যাদের অর্থ-সম্পদ তেমন নেই, তারা হলো হ্যাব নটস-এর দলে। একদল জাকাত দেবে, আর একদল দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়া জাকাত গ্রহণ করবে। একদল হজে যাবে, আরেক দল হজে যেতে পারবে না। একদল কুরবানি দিয়ে আর একদল কুরবানি উপহার গ্রহণ করবে। ইসলামের দৃষ্টিতে ভালো এবং মন্দ যেমন দুই ভাগ, তেমনি সামর্থ্যবান ও সামর্থ্যহীন এভাবেই মানুষকে বিভাজিত করা হয়েছে। এটাই ইসলামের সৌন্দর্য। ইসলামে ভ্রাতৃত্ব, আত্মীয়তা ও বন্ধুত্ব এর ওপর অনেকটা নির্ভর করে। আসলে যারা জাকাত দেয় এবং হজে যাবার সামর্থ্য রাখে, তাদের ওপর কুরবানি দেয়ার হুকুম রয়েছে। সারা বছর খরচ করে যাদের কিছু সঞ্চয় থাকে, এদের আমরা সামর্থ্যবান বলে থাকি। এই সামর্থ্যবানরাই কুরবানি দেবে- এটাই ইসলামের মূল কথা। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায়, সামর্থ্যবানরা অনেক বড় বড় গরু কিনে কুরবানি দেয়। আবার দেখা যায়, এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা চলে। আবার অনেকে সামাজিক ও পারিবারিক মানমর্যাদা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে কুরবানি দেয়। আমাদের ধর্মে এসব নেই।
দাদু ভাই : তুমি ছোট মানুষ হলেও ইসলামের মূল কথা বলতে পেরেছ। বাকি কিছু কথা রয়ে গেল। আজ তো নামাজের সময় হয়ে গেছে। আগামীতে আরো আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।