অসুস্থ পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স


১৫ মে ২০২৬ ২১:৩১

আরিফ সাদাত, পুঠিয়া (রাজশাহী) : নানা অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অনিয়ম যেন তার নিত্যসঙ্গী। পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দামি ওষুধগুলো পায় না সাধারণ রোগীরা। তবে দামি ওষুধ নিতে হলে রাজনৈতিক এবং এলাকার পরিচিত ব্যক্তির তদবির থাকলে দামি ওষুধ পাওয়া যায়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অসাধু কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দামি ওষুধগুলো তাদের আত্মীয়-স্বজন এবং কাছের মানুষের মাঝে বিতরণ করার অভিযোগ উঠেছে। ভর্তি রোগীদের খাবারও নিম্নমানের। এদিকে গত আট মাস ধরে ছয় ইউনিয়নে ২৮টি কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগীদের ওষুধ দেওয়া বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
জানা গেছে, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সরকারি নিয়মানুযায়ী এখানে ২৮ জন চিকিৎসক কর্মরত থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত ডাক্তারের সংখ্যা রয়েছে ১৫ জন। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পদ রয়েছে ১১ জন। আর এখন আছেন ৮ জন। এদের মধ্যে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মতিউর রহমান দীর্ঘ ১৭ মাস যাবত ধরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেষণে সংযুক্তি হিসেবে রয়েছেন। কিন্তু তার বেতন-ভাতা এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হতে দেওয়া হচ্ছে।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের পাশে হওয়ায় কয়েকটি উপজেলার মিলন স্থলে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রতিদিন বহির্বিভাগে শত শত রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। রোগীর গাদাগাদিতে পা ফেলার স্থান নেই। অনেক চিকিৎসকরা দুপুর ১২টার পর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো রোগী দেখেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে। আবার কেউ কেউ কর্মরত অবস্থায় উপজেলার বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা স্বাস্থ্যসেবা দিতে দেখা যায়। গাইনি ডাক্তার থাকলেও সিজার অপারেশন করেন না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকল প্রকার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা থাকলেও বেশিরভাগ পরীক্ষা বিভিন্ন অজুহাতে বাহির হতে ডাক্তাররা করিয়ে থাকেন। এখানে যুগের পর যুগ অনেক কর্মচারী-কর্মকর্তা অনিয়ম করার পরও তারা বহাল তবিয়তে রয়েছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকজনকে আউট সোর্সভিত্তিক কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল। বর্তমান কর্তৃপক্ষ চাকরি থেকে তাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। এখন তারা বিভিন্ন ডাক্তার ও প্রাইভেট ক্লিনিকের হয়ে হাসপাতাল হতে আয় করছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বহির্বিভাগে আসা রোগীদের আউটসোর্সিং কর্মচারীদের অনিয়ম প্রকাশ্যে দেখতে পাওয়া যায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের জন্য অত্যন্ত নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয় এমন অভিযোগ চিকিৎসাধীন রোগীদের।
এদিকে কাকডাকা ভোর হতে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকের নারী-পুরুষ দালালদের টানাহেঁচড়ায় রোগীরা অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। গোলাম রসুল নামে রোগীর স্বজন বলেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন শতশত রোগী আসেন। হাসপাতাল থেকে দুই-তিনটির বেশি ওষুধ দেওয়া হয় না। গ্রাম থেকে আসার জন্য আমাদের দামি ওষুধ দেওয়া হয় না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়া ভালুকগাছি ইউনিয়নের রোগী শেফালি বেগম বলেন, পুঠিয়া সদরে যারা বসবাস করেন এবং হাসপাতালের লোকদের সঙ্গে সুসর্ম্পক রয়েছে কেবল সেসব রোগীকে সরকারি দামি ও ভালো ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। আর আমাদের দামি ওষুধগুলো বাহির হতে কিনে আনতে বলা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মচারীরা জানায়, রাজনৈতিক তদবিরে হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে দামি ওষুধ নিয়ে বাইরে গিয়ে বিক্রি করে দেয়। আমরা প্রতিবাদ করলে মবের শিকার হবো। এ কারণে সাধারণ গ্রামের রোগীরা দামি ওষুধ হতে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। উপজেলা স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা ডা. শশী শবনম চৌধুরী বিভিন্ন অজুহাতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত অফিসে আসেন না।
প্রাইভেট ক্লিনিকের মহিলা দালালদের সূত্রে জানা গেছে, তাদের ক্লিনিক ও প্যাথলজির মালিকরা নিয়মিত হাসপাতালের ডাক্তারদের মাসোহারা দিয়ে থাকেন। তাই আমরা প্রতিদিন হাসপাতালে এসে ক্লিনিকের জন্য রোগী নিয়ে যাই।
এ ব্যাপারে পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সূচনা মনোহরা বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে কিছু ব্যক্তি নিয়মিত দামি ওষুধ নিয়ে যায়, তা আমি শুনেছি। এই চক্রটিকে আমরা হাতেনাতে ধরার চেষ্টা করছি। হাসপাতালে বর্তমানে মেডিসিন, যৌন, চর্ম, চোখ ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ভীষণ প্রয়োজন রয়েছে। অনিয়মগুলো দূর করার চেষ্টা করছি।