পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের হাহাকার
২১ মে ২০২৬ ১০:১৩
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
মুহাম্মদ বিন কাসিমের ৭১১ খ্রিস্টাব্দে আরবদের পক্ষ থেকে সিন্ধু বিজয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ তথা ভারতে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত। পরবর্তীতে খলজি, তুঘলক, লোধি, মুঘল বিভিন্ন মুসলিম শাসকগোষ্ঠী ভারতবর্ষ শাসন করেন। প্রায় হাজারের অধিক বছরের শান্তিপূর্ণ মুসলিম শাসন ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধ থেকে ১৮৫৬ সালের সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে শেষ হয়। তারপর ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন সমাপ্তিতে হিন্দুরা শাসনভার পায়, যার সময়কাল ৮০ বছরেরও কম। কিন্তু এই অল্প সময়ে উগ্র হিন্দুদের অত্যাচারে মুসলিমসহ অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। ভারত বিভাজনের পর থেকে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংস, ২০০২ সালের গুজরাট, ২০১৩ সালের মুজাফরনগর ও ২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গা, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৭০, CAA, SIR ইত্যাদিভাবে মুসলিমদের যুলুম করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের হাহাকার, আত্মহত্যার হুমকি : পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারি আদেশ অনুযায়ী, পৌরসভার চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি এবং একজন সরকারি পশু চিকিৎসক যৌথভাবে লিখিত সার্টিফিকেট দিলেই কোনো বলদ, গরু বা মহিষ জবাই দেওয়া যাবে। উভয় প্রতিনিধিকে একমত হতে হবে যে পশুটি কাজ ও প্রজননের ক্ষেত্রে অন্তত ১৪ বছরের বেশি বয়সি অথবা বার্ধক্য, আঘাত, বিকৃতি বা অন্যান্য দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছে। সেইসঙ্গে গর্ভবতী কোনো পশু জবাই করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এছাড়া খোলা জায়গায় পশু জবাই নিষিদ্ধ করে শুধুমাত্র অনুমোদিত কসাইখানায় জবাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিধানসমূহ লঙ্ঘন করলে ছয় মাসের কারাদণ্ড, এক হাজার রুপি জরিমানা বা উভয় দণ্ড আরোপ করার কথা বলা হয়েছে। রাজ্য সরকার মূলত ১৯৫০ সালের ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যানিমেল স্লটার কন্ট্রোল অ্যাক্ট’ এবং ২০১৮ সালের কলকাতা হাইকোর্টের একটি নির্দেশিকাকে কঠোরভাবে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে এমন আদেশে রাজ্যটিতে মুসলিম ছাড়াও হিন্দুদের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া। কারণ এর সাথে মুসলমানদের সংবিধানে প্রদত্ত ধর্মীয় এবং হিন্দুদের রুটি রুজি জড়িত।
বিতর্কিত নির্বাচন ও এসআইআর : সম্প্রতি ভারতীয় বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর। বিবিসির প্রতিবেদনমতে, তথাকথিত ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের’ অর্থাৎ মুসলিমদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সংশোধন কার্যক্রম চালানো হয়। বিতর্কিত বিধানসভা নির্বাচনে পশিচমবঙ্গ ও আসাম রাজ্যে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এবং কেন্দ্রশাসিত পদুচেরিতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জয়লাভ করেছে। নির্বাচনের পরপরই বুলডোজার দিয়ে সংখ্যালঘুদের হত্যা, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করেছে বিজেপি। এমনকি দলটির পশ্চিমবঙ্গের সাংসদ সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রীংলাকেও এ সময় উল্লসিত দেখা যায়। আর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে বলতে দেখা গেছে, মুসলিমরা আমাকে ভোট দেয়নি যাতে সহিংসতা আরো বৃদ্ধি পায়। