ঈদের ছুটি : আবেগ ও বাস্তবতা
৪ জুন ২০২৬ ১০:৫৫
॥ মাহবুবুল হক ॥
মুসলিমদের জন্য বছরে মাত্র দুটি উৎসব। একটির নাম ঈদুল ফিতর এবং অপরটির নাম ঈদুল আজহা। প্রথম উৎসবটি শেষ হওয়ার দুই মাস দশ দিন পর দ্বিতীয় উৎসবটির অবতারণা। সেসব নিয়ে অনেক কথা আছে।
আজকের বিষয়টি উঠে এসেছে যেখান থেকে- ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক ভদ্রলোক বলেছেন, ঈদের ছুটি তো শেষ। সরকারি অফিস-আদালতে এখনো সবাই উপস্থিত হননি। যারা উপস্থিত হয়েছেন, তারাও কাজকর্ম শুরু করেননি। বসে বসে গল্প করছেন, গুজব করছেন- এভাবে দিনটা পার করে বাসা বা ম্যাসে ফিরছেন। ভদ্রলোক বলেছেন, মনে হচ্ছে, সরকারি অফিসে এখন অঘোষিত অনশন বা স্ট্রাইক চলছে। কর্মবিরতি চলছে। কবে নাগাদ এই কর্মবিরতি ভাঙবে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে এক রোববার অতিক্রান্ত হবার পর আগামী রোববারে গিয়ে এই অনশন ভাঙবে বলে আশা করা যায়। সে হিসাবে আমাদের এবার ছুটি দাঁড়াচ্ছে প্রায় পনের দিন। শুধু এবার নয়, প্রতি বছরই আমরা আমাদের দুই উৎসবে ১৫ দিন করে এক মাস ছুটি কাটাই। গড়ে সরকার ছুটি প্রদান করে প্রতি উৎসবে ৭ দিন করে। অর্থাৎ গোটা শহরে উৎসবের ছুটি সরকারিভাবে থাকে ১৪ দিন। আমরা নানা ছুঁতা-নাতায় ছুটি বাড়িয়ে করে ফেলি প্রায় এক মাস।
অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। ছুটির ক্ষেত্রে আমরা সীমাহীনভাবে উদার। এখানে জনতুষ্টির বিষয়টি চাক্ষুষ। সস্তা পপুলারিটি অর্জনের জন্য দুর্নীতিপরায়ণ রাজনৈতিক দলগুলো এসব করেছে এবং ক্রমাগতভাবে করে যাচ্ছে। আমাদের মতো দেশগুলোয় এসব থামানো যাবে না। ‘আবেগ’ যেখানে প্রাধান্য পায় ‘বাস্তবতা’ সেখান থেকে অনেক দূরে সরে যায়। যারা আমরা বেশি বেশি ছুটি গ্রহণের পক্ষে, দেখা যায় তারাই আমরা নিজেদের ক্ষেত্রে একই নীতি বা নৈতিকতা প্রয়োগ করি না। একটু দৃষ্টান্ত বা উদাহরণ পেশ না করলে হয় না।
এই যে কুরবানির ঈদটা গেল, কতজন আমরা আমাদের নিজেদের কর্মচারীদের ছুটি দিয়েছি। গৃহকর্মীদের কথাই যদি তুলে ধরি, তাহলে নগর জীবনের পৌনঃপুনিক বাস্তবতা হলো দুই ঈদে অধিকাংশ কর্মচারীর চাকরি চলে যায় বা থাকে না। ঈদের পর আনকোরা নতুন কর্মচারী নিয়োগ করতে হয়। এক্ষেত্রেও আবেগ ও যুক্তির প্রশ্ন মাথা তুলে দাঁড়ায়। আমাদের ব্যক্তিগত কর্মচারীরা যখন প্রশ্ন করে, আপনি তো সরকারি চাকরি করেন, এই ঈদে আপনি কতদিন ছুটি পাচ্ছেন? ঐটুকু ছুটি আপনারা আমাদের দিন! তখন আমরা লা-জবাব হয়ে যাই। আমাদের বলার মতো যৌক্তিক কোনো কথা থাকে না। সত্য ও বাস্তব কথা হলো, আমরা আমাদের গৃহকর্মীদের সাপ্তাহিক ছুটিও প্রদান করি না। কারণ আমরা বেশ ভালো করে জানি বা উপলব্ধি করি, ছুটি দিলে আমরা কষ্ট পাবো, অ্যারেঞ্জমেন্ট বা ম্যানেজমেন্ট সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে পারবো না। আবার বাড়তি আয়ের জন্য যদি ঘরেই বা বাড়িতেই কোনো প্রোডাক্টিভ ইউনিট বিরাজমান থাকে, তাহলে তো প্রোডাকশন বন্ধ হয়ে যাবে, সেক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি হবে এবং দেশ ও রাষ্ট্রের প্রভূত ক্ষতি সাধিত হবে। অবশ্য এ কথা ধ্রুব সত্য যে, দেশ ও জাতির কথা আমরা খুব কমই চিন্তা করে থাকি।
