চব্বিশের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনো মেরামত হয়নি

নতুন বন্যার আতঙ্কে ফেনীর হাজারো পরিবার


৪ জুন ২০২৬ ১১:১১

একেএম আবদুর রহীম, ফেনী : ফেনীর পরশুরাম উপজেলায় ২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যায় মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া ও ফেনী নদীর ৪২টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর, দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলা প্লাবিত হয়েছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন লাখো মানুষ, ক্ষতি হয়েছে ফসল, সড়ক, সেতু দোকানের মালামাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটা ছিল শত বছরের ইতিহাসের ভয়াবহতম বন্যা। প্রাথমিক হিসাবে এতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার। যার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি এখনো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ।
ফেনীর সেই ভয়ংকর বন্যাটি প্রাকৃতিক কারণে হয়নি, বরং সেটা ছিল চব্বিশের বিপ্লবোত্তর ভারতের জিঘাংসার বলি। সেবার মুহুরী কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর ভারতীয় অংশে স্থাপিত কালশি স্লুইস, গজলডোবা স্লুইসসহ সবগুলো স্লুইসগেট খুলে দিলে বাংলাদেশে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ বন্যা। আন্তর্জাতিক আইন কানুনের কোনো তোয়াক্কা তখন ভারত করেনি। এমনকি ভারতের বিএসএফ মুহুরী নদীর বাংলাদেশের বল্লামুখা নামক স্থানে বাঁধ কেটে দিয়ে বিপর্যয়ের ষোলোকলা পূর্ণ করে। প্রায় ১৫ দিন ফেনী জেলার ৮০% মানুষ পানিবন্দি ছিল।
সারা দেশের মানুষ ফেনীর বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির ফেনী জেলা শাখা সেসময় পঞ্চাশ কোটি টাকার অধিক ত্রাণ বিতরণ করেছে। জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমার একবুক পানিতে হেঁটে হেঁটে বন্যার্ত মানুষদের খোঁজখবর নিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন। আর কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকে তখন বন্যার্তদের পাশে এভাবে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। তবে বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, ঢাবি শিক্ষার্থীসহ অনেক সংস্থাও ত্রাণ নিয়ে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছিল।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, কোটি টাকা ব্যয়ে বেড়িবাঁধ মেরামত করা হয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। সরেজমিন চিত্র ভিন্ন। মির্জানগর ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামে ছিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধ ২০২৪ সালের বন্যায় তলিয়ে যায়। ওই বেড়িবাঁধ মেরামত না করায় বন্যায় আক্রান্ত হয়েছেন স্থানীয়রা। কিন্তু এখনো মেরামত তো দূরের কথা, যেভাবে ভেঙে যায় সেভাবেই রয়ে যায়। ভারী বৃষ্টি হলে ভাঙা অংশ দিয়ে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করে। পুরো এলাকা ক্ষণিকের মধ্যে প্লাবিত হয়ে যায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এখনো মেরামত করা হয়নি। আকাশে মেঘ জমলেই নদীর তীরের বাসিন্দাদের মধ্যে অজানা আতঙ্ক দেখা যায়। গত দুই বছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত না শুকাতেই এ বছর আবারও বৈরী আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। গত ১৫ দিনে কয়েকবার কালবৈশাখীর ছোবল দেখা গেছে। সাগরের নিম্নচাপ বা টানা বৃষ্টির পূর্বাভাস দেখলেই কপালে পড়ছে শঙ্কার ভাঁজ।
মির্জানগর ইউনিয়নে কাশিনগর মহুরী নদীর বেড়িবাঁধ মেরামত না করার কারণে ২৫০ পরিবারের মাঝে বন্যার আতঙ্কের মধ্যে জীবন কাটছে। জেলা প্রশাসক বরাবর আবেদন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। কাশীনগর ও চম্পক নগর দুটি স্থানে মহুরী নদীর বেড়িবাঁধে ভাঙন রয়েছে। আবার একই বেড়িবাঁধের পশ্চিমে ৪৫০ ফুট বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ২৫০ পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। আবার বৃষ্টি হলে বন্যার আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয়রা।
ব্যবসায়ী করিম মিয়া বলেন, বেড়িবাঁধ নির্মাণ না করায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন হাজার হাজার মানুষ। এছাড়া ৯০ শতাংশ সড়ক, সেতু, মৎস্য ব্যবসায়ী, কৃষক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন, উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বেড়িবাঁধ মেরামত করা না হলে গত দুই বছরের মতো ক্ষেত-খামার, পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ফসল, রাস্তা, সেতু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মেঘ দেখলে সাধারণ মানুষের মাঝে অনেক আতঙ্ক দেখা দেয়।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে বেড়িবাঁধ মেরামত হয় না। প্রতি বছর লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। চিথলিয়া ইউনিয়নে শালধর গ্রামে বেড়িবাঁধ মেরামত হয়েছে নামেমাত্র। তবে ঠিকাদার লাভবান হলেও বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতে রয়েছে।
পরশুরাম উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হালিম মানিক বলেন, এটা আমার নজরে ছিল না। কিন্তু ভাঙা অংশ মেরামত করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। দ্রুত মেরামতের জন্য চেষ্টা করব।
পরশুরাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া সুলতানা বলেন, বেড়িবাঁধ মেরামত করার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামত করতে যোগাযোগ করব।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে পরশুরাম উপজেলার মুহুরী, কহুয়া, সিলোনিয়া নদীর বেড়িবাঁধ মেরামত করা হয়েছে। এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধের তালিকা করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের মধ্যদিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামত করা হবে।
সেই ২৪ থেকেই ফেনীবাসী আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি জানিয়ে আসছে পরশুরাম ফুলগাজী উপজেলার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ টেকসই ও স্থায়ীভাবে মেরামতের জন্য। তবে তা যেন অবশ্যই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ও বিদেশী ঠিকাদারের মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর এখনো এই বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণের কোনো উদ্যোগ বা কার্যকর পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না।