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য শতাব্দী রায়ের অভিযোগ, রাজ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। CAA, SIR ইত্যাদির মাধ্যমে ভারতে মুসলিমদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেওয়াসহ বিভিন্নভাবে নির্যাতন করায় দেশটিতে আবার ১৯৪৭ এর দ্বিজাতিতত্ত্বের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কাশ্মীর : ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীর বিরোধ নিরসনে পাঁচবার গণভোটের রেজ্যুলেশন হয়। ভারতের আপত্তির কারণে তা কার্যকর করা সম্ভবপর হয়নি, বরং ১৯৫৭ সালেই কাশ্মীরি ও জাতিসংঘের আপত্তি সত্ত্বেও অঞ্চলটিকে ভারত একীভূত করে। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করায় কাশ্মীরিদের আজাদ হওয়ার আকাক্সক্ষা তীব্রতর হলে সেখানে সরকার ব্যাপক নির্যাতন চালায়। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর কাশ্মীরের সর্বজনশ্রদ্ধেয় বর্ষীয়ান নেতা সৈয়দ আলী শাহ গিলানি (৯০) এক টুইটার বার্তায় বিশ্ববাসীর নিকটে তাদের রক্ষার আর্তি জানিয়ে লিখেছেন যে, আপনারা এই বার্তাকে ‘এস ও এস’ হিসেবে গণ্য করুন! রাজ্যসভায় কংগ্রেসের বিরোধী দলনেতা গোলাম নবী আযাদও বিলটির বিরোধিতা করেন। বিলের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আযাদ কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী রাজা ফারূক হায়দার খান বলেন, ‘ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে কাশ্মীরকে হারালো’। ভারতীয় কংগ্রেসের এমপি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘সিমলা চুক্তি ও লাহোর চুক্তি সত্ত্বেও কীভাবে এটা অভ্যন্তরীণ বিষয় হলো?’ কংগ্রেস নেতা মনিস তেওয়ারী বলেন, ‘ভারতীয় সংবিধানে কেবল ৩৭০ ধারা নয় ৩৭১-এ থেকে আই পর্যন্তও রয়েছে। যেগুলো নাগাল্যান্ড, আসাম, মণিপুর, অন্ধ্র প্রদেশ, সিকিম প্রভৃতি রাজ্যে ‘বিশেষ অধিকার’ প্রদান করে।’ আর মিজোরামের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা লালথান হাওলা ৩৭০ ধারা বাতিলের প্রেক্ষিতে বলেন, ৩৭১-এ ধারায় হাত পড়লে রুখে দাঁড়াবে মিজোরাম। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। একই ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন অন্যান্য রাজ্যগুলোর নেতারা, যা তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা আন্দোলনের ইঙ্গিত বহন করে। কাশ্মীরের দীর্ঘদিন চলমান আজাদি সংগ্রামে লক্ষাধিক কাশ্মীরি নিহত হয়েছেন। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের মধ্যে অনেক বার বড় আকারের যুদ্ধ হলেও কাশ্মীর আযাদ হয়নি।
মুসলিম গণহত্যা : প্রায় ৩ হাজার বছর আগে ফিরাউন, মূসা (আ.)-কে হত্যার উদ্দেশ্যে মায়ের পেট থেকে সদ্য জন্ম নেয়া শিশুদের হত্যা করে যে নারকীয়তা সৃষ্টি করেছিল, এই যুগের অসভ্য বর্বর উগ্র ভারতীয় হিন্দুরা সেই নারকীয়তাকেও হার মানিয়েছে। ২০০২ এর ২৭ ফেব্রুয়ারি–গুজরাটের SABARMATI EXPRESS নামে একটি ট্রেনে হামলার ঘটনায় কোনো প্রমাণ ছাড়াই মুসলমানদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরবর্তীতে ‘নতুন নানাভাতি’ তদন্ত রিপোর্টে বেরিয়ে আসে, ভারতের মুসলমানদের উপর হামলা চালানোর পূর্ব-ষড়যন্ত্র হিসেবেই উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসীরা এটি করেছিল তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং মোদির নির্দেশেই। এই অজুহাতে মাসখানেক ধরে সাম্প্রদায়িক উগ্র