বাংলাদেশ-পাকিস্তান সহযোগিতা চুক্তি

চাণক্যপুরিতে অস্বস্তি

সোনার বাংলা অনলাইন
১৪ মে ২০২৬ ১০:৩৪

শুক্রবার রাজধানী ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই দেশের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই সমঝোতা স্মারকে সই করেন

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ভারতের দাদাগিরির ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (ইন্টেরিয়র মিনিস্টার) সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভির বাংলাদেশ সফর। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং ‘মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস’ সহযোগিতা চুক্তির খবরে ভারতের কপালে চিন্তার ভাঁজ লক্ষ করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কিন্তু কেন? কী এমন আছে এ চুক্তিতে?
কিছু সংবাদমাধ্যমে সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভির এ সফরকে বেসরকারি বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাদের ভাষায়, তিনি আসছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান হিসেবে। তাদের পক্ষ থেকে এমন প্রচার করা হলেও আস্তে আস্তে সেই রহস্যের পর্দা খুলতে শুরু করলে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক চাণক্যপুরীতে অস্বস্তির শীতল বাতাস বইতে শুরু করে। তারা নড়েচড়ে বসেন। তাদের পুরোনো চাল অচল হওয়ার আশঙ্কায় নরেন্দ্র মোদির সরকার বাংলাদেশের সাথে বৈরী আচরণের বদলে সুর নরম করে বিষয়টি প্রথমে বোঝার ও পরে মোকাবিলার ছক আঁকতে শুরু করে। কারণ তাদের পুরোনো অস্ত্র ‘ভাগ কর ও শাসন করো’ অচল হতে চলেছে।
কেন পুরোনো অস্ত্র অচল হতে চলেছে
ভাগ কর এবং শাসন কর- ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষকদের এ নীতি ভারতের চাণক্যবাদীরা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছে। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর এ কূটকৌশলে উপমহাদেশের ভ্রাতৃপ্রতিম দেশগুলোর মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করে ভারত প্রায় আশি বছর যাবত দাদাগিরি ফলাচ্ছে। তাদের দাদাগিরির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি কৌশলী উদ্যোগ ছিলো- সার্ক (SAARC-South Asian Association for Regional Cooperation) বা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা। তিনি এর স্বপ্নদ্রষ্টা হলেও সার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় তার শাহাদাতবরণের পর। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ঢাকায় এ সংস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু ভারতের দাদাগিরির কারণে এ মহতি উদ্যোগ এখন নিষ্ক্রিয়প্রায়। সাপ্তাহিক সোনার বাংলার একটি সংখ্যায় সার্কের অচলাবস্থা তুলে ধরে ‘ভারতের শার্ক (হাঙর)-এর কবলে সার্ক’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে সেই ১৯৯০-এর দশকে। ভারত শুধু সার্কই গিলে খাইনি। ভারত ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে দূরত্ব সৃষ্টি করে রেখেছে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, এবার সেই দূরত্বের দেয়াল ভাঙার সময় এসেছে। গত ৮ মে শুক্রবার ঢাকায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা, মাদক ও মানব পাচার রোধে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর সেই দূরত্বের দেয়াল ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
কী আছে এ চুক্তিতে
চুক্তিতে যাই থাকুক না কেন, ভারতের ভাবনার কারণ আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের বিষয়টি। ভারতীয় বিশ্লেষকদের যুক্তি, পাকিস্তানের সাথে আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা চুক্তির কী দরকার বাংলাদেশের। দেশটির সাথে তো বাংলাদেশের কোনো সীমান্ত নেই। বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে আছে ভারত। তার মানে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারত অশান্তি সৃষ্টি করলে বাংলাদেশ-পাকিস্তান একসাথে তার জবাব দেবে।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ও ভারতের ভাবনার কারণ। বিষয়টি এতদিন তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কারণ হাসিনার দেড় দশক বাংলাদেশের গোটা গোয়েন্দা বিভাগে ছিল তাদের অসীম আধিপত্য। সেনানিবাসের ভেতর আয়নাঘর তৈরি করে হাসিনা সরকারের আসকারায় কিছু অনুগত বিপৎগামী অফিসারের সহযোগিতায় ভারত বিনা বাধায় সৈনিকদের অবৈধ কাজে বাধ্য করত। বাংলাদেশের চৌকস ও মেধাবী অফিসারদের আয়নাঘরে বন্দি রাখত, চাকরিচ্যুত করত। বলতে গেলে বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ছিল ভারতের কাছে পণবন্দির মতো নয়তো খেলার পুতুল। তাই এ সুযোগ হারানোর যাতনা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। এ চুক্তিতে আর কী আছে?
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এ চুক্তির সংক্ষিপ্তসার হলো-
১. মাদক ও মানব পাচার রোধ : মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার রোধে যৌথ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
২. গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান : মাদক চোরাচালানকারী ও তাদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন।
৩. সহযোগিতার ক্ষেত্র : অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন এবং সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।
