সারা বছরের ভাইরাসজনিত রোগ


২১ মে ২০২৬ ১০:০৬

সচেতনতা ও টিকা করবে প্রতিরোধ

॥ হামিম উল কবির ॥
বাংলাদেশে ভাইরাসের কারণে প্রচুর মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকে; এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই ভাইরাসগুলো সারা বছরই রোগ-ব্যাধির কারণ। ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, তবে লক্ষণ দেখে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শরীরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়। লক্ষণ দেখে চিকিৎসা দিলে আক্রান্তের রোগের প্রকোপ আর বাড়ে না এবং একসময় সুস্থ হয়ে যায়। কিছু কিছু ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা রয়েছে। টিকা নেয়া হলে শরীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোনো ওষুধ না থাকলেও সচেতন হলে ভাইরাসটি থেকে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে।
ঋতু পরিবর্তনের ভাইরাস : ঋতু পরিবর্তনের সময়ে কিছু ভাইরাসের বিস্তার ঘটে। ফলে সর্দি-কাশি, জ্বর, গলাব্যথা এবং শরীর ব্যথা করে থাকে শরীরে। এই ভাইরাসগুলো হলো ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, রাইনো ভাইরাস, অ্যাডিনো ভাইরাস।
রাইনো ভাইরাসে সারা বছর ধরে মানুষের সর্দি লেগে থাকে। অ্যাডিনো ভাইরাস শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে সর্দি, কাশি, জ্বরের কারণ ঘটায় এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়ে থাকে এই ভাইরাসটি।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের কারণে অতীতে মহামারি হয়েছে এর বিরুদ্ধে প্রতিষেধক না থাকায়। ১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যে ইনফ্লুয়েঞ্জায় বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। তখন এটাকে স্পেনিশ ফ্লু নামে অভিহিত করা হয়। তখন এর বিরুদ্ধে করোনা ভাইরাসের মতো কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এরপরও বিভিন্ন সময়ে নতুন নতুন ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের উদ্ভব হয়ে বিশ্বব্যাপী প্রচুর মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে। একই ভাইরাসের বিভিন্ন রূপ মানুষ, পাখি, শূকরের নানা প্রজাতির জীবকে পোষক রূপে ব্যবহার করে মৃত্যু ঘটিয়েছে। তিন ধরনের ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস চিহ্নিত হয়েছে। সেগুলো হল টাইপ এ, বি ও সি। টাইপ ‘এ’ ইনফ্লুয়েঞ্জা পাখি, শূকর, ঘোড়া এবং সিলকে সংক্রমিত করে। এই প্রাণীগুলোর জন্য ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘বি’ ভাইরাস মাঝে মাঝে কিছু মহামারির জন্য দায়ী হলেও ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘সি’ ভাইরাস তেমন ক্ষতিকর নয়
আবহাওয়া বদলালে অনেকেরই ঠাণ্ডা সর্দি-জ্বর হয়। নাক দিয়ে পানির ধারা ঝরে, হাঁচি হয়। অনেকের গলা খুসখুস, কফ, জ্বর, শরীর ব্যথা, মাথা ধরা, চোখ ছলছল করে ও শরীরও গরম হয়ে ক্লান্তিও চলে আসে। ক্রমে ক্রমে শ্লেষ্মা হতে পারে। চিকিৎসকরা বলেছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে জ্বর খুব বেশি হয় না কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। এটাকে অনেকেই সাধারণ ঠাণ্ডা লাগা বলে থাকে। এর পেছনে কোল্ড ভাইরাসের ২০০’র বেশি প্রজাতি দায়ী। শ্বাসনালির ওপর অংশ নাক ও গলায় বেশি আক্রমণ করে। চিকিৎসকরা বলছেন, এটা আপাত দৃষ্টিতে নিরীহ অসুখ বলে ধরে নেয়া হলেও এর সাথে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ হলে শ্বাসনালির নিচের ভাগ ও ফুসফুসও আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান বলেন, শিশু ও বয়স্কদের এমন ঠাণ্ডা লাগলে সতর্ক থাকতে হবে বেশি। তা থেকে হঠাৎ নিউমোনিয়া হয় যেতে পারে। কোল্ড ভাইরাস ধরলে উপসর্গ দেখা দেয় এক থেকে তিন দিন পর। এটা ছোঁয়াচে, সরাসরিও সংক্রমণ ঘটতে পারে কোনো স্পর্শ ছাড়াই। হাঁচি দিলে বা কাশি হলে মুখ থেকে পানির কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা থেকে অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে। কেউ হাঁচি দিলে সেই হাঁচি হাত দিয়ে চেপে ধরে পরে হাতল ধরে দরোজা বন্ধ করে চলে গেলে সেই হাতলে অন্য কেউ হাত লাগিয়ে মুখের কাছে হাত নিলে সেই ভাইরাসগুলোয় সংক্রমিত হয়ে থাকে। হাঁচি হাত দিয়ে মুছে অন্যের সঙ্গে হাত মেলালেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস
বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে (জুলাই থেকে অক্টোবর, এখন অবশ্য বাংলাদেশে সারা বছরই সংক্রমণ ঘটে থাকে) এই ভাইরাসগুলোর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এই দুটি ভাইরাস এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এডিস মশা নিজে রোগ ছড়ায় না। এর মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাসের জীবাণু প্রবেশ করে মানুষকে কামড়ালেই সংক্রমণ ঘটে। এডিস ইজিপ্টাই বা এডিস এল্বোপিক্টাস জাতের স্ত্রী মশার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়ায়। বৃষ্টি, তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতা মশার জীবনযাপন, ডিম পাড়া, ডিম ফোটা এবং রোগ ছড়ানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনুকূল পরিবেশ পেলে এডিস মশার বংশ বৃদ্ধি বেশি ঘটে। এডিস মশা মানুষের বসতির সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। এরা বেশিরভাগ সময়ই মানুষের বসতির আশপাশে যেখানে তুলনামূলক পরিষ্কার পানির মধ্যে ডিম পাড়ে। এই মশারা ভোর আর সন্ধ্যা বেলায় বেশি কামড়ায়। এরা খুব বেশি দূর উড়তে পারে না, বেশি হলে ১১০ গজ উড়তে পারে। নিজের ডানায় ভর করে দোতলার বেশিও উঠতে পারে না, কিন্তু লিফটের সাহায্যে বা কোনো কিছুর ওপর বসে এরা যে কোনো উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। এই মশার কামড় খুব একটা টের পাওয়া যায় না, আলতোভাবে ঘাড়ে বা পায়ে কামড়ে দেয়। এদের পেট না ভরা পর্যন্ত তাড়িয়ে দিলেও বারবার কামড়ে চলে এবং একজন থেকে অন্যজনের শরীরে বসতে থাকে। এর ফলে দ্রুত রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে। তাই এক মশা থেকেই ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে পরিবারের সকলের আক্রান্ত হবার ঘটনা ঘটতে পারে। এডিস মশার মধ্যে ডেঙ্গু ভাইরাস প্রবেশ করার ৪ থেকে ১০ দিন পর থেকে যতদিন বেঁচে থাকে রোগ সংক্রমণ করার ক্ষমতা রাখে। এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস এল্বোপিক্টাস মশার ডিমের ভেতরেও ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের জীবাণু বহন করতে পারে। ডিমের মাধ্যমে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার জীবাণু বহন করতে পারে বলে এই জীবাণু প্রকৃতিতে অনেক দিন টিকে থাকে।
ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে শরীরের রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে। রক্তের তরল অংশ রক্তনালি থেকে বের হয়ে শরীরে জমা হয় বলে তীব্র ব্যথা, জ্বর, চামড়ায় লালচে র‌্যাশ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও শক হতে পারে। ডেঙ্গু হলে মানবদেহের ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন পরিবর্তন ও লক্ষণ প্রকাশ পায়। রক্ত ও রক্তনালির পরিবর্তন ঘটে; রক্তের রক্ত জমাটবাঁধার কোষ বা প্লাটিলেট দ্রুত হ্রাস পায় বলে শরীরের যেকোনো স্থান থেকে রক্তপাতের ঝুঁকি তৈরি হয়। রক্তনালি লিক হয়ে গেলে রক্তনালির দেয়াল দুর্বল হয়ে তরল অংশ (প্লাজমা) বের হয়ে ফুসফুস ও পেটের চারপাশের ফাঁকা জায়গায় জমতে পারে। মারাত্মক ডেঙ্গু হলে হঠাৎ ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের তীব্র জ্বর হতে পারে। প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে তীব্র ব্যথা এবং হাড়, পেশি ও জয়েন্টে অসহ্য ব্যথা অনুভূত হয়। মনে হয় শরীরের হাড় ভেঙে গেছে। জ্বরের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম দিনের মধ্যে বুকে, পিঠে বা মুখে ছোট ছোট লালচে দানা বা র‌্যাশ দেখা দিতে পারে। প্রচণ্ড বমি ভাব, বমি হওয়া, খাওয়ার অরুচি এবং চরম ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব হয়ে থাকে।
নিপাহ ও রিও ভাইরাস
