সরকারে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ক্রমান্বয়ে কমছে, হচ্ছে নির্যাতিত
৪ জুন ২০২৬ ১০:২৭
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
‘দ্য ইউনিয়ন অব সাউথ আফ্রিকা’। দেশটির আয়তন ১২ লাখ ১৯ হাজার ৯১২ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে এটি ইউরোপীয় সাদা চামড়ার কর্তৃত্বসংবলিত খ্রিষ্টান ভূমি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে এটি গণপ্রজাতন্ত্রে ফিরে আসে। দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র নামিবিয়া, বোতসওয়ানা, জিম্বাবুয়ে এবং পূর্বে মুজাম্বিক কর্তৃক পরিবেষ্টিত। দেশটি ৯টি প্রদেশ নিয়ে গঠিত। প্রদেশগুলো হচ্ছে ইস্টার্নকেপ, ফ্রিস্টেট, গাউতেঙ, ওয়াগুলু নাতাল, লিমপোপো, পুমালাঙ্গা, নদার্নকেপ, নর্থওয়েস্ট এবং ওয়েস্টার্নকেপ। এদেশের প্রশাসনিক রাজধানী প্রিটোরিয়া এবং কেপটাউন হচ্ছে লেজিসলেটিভ রাজধানী আর জুডিশিয়াল রাজধানী ব্লোয়েমফোন্টেইন। এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে জোহানেসবার্গ, ডারবান, পোর্ট এলিজাবেথ এবং ইস্ট লন্ডন অন্যতম। বর্তমান দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। যার প্রায় ৭৮ ভাগ খ্রিষ্টান, ১৫ ভাগ ধর্মীয় পরিচয়হীন, ৬ ভাগ মুসলিম এবং অবশিষ্টরা ইহুদি ও লোকজধর্মের অনুসারী। দেশটির আর্থসামাজিক উন্নয়নে মুসলিমদের ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও মুসলিমরা এখানে নির্যাতিত এবং বঞ্চিত।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলামের প্রচার ও প্রসার : বাণিজ্যিক যোগাযোগ ও ইসলাম প্রচারকগণের প্রচেষ্টার ফলে ইসলামের প্রাথমিক পর্বে কিংবা উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে মুসলিম বিজয়ের সমকালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলামের দাওয়াত সম্প্রসারিত হয়। ১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ আফ্রিকায় পর্তুগিজ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠিত হলে মুসলমানদের জন্য দুর্দিন নেমে আসে। তারা মুসলমানদের ধর্মীয় ইতিহাস ঐতিহ্য অনেকাংশেই ধ্বংস করে ফেলে। সপ্তদশ শতাব্দীতে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জাভা বা বর্তমান ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ইন্দোনেশিয়ার ডাচবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমরা যুক্ত থাকায় ডাচরাও মুসলিমদের ওপর দমন-পীড়ন চালায় এবং তারা শাসক, বণিক ও সমাজের অভিজাত শ্রেণির মুসলমানদের হাজার হাজার মাইল দূরে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে নির্বাসিত করে। এ কাজটি তারা নিষ্ঠুরতার সাথে করলেও মূলত এভাবে দক্ষিণ আফ্রিকায় মুসলমানদের বিস্তার ঘটে।
রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক আক্রোশ : রাজনৈতিকভাবে ইন্দোনেশীয় অঞ্চল থেকে প্রথম নির্বাসনের খবর জানা যায় ১৬৬৭ সালে। এ সময় মালয় ও জাভা দ্বীপের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অথচ শিল্প বাণিজ্য ও শিক্ষা সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ মুসলিম সালতানাত প্রতিষ্ঠিত ছিল। মুসলমান সুলতানগণই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাই বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই সুলতানদের পরাভূত করা ডাচদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সুলতানদের পরিষদবর্গের অনুগত সদস্য ও প্রধান বাণিজ্যিক ব্যক্তিত্বসহ অনেককেই গ্রেফতার করে হত্যা করা হতো অথবা নির্বাসনে পাঠানো হতো। ১৬৬৭ সালে সুমাত্রার সুলতান শাইখ আব্দুর রহমান মাতাবী শাহ এবং স্বীয় প্রধান পরিষদ শাইখ মাহমুদসহ সুমাত্রার শাসকশ্রেণি ও বণিকগোষ্ঠীর অনেককেই বন্দি করা হয় এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে নির্বাসন দেওয়া হয়। নির্বাসিত হবার পরও বন্দিজীবনের বিভিন্ন পর্যায়েও নির্বাসিত অন্যদের মধ্যে ইসলাম প্রচারে কাজ চালিয়ে গেছেন এই মনীষীরা।
সুলতান শাইখ ইউসুফ : রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত দ্বিতীয় পর্বের ব্যক্তি হচ্ছেন সুলতান শাইখ ইউসুফ। তিনি বানতাম অঞ্চলের সুলতান ছিলেন। শিল্প, বাণিজ্য ও শিক্ষা সংস্কৃতিতে বানতাম সে সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য সালতানাত হিসেবে পরিগণিত ছিল। ১৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২ এপ্রিল তার অনুচর ও পরিষদবর্গ এবং পারিবারিক সদস্যগণসহ কয়েকশত মুসলমানকে গ্রেফতার করে দক্ষিণ আফ্রিকায় নির্বাসন দেওয়া হয়। তাদের কেপটাউনের দূর-পার্শ্ববর্তী ইস্ট নদীর সম্মুখবর্তী জানডভেইট নামক কৃষিভূমি অঞ্চলে নির্বাসিত করা হয়। শ্রমিক, দাস এবং নানা কাজে ব্যবহৃত নির্যাতিত মুসলমানগণ শাইখ ইউসুফকে ঘিরে ধর্মচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ডাচদের এ পরিকল্পনা বিপরীত ফল প্রদান করে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলাম সম্প্রসারিত হয়েছে।