৪. সীমান্ত নিরাপত্তা সহায়তা : পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের ‘সেফ সিটি প্রজেক্টে’ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছেন।
১০ বছর মেয়াদি এ চুক্তি, যা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ৩৬ জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের এটি একটি সাহসী উদ্যোগ। এর ফলে বাংলাদেশের সাথে এখন আর ভারত করদরাজ্যের মতো ব্যবহার করার সাহস দেখাবে না। সমমর্যাদার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কোন্নয়ন ছাড়া ভারতের সামনে কোনো বিকল্প নেই। যদি এদেশীয় ভারতীয় দালালদের ব্যাপারে সরকার ও জনগণ সতর্ক থাকে।
কারণ পুরোনো কাসুন্দি বা বয়ান দিয়ে বাংলাদেশকে নিজেদের হাতের পুতুল বানানোর ভারতীয় বয়ান বাস্তবায়নে পতিত ও নিষিদ্ধ আওয়ামী এবং তাদের ল্যাসপেন্সার বা সহকারী, অনুচর, শিষ্য বা শাগরেদরা এখনো তৎপর। তারা তাদের মিডিয়া ব্যবহার করে ভ্রাতৃপ্রতিম দুই দেশের সম্পর্ক নষ্ট করতে নতুন নতুন ছক আঁকছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
অথচ কোনো দেশের সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা লাভ করলেই তাকে শত্রু ভাবতে হবেÑ পৃথিবীর ইতিহাস এমন কথা বলে না।
পৃথিবীর ইতিহাস কী বলে
পৃথিবীর ইতিহাস খোঁজার আগে একটু ভারতীয় উপমহাদেশের দিকে নজর দেয়া যাক। এ উপমহাদেশের মানুষ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক দখলদার শোষক বেনিয়াদের বিরুদ্ধে ১৯০ বছর সংগ্রাম করেছে।
ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা, হাজী শরীয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন, বালাকোটের যুদ্ধ, টিপু সুলতানের প্রতিরোধ আন্দোলন, সিপাহি বিদ্রোহ, সত্যাগ্রহ, অসহযোগ আন্দোলনসহ ছোট বড় শত শত আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ শহীদ হয়েছেন, আন্দামানের দ্বীপে কত শত স্বাধীনতাকামী নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু ব্রিটিশদের সাথে স্বাধীনতা লাভের পর সকল বৈরিতা ভুলে ভারত সম্পর্ক ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে যোগ দিল তাদের গড়া কমনওয়েলথ অব নেশন্সে। আমেরিকা স্বাধীনতা লাভ করেছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু এখন তারা একে অপরের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র।
চুক্তির আন্তর্জাতিক প্রভাব
মুসলিম বিশ্ব বাংলাদেশের সাথে পাকিস্তানের এ চুক্তিকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী সংবাদপত্র আরব নিউজ মন্তব্য করেছে, “Pakistan and Bangladesh were part of the same country until Bangladesh’s secession following a bloody civil war in 1971, an event that long cast a shadow over bilateral ties. Both countries have moved closer since 2024, following the ouster of Prime Minister Sheikh Hasina who was considered as an Indian. অর্থাৎ ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী ‘গৃহযুদ্ধের পর’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত পাকিস্তান ও বাংলাদেশ একই দেশের অংশ ছিল। এই ঘটনাটি দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর একটি কালো ছায়া ফেলেছিল। ২০২৪ সাল থেকে উভয় দেশ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে; বিশেষত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, যাকে ভারতপন্থী বলে মনে করা হতো।”  (তথ্য সূত্র:Pakistan, Bangladesh sign agreement to enhance cooperation against drug trafficking)পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে, নাকভি এবং তার বাংলাদেশি প্রতিপক্ষ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেছেন এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছেন। এতে আরও বলা হয়েছে, ‘তারা সন্ত্রাসবাদ দমন এবং মানব পাচার প্রতিরোধে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা করেছেন।’
ভারতের ইকোনমিক টাইমস, মাইল্যান্ড, দ্য প্রিন্টসহ প্রায় প্রত্যেকটি প্রভাশালী মিডিয়া বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দেশটির কোনো কোনো মিডিয়া নেতিবাচকভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করে জঙ্গিবাদের দিকে ইঙ্গিত দিলেও এ চুক্তি যে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে, তা কেউ অস্বীকার করেনি। প্রভাবশালী অনলাইন পোর্টাল মাইল্যান্ড লিখেছে, ‘বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যা মাদকবিরোধী কার্যক্রমের বাইরেও সহযোগিতাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করবে। এই চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ অভিযান এবং গোপনীয় বিনিময়ের জন্য একটি কাঠামো তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের পর এই পদক্ষেপটিকে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।’ ( তথ্য সূত্র:Bangladesh-Pakistan intelligence sharing agreement signals major shift in regional ties )
আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশ পাকিস্তানের এ সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ভারতের দাদাগিরির অবসানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে, এতে সন্দেহ নেই।

হারুন ইবনে শাহাদাত

সম্পর্কিত খবর