RSS সহ হিন্দু সন্ত্রাসীরা মুসলিমদের ওপর হামলা চালায়। শুরু হয় দাঙ্গা। বাবুভাই প্যাটেল, সকলের কাছে পরিচিত উপনাম বাবু বজরঙ্গি হিসেবে। গুজরাটে মুসলিম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম এই নরপশুর সাক্ষাৎকার ধারণ করেন তেহেলকার ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক ২০০৭ সালে গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় ‘নারোদা পাতিয়া গণহত্যা’ (আহমেদাবাদ এলাকায়) চালাতে সে কীভাবে হিন্দুদের সংঘবদ্ধ করেছিল, সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারে আনন্দের সাথে বর্ণনা করে কিভাবে সে ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা বহু মুসলমানকে আগুনে পুড়িয়ে ও তলোয়ারে কেটে হত্যা করে। সাক্ষৎকারের কিছু অংশ- ‘কেটে টুকরা করা, পুড়িয়ে দেয়া, আগুন ধরানো অনেক কিছুই করা হল। আমরা মুসলমানদের আগুনে পোড়াতেই বেশি পছন্দ করি, কারণ এই জারজরা তাদের দেহ মৃত্যুর পর চিতায় পোড়াতে চায় না।’ আমার শুধু একটি শেষ ইচ্ছা… আমাকে মৃত্যুদণ্ড বা ফাঁসিতে ঝোলানো হলেও তা গ্রাহ্য করব না… তবে আমাকে ফাঁসিতে দেওয়ার আগে মাত্র দুইদিন সময় দেয়া হোক, আমি জুহাপুরা (মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা) চলে যাব। সেখানে ৭-৮ লাখ লোক বাস করে। আমি তাদের শেষ করব… কমকরে হলেও তো সেখানে আমার ২৫-৫০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা উচিত। “গণহত্যার পর থানায় মামলার নথিতে লেখা হয়, এক গর্ভবতী মুসলিম মহিলার পেট চিরে আমি ৯ মাসের ফিটাস বা ভ্রুন (ভূমিষ্ট হওয়ার আগপর্যন্ত শিশুদের ফিটাস বা ভ্রুন বলে) বের করেছি, নিক্ষেপ করেছি আগুনে। আসলে আমি তাদেরকে দেখিয়েছি, দেখ! আমাদের বিরোধিতার শাস্তি কি। একজনকেও ছাড়া যাবে না। এমনি তোদের ভূমিষ্ঠ হতেও দেয়া যাবে না। আমি বলেছি, যদি মহিলাও হয়….., যদি শিশু হয় তবু তাদের কেটে ফেল… চিড়ে ফেল… টুকরো করে ফেল……আগুনে পোড়াও সকল মুসলমানদের। আমি আমার সঙ্গীদের বলেছি তাদের কাউকে বাঁচতে দিও না, এরপর তাদের ধনসম্পদ সবই তো আমাদের। আমরা দলবেধে প্রত্যেকেই মুসলমান মারছিলাম অতি উন্মাদনার সাথে।…আমরা এসআরপি (স্টেট রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) ক্যাম্পের পাশেই এই গণহত্যা চালাই।…আসলে একসাথে মুসলমান মারতে এত মজা লাগে না… সাহেব, তাদের মারার পর আমার নিজেকে রানা প্রতাপ বা মহেন্দ্র প্রতাপের মতো (মুসলিম নিধনকারী রাজা) মনে হয়েছে। এতদিন শুধু তাদের নাম শুনেছি, কিন্তু সেই দিন আমি তাই করলাম… এটা ছিল একটি অপকর্মের নমুনা মাত্র।
দাঙ্গায় মোদির উসকানি : ২০০২ সালের দাঙ্গার সময় মুসলিম মহিলারা পুলিশের কাছে তাদের ইজ্জত রক্ষার আবেদন জানালে পুলিশ বলেছিল, ‘তোমাদের তো মেরেই ফেলবে। তার আগে ইজ্জত থাকলো কী চলে গেল তাতে কি?’ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা ঐ দাঙ্গায় মুসলিম মহিলাদের গণধর্ষণ করে, লাঠি, ছুরি ইত্যাদি দিয়ে যৌনাঙ্গে আঘাত করে। তাদের স্তন, জরায়ু কেটে দেয় এবং তাদের যোনিপথে রড প্রবেশ করানো হয়। তাদের অধিকাংশকেই টুকরো টুকরো কেটে ফেলা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। ২৫০-৩০০ নারীকে খুন করা হয়। উগ্রবাদী হিন্দু সন্ত্রাসীরা ৫৬৩টি মসজিদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। বেসরকারি জরিপ বলেছে, এই ধ্বংসলীলায় ক্ষতির পরিমাণ তিন হাজার আটশ’ কোটি টাকা প্রায়। মুসলমানবিরোধী দাঙ্গা চলাকালে গুজরাটের প্রধান নগরী আহমেদাবাদের একটি আবাসিক এলাকায় ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুলবার্গ হাউজিং সোসাইটি গণহত্যার শিকার হন সাবেক কংগ্রেস সাংসদ এহসান জাফরিসহ ৬৯ জন মুসলিম। তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে শহীদ করা হয়। ২০০২ সালের ১ মার্চ ওডি গ্রামে এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ির মুসলিম বাসিন্দা একটি তিনতলা বাড়িতে আশ্রয় নিলে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দুরা। নরেন্দ্র মোদি ২০০২ সালের মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার জন্য অনুতপ্ত নন বলেও ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তার গাড়ি কোনো কুকুর ছানাকে চাপা দিলে সে জন্য দুঃখ অনুভব করবেন তিনি, কিন্তু মুসলিম হত্যার জন্য নয় যেটি তার উল্লাসেরই নামান্তর! (রয়টার্স) একটি ট্রাইব্যুনালের হিসাবে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ওই গণহত্যায় প্রায় ৫ হাজার মুসলমানকে শহীদ এবং ঘরছাড়া হতে হয়েছিল আড়াই লাখ মানুষকে।
‘মকতুব’ নামে একটি এনজিও-র হয়ে সেখানে দাঙ্গাপীড়িতদের মধ্যে বহুদিন ধরে কাজ করছেন রাবিহা আবদুর রহিম। তিনি বলেন ‘আজ এদেশে মুসলিম মেয়েরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে কোনোদিন তারা খুন হতে পারে, পরিবারের সদস্য, সংঘবদ্ধ দল বা ক্যামেরার সামনে ধর্ষিতা হতে পারে বা জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারেÑ স্রেফ তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য।’ গুজরাট দাঙ্গাকারীদের না ঠেকাতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যেটি উসকানিমূলক।
পেহেলগাঁ : ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের পেহেলগাঁয়ে হামলার পর মুসলিম হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, অগ্নিসংযোগ, ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর সর্বত্র বৃদ্ধি পায়। জানা যায় ২২ এপ্রিল থেকে ২ মে ২০২৫ ভারতজুড়ে ৬৪টি ঘৃণামূলক বক্তব্য নথিভুক্ত করেছে ইন্ডিয়া হেট ল্যাব (আইএইচএল)। সর্বোচ্চসংখ্যক ঘৃণামূলক বক্তব্য রেকর্ড করা হয়েছে মহারাষ্ট্রে। এ সকল বক্তব্য বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ডব্লিউএইচপি), আন্তঃরাষ্ট্রীয় হিন্দু পরিষদ (এএইচপি), রাষ্ট্রীয় বজরং দল (আরভিডি), হিন্দু জনজাগৃত সমিতি, সকল হিন্দু সমাজ, হিন্দু রাষ্ট্র সেনা এবং হিন্দু রাষ্ট্র দলসহ হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর মধ্য থেকে মুসলিমদের লক্ষ করে ঘৃণা ও ভয় দেখানোর জন্য ভারতব্যাপী সমন্বিত প্রচারণা চালানো হয়।
ইন্ডিয়া হেট ল্যাব (আইএইচএল) এর প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, মিজোরাম বিমানবন্দর থেকে বাংলাভাষী (মুসলমান) দুই আমেরিকান নাগরিককে আটক এবং ত্রিপুরায় গরু নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তিন মুসলিম যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে আগ্রাতে কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোরক্ষক দল ১ মে ২০২৫ সালে দুজন মুসলমানকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। কট্টর হিন্দুরা প্রকাশ্যে আরো ঘোষণা করছে পেহেলগাঁয়ের ২৬ জন হত্যার প্রতিশোধ নিতে ২ হাজার ৬০০ মুসলমানকে হত্যা করা হবে।
‘বিয়িং মুসলিম ইন ইন্ডিয়া’ বইয়ের লেখক জিয়া উস সালাম বলেন, ‘ভারতের মুসলমান জনগোষ্ঠী যেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে পড়েছে, তারা নিজের দেশেই অদৃশ্য সংখ্যালঘু।’
শুধুমাত্র পেহেলগাঁয়ে হামলার পর থেকে ১০৬টি সহিংসতা, আক্রমণ, হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটস (এপিসিআর) মানবাধিকার সংগঠনের এক রিপোর্টে এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘পেহেলগাঁয়ের পর ঘৃণা : সহিংসতা ও ভীতি প্রদর্শনের মানচিত্র’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এপিসিআর। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতেই সবচেয়ে বেশি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণাভাষণ, হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা সামনে এসেছে। তবে যুদ্ধবাজ বিজেপি সরকারের পেহেলগাঁ কার্ডের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে বিপুল পরাজয়ে একটি চরম শিক্ষা হয়েছে।
‘স্বাধীন ভারতের মুসলমানদের ওপর হিংস্রতা’ : আরএসএস অনুসারী দাগি দাঙ্গাবাজ মোদি, তার জঘন্য অভিপ্রায় উন্মোচন করে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষক জনাই রাইট ‘স্বাধীন ভারতের মুসলমানদের ওপর হিংস্রতা’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ‘২০২৩ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতজুড়ে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাশ্রিত বক্তৃতা ৬২ শতাংশ বেড়েছে। ভারতে সাধারণ নির্বাচন ঘনিয়ে এলেই মুসলিমবিরোধী প্রচারণা ও দাঙ্গা বেড়ে যায়।’ মোদি মূলত কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দু রাজনীতিক ও তাত্ত্বিক ভিডি সাভারকারের শিষ্য। সাভারকার ১৯২৩ সালে তার রচিত ‘হিন্দুত্ব: হিন্দু কে?’ শীর্ষক বইতে শুধু হিন্দুদেরই তথাকথিত পবিত্রভূমি ভারতের ভূমিপুত্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা হলো ‘বহিরাগত’।
মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলমানদের ওপর যে গণহত্যা, বাড়িঘর-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও নারীদের ধর্ষণ হয়েছে, তার রেশ এখনো শেষ হয়নি। আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে গুজরাটে মুসলিম হত্যার করুণ কাহিনী তুলে ধরা হয়। নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গরু বিক্রি এবং গরুর গোশত খাওয়ার অভিযোগে বিজেপির সমর্থক পাহারাদাররা ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সনের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৪ জনকে হত্যা করে। তাদের মধ্যে ৩৬ ছিলেন মুসলিম।
‘লাভ-জিহাদ’ : হিন্দু যৌতুক প্রথায় অতিষ্ঠ হয়ে মুসলিম পুরুষের সঙ্গে হিন্দু কন্যাদের স্বতঃস্ফূর্ত বিয়ে দেওয়াকে ‘লাভ-জিহাদ’ নামে অভিহিত করে উগ্র হিন্দুরা। মুসলিম হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করে হিন্দুদের সংখ্যা হ্রাসের চক্রান্তে লিপ্ত এই অভিযোগে মুসলিমদের নির্যাতন করে ঐ উগ্ররা। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ১৮ মে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে মুসলিম নির্যাতন-নিপীড়ন এখন অঘোষিতভাবে আইনসম্মত। এই নির্যাতন শিক্ষাঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে বিপদে রয়েছে মুসলিম মেয়ে শিক্ষার্থীরা। আর দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে জানায়, বিদ্যালয়ে হিজাব বা বোরকা পরা নিষিদ্ধ করার কারণে কর্ণাটকে এক হাজারের বেশি মুসলিম ছাত্রী বিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন যেটি মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন।