কালিমা পাঠে শাস্তি : ডাচরা অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, মুসলমানদের ঈমানি চেতনা তাদের স্বাধীনতাবোধকে জাগ্রত করে থাকে। তাই তারা নির্বাসিত ব্যক্তিদের ধর্মচর্চায় বাধা সৃষ্টি করে। সালাতসহ প্রকাশ্য ধর্মচর্চা তো দূরের কথা তাদের কালিমা পাঠ করলেও শাস্তি প্রদান করা হতো। এমন প্রেক্ষাপটে এসব মুসলমান সারা দিনের ক্লান্তিময় শ্রম শেষে নিজেদের আশ্রয়স্থলে ফিরে রাতের গভীরে পাহাড়ি এলাকায় সমবেত হয়ে সারা দিনের সালাত একসাথে আদায় করতেন। সেইসাথে শাইখ ইউসুফের নিকট ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এরা বানতাম ও মাকাসসার অঞ্চল থেকে আগত হয়ে এখানে আশ্রিত ছিলেন বলে জানডভেইট জেলার পার্শ্ববর্তী এ অঞ্চলকে ‘মাকাসসার’ নামে অভিহিত করা হয়। আজও এ অঞ্চলে মুসলমানগণ সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করলেও উগ্র বর্নবাদী খ্রিষ্টানদের নির্যাতন থেকে মুক্তি মেলেনি।
পুলিশ দাঈ : আরবের ইয়েমেন অঞ্চলের মক্কী বংশোদ্ভূত সায়্যিদ আলাউয়্যি নামক জনৈক মুসলিম মনীষী ১৭৪৪ খ্রিষ্টাব্দে হাজী মাতারিম নামক জনৈক ব্যক্তিকে সাথে নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা ভ্রমণে এসেছিলেন। তিনি পরবর্তীতে তুয়ান সায়্যিদ নামে পরিচিত ছিলেন। তারা সন্দেহভাজন হিসেবে কেপটাউনে ডাচ কর্তৃক গ্রেফতার হন। ইসলাম প্রচার ও দক্ষিণ আফ্রিকান বন্দি মুসলমানদের গোপন সংবাদ ও তথ্য-সংগ্রহের অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করে রবিন দ্বীপে কারারুদ্ধ করা হয়। কিছুদিন পরে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তারা কেপটাউনে পুলিশ কনস্টেবল হিসেবে চাকরির সুযোগ লাভ করেন। এ পেশাকে তারা ইসলাম প্রচার ও তথ্য-সংগ্রহের সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। তারা দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে বন্দিশিবির বা ‘স্লাভ কোয়ার্টার’ এ গমন করেন। তারা প্রায়ই রাতের অন্ধকারে বন্দিদের ইসলাম শিক্ষাদানের জন্য সেখানে যেতেন এবং ইসলামের খেদমতে এমন কর্মকাণ্ডের জন্যই তুয়ান সায়্যিদকে কেপটাউন অঞ্চলের প্রথম অফিসিয়াল ইমাম হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
প্রথম মাদরাসা : ইন্দোনেশিয়ার তিডোর অঞ্চলের মুসলিম যুবরাজ ছিলেন আব্দুলাহ কাজি আবু সুলাইমান। তিনি অত্যন্ত শিক্ষিত এবং স্বাধীনচেতা যুবরাজ ছিলেন। ডাচদের রোষানলে পড়ে তিনি ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে গ্রেফতার হয়ে কেপটাউনে প্রেরিত হন। তিনি ছিলেন পবিত্র কুরআনের হাফেজ। তিনি কারারুদ্ধ অবস্থায় স্মৃতিপট থেকেই পবিত্র কুরআন লিপিবদ্ধ করেন। তার লিখিত সেই কুরআনের কপি কেপটাউনে এখনো সংরক্ষিত আছে। তিনি ১৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে জেল থেকে মুক্তি পান এবং ঐ বছরই স্থানীয় মুসলমানদের শিক্ষার সুযোগ তৈরির জন্য কেপটাউনে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটাই দক্ষিণ আফ্রিকার মুসলমানদের জন্য প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
দারুল উলুম : দক্ষিণ আফ্রিকায় দারুল উলুম নামে ইসলাম বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য বেশকিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। উল্লেখযোগ্য দারুল উলুম মাদরাসাসমূহ হচ্ছে দারউল উলুম জাকারিয়াহ, দারউল উলুম আজাদভিলে, দারউল উলুম প্রিটোরিয়া, দারউল উলুম কেপটাউন, দারউল উলুম বেনোনি, দারউল উলুম নিউক্যাস্টল, দারউল উলুম স্প্রিংস, দারউল উলুম ইসিপিংগো, দারউল উলুম ক্যাম্পেরডাউন, দারউল উলুম স্টার্ন্ড প্রভৃতি। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকান মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, মক্কার উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও তাদের কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ নেই।
মুসলিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল : মুসলিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংস্থাটি ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। এটি বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক আইনের প্রতিবাদ জানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণকে একসূত্রে রাখার চেষ্টা করে। সেইসাথে খাবারের হালাল-হারামসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ করে থাকে। আর অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যবদ্ধকরণের প্রয়াসে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামিক ইন্টারফেইস রিসার্চ ইনস্টিটিউট। দক্ষিণ আফ্রিকার জনগণকে বিভিন্ন বিষয় সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, হাতে কলমে শিক্ষাদান, বিভিন্ন সমস্যার সমাধানকল্পে কাজ করে যাচ্ছে অর্গানাইজিং এন্ড অরকেস্ট্রচিং দাওয়াহ ইন সাউদার্ন আফ্রিকা। এছাড়া ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে কেপটাউনে প্রতিষ্ঠিত ‘সাউথ আফ্রিকা মুসলিম এসোসিয়েশন’ ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম চিকিৎসকদের সংগঠন ‘লাজনাতুল আতিবা’, ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘ইসলামিক কাউন্সিল অব সাউথ আফ্রিকা’ ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘উমলাস মারিয়ান হিল ইসলামিক সেন্টার’, আফ্রিকা মুসলিম পার্টি, ইসলামিক পার্টি এবং পিস এন্ড জাস্টিস কংগ্রেস দক্ষিণ আফ্রিকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষভাবে ভূমিকা রাখছে।
মুসলিম ভিউজ, ইসলাম দ্য ওয়ে অব লাইফ : ২০১১ সালের ইউএনএইডস রিপোর্ট অনুয়ায়ী দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ৫.৬ মিলিয়ন লোক এইচআইভিতে আক্রান্ত। ২০০৮ সালের একটি গবেষণায় সেখানকার মোট জনগোষ্ঠীর শতকরা ১৩.৯ ভাগ এইচআইভি জীবাণু বহনকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এইডস নির্মূলে ইসলামের আদর্শ ও নৈতিক দর্শন দক্ষিণ আফ্রিকান সমাজে ক্রীড়ানকের ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। সেইসাথে ইসলামের বর্ণভেদ প্রথাবিরোধী চেতনা দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মানুষদের আলোড়িত করতেও সক্ষম হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল, বেতার এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় ইসলামের নৈতিক বিষয়সহ বিভিন্ন দিক প্রচারিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে মুসলমানদের কমিউনিটি রেডিও, রেডিও ইসলাম এবং ভয়েস অব দ্য কেপ এ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে মুসলমানদের অনুষ্ঠানসমূহ বিশেষভাবে প্রচার করে। সেইসাথে মুসলিম ভিউজ, ইসলাম দ্য ওয়ে অব লাইফ নিউজ পত্রিকায় ইসলামী আদর্শের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। উইটস ইউনিভার্সিটি এবং ওয়েস্টার্নকেপ ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কুরআন ও আরবি ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ আছে। মুসলিমদের এরকম কর্মকাণ্ড দক্ষিণ আফ্রিকায় ব্যাপকভাবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন এবং ইসলাম প্রসারেও সহায়ক হলেও সেখানে অনেক ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত মুসলিমরা।
এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকায় ইসলাম সম্প্রসারণের সংক্ষিপ্ত উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো মধ্যে রয়েছে-
১. দাসদের ধর্মান্তর, যাদের জন্য ইসলাম নিরাপদ স্থান এবং এলাকার পরিচয় প্রদান করেছিল।
২. কেপের মুসলিম পুরুষ এবং ইংরেজ নারীদের মধ্যে বিবাহ।
৩. পরিত্যক্ত শিশুদের মুসলিম পরিবারে আশ্রয়।
৪. অন্যান্য জাতি ও ধর্মের শিশুদের মুসলিম স্কুলে উপস্থিতি।
৫. মুসলিম নীতি ও আচারের প্রতি আকর্ষণ।
৬. খ্রিস্টানকৃত দাসদের বিক্রয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা। তাই দাস মালিকরা পরোক্ষভাবে তাদের দাসদের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পরিবর্তে ইসলাম গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছিল।
মুসলিম নির্যাতন : বিশ্ববরেণ্য কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মানবতাবাদী দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে সমাজের নির্যাতিত কালো মানুষসহ পিছিয়ে পড়ারা অনেকাংশে আশার প্রদীপ দেখতে পেলেও মুসলিম জনগোষ্ঠী নির্যাতিত হয়ে থেকে যায়। মুসলমানদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ যেমন কম তেমনি শিক্ষা গ্রহণের পরে চাকরির পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় তারা উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহীও হয়ে ওঠেনি। ইতিহাসবিদ M Ali Kettani বলেন মুসলিমরা ডাচ ও ইংরেজদের নির্যাতন ও নিষ্পেষণে সেখানকার একটি বড় অংশ দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং কিছুসংখ্যক মুসলমান পেশাজীবী হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে।
মুসলিম প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত : সাউথ আফ্রিকায় মুসলিম নির্যাতন খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সেখানে মুসলিমদের দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর বর্ণবাদী খ্রিষ্টান কর্তৃক ভস্মীভূত করা এক রুটিন কাজে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেশটিতে এক রাতে তিনজন মুসলিমকে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদের দোকানে পুড়ে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া দিন-দুপুরে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও চাঁদাবাজি হর হামেশাই হয়। কিন্তু মুলিমদের ওপর এই নির্যাতন বন্ধের জন্য সরকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং পোস্ট-এ্যাপার্থেইডকালীন অসাম্য : দক্ষিণ আফ্রিকা এখনো বিশ্বের সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে অসম দেশের মধ্যে একটি। যদিও এ্যাপার্থেইড ব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বিমুক্ত হয়েছে। বৈষম্য যেন সামাজিক-অর্থনৈতিক সংযোজনের স্থায়ী একটি উত্তরাধিকার রেখে গেছে, যা দক্ষিণ আফ্রিকান মুসলিমদের Disproportionately প্রভাবিত করেছে। ১৯৯৪ সালের পর গণতান্ত্রিক সংস্কারের পরও মুসলিমদের বেকারত্ব, মানসম্পন্ন শিক্ষার অসমান প্রবেশাধিকার এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা সেবার মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো এই বৈষম্যগুলোকে আরও বৃদ্ধি করছে। যদিও দক্ষিণ আফ্রিকার গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রথম সময়ে আশা করা হয়েছিল যে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং বিস্তৃত অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে এই বৈষম্যগুলোর সমাধান হবে, যেমন ব্রড-বেসড ব্ল্যাক ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট (B-BBEE)। তবে এই প্রচেষ্টা সামাজিক বিভাজন বাড়িয়েছে।
সমকালীন মুসলিম সম্প্রদায় : মুসলিম সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক শক্তি এবং জাতীয় অবদান সত্ত্বেও, মুসলিমরা রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু হিসেবে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে দেশটিতে। ১৯৯৪ সালের পর মুসলিমরা ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ভূমিকায় তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল তথাপিও বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মুসলিম প্রতিনিধিত্ব ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এমনকি বর্তমান সরকারের কাঠামোয় কোনো মুসলিম প্রতিনিধিত্ব নেই। যেখানে প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারের সময় মুসলিমরা মন্ত্রিসভায় ১০%-এরও বেশি মন্ত্রীপদে প্রতিনিধিত্ব করেছিল এবং এর ফলে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী পদগুলির ১০% অলঙ্কৃত করেছিল। সেসময় আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC) প্রার্থীর তালিকার প্রায় ৩.৫% মুসলিম সদস্য ছিল।
মুসলিম সম্প্রদায়ের দক্ষিণ আফ্রিকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও মুসলিমরা যে সামাজিক-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে তা দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজে অসমতা, বেকারত্ব এবং স্বতন্ত্রতার সমস্যা। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারকে মুসলিমদের ওপর সকল ধরনের অন্যায়, নির্যাতন, বঞ্চনা বন্ধ করার আইন প্রণয়ন করে মুসলিমদের অর্থনৈতিক শক্তি, কৌশলগত অবস্থান এবং আদর্শ ব্যবহার করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রসারিত করতে হবে।
তথ্যসূত্র : পিউ রিসার্চ ইনস্টিটিউট, islamonline.net, muslimpopulation.com, southafricanmuslimcouncil.org, justiceforall.org, islamawarness.net, britishmuslim-magazine.com
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com