শীতকালে কাঁচা খেজুরের রস বা বাদুড়ের খাওয়া ফল থেকে এই ভাইরাসগুলো ছড়ায়। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কের প্রদাহের কারণ হতে পারে। বাংলাদেশে যেসব অঞ্চলের মানুষ খেজুরের কাঁচা রস পান করে থাকে, সেসব অঞ্চলে রোগটি দেখা যায়। এটা খুবই প্রাণঘাতী রোগ। অনেক সময় আক্রান্তের সবার মৃত্যু হয়ে থাকে। নিপাহ ভাইরাস একটি প্রাণীবাহিত রোগ, যা বাদুড় থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়। ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে প্রথম রোগটি শনাক্ত হয়। বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতে ৩টি প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যায়। সেগুলো হলো শিলিগুড়িতে (২০০১), নদিয়ায় (২০০৭) এবং কেরালায় (২০১৮)। এগুলোয় মোট ৬৬ জন রোগীর মাঝে ৪৫ জন অর্থাৎ ৭৫ শতাংশের মৃত্যু হয়। এই তিনটি প্রাদুর্ভাবের প্রথম উৎস নিশ্চিত না হলেও মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়। ফিলিপাইনে ২০১৪ সালের প্রাদুর্ভাবে ১৭ জনের মধ্যে ৯ জন মারা গিয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রথম নিপাহ ভাইরাসের তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু শনাক্ত করা হয় ২০০৪ সালে। তখন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই নিপাহ প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া যাচ্ছে। মোট ৩০৩ জন নিপাহ আক্রান্ত রোগীর মাঝে ২১১ জন বা ৭০ শতাংশের মৃত্যু ঘটেছে।
খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য গাছের কাণ্ডের একদম ওপরের দিকে খানিকটা অংশ চেঁছে সেখানে সারারাত হাঁড়ি ঝুলিয়ে রাখা হয়। ইনফ্রারেড ক্যামেরা অন্ধকারেও ছবি তুলতে পারে এমন ক্যামেরা (ইনফ্রারেড) দিয়ে তোলা ছবি থেকে দেখা যায় বাদুড় হাঁড়ি থেকে রস চাটছে, বা গাছের চাঁছা অংশে মুখ দিচ্ছে অথবা হাঁড়ির মধ্যে প্রস্রাব করছে। নমুনা সংগ্রহ করে বিশেষ পরীক্ষার (পিসিআর) মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাসের আরএনএ (জিনেটিক কোড) নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা গেছে। নেশাজাতীয় পানীয় ‘তারি’ নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বেশিরভাগ নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরই জ্বর হয়। অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে ঘুমঘুম ভাব, মাথাব্যাথা, এলোমেলো লাগা, ঝিমুনি, বমি, অচেতন হওয়ার পাশাপাশি মস্তিষ্কে প্রদাহ ও শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা থাকে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ জানান, প্রাথমিক সংক্রমণ ও একজন থেকে অন্যজনে ছড়ানোর মাঝে এই রোগের সুপ্তাবস্থার সময়সীমা ২ থেকে ৩৬ দিন হতে পারে।
শিশুদের হাম বা মিজলস
হাম মূলত ‘মিজেলস’ বা ‘রুবিওলা’ নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত রোগ। হাম খুবই ছোঁয়াচে রোগ। হাঁচি, কাশির মাধ্যমে মুহূর্তেই হামের ভাইরাস আক্রান্ত শিশুর কাছ থেকে আশপাশে থাকা অনেক সুস্থ্ শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে। একটি আক্রান্ত শিশু ৯ থেকে ১৮টি শিশুকে আক্রান্ত করতে পারে। উচ্চমাত্রার জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, রক্তবর্ণের চোখ এবং জ্বরের চার দিনের মাথায় মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র‌্যাশ নিয়ে হাম আবির্ভূত হয়। মিজেলস ভাইরাসটি শ্বাসনালি দিয়ে শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাময়িকভাবে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হামে আক্রান্ত হলে শিশু নানারকম ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণু দ্বারা সহজে সংক্রমিত হয়। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকায় এবং সময় হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা নিতে না পারায় নিউমোনিয়ায় অনেক শিশুর মৃত্যু ঘটে থাকে। ফলে হামের জটিলতায় হামের জটিলতা হিসেবে পরবর্তী সময়ে প্রায়ই নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া হতে পারে।
