শান্তি আলোচনা চূড়ান্তের অপেক্ষায় মধ্যপ্রাচ্য
৪ জুন ২০২৬ ০৯:৪৭
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়, তখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে নেমে আসে অন্ধকার। আর সেই অন্ধকার দূর করতে মশাল হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তান। মধ্যপ্রাচ্যের অন্ধকার না কাটলেও অমানিশা বা ঘোর অন্ধকার নেই। দফায় দফায় চলছে শান্তি আলোচনা, শর্ত পাল্টা শর্ত। আলোচনার মধ্যে কখনো কখনো পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটলেও তা মৃদু, অর্থাৎ ভয়াবহতা নেই। ইরানে হামলা না করার বিষয়ে সম্মত হলেও লেবাননে ঠিকই হামলা চলছিল। কিন্তু সেই লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে যখন আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে ফোনালাপ করতে হচ্ছে, তখন পরিস্থিতি যে আরও পাল্টাবে, সেটা আন্দাজ করা যায়। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর নেতানিয়াহুর মধ্যে চলছে এক ধরনের দূরত্ব। এই দূরত্ব বোঝা গেছে তখন, যখন ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলছেন আপনি একটা পাগল, লোকেরা আপনাকে ঘৃণা করেন। তাছাড়া ইরান যুদ্ধে জড়ানো যে যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক হয়নি, এমন মন্তব্যও করেছেন ট্রাম্প। ফলে পরিস্থিতি ক্রমেই ইরানের পক্ষে যাচ্ছে এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা রয়েছেন শান্তি আলোচনা চূড়ান্ত ফলের অপেক্ষায়।
ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হলে তেলআবিবের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান
ইরানের সংসদ স্পিকার বলেছেন, ইরান ও লেবাননের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যদি ইসরাইল তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তাহলে তেহরান শুধু আলোচনার প্রক্রিয়াই বন্ধ করবে না, বরং সরাসরি ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবফ লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবি বেরির সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে এসব কথা বলেন। বাঘের গালিবফ বলেন, হিজবুল্লাহ ও আমাদের আন্দোলন আজ শুধু নিজেদের মাতৃভূমি লেবাননকেই রক্ষা করছে না, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামও চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই ইরান ও লেবাননের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর এবং অবিচ্ছেদ্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের ও আপনাদের ভাগ্য এবং স্বার্থ একসূত্রে গাঁথা।’
ইরানের অধিকার বিবেচনা করেই হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল
ইরানের সংসদ মজলিসে শুরায়ে ইসলামীর ডেপুটি স্পিকার জোর দিয়ে বলেছেন, ইরানি জনগণের অধিকার বিবেচনা না করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে কোনো ধরনের চলাচল সম্ভব নয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরআইবির উদ্ধৃতি দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, ইরানের সংসদের উপ-স্পিকার হামিদ রেজা হাজী বাবায়ি গত ১ জুন সোমবার রাতে তেহরান প্রদেশের মালার্দ শহরে বিপ্লবী জনতার বিশাল এক সমাবেশে বলেন, ইরানি জাতির অবিসংবাদিত অধিকার যে হরমুজ প্রণালী- এ বিষয়ে কি কারো কোনো সন্দেহ আছে? অপরাধী আমেরিকাকে বুঝতে হবে যে, ইরানি জাতির অধিকার বিবেচনা না করে এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করা সম্ভব নয়।
নেতানিয়াহুকে থামালেন ট্রাম্প
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদানের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবাননে হামলার বিষয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে সংযত থাকতে বাধ্য করেছেন। ইরানের জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির বরাত দিয়ে পার্সটুডে জানিয়েছে, গত ১ জুন সোমবার রাতে অ্যাক্সিওস তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ইরানের সতর্কবার্তার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈরুতের নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলার বিষয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা থামিয়ে দেন।
নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ আখ্যা দিলেন ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধের মধ্যে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে টেলিফোনে কড়া কথা শুনিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে সম্মোধন করেছেন। নেতানিয়াহু যে এখন সবার কাছে অপ্রিয় হয়ে উঠেছেন, সে কথাও শোনাতে ছাড়েননি ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের ইতি টানতে যুক্তরাষ্ট্র যখন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন লেবাননে ইসরাইলি হামলার কারণে তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গত ১ জুন সোমবার ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন ট্রাম্প। এর আগে ইসরাইল জানিয়েছিল, তাদের সামরিক বাহিনী লেবাননে অভিযান আরও জোরদার করবে। এমনকি রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে বোমা হামলা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, ফোনে নেতানিয়াহুর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। দুই নেতার ফোনালাপের বিষয়ে জানেন- এমন দুজন মার্কিন কর্মকর্তা এবং একটি সূত্র অ্যাক্সিওসকে জানায়, কথা বলার সময় নেতানিয়াহুকে সরাসরি ‘পাগল’ বলেন ট্রাম্প। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে ‘অকৃতজ্ঞ’ও বলেন তিনি। এও বলেন যে লোকেরা আপনাকে ঘৃণা করেন।
হিজবুল্লাহর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপ
লেবাননে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং ইসরাইলের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকরের লক্ষ্যে হিজবুল্লাহর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৈরুতের শহরতলিতে ইসরাইলি বাহিনীর নতুন করে জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের পর গত সোমবার (১ জুন) তিনি এ চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান। ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে জানান, উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর সঙ্গে তার খুব ভালো ফোনালাপ হয়েছে এবং উভয় পক্ষ সব ধরনের গোলাগুলি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইল হিজবুল্লাহর ওপর আর কোনো হামলা চালাবে না এবং হিজবুল্লাহও ইসরাইলে আক্রমণ করবে না।
ইরানের হামলা ছিল অনেক ‘নিখুঁত’, ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২০ মার্কিন সামরিক স্থাপনা
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশটির হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিও থেকে এ তথ্য জানা গেছে। এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, ইরানের হামলার পরিধি যতটা ব্যাপক বলে যুক্তরাষ্ট্র এ পর্যন্ত প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে, প্রকৃত চিত্র তার চেয়ে অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে একযোগে হামলা চালায়। যুক্তরাষ্ট্র এ অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। মার্কিন-ইসরাইলি হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। ইসরাইলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিশানা করে ইরান। এতে এসব দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজ ও রাডার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগণের হিসেবে, অপারেশন এপিক ফিউরি শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। এ বিষয়ে বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানের পক্ষ থেকে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘নিরাপত্তার কারণে’ তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বিবিসি ভেরিফাই যুক্তরাষ্ট্রের ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পেরেছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ কোনো কোনো বিশ্লেষক এ সংখ্যা ২৮ পর্যন্ত হতে পারে বলে মনে করছেন।
ইরান যুদ্ধে আমাদের জড়ানোই উচিত হয়নি, বলছেন ট্রাম্প
অতীতের মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপগুলোর বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘জড়ানোই উচিত হয়নি’। সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ট্রাম্প বলেন, ইরাকে কী ঘটেছিল, তা আপনারা দেখছেন। আমরা সেখানে অত্যন্ত বাজে পরিস্থিতি তৈরি করেছিলাম। আমরা যা করেছিলাম, তা ছিল চরম বোকামি। সত্যি বলতে, প্রথমত আমাদের সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি। তিনি আরও বলেন, ইরানেও আমাদের জড়ানো ঠিক হয়নি, তবে ইরানের সেই সক্ষমতা (পরমাণু অস্ত্র তৈরির) রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমরা মূলত (ইরানের) নেতৃত্বের বিভিন্ন পর্যায়কে স্তব্ধ করে দিয়েছি। কিন্তু তাদের সামরিক বাহিনীকে আমরা স্পর্শ করিনি।