আমরা পূর্বে সাপ্তাহিক ছুটি পেয়েছি মাত্র একদিন। এই নিয়মটাই সর্বদিক থেকে আমাদের জন্য বিবেচনাযোগ্য ছিল। উন্নত দেশের সঙ্গে আমাদের কর্মঘণ্টা মেলান, একদম ঠিক হয়নি। ওরা ধনী, আমরা গরিব। ওদের সাথে আমাদের কোথায় কী মিল আছে? কোথাও কোনো মিল নেই। যত বড় বড় কথা আমরা বলি, বাস্তবে আমরা ওদের চাকর-বাকর ছাড়া অন্য কিছু নই। উপনিবেশ নেই, নিবেশ আছে। শ্রমিক হিসেবে আমরা যারা বিদেশে, তারা তো বলতে গেলে একদম ক্রীতদাস। কথাটা আমার নয়, দেশবরেণ্য একজন সমাজতান্ত্রিক, কবি ও অ্যাকটিভিস্ট ফরহাদ মজহার সাহেবের। একসময় তিনি সরাসরি বলেছেন, ক্রীতদাস হওয়ার জন্যই আমরা মধ্যপ্রাচ্যে যাই। কথাটা সত্য এবং বাস্তব। কিন্তু উপায় কী বলুন? সাপ্তাহিক ছুটি অন্তত একদিন কমানো দরকার।
১৮ কোটি মানুষের দেশ। অন্তত ৫০% কর্মক্ষম মানুষের কাজের জন্য বিদেশে পাড়ি দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রতিযোগিতায় আমরা এযাবৎ উত্তীর্ণ হতে পারিনি। ভারতসহ এই উপমহাদেশের সব দেশের সাধারণ ম্যানপাওয়ার সবসময় যাচ্ছে। আমরা যেতে পারছি না। এর কারণ অনেক। প্রথম কারণ আমাদের সরকার, আমাদের রাজনীতি, রাজনীতির সঙ্গে জড়িত সরকারি দলের লোকজন, আমলা, বৃহৎ ব্যবসায়ী, শিল্পপতি সকলেই উচ্চহারের লেনদেনে ব্যস্ত। ছোট কাজে তারা হাত দিতে চায় না। অধিক মুনাফা তাদের একমাত্র ডেসটিনি। কমিশন বাণিজ্যে গোপনীয়তা বেশি। মিডিয়া সেখানে পৌঁছাতে পারে না। দুদুক এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না। দুদকের দৃষ্টিভঙ্গি হলো আগে দুর্নীতি করুক। তারপর দেখা যাবে। বেটারা যাবে কোথায়?
দুদক তো নতুন নাম। পাকিস্তান আমলে এই বিভাগের নাম ছিল ‘ডিপার্টমেন্ট অব এন্টি করাপশন।’ এই নামের বিরুদ্ধে প্রখ্যাত সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন, এর অর্থ হলো ‘দুর্নীতিবিরোধী বিভাগ’ বা ‘দুর্নীতিবিরোধী দফতর।’ অর্থাৎ স্বীকার করে নেয়া হলো পাকিস্তানে দুর্নীতি আছে, সেই দুর্নীতিকে দমন করতে হবে অথবা নির্মূল করতে হবে। ঘটনাটা ৫৪-৫৫ সালের দিকের। পূর্ব পাকিস্তানে তখন যুক্তফ্রন্টের সরকার। আবুল মনসুরসহ অনেকেই প্রশ্ন তুললেন, মাত্র তো আমরা একটা দেশ পেলাম। এখনই দুর্নীতি ইরাডিকেশনের কাজ শুরু হয়ে গেল? মানুষের জবাব কত রকম হয়। জবাবে বলা হলো, রাষ্ট্র তো পূর্ব থেকেই ছিল। সরকারও তো পূর্ব থেকেই ছিল। সেসব কোনটা কী অবস্থায় আছে, সেসব দেখ-ভাল করতে হবে না? উপমহাদেশে পাঞ্জাবীরা তখন সব দিক থেকে চৌকস ছিল। তারা ব্রিটিশ আমলে চাকরি-বাকরি বেশি করেছিল বলে অহংকার করতো। এর পরপরই জাতিসংঘের সহযোগিতায় শুরু হয়ে গেল ‘কালাজ¦র ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম’, ‘আমাশয় ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম’, ‘ডায়রিয়া ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম’ এবং বসন্ত, কলেরা ও ম্যালেরিয়া ইরাডিকেশন প্রোগ্রাম।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাংবাদিক শাহরিয়ারসহ কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধা মিলে যেমন বানানো হয়েছিল ‘ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি’ যা এখনো বিরাজমান রয়েছে। যারা ‘নির্মূল কমিটি’ গঠন করেছিলেন, তাদের অতীতে অভিজ্ঞতা ছিল। সে কারণেও তারা নির্মূলের ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিল। যদিও ‘দালাল নির্মূল কমিটি’ তেমন কিছু করতে পারেনি, তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।