হাম আক্রান্ত শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’র মজুদ মারাত্মকভাবে কমে যায়। ফলে শিশুর চোখের পানি কমে যায় বা চোখ শুষ্ক হয়ে যায়, এ থেকে রাতকানা থেকে শুরু করে অন্ধত্ব পর্যন্ত হতে পারে। হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর কানপাকা, মুখে ঘা, মারাত্মক অপুষ্টি, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরো অনেক রকম জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুবার ‘এমআর’ (মিজলস রুবেলা) টিকা দেয়া হয়। একবার ৯ মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে।
টিকা নেয়ার পরও হাম হচ্ছে। দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। এর কারণ হিসেবে মিরপুরের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের শিশু আইসিইউ বিশেষজ্ঞ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আবু তালহা বলেন, এখনো অনেক জায়গায় অনেক শিশু এই ‘এমআর’ টিকা পায়নি বা টিকা দেয়ার জন্য তাকে টিকাকেন্দ্রেই নিয়ে যাওয়া হয়নি অথবা কেউ কেউ একটা নিয়েছে। এ কারণে টিকাবঞ্চিত শিশুর আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যেমন বেশি, আক্রান্ত হলে অন্যদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাও অনেক বেশি। অনেক সময় টিকা প্রাপ্ত শিশুর শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলেও সে আবার হামে আক্রান্ত হতে পারে।
অভিভাবকের করণীয় : চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিকসহ তাকে পরপর দুই দিন দুটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।
ডায়রিয়ার জন্য দায়ী রোটা ভাইরাস
বাংলাদেশে মারাত্মক ডায়রিয়ার জন্য রোটা ভাইরাস নামক এক ধরনের জীবাণু দায়ী। সারা বছরই বাংলাদেশে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। বাংলাদেশে গ্রীষ্মের শুরুতে (মার্চ থেকে জুন) এবং বর্ষার শেষে (সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর) বেশি ডায়রিয়া হয়ে থাকে। শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে শীতকালীন ডায়রিয়া হয়ে থাকে। শীতকালীন ডায়রিয়া হয়ে থাকে রোটা ভাইরাসের কারণে। এটা মারাত্মক হয়ে থাকে। রোটা ভাইরাস সংক্রমণের ইনকিউবেশন পিরিয়ড ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার প্রায় দুই দিন পরে। প্রাথমিক লক্ষণ জ্বর এবং বমি এবং পরে চার থেকে আট দিনের মধ্যে পানির মতো ডায়রিয়া হয়। রোটা ভাইরাস সংক্রমণে পেটে ব্যথা হতে পারে। এমনকি যদি চিকিৎসা না করালে গুরুতর পানিশূন্যতা হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। রোটা ভাইরাসের লক্ষণগুলি শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পরিবর্তিত হয়।
শিশুদের মধ্যে কিছু উপসর্গ অন্তর্ভুক্ত : অত্যধিক ক্লান্তি, বমি, উচ্চতাপমাত্রার জ্বর, খিটখিটেভাব, পেটে ব্যথা অন্যতম। এর মধ্যে পানিশূন্যতা শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। পানিশূন্যতা হলে শরীর থেকে খনিজ পদার্থ সমৃদ্ধ তরল এবং ইলেক্ট্রোলাইট কমে গিয়ে মৃত্যু হতে পারে। শিশুর পানিশূন্যতা হলে শুষ্ক মুখ, শীতল ত্বক, প্রস্রাবের পরিমাণ ও সময় হ্রাস পায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে রোটা ভাইরাসের সংক্রমণ হলে বমি, অত্যধিক ক্লান্তি, মাত্রাতিরিক্ত জ্বর, খিটখিটেভাব, পেটে ব্যথা হয়। রোটা ভাইরাস জীবাণু সংক্রামিত ব্যক্তির মলের মধ্যে উপসর্গের কমপক্ষে দুই দিন আগে উপস্থিত থাকে এবং লক্ষণগুলো হ্রাস পাওয়ার পর দশ দিন পর্যন্ত দেখা যায়। এই ভাইরাল সংক্রমণে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি মলমূত্র ত্যাগ করার পর তাদের হাত না ধুইলে অন্যের মধ্যে ছড়াতে পারে বিশেষ করে মা থেকে শিশুর মধ্যে। রোটা ভাইরাস সংক্রমণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তবে লক্ষণগুলোর ব্যবস্থাপনা এবং বারবার তরল পান করে বা খাবার স্যালাইন পান করে পানিশূন্যতা রোধ করতে হয়।
টিকা আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
টিকা ২ মাস এবং ৪ মাস বয়সী শিশুদের দুটি ডোজে দেয়া হয়। আবার আরেকটি টিকা মুখের মাধ্যমে তিন ডোজে দেয়া হয় ২, ৪ এবং ৬ মাসের ব্যবধানে।