চৌদ্দ শতকের ভোজশালা মসজিদের জায়গাকে মন্দির বলে রায় : ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার জেলার ভোজশালা-কামাল মাওলা মসজিদের স্থানকে সরস্বতী মন্দির বলে সম্প্রতি রায় দেয় মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, ভোজশালা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ও ব্যবস্থাপনা ভারতের আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) হাতেই থাকবে এবং পূজার্চনার অধিকারী হবে শুধু হিন্দুরাই। ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের দাবি, এটি ‘কামাল মাওলা দরগা ও মসজিদ’। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) মতানুসারেও চতুর্দশ শতকে সুফি সাধক কামালউদ্দিনের মৃত্যুর পর ওই অঙ্গনে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। সেখানে মসজিদ গড়ে ওঠে, যা ‘কামাল মাওলা মসজিদ’ নামে খ্যাত। মুসলিম স্বত্ব উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার বাবরি মসজিদের মতো ভোজশালার মসজিদও কেড়ে নিল উগ্র বিজেপি।
অভিন্ন দেওয়ানি আইন-মুসলিমদের উদ্বেগ : ভারতের আসাম রাজ্যে ইউনিফর্ম সিভিল কোড (ইউসিসি) বা অভিন্ন দেওয়ানি আইন চালু হতে যাচ্ছে। গত ২০ মে বুধবার রাজ্যটির নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পরে প্রথম বৈঠকে ইউসিসি নিয়ে প্রস্তাব পাস হয়েছে। প্রস্তাবটি বিল আকারে আগামী ২৬ মে রাজ্যের বিধানসভায় পাস হবে বলে জানানো হয়েছে। ভারতের আরও কিছু রাজ্য ইউসিসি পাসের পথে এগিয়ে গেছে। আসামের পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে প্রথমবার জিতে সরকার গঠন করেছে বিজেপি। নির্বাচনী ইশতেহারে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিও ইউসিসি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ভবিষ্যতে সেখানেও ইউনিফর্ম সিভিল কোড চালু হবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের মুসলিমদের অনেক সংগঠন এবং মুসলিম সমাজের বিশ্বাস অনুযায়ী মুসলিম বিবাহ, তালাক, ওয়ারিশ ইত্যাদি শরিয়ার ভিত্তিতে করা বাধ্যতামূলক। তবে বিজেপি-শাসিত অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে তুলনা টেনে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বশর্মা বলেন, উত্তরাখণ্ড, গোয়া ও গুজরাট এরই মধ্যে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে। আসাম এখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই আইন অনুমোদন করেছে। তিনি বলেন ইউসিসি ‘এক দেশ, এক আইন’ নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন আইন ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে লঙ্ঘন করে।
দেশজুড়ে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক হামলা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে আনল ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার (আইপিটি)। সংস্থাটির প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, শুধু এই চার মাসে দেশের আটটি রাজ্যে চরমপন্থী ধর্মীয় সংগঠনের হামলায় অন্তত ১৩ জন মুসলিমের মৃত্যু হয়েছে। সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই সংস্থার রিপোর্টে একটি আত্মহত্যার ঘটনাও নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ১২টি রাজ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ১৮টি রাজ্যে বিদ্বেষমূলক অপরাধ, হুমকি ও ভয় দেখানোর একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সময়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও আক্রমণ ও বৈরিতার ঘটনা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে রিপোর্টে। পশ্চিমবঙ্গসহ প্রায় হাজার বছরের মুসলিম শাসনের ভারতজুড়ে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর হিন্দুত্ববাদী হত্যা, জুলুম, নিপীড়ন চলছে তা এখনই বন্ধ করতে হবে।
তথ্যসূত্র : ডেইলি ডন, বিবিসি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস, আনন্দ বাজার, পুবের কলম।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com