আসলে আমি কথা বলতে চেয়েছিলাম, জিডিপি গ্রস ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট নিয়ে (Gross Domestic Product)। আমার এখন মনে পড়ছে না, কবে থেকে GDP শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। পাকিস্তান আমলে শব্দটি ছিল GNP (Gross National Product)। এতে সাধারণ মানুষের বা সাধারণ পাঠকের সুবিধা ছিল। চট করে সবাই বলতে পারতো, পাট, চা, চামড়া। আমাদের পাট, চা, চামড়া বিশ্বের মধ্যে খ্যাতিমান ছিল। সভ্য বিশ্ব বেশি মূল্য দিয়ে আমাদের প্রোডাক্ট ক্রয় করতো। এখন আর সেদিন নেই। প্রতিবেশী দেশের চক্রান্তে আমরা পাট ও চামড়া হারিয়েছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমাদের বর্ডারের সন্নিকটে প্রতিবেশীরা শত শত পাটকল গড়ে তুললো। অন্যদিকে কে বা কারা আমাদের দেশের বিশাল বিশাল পাটকলগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে ফেললো।
এ বিষয়ে তদানীন্তন সময়ে ক্ষুরধার লেখনী উপস্থাপন করতেন সাংবাদিক আবুল মনসুর আহমদ ও সাংবাদিক খন্দকার আবদুল হামিদ। দুজন বরেণ্য ব্যক্তি দৈনিক ইত্তেফাকেই সেসব লেখা দিতেন। দৈনিক ইত্তেফাকের তখন খুব কাটতি ছিল।
চামড়ার বিষয়টি খুব গবেষণা করে শেষ করে দিয়েছে একই প্রতিবেশী। তারা দুনিয়াকে জানালো পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গরুর চামড়া দিয়ে বিশ্বের সমস্ত চাহিদা পূরণ করা যাবে না। সুতরাং বিকল্প ম্যাটেরিয়াল প্রোডাক্ট তৈরি করতে হবে। ভারতীয়রা বিশ্ববাসীকে অভয় প্রদান করলো, আমরা বিকল্প প্রোডাক্ট তৈরি করে দেব? এটা ছিল একটা ভাঁওতাবাজি। এখন ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের ধারণা দারুণভাবে পাল্টে গেছে। শিল্প-কারখানা, কুটির শিল্পে সমবায়ের মাধ্যমে যা উৎপাদিত হয়, তা শুধু ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট নয়। দেশের শিক্ষা, জ্ঞান, বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়ে একজন মানুষ যদি কিছু আয় করতে পারে, সেটাও ডোমেস্টিক প্রোডাক্টের অন্তর্ভুক্ত। IT এবং AI এখন ডোমেস্টিক সাবজেক্ট। আমরা যে ১০০% তৈরি পোশাক রফতানি করছি, এটাকে ১০০% ডোমেস্টিক প্রোডাক্ট ধরা হচ্ছে না। কারণ এর সাথে Foreign Induction প্রচুর।
আমরা যদি খাদ্যে, চিকিৎসায়, আবাসনে, শিক্ষায় ও বস্ত্রে গবেষণা বাড়িয়ে দিয়ে নির্দিষ্ট মেধার মাধ্যমে কম খরচের মধ্য দিয়ে জীবন ধারণ করতে পারি, সঞ্চয় করতে পারি, যাপিত জীবনকে সমুজ্জ্বল করতে পারি, তাহলে সেটা হবে আমাদের জন্য বিপুল বিজয়।
শিক্ষা ব্যবস্থাকে অবশ্যই পাল্টাতে হবে, গবেষণায় প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হবে। পাবলিক ও প্রাইভেটের ব্যবধান কমাতে হবে। ভাষা শিক্ষায় দুর্বারভাবে এগিয়ে যেতে হবে।
যেহেতু নিজের প্রোডাক্ট-এর ধারণা, উপযোগিতা নিজেকেই উপস্থাপন করতে হবে, সেহেতু অন্তত ৩টা ভাষা (বাংলা, আরবি ও ইংরেজি) আমাদের সকলকে শ্রদ্ধার সাথে জানার, বোঝার এবং উপলব্ধি করার যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ট্রেডিশনাল প্রোডাক্ট দিয়ে এখন আর এই বিশ্বে Sustain করা যাবে না। জিডিপি বাড়াতে হবে। বাড়াতে হলে কর্মঘণ্টা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রের সরকারের অযথা ছুটি কমাতে হবে। ‘সালাত শেষ হলে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে আর আল্লাহকে বেশি স্মরণ করবে- যাতে তোমরা সফল হও।’ সূরা জুমুয়া